📄 হাসান ইব্ন সাবিতের কবিতা
ইব্ন ইসহাক বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবিগণ মৃতার যুদ্ধের ব্যাপারে যেসব মর্সিয়ার রচনা করেছিলেন, তার মধ্যে হাসান ইব্ন সাবিত (রা)-এর নিম্নোক্ত কবিতা ছিল অন্যতম :
মদীনায় আমার উপর দিয়ে অতিবাহিত হয় এক সুকঠিন রাত। সে রাতে সবই যখন সুখনিদ্রায় বিভোর আমি তখন রাত জেগে ছিলাম— আমার এক বন্ধুর স্মরণে।
চোখ থেকে প্রবাহিত হচ্ছিল অশ্রুমালা, কান্নার হেতু ছিল স্মরণ। হ্যাঁ, বন্ধুর বিরহ এক সুকঠিন বিপদই বটে। কিন্তু এখনো রয়েছেন এমন অনেক সম্ভ্রান্ত লোক, বিপদে যারা ধৈর্য ধারণ করে থাকেন।
কত বিশিষ্ট ঈমানদার ব্যক্তিগণকে দেখলাম, একের পর এক অবতরণ করছেন মৃত্যুর ঘাটে। যাদের শূন্যস্থান পূরণ হবে অনেক দেরীতে (সহজে সে ক্ষতি পূরণ হবার নয়।)
আল্লাহ্ তা'আলা যেন দূরে না রাখেন সে সব শহীদকে—
যাঁরা একের পর এক শহীদ হলেন মুতার প্রান্তরে। দুই ডানাধারী জা'ফর, যায়দ ইবন হারিসা এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা যাদের অন্যতম।
যখন তারা শহীদ হলেন একের পর এক, আর মৃত্যুর সব হেতু সেখানে কার্যকর ছিল। এটা হচ্ছে ঐ দিনের কথা যেদিন তারা মু'মিনদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
এক সৌভাগ্যশালী নধরকান্তি, পূর্ণিমার চাঁদসম উজ্জ্বল আনন বিশিষ্ট এক হাশেমী—তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন—। অপকর্ম আর পঙ্কিলতাকে যিনি ঘৃণা করতেন— অধিকার সংরক্ষণে তৎপর দুঃসাহসী বীর পুরুষ।
রণাঙ্গনে তিনি প্রাণপণে মুকাবিলা করেন বল্লমধারী দুশমনের। শত্রুর বল্লমের আঘাতে তিনি এমনভাবে লুটিয়ে পড়েন যে, কোন কিছুর অবলম্বন গ্রহণেরও ছিল না কোন অবকাশ। এমন কি শেষ পর্যন্ত তিনি শামিল হয়ে পড়লেন শহীদদের দলে।
প্রতিদান তাঁর জান্নাতের নিবিড় সবুজ বাগ-বাগিচা। জা'ফরের মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করতাম
মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি তাঁর অকুন্ঠ আনুগত্য। আর তিনি যখন নির্দেশ প্রদান করতেন, তখন তা হতো দৃঢ় প্রত্যয়ে বলীয়ান আদেশ।
হাশেমীরা চিরকালই রয়েছেন ইসলামের স্তম্ভস্বরূপ, গৌরব ও মর্যাদার প্রতীকরূপে। এঁরা হলেন ইসলামের পর্বত স্বরূপ, আর অন্যরা পর্বত গাত্রের পাথর স্বরূপ।
এঁরা হচ্ছেন নানাবিধ গুণে গুণান্বিত সর্দার গোষ্ঠী。
এঁদের মধ্যে রয়েছেন জা'ফর, তাঁর সহোদর আলী হামযা, আব্বাস ও আকীলের মতো গুণীজন।
সর্বোপরি এঁদের মধ্যে রয়েছেন নির্বাচিত পুরুষ মুহাম্মদ (সা) এঁরা হচ্ছেন সজীব তরতাজা কাঠ স্বরূপ- যাথেকে তার যে কোন অংশ নিংড়িয়ে সংগ্রহ করা চলে জীবন রক্ষাকারী পানি।
এঁরা এমনি বীর পুরুষ- যাঁদের মাধ্যমে প্রতিটি ধূলি আচ্ছন্ন রণাঙ্গনে পাওয়া যায় মুক্তির সন্ধান।
এঁরা আল্লাহর ওলী। এঁদের মধ্যেই আল্লাহ্ নাযিল করেছেন তাঁর পবিত্র বিধান। আর এঁদেরই মাঝে রয়েছেন পবিত্র গ্রন্থধারী পবিত্র আত্মা মহাপুরুষ।
📄 কা'ব ইবন মালিকের কবিতা
