📄 শাহাদতের আগ্রহ
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) লোকজনকে উদ্বুদ্ধ করতে বীরত্বব্যঞ্জক এক ভাষণ দেন। তাতে তিনি বলেন:
"লোকসকল! আল্লাহর কসম, এখন তোমরা যা অপসন্দ করছো, সে শাহাদত লাভের উদ্দেশ্যেই তোমরা কিন্তু বেরিয়ে এসেছো। আমরা মুসলমানরা সংখ্যা, শক্তি ও আধিক্যের জোরে লড়াই করি না। সে দীনের জন্যে আমাদের লড়াই, যার দ্বারা আল্লাহ্ আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছেন। অতএব, সম্মুখপানে অগ্রসর হও! দু'টি কল্যাণের একটি আমাদের জন্য অবশ্যম্ভাবী, হয় বিজয়, নয় শাহাদত।
বর্ণনাