📄 আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদত
জাফর (রা) শাহাদত বরণ করলে عبدالله্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) ঝাণ্ডা তুলে নেন এবং ঘোড়ার পিঠে চড়ে কিছুটা দ্বিধার সাথে অগ্রসর হতে থাকেন এবং বলতে থাকেন:
أقسمت يا نفس لتنزلنه * طائعة أو لا لتكرهنه
إن أجلب الناس وشدوا الرنة * ما لي أراك تكرهين الجنة
“হে আমার আত্মা! আমি কসম খেয়েছি, হয় তুমি স্বেচ্ছায় অবতরণ করবে, নতুবা আমি তোমাকে বাধ্য করবো। লোকে যখন যুদ্ধের জন্য সমবেত হয়ে শোরগোল তুলেছে, তখন আমি তোমাকে জান্নাতের প্রতি অনাগ্রহী দেখছি কেন?”
قد طال ما قد كنت مطمئنة * هل أنت إلا نطفة فى شنة
“তুমি তো দীর্ঘদিন যাবত শান্তিতে ছিলে, আসলে তুমি তো একটি পুরনো মশকের এক ফোঁটা পানি ছাড়া কিছুই নও।”
তিনি আরও বলেন:
يا نفس إلا تقتلى تموتى * هذا حمام الموت قد صليت
وما تمنيت فقد أعطيت * إن تفعلى فعلهما هديت
“হে আত্মা! যদি তুমি নিহত না হও, তবু তো একদিন মরবেই। এ তো মৃত্যুর পরোয়ানা, যা তোমার উপর জারি হয়ে গেছে। তুমি যা কামনা করেছিলে, তাই আজ তোমাকে দেওয়া হয়েছে। যদি তুমি তোমার পূর্ববর্তী দু'জনের মত করতে পার, তবে তুমি হিদায়াত পেয়ে যাবে।”
এখানে তিনি তাঁর পূর্ববর্তী দু'জন সেনাপতি যায়দ ও জা'ফর (রা)-এর প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তারপর তিনি অবতরণ করেন। তাঁর এক চাচাতো ভাই একটি হাড় নিয়ে তাঁর কাছে এসে বললেন: এটা দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করুন, আজকের দিনটি ছিল আপনার জন্য একটি কঠিন দিন। তিনি তা হাতে নিয়ে খানিকটা খেলেন। তারপর যখন তিনি লোকজনের মধ্যে গোলমাল শুনতে পেলেন, তখন তিনি নিজেকে লক্ষ্য করে বললেন: “আর আমি এখনও দুনিয়াতেই পড়ে আছি।”
তখন তিনি তা হাত থেকে ফেলে দিয়ে তরবারি হাতে তুলে নিলেন এবং সামনে অগ্রসর হলেন। অবশেষে তরবারি বিদ্ধ হয়ে তিনিও শহীদ হলেন। আল্লাহ্ তাঁর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
📄 খালিদ সেনাপতি হলেন
আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) শাহাদত লাভ করার পর বনূ আজলানের সাবিত ইব্ন আরকাম (রা) ঝাণ্ডা হাতে তুলে নিলেন এবং বললেন: হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের মধ্য থেকে একজন সেনাপতি মনোনীত করে নাও। তখন তাঁরা বললেন: আপনিই এর যোগ্য। তিনি বললেন: আমি এর যোগ্য নই। তারপর তাঁরা খালিদ ইব্ন ওয়ালীদকে সেনাপতি মনোনীত করলেন। তিনি ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে শত্রুদের সাথে কিছুক্ষণ যুদ্ধ করলেন। তারপর তিনি তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে নিলেন এবং শত্রুরাও তাঁর অনুসরণ করা থেকে নিবৃত্ত হলো। অবশেষে তিনি তাঁর সৈন্যদের নিয়ে প্রত্যাবর্তন করলেন এবং তারাও তাদের নিজ নিজ শিবিরে ফিরে গেল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন যুবায়র (র) উরওয়া ইব্ন যুবায়রের সূত্রে বর্ণনা করেছেন, খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে এলেন, তখন তিনি তাঁকে ‘আল্লাহর তরবারি’ উপাধি দান করেন। সেদিন থেকেই তিনি ‘সায়ফুল্লাহ্’ নামে অভিহিত হন।
📄 যুদ্ধের পরিস্থিত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অবগতি লাভ
ইবন ইসহাক বলেন : মুসলিম বাহিনী যখন বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় বলে উঠলেন :
"যায়দ ইবন হারিসা পতাকা হাতে নিয়ে লড়তে লড়তে শহীদ হয়ে গিয়েছে। তারপর জা'ফর পতাকা ধারণ করেছে এবং সেও শহীদ হয়ে গিয়েছে।"
বর্ণনাকারী বলেন : এতটুকু বলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নীরব হয়ে যান। ফলে আনসারদের মুখমণ্ডল বিবর্ণ হয়ে যায় এবং তাঁরা ধারণা করেন যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহার সংবাদও হয়তো সন্তোষজনক নয়। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন :
"এরপর আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা পতাকা ধারণ করেছে। তারপর সেও পতাকা হাতে লড়তে লড়তে শাহাদত লাভ করেছে।"
তারপর তিনি পুনরায় বললেন : আমি দেখলাম, জান্নাতে এঁদের সকলকে আমার কাছে উপস্থিত করা হয়েছে। তাঁরা সকলেই স্বর্ণের পালঙ্কে উপবিষ্ট রয়েছে, কিন্তু আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহার পালঙ্ক একটু কাৎ হয়ে রয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম : এমনটি হলো কেন?
