📄 বনূ বকর ও বনু খুযাআর সংঘর্ষ
ইবন ইসহাক বলেন: মৃতা অভিযান শেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুমাদাল উখরা ও রজব দুই মাস মদীনায় অবস্থান করেন।
তারপর একদা বনূ বকর ও বনূ আব্দ মানাত ইব্ন্ন কিনানা বনু খুযাআ গোত্রের উপর আক্রমণ করে বসে। তারা তখন মক্কার নিম্নাঞ্চলে ওতীর নামক একটি কূপের নিকট অবস্থান করছিল। উক্ত দু'টি গোত্রের সংঘাতের হেতু ছিল এই যে, মালিক ইব্ন আব্বাদ নামক বনু হাযরামীর জনৈক ব্যক্তি ব্যবসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঐ হাযরামী ব্যক্তিটি তখন ছিল আসওয়াদ ইবন রাযন এর চুক্তিবদ্ধ মিত্র। যখন সে বনু খুযাআর অঞ্চলের মাঝামাঝি এলাকায় পৌঁছল, তখন তারা তাকে হত্যা করে ফেলে এবং তার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এর প্রতিশোধ স্বরূপ বনূ বকরও বনু খুযাআর এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। ইসলামের আর্বিভাবের অব্যবহিত পূর্বে বনূ খুযাআ বনূ আসওয়াদ ইব্ন রাযন দায়লীর উপর হামলা করে সালমা, কুলসুম ও যুআয়ব নামক তিন ব্যক্তিকে আরাফাতে একেবারে হারমের সীমান্তফলকের নিকটে হত্যা করে। এঁরা ছিলেন বনূ কিনানার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব।
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ দায়লীর একব্যক্তি আমাকে বলেছে যে, জাহিলী যুগে বনূ রাযনের কোন ব্যক্তি নিহত হলে, তার বিনিময়ে দু'দুটো দিয়ত বা রক্তপণ দেয়া হত। পক্ষান্তরে, আমাদের কেউ নিহত হলে, তার জন্যে দেয়া হত একটা করে দিয়ত। কারণ, আমাদের মধ্যে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকৃত ছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ বকর ও বনূ খুযাআর মধ্যে এ হানাহানি চলতেই থাকে যাবৎ না ইসলাম এসে বাঁধা দেয় এবং মানুষজন তা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তারপর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও কুরায়শদের মধ্যে হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়, তখন কুরায়শগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি যে শর্তারোপ করে এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের প্রতি যে শর্তারোপ করেন, তন্মধ্যে একটি শর্ত ছিল, যেমন যুহরী যথাক্রমে উরওয়া ইন্ন যুবায়র, মিসওর ইন্ন মাখরামা ও মারওয়ান ইব্ন হাকাম থেকে বর্ণনা করেছেন:
যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া পসন্দ করবে, তারা তা পারবে, আর যারা কুরায়শদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হতে চাইবে, তারাও তা পারবে। এ শর্ত মুতাবিক বনূ বকর কুরায়শদের সাথে, আর বনু খুযাআ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়।
ইবন ইসহাক বলেন: এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় বনূ বকর এর শাখাগোত্র বনূ দায়লী একে গনীমতরূপে গ্রহণ করে এবং বনু খুযাআর নিকট থেকে বনূ আসওয়াদ ইবন রাযন-এর লোকদের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণে উদ্যত হয়। অবশেষে নাওফাল ইব্ন মুআবিয়া দায়লী দায়ল গোত্রে আসে। তখন সে তাদের সর্দার হলেও বনু বকর-এর সকলে কিন্তু তাকে সর্দাররূপে মান্য করতো না। সে তার দলবল নিয়ে এক রাতে অতর্কিতে বনু খুযাআর উপর আক্রমণ করে বসে। তখন তারা ওতীর নামক স্থানে তাদের কূপের নিকট অবস্থান করছিল। তারা প্রথমে ঐ গোত্রের এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। তারপর উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।