কা'ব ইবন মালিক (রা) তাঁর কবিতায় বলেন:
সকলের চোখ যখন নিদ্রায় আচ্ছন্ন তোমার চোখ দু'টি তখন মুষলধারে অশ্রুবর্ষণ করছে- যেন মেঘমালা করে মুষলধারে বারিপাত।
এমন এক বিষাদ ঘেরা রাতে যখন দুনিয়ায় যত বিপদ এসে আমাকে করলো আচ্ছন্ন কখনও আমি নির্জনে করি অশ্রু বিসর্জন আবার কখনও অস্থিরভাবে করি পার্শ্ব পরিবর্তন।
বিষাদসিন্ধু আমাকে গ্রাস করেছে।
মনে হয় যেন সপ্তর্ষিমণ্ডল ও সামাক তারার হাতে আমাকে সমর্পণ করা হয়েছে।
(বিশ্বচরাচরের সাথে যেন আমি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক নভোচারী)
যেন আমার পাঁজরসমূহ এবং দেহাভ্যন্তরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গে / ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে একটি অগ্নিপিণ্ড, যা আমার দেহাভ্যন্তরে টবগ করে ফুটছে।
এসব সেই শহীদানের শোক ব্যথার কারণে, যাঁরা শহীদ হয়েছেন মুতার রণক্ষেত্রে একের পর এক। অথচ তাঁদের শবদেহগুলোকে স্থানান্তরিত করাও সম্ভব হয়ে উঠেনি।
আল্লাহ্ রহমত বর্ষণ করুন এসব নওজোয়ান শহীদানের প্রতি, আর তিনি তাঁদের অস্থিসমূহকে সিক্ত করুন মুষলধারে বর্ষিত বৃষ্টির দ্বারা।
আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে মৃতায় তাঁরা নিজেদেরকে করেছিলেন দৃঢ়পদ, অবিচল যাতে না দেখতে হয় পরাজয়ের মুখ, আর না যেতে হয় পশ্চাৎ অপসরণ করে পালিয়ে।
তাঁরা বেরিয়ে পড়লেন মুসলিম বাহিনীর সম্মুখ দিয়ে বর্মসজ্জিত উষ্ট্রের মত।
এটা হচ্ছে ঐ সময়ের কথা- যখন ঐ শহীদগণ পথের দিশা ও অনুপ্রেরণা পাচ্ছিলেন তাঁদের অগ্রপথিক সেনাপতি জা'ফর আর তাঁর হস্তস্থিত পতাকা থেকে।
কত উত্তম সেনাপতি-ই না তিনি! সারিবদ্ধ সৈন্যরা এগিয়ে গেল, উভয় পক্ষে হলো তুমুল সংঘর্ষ। ভূ-লুণ্ঠিত ও শহীদ হলেন জা'ফর জা'ফরের অন্তর্ধানে বিবর্ণ হয়ে পড়লো দীপ্ত চন্দ্র, সূর্য হলো রাহুগ্রস্ত আর উপক্রম হয়েছিল তা অস্ত যাওয়ার।
জা'ফরের নেতৃত্ব-হাশিম গোত্রের আভিজাত্য ও উচ্চতার বুনিয়াদের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত তাঁকে অনুকরণ করবে সে সাধ্য কারো নেই।
এঁরা এমনি এক গোষ্ঠী- যাঁদের মাধ্যমে আল্লাহ্ রক্ষা করেছেন তাঁর বান্দাদেরকে আর তাঁদেরই মাঝে তিনি নাযিল করেছেন তাঁর পবিত্র গ্রন্থ।
সমস্ত মানবগোষ্ঠীর মধ্যে তাঁরা সম্মান সম্ভ্রমের দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। তাঁদের জ্ঞান গরিমা অজ্ঞদের অজ্ঞতাকে ঢেকে ফেললো।
📄 জা'ফর উদ্দেশ্যে হাসান ইন্ন সাবিত (রা)-এর শোকগাথা
আমি অনেক ক্রন্দন করলাম। আর আমার নিকট জা'ফরের হত্যাকাণ্ড ছিল এক অসহনীয় গুরুভার। সৃষ্টি জগতের মধ্যে তিনিই ছিলেন নবীর সর্বাধিক প্রিয়জন।
আমার কাছে যখন জা'ফরের মৃত্যু সংবাদ দেয়া হলো আমি তখন চীৎকার করে বলে উঠলাম : নবীর পতাকা 'উকাব' আর এর ছায়াতলে এখন আর কে লড়বে
জা'ফরের মত অগ্রসেনার ভূমিকা পালন করে— যখন তলোয়ারগুলো হবে নিষ্কোষিত, আর বল্লম উপর্যুপরি নিক্ষিপ্ত হয়ে করবে তার তৃষ্ণা নিবারণ?
ফাতিমার স্বনামধন্য নন্দন জা'ফরের পরে? যিনি সৃষ্টি জগতের সকলের তুলনায় উত্তম কুল-মর্যাদার দিক থেকে এবং সমধিক মর্যাদাবান বদান্যতার দিক থেকে।
অনাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে যিনি সর্বাধিক আপোষহীন। সত্যের সামনে যিনি সর্বাধিক অবনত মস্তক, অকপটে।
বদান্যতায় যিনি সর্বাধিক মুক্ত হস্ত অশ্লীল কুবাক্য উচ্চারণে সর্বাধিক সকুণ্ঠ, সদাচার অনুষ্ঠানে যিনি সর্বাধিক করিৎকর্মা
তবে একমাত্র নবী মুহাম্মদ (সা) ছাড়া। কেননা, সৃষ্টিজগতে তাঁর তুল্য আর কেউই নেই। সৃষ্টিকূলের মাঝে তিনিই তো সেরা পুরুষ।
📄 মৃতার যুদ্ধের দিন হাসান ইন্ন সাবিতের মর্সিয়া
মৃতার যুদ্ধের দিনে হাসান ইব্ন সাবিত (রা) যায়দ ইবন হারিসা এবং আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর জন্য শোক প্রকাশ করে বলেন:
অতিরিক্ত কান্নায় শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুধারী হে নয়ন, তোমার এ অশ্রু মোটেও যথেষ্ট নয়— তুমি আরো কাঁদো, আরো অশ্রু বহাও!
অবকাশ মুহূর্তে এ কবরবাসীদের কথা স্মরণ কর। স্মরণ কর মৃতার কথা, আর সেখানকার সে ঘটনাটি— যখন মুসলিম বাহিনী পশ্চাদ অপসরণ করে— পালানোর দুঃসহ ঘটনাটি ঘটেছিল যায়দকে একাকী রণক্ষেত্রে ফেলে।
হায় বেচারা যায়দ! কী উত্তম পরিণতি হলো এ বেচারা বন্দীটির! (শাহাদতের পিয়ালা তিনি পান করলেন!)
মানবকূলের সর্দার— সৃষ্টিকূলের সর্বোত্তম পুরুষের তিনি স্নেহভাজন।
তাঁর প্রতি অনুরাগ প্রতিটি বুকে বিরাজমান। একমাত্র আহমদ নবীই এমন— যাঁর কোন জুড়ি নেই— তাঁর দুঃখশোকে আর আনন্দে, আমরা সর্বাধিক একাত্মতাবোধ করি।
নিঃসন্দেহে যায়দ আমাদের আমীরের দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ দায়িত্ব পালনে তিনি মিথ্যা বা কপটতার আশ্রয় নেননি।
হে আমার অশ্রুপূর্ণ নয়ন!
খাযরাজী আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহার জন্যে অশ্রু বিসর্জনেও তুমি কার্পণ্য করো না।
কেননা, এই খাযরাজী ছিলেন সেখানকার সিপাহসালার আর তিনি চেষ্টার কোন ত্রুটিই করেননি।
তাঁদের শাহাদতের সংবাদটি আমাদের কাছে পৌছে— ভেঙ্গে দিয়েছে আমাদের মনোবল, এখন আমাদের রাত অতিবাহিত হয় বিষাদ আর— আহাজারীর মধ্য দিয়ে।