📄 জা'ফর (রা)-এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শোক
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর (রা) যথাক্রমে খুযা'আ গোত্রের উন্মু ঈসার সূত্রে, তিনি মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর কন্যা উম্মু জা'ফরের সূত্রে, তিনি তাঁর (দাদী) আসমা বিন্ত উমায়সের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন : জা'ফর (রা) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদত লাভের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার নিকট আগমন করেন। আমি তখন চল্লিশটি চামড়া শোধন করে, আটা গুলে, ছেলে মেয়েদের গোসল করিয়ে, তেল মাখিয়ে সবেমাত্র অবসর হয়েছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এসে আমাকে বললেন: তুমি জা'ফরের ছেলে মেয়েদের একটু আমার কাছে নিয়ে এসো।
আসমা বলেন: আমি তাদেরকে তাঁর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তাদেরকে কোলে টেনে নেন। তখন তাঁর দু'চোখে অশ্রুর বন্যা। আমি বললাম: হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, আপনার কান্নার হেতু কি? আপনার কাছে জা'ফর ও তার সঙ্গীদের কোন খবর পৌঁছেছে কি?
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ, আজই তাঁরা শহীদ হয়েছে।
আসমা বলেন: শুনে আমি চীৎকার করে উঠে দাঁড়ালাম এবং মহিলারা আমার কাছে এসে জড়ো হলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বললেন: দেখ, তোমরা কিন্তু জা'ফরের পরিবারের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে গাফলতি করো না! কেননা, তাঁরা তাদের গৃহকর্তার শোকে মুহ্যমান।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুর রহমান ইবন কাসিম ইবন মুহাম্মদ তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: জা'ফর (রা)-এর মৃত্যু সংবাদ আসলে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখমণ্ডলে শোকের ছাপ দেখতে পেলাম।
আয়েশা (রা) বলেন: তখন একব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মহিলারা তো আমাদেরকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। জবাবে তিনি বললেন তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে শান্ত করো।
আয়েশা (রা) বলেন: লোকটি চলে গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে ঐ একই অনুযোগের পুনরাবৃত্তি করলো। রাবী বলেন: শুনে আয়েশা (রা) বললেন: লৌকিকতা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট লোকদের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
আয়েশা (রা) বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি আবার গিয়ে তাদেরকে শান্ত কর! যদি তাতে তারা না মানে, তাহলে তাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করবে।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি তখন মনে মনে বললাম, আল্লাহ্ তোমাকে রহমত থেকে দূরে রাখুন। আল্লাহ্র কসম! না তুমি পারলে নিজেকে সংযত রাখতে, না পারলে রাসূল (সা)-এর হুকুম তামিল করতে। তিনি বলেন: আমি তখনই আঁচ করতে পেরেছিলাম যে, লোকটি মহিলাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করতে পারবে না।
📄 মালিক ইবন যাফিলার হত্যা
ইন ইসহাক বলেন: মুসলিম বাহিনীর দক্ষিণ অংশের দায়িত্বে নিয়োজিত কুতবা ইব্ন কাতাদা উফ্রী (রা) মালিক ইবন যাফিলার উপর আক্রমণ চালিয়ে তাকে হত্যা করেন। এসময় কৃষ্ণ ইব্ন কাতাদা কবিতার ছন্দে বলেন:
طعنت ابن زافلة بن الارا * শ برمح مضى فيه ثم انحطم
ضربت على جيره ضربة * فمال كما مال غصن السلم
وسقنا نساء بني عمه * غداة رقوقين سوق النعم