এদিকে কুরায়শরা ও বনূ বকরকে অস্ত্র সরবরাহ করে। এমন কি রাতের আঁধারে কিছু সংখ্যক কুরায়শ যোদ্ধা তাদের সাথে গোপনে যুদ্ধেও সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করে। একপর্যায়ে তারা বুযাআ-গোত্রীয়দেরকে ধাওয়া করে হারম সীমার মধ্যে ঠেলে দেয়। হারমে ঢুকে পড়ে গোত্রীয়রা বলল: হে নাওফাল, আমরা তো হারমে ঢুকে পড়েছি। এবার তুমি জান, আর উপাস্য দেবতারা জানে। জবাবে নাওফাল বলে: এতো একটা গুরুতর কথা! আজ কোন উপাস্য দেবতা নেই। তোমরা তোমাদের রক্তপণের শোধ নিয়ে নাও! আমার জীবনের কসম! তোমরা যখন হারমের মধ্যে চুরি করতে পার, সেখানে তোমরা তোমাদের রক্তপণের শোধ নিতে পারবে না কেন? অথচ ঘটনা হচ্ছে এই যে, বনূ বকর গোত্রই বনু খুযাআ গোত্রের মুনাব্বিহ্ নামক এক ব্যক্তিকে—ওতীর নামকস্থানে নৈশহামলা চালিয়ে হত্যা করেছিল। মুনাব্বিহ ছিল অত্যন্ত দুর্বল ও জরাগ্রস্ত লোক। সে এবং তার স্বগোত্রীয় তামীম ইবন আসাদ নামক আরেক ব্যক্তি একদিন কোথাও রওনা হয়েছিল। পথে মুনাব্বিহ্ তাকে লক্ষ্য করে বলে: তুমি তোমার নিজের জান বাঁচাও। আল্লাহ্র কসম! আমি তো মরতেই বসেছি। আমাকে ওরা মেরে ফেলুক বা ছেড়েই দিক আমার মনোবল ভেঙ্গে গেছে। এরপর তামীম তাকে ছেড়ে চলে যায়। বনু বকরের লোকজন একাকী নাগালে পেয়ে তাকে হত্যা করে ফেলে। বনু খুযাআ মক্কায় প্রবেশ করে বুদায়ল ইব্ন ওরাকা এবং রাফি নামক তাদেরই এক কৃতদাসের ঘরে আশ্রয় নেয়। এরপর মুনাব্বিহ্কে একাকী ফেলে পালিয়ে আসার ব্যাপারে ওযরখাহী করে তামীম ইব্ন আসাদ কবিতায় বলেন:
আমি যখন প্রত্যক্ষ করলাম— ধেয়ে আসছে বনূ নুফাসার মারমুখী লোকজন, বিস্তৃত সমভূমি, শক্ত কঙ্করময় ও নরম কাঁদামাটী সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে, চতুর্দিকে কেবল তারা আর তারাই অন্য কারো অস্তিত্বই নেই। বিশাল বপু ঘোড়াসমূহে সওয়ার হয়ে তখন আমার স্মৃতিপটে জাগরুক হল—
তাদের তো বেশ কিছু রক্তপণ আমাদের কাছে পাওনা আছে বেশ কিছু কাল ধরে।
আমি তখন তাদের দিক থেকে পেলাম মৃত্যুর গন্ধ আর শঙ্কিত হলাম ভারতীয় শাণিত তরবারির প্রচণ্ড মারের ব্যাপারে।
আমি অনুভব করলাম, তাদের হাতে যে-ই পড়বে, তার আর রক্ষা নেই; তারা নির্ঘাৎ তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে সিংহী আর তার শাবকের আহার্য সরবরাহ করবে। আর তার উচ্ছিষ্ট তারা রেখে দেবে— কাকের আহার্য রূপে।
আমি তখন আমার পদযুগলকে শক্ত করে দাঁড়িয়ে গেলাম।
হোঁচট খাওয়ার ভয় তখন আমার আর রইলো না, আর বস্ত্রাদি ছুঁড়ে ফেলে দিলাম তরুলতাহীন প্রান্তরে এমনিভাবে আমি আমার প্রাণটা বাঁচালাম।
ঐ সময় আমি যেভাবে এস্তপদে ছুটে পালিয়েছি সম্ভবতঃ শূন্য উদর বিশিষ্ট কোন গর্দভও এভাবে ছুটে পালাতে পারে না।
সে (অর্থাৎ আমার সহধর্মিণী) আমাকে ভর্ৎসনা করে আমি নাকি হচ্ছি চরম ভীতু, অথচ সে নিজে যদি ঐ ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা স্বচক্ষে দেখতে পেতো,
তবে রীতিমত প্রস্রাব করে তার গুপ্তাঙ্গের চতুর্দিক (তথা কাপড়-চোপড়) ভিজিয়ে তুলতো!
আমাদের লোকজন সম্যক জ্ঞাত আছে, মুনাব্বিকে ছেড়ে সাধে আমি পালিয়ে আসিনি। ওরে পোড়া কপালী যদি তোর বিশ্বাস না হয়। আমার সঙ্গী সাথীদেরকে জিজ্ঞাসা করে দেখ, কী মারাত্মক পরিস্থিতির সেদিন উদ্ভব হয়েছিল।
ইবন হিশাম বলেন: বর্ণিত আছে যে, উক্ত পংক্তিগুলো মূলতঃ হাবীব ইব্ন আবদুল্লাহ্ আলম হুযালীর। এছাড়া—
ইব্ন ইসহাক বলেন: আখজার ইব্ন লুয়াত দায়লী নিম্নোক্ত কবিতা বনূ কিনানা এবং বন্ বৃষাআর যুদ্ধ সম্পর্কে বলেছিলেন:
সুদূরের ঐ বন্ধুরা কি এ সংবাদটি পেয়েছে যে, কা'ব গোত্রকে আমরা ফিরিয়ে দিয়েছি বর্শা ফলকের উপরিভাগের দ্বারা?
রাফি ক্রীতদাসের বাড়িতে আমরা তাদেরকে আবদ্ধ করেছি, যা বুদায়ল গোত্রের পল্লীর নিকট অবস্থিত।
তারা ছিল একান্তই অসহায় বন্দী— নড়াচড়া করবার শক্তি ছিল না তাদের।
আমরা তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখলাম, যখন দীর্ঘ হলো সে অবরোধ, তখন আমরা তাদের প্রতি— প্রতিটি গিরি সঙ্কট থেকে মুষলধারে তীর বর্ষণ করতে লাগলাম।
আমরা তাদেরকে যবাই করছিলাম— মেষ যবাই করার মতো, তখন আমরা যেন সেই সিংহকূল, যারা দন্ত-নখর দ্বারা ওদেরকে খণ্ডবিখণ্ড করে চলেছিল।
তারা আমাদের প্রতি যুলুম করেছে। তারা চলার পথে আমাদের প্রতি— আক্রমণ চালিয়েছে। হারামের পাথরের ফলকের কাছেই ওরা আমাদের লোকদের প্রথমে হত্যা করেছে।
জনপদ থেকে তাদেরকে যখন— তাড়া করা হয়েছিল, তখন মনে হচ্ছিল, ফাসুর পাহাড়ে কেউ যেন উটপাখির ছানাদের তাড়াচ্ছে; আর তারা প্রাণপণে ছুটে পালাচ্ছে।
📄 বুদায়লের কবিতা
আল-বুদায়ল ইব্ন আবদে মানাত ইব্ন সালামা ইব্ন আমর ইব্ন আজব নিম্নের কবিতা নিয়ে তার জবাব দেন। ঐ কবিকে বুদায়ল ইব্ন উন্মু আসরাম বলে অভিহিত করা হতো। ঐ যাবিভায় তিনি বলেন:
আত্মম্ভরিতা প্রকাশে অভ্যস্ত ব্যক্তিরা— হারালো একে অপরের সঙ্গ, আমরা এক নাফেল ছাড়া তাদের কোন নেতাকেই আর অবশিষ্ট রাখিনি; যে তাদেরকে সংহত ও সংঘবদ্ধ করে নেতৃত্ব দেবে।
ঐ সম্প্রদায়ের ভয়েই কি তোমরা— ওতীর অতিক্রমকালে কেঁপে মরো, তাদের নিয়ে তোমরা অহরহ মেতে থাকো টিপ্পনী কাটার মধ্যে?
আর কোন সময় পেছন পানে ফিরেও তাকাও না? প্রতিদিনই আমরা শোধ করে থাকি কারো না কারো রক্তপণ, কিন্তু কোন রক্তপণ আমাদের দেওয়া হয় না। (কেননা, আমাদের কেউ তো— শত্রুর হাতে নিহতই হয় না। তাই রক্তপণের প্রশ্নও উঠে না। আমরা এমনি বীর গোষ্ঠী।)
তালাআ কূপের নিকট তোমাদের পল্লীতে আমরা আক্রমণ চালাই অতি ভোরে তরবারি দিয়ে, যে তরবারিগুলো ধারই ধারেনা তোমাদের ভর্ৎসনাকারিণী ললনাদের।
আমরা অন্তরায় সৃষ্টি করি বীয ও ওতৃদ থেকে নিয়ে রাযওয়া পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত, বিস্তৃত বিশাল অঞ্চলে তোমাদের অশ্বপাল চলার পথে।
গামীমের যুদ্ধের দিন তোমাদের এক ব্যক্তি যখন আত্মরক্ষার্থে দৌড়িয়ে পালাচ্ছিল, তখন আমাদের এক বীর অশ্বারোহীর মাধ্যমে ওখানেই তার দফারফা করে দেই।
কসম আল্লাহ্র ঘরের— তোমরা মিছামিছিই বলছো যে, তোমরা করোনি যুদ্ধের সূত্রপাত; আর আমরাই তোমাদেরকে অহেতুক পেরেশানীতে লিপ্ত করেছি।
ইবন হিশাম বলেন: উক্ত কবিতার অংশ 'নাফিল ব্যতীত আরো কোন নেতাকে অবশিষ্ট রাখিনি......।' এবং যে পংক্তিটিতে বলা হয়েছে: রাযওয়া পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ..." তা ইবন ইসহাক থেকে বর্ণিত নয়, বরং পংক্তিগুলো অন্যের বর্ণনা থেকে নেয়া।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বনু খুযাআর সাহায্যের আবেদন
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ বকর ও কুরায়শ বনু খুযাআর উপর যৌথভাবে চড়াও হয়ে তাদের ক্ষতিসাধন ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে কৃত সন্ধি ভঙ্গ করে। কেননা, খুযাআ গোত্রের লোকজন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চুক্তিবদ্ধ মিত্র ছিল। তখন খুযাআ গোত্রের আমর ইবন সালিম, যিনি বনূ কা'ব-এরও একজন বটে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট মদীনায় আসেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন লোকজন-পরিবেষ্টিত অবস্থায় মসজিদে নববীতে উপবিষ্ট ছিলেন। তখন আমর ইবন সালিম কবিতার ছন্দে বললেন:
হে রব! আমি মুহাম্মদকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি সেই পুরনো সন্ধির কথা, যা সম্পাদিত হয়েছিল তাঁর এবং আমার পূর্ব পুরুষদের মাঝে।
(বনূ আবদে মানাতের মা ও কুসাঈ-এর মা আমাদের খুযাআ বংশীয়া রমণী হওয়ার সুবাদে) (হে মুহাম্মদ!) আপনারা হচ্ছেন আমাদের সন্তান, আমাদেরই লোক আপনার পিতৃপুরুষ এ জন্যেই আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি (বা আপনার সাথে সন্ধিবদ্ধ হয়েছি।) আর তারপর সে সন্ধি থেকে আমরা গুটিয়ে নেইনি আমাদের হাত, সুতরাং আপনি আমাদের সাহায্য করুন! আল্লাহ্ আপনাকে যথার্থ পথে পরিচালিত করুন! আর আপনি আল্লাহ্র বান্দাদেরকে আহবান জানান- তারা যেন এগিয়ে আসে আমাদের সাহায্যার্থে। তাদের মধ্যে বিরাজ করছেন আল্লাহ্র রাসূল, যিনি অনন্য তাঁর ব্যক্তিত্বে।
তাঁর প্রতি যখন কেউ করে অন্যায় আচরণ, তখন বিবর্ণ হয়ে যায় তাঁর মুখমণ্ডল।
এক বিশাল বাহিনী পরিবেষ্টিত হয়ে— তখন তিনি এগিয়ে আসেন সমুদ্রের ফেনা উদ্গীরণের মতো।
এখন কুরায়শরা আপনার সাথে কৃত সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করেছে, যা তারা আপনার সাথে সম্পাদন করেছিল পাকাপোক্তভাবে।
আর তারা 'কাদা' নামক স্থানে আমার জন্যে ওঁৎ পেতে রয়েছে। তাদের ধারণা, আমি কাউকেই ডেকে পাবো না, অথচ তারা মর্যাদায় নিকৃষ্ট এবং সংখ্যায় অল্প।
তারা ওতীরে আমাদের উপর নৈশ আক্রমণ চালিয়েছে, এবং রুকু ও সিজদারত অবস্থায় আমাদের হত্যা করেছে।
ইব্ন ইসহাক বলেন: তার এ উদাত্ত আহবান শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : نصرت با عمرو بن سالم - "অবশ্যই তোমাদের সাহায্য করা হবে, হে আমর ইবন সালিম!" তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে আকাশ থেকে এক টুকরো মেঘ আত্মপ্রকাশ করল। তিনি বলে উঠলো: এ মেঘমালা বনু কা'ব-এর উপর সাহায্যের বৃষ্টি বর্ষণ করবে।
তারপর বুদায়ল ইব্ন ওরাকা বনু খুযাআর কিছু সংখ্যক লোক নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট মদীনায় আগমন করে এবং তাঁকে তাদের বিরুদ্ধে কুরায়শদের বনূ বকরকে সাহায্য প্রদানের কথা অবহিত করেন। তারপর তাঁরা মক্কা অভিমুখে রওনা হয়ে যান। তাঁরা চলে গেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন: যতদূর মনে হয়, সন্ধিকে পাকাপোক্ত করা এবং সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আবু সুফিয়ান তোমাদের নিকট ছুটে আসছে।
বুদায়ল ইব্ন ওরাকা ও তাঁর সঙ্গীরা মক্কার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলেন। পথে উসফান নামক স্থানে আবু সুফিয়ানের সাথে তাঁদের সাক্ষাৎ হলো। কুরায়শরা তাঁকে সন্ধি পাকাপোক্ত করার এবং সন্ধির মেয়াদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট প্রেরণ করেছে। বলাবাহুল্য, তারা যে কাণ্ড করেছিল, তাই তাদেরকে শঙ্কিত করে তুলেছিল। বুদায়লকে দেখে আবু সুফিয়ান তাঁকে জিজ্ঞাসা করলো: কী হে বুদায়ল। কোথেকে আসছো? আবু সুফিয়ানের অনুমান করতে কষ্ট হয়নি যে, বুদায়ল নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসেছিলেন।
জবাবে বুদায়ল বললেন: এই তো খুযাঈদের সাথে একটু সমুদ্রোপকূলে আসলাম। আবূ সুফিয়ান বললো: তুমি কি মুহাম্মদের নিকট আসোনি? বুদায়ল বললেন: না তো!
তারপর বুদায়ল মক্কায় এসে পৌঁছলে আবু সুফিয়ান তাঁর লোকজনকে বললো : বুদায়ল যদি মদীনা থেকে এসে থাকে, তবে তার বাহন খেজুর বীচি খেয়ে থাকবে। এই বলে আবু সুফিয়ান তাঁর বাহনের আস্তাবলে গিয়ে বুদায়লের উষ্ট্রীর কিছু মল নিয়ে তাতে খেজুরের বীচি দেখতে পেলো। দেখেই সে মন্তব্য করলো : আমি আল্লাহর শপথ করে বলতে পারি যে, বুদায়ল মুহাম্মদের নিকট থেকেই এসেছে।
📄 আবু সুফিয়ানের সন্ধি প্রচেষ্টাঃ পিতার সাথে উম্মু হাবীবার আচরণ
তারপর আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে আগমন করে। এসে সে সর্বপ্রথম নবী সহধর্মিণী (স্বীয় কন্যা) উম্মু হাবীবার ঘরে যায়। ঘরে প্রবেশ করেই আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিছানার উপর বসতে উদ্যত হলে, উম্মু হাবীবা বিছানাটি গুটিয়ে সরিয়ে ফেলেন। তখন আবু সুফিয়ান বলে উঠলো : বেটি! আমার সম্মানে এ বিছানা থেকে আমাকে দূরে রাখছো, নাকি বিছানাটির সম্মানে তাথেকে আমাকে সরিয়ে দিচ্ছো, বুঝে উঠতে পারলাম না! জবাবে উম্মু হাবীবা (রা) বললেন: বরং এটা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শয্যা। আর আপনি হচ্ছেন নাপাক পৌত্তলিক। আপনি আল্লাহর রাসূলের শয্যার উপর বসবেন এটা আমি মেনে নিতে পারছি না। এ কথা শুনে আবু সুফিয়ান বলে উঠলো : আল্লাহর কসম! বেটি, আমাকে ছেড়ে এসে তুই খুবই খারাপ হয়ে গেছিস।
অরপর আবু সুফিয়ান বের হয়ে এসে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সংগে কথা বলে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ নিরুত্তর থাকায় সে আবূ বকরের নিকট গিয়ে তার পক্ষে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে কথা বলার অনুরোধ জানায়। জবাবে হযরত আবূ বকর (রা) বললেন: আমার পক্ষে তা সম্ভবপর হবে না।
তারপর আবু সুফিয়ান উমর (রা)-এর নিকট এসে এ ব্যাপারে আলাপ করলে, তিনিও বললেন : রাসূলুল্লাহর দরবারে আমি করবো সুপারিশ তোমাদের পক্ষে? আল্লাহ্র কসম! আমি যদি এতটুকু শক্তিও পাই, তা হলে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবো!
অগত্যা সে আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর নিকট গেল। রাসূল-তনয়া ফাতিমা (রা) যখন আলী (রা)-এর নিকটে বসা ছিলেন এবং তার কাছে ছিলেন তাঁদের শিশুপুত্র হাসান। আবু সুফিয়ান এভাবে কথা পাড়লো: “আলী, তোমাকেই আমি আমার প্রতি সর্বাধিক দরদী মনে করি। আমি বিশেষ একটি প্রয়োজনে এসেছিলাম। বিফল হয়ে ফিরে যেতে মন চায়না। অতএব তুমি আমার পক্ষে রাসূলুল্লাহ্র কাছে একটু সুপারিশ কর!”