উত্তরে আমাকে বলা হলো : ওরা দু'জন নির্দ্বিধায় সম্মুখে অগ্রসর হয়েছিল? পক্ষান্তরে, আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষণ ইতস্তত: করে তারপর অগ্রসর হয়েছিল।
📄 জা'ফর (রা)-এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর শোক
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর (রা) যথাক্রমে খুযা'আ গোত্রের উন্মু ঈসার সূত্রে, তিনি মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর কন্যা উম্মু জা'ফরের সূত্রে, তিনি তাঁর (দাদী) আসমা বিন্ত উমায়সের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন : জা'ফর (রা) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদত লাভের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার নিকট আগমন করেন। আমি তখন চল্লিশটি চামড়া শোধন করে, আটা গুলে, ছেলে মেয়েদের গোসল করিয়ে, তেল মাখিয়ে সবেমাত্র অবসর হয়েছি। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) এসে আমাকে বললেন: তুমি জা'ফরের ছেলে মেয়েদের একটু আমার কাছে নিয়ে এসো।
আসমা বলেন: আমি তাদেরকে তাঁর কাছে নিয়ে এলাম। তিনি তাদেরকে কোলে টেনে নেন। তখন তাঁর দু'চোখে অশ্রুর বন্যা। আমি বললাম: হে আল্লাহ্র রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্যে কুরবান হোক, আপনার কান্নার হেতু কি? আপনার কাছে জা'ফর ও তার সঙ্গীদের কোন খবর পৌঁছেছে কি?
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ, আজই তাঁরা শহীদ হয়েছে।
আসমা বলেন: শুনে আমি চীৎকার করে উঠে দাঁড়ালাম এবং মহিলারা আমার কাছে এসে জড়ো হলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বললেন: দেখ, তোমরা কিন্তু জা'ফরের পরিবারের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে গাফলতি করো না! কেননা, তাঁরা তাদের গৃহকর্তার শোকে মুহ্যমান।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুর রহমান ইবন কাসিম ইবন মুহাম্মদ তাঁর পিতার সূত্রে, তিনি আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: জা'ফর (রা)-এর মৃত্যু সংবাদ আসলে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখমণ্ডলে শোকের ছাপ দেখতে পেলাম।
আয়েশা (রা) বলেন: তখন একব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মহিলারা তো আমাদেরকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। জবাবে তিনি বললেন তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদেরকে শান্ত করো।
আয়েশা (রা) বলেন: লোকটি চলে গিয়ে পুনরায় ফিরে এসে ঐ একই অনুযোগের পুনরাবৃত্তি করলো। রাবী বলেন: শুনে আয়েশা (রা) বললেন: লৌকিকতা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট লোকদের জন্যে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
আয়েশা (রা) বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি আবার গিয়ে তাদেরকে শান্ত কর! যদি তাতে তারা না মানে, তাহলে তাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করবে।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি তখন মনে মনে বললাম, আল্লাহ্ তোমাকে রহমত থেকে দূরে রাখুন। আল্লাহ্র কসম! না তুমি পারলে নিজেকে সংযত রাখতে, না পারলে রাসূল (সা)-এর হুকুম তামিল করতে। তিনি বলেন: আমি তখনই আঁচ করতে পেরেছিলাম যে, লোকটি মহিলাদের মুখে ধূলি নিক্ষেপ করতে পারবে না।