অর্থাৎ-যাফিলা ইব্ন আরাশের পুত্রের উপর আমি বল্লম দ্বারা এমনি আঘাত হানলাম যে, তার দেহাভ্যন্তরে ঢুকেই তা ভেঙ্গে গেল। তার ঘাড়ে আমি এমনি আঘাত হানলাম যে, কুলগাছের শাখার ন্যায় সে নুয়ে পড়লো। তারপর তার বংশের মহিলাদের হাঁকিয়ে নিলাম এমনভাবে, যেমনটি হাঁকিয়ে নেয়া হয় উটপাখিকে।
ইবন হিশাম বলেন: ইব্ন আরাশ বা আরাশের পুত্র শব্দটি ইবন ইসহাকের নয়, অন্য কারো থেকে তা বর্ণিত। এর তৃতীয় পংক্তিটি খাল্লাদ ইব্ন কুররার। মালিক ইবন যাফিলার স্থলে কেউ কেউ মালিক ইব্ন রাফিলা বলেছেন।
📄 হাদাস গোত্রীয় মহিলা জ্যোতিষীর সতর্কবাণী
ইবন ইস্হাক বলেন: হাদাস গোত্রের এক মহিলা জ্যোতিষী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাহিনীর আগমন সংবাদ শুনে তার স্বগোত্র হাদাস ও বাতান গোত্রকে যার অপর নাম গানাম গোত্র- সতর্ক করে দিয়ে বলে:
انذركم قوما حزراً ينظرون شزرا ويقودون الخيل تترى ويهريقون دما عكرا
আমি এমন এক সম্প্রদায় সম্পর্কে তোমাদেরকে সতর্ক করছি, যারা দৃষ্টিপাত করে সদম্ভে ও বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে হাঁকিয়ে চলে সারি সারি অশ্ব, রক্তপাত করে নানাভাবে।
তার গোত্রের লোকজন তার কথায় সতর্ক হয় এবং বনূ লাখম এর সংশ্রব ও সমর্থন দান থেকে তারা সরে দাঁড়ায়। ফলে, হাদাস গোত্রের মধ্যে বনূ গানাম সর্বাধিক সমৃদ্ধিশালী রূপে টিকে থাকে। আর যারা যুদ্ধে জড়িয়েছিল, হাদাস গোত্রের সেই শাখাগোত্র বনূ ছালাবা বেশীদিন তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি। দিন দিন তাদের সংখ্যা হ্রাস পেতে থাকে। যাহোক, শেষ পর্যন্ত খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) মুসলমানদেরকে নিয়ে পশ্চাৎ অপসরণ করে সদলবলে মদীনায় ফিরে আসেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক বীর যোদ্ধাদের অভ্যর্থনা জ্ঞাপন
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইন্ন যুবায়র (র) উরওয়া ইন্ন যুবায়র সূত্রে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, মুসলিম বাহিনী মদীনার নিকটবর্তী হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং মুসলমানগণ এগিয়ে গিয়ে তাঁদের অভ্যর্থনা জানান। শিশু-কিশোররাও ছুটে আসে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাহনে চড়ে জনতার সঙ্গে এগিয়ে আসছিলেন। শিশু-কিশোরদেরকে দেখে তিনি বলে উঠলেন: শিশুদেরকে তোমরা বাহনের উপর তুলে নাও, আর জা'ফরের ছেলেটিকে আমার কাছে দাও! সে মতে জা'ফরের পুত্র আবদুল্লাহকে আনা হলে তিনি তাকে নিজের পাশে বসিয়ে নেন。
বর্ণনাকারী বলেন: জনতা সৈন্যদের উপর ধূলি নিক্ষেপ করতে শুরু করে এবং ভর্ৎসনা করে তাদেরকে বলে : হে পলায়নকারী দল! আল্লাহর রাহে যুদ্ধ থেকে তোমরা পালিয়ে এসেছো।
বর্ণনাকারী বলেন: তা' শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: ليسوا بالفرار ولكنهم الكرار انشاء الله تعالى
"না, না, এরা পলায়নকারী নয়, বরং পুনরায় এরা আল্লাহ্ চাহেতো ফিরে গিয়ে আক্রমণ চালাবে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর যথাক্রমে আমির ইবন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র, হারিস ইন্ন হিশام এর বংশের জনৈক ব্যক্তি এবং নবী সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রা) সূত্রে আমার নিকট বর্ণনা করেন। উম্মু সালামা (রা) সালামা ইবন হিশام ইবন 'আসের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন: ব্যাপার কী, সালামাকে যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলমানদের সাথে সালাতের জামাআতে হাযির হতে দেখছি না?
উত্তরে সে বললো: আল্লাহ্র কসম! তিনি বের হতেই পারেন না। বের হলেই জনতা ঠাট্টা করে বলতে শুরু করে, হে পলায়নকারী! আল্লাহ্ রাহে যুদ্ধ থেকে তুমি পালিয়ে এসেছ। এমন কি শেষ পর্যন্ত তিনি ঘর থেকে বের হওয়া ছেড়েই দিয়েছেন, এখন আর বেরই হন না।