জবাবে আলী (রা) বললেন : তোমার সর্বনাশ হোক, আবু সুফিয়ান, আল্লাহর রাসূল যে প্রতিজ্ঞ, সে ব্যাপারে কিছু বলার সাধ্যি আমার নেই। জবাব শুনে আবু সুফিয়ান ফাতিমা খাতুনকে লক্ষ্য করে বললো: হে মুহাম্মদ তনয়া! তুমি তোমার এ শিশু-পুত্রটিকে লোকদের মধ্যে মীমাংসা করে দিতে বলবে কি? ফলে, আজীবন সে আরবের নেতা রূপে গণ্য হবে? জবাবে ফাতিমা (রা) বললেন: ওর এখনো সে বয়স হয়নি যে সে লোকদের বিচার মীমাংসা করতে পারে! তা ছাড়া আল্লাহ্র রাসূলের উপর বিচার মীমাংসা করার সাধ্যিও কারো নেই।
আবু সুফিয়ান বললো: আবুল হাসান, আমার জন্যে বিষয়গুলো জটিল হয়ে গেল দেখছি! তুমি আমাকে কিছু পরামর্শ দাও দেখি!
জবাবে আলী (রা) বললেন: আমি কিছু বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি হচ্ছো বনূ কিনানার সর্দার। তুমি নিজেই লোকদের মাঝে মীমাংসার ব্যবস্থা করে দেশে চলে যাও!
আবু সুফিয়ান বললো: তুমি কি মনে কর, এতে কোন কাজ হবে? জবাবে আলী (রা) বললো: না, আল্লাহর শপথ আমি ঠিক তা মনে করি না, কিন্তু এছাড়া তোমাকে বলার মত তো আমি কিছুই পাচ্ছি না!
তারপর আবু সুফিয়ান মসজিদে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো: লোকসকল! আমি সকলের সামনে হুদায়বিয়ার সন্ধি নবায়ন করলাম। একথা বলেই সে উটের পিঠে চড়ে তৎক্ষণাৎ রওনা হয়ে চলে যায়।
তারপর সে কুরায়শদের নিকট ফিরে এলে তারা তাকে জিজ্ঞাসা করলো: কী সংবাদ নিয়ে আসলে? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: মুহাম্মদের কাছে গিয়ে আমি তার সঙ্গে আলাপ করেছি। কিন্তু আল্লাহর শপথ! সে আমাকে কোন উত্তরই দিল না! তারপর গেলাম আবূ কুহাফার ছেলের কাছে। কিন্তু তার কাছেও কোন কল্যাণ পেলাম না। তারপর খাত্তাবের পুত্রের নিকট গিয়ে তাকে পেলাম নিকৃষ্টতম শত্রুরূপে। ইবন হিশাম 'নিকৃষ্টতম শত্রু' স্থলে 'সেরা শত্রু' বলেছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: (আবূ সুফিয়ানের বিবরণ) তারপর আমি গেলাম আলীর নিকট। তাকে অবশ্য অন্যদের তুলনায় অনেকটা নমনীয় পেয়েছি। সে আমাকে যে পরামর্শ দিল, আমি তা-ই বাস্তবায়িত করে এসেছি। কিন্তু তাতে কোন ফলোদয় হয়েছে কি না, তা আমি বলতে পারবো না।
তারা বললো: তোমাকে সে কী পরামর্শ দিয়েছিলো? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: আমাকে সে লোকসমক্ষে সন্ধি চুক্তি নবায়নের ঘোষণা দিতে বলে দিয়েছিল। আমি তাই করে এসেছি।
তারা আবার জিজ্ঞেস করলো: মুহাম্মদ কি তা অনুমোদন করেছে? জবাবে আবু সুফিয়ান বললো: 'না', তারা বললো ধ্বংস হোক তোমার! আল্লাহর শপথ! লোকটি তোমার সঙ্গে তামাশা বৈ কিছু করেনি। তুমি যা বলে এসেছো তাতে কোন কাজই হবে না।
আবূ সুফিয়ান বললো: তা অবশ্যি ঠিক। আল্লাহর কসম! এ ছাড়া আমার কোন গত্যন্তরও ছিল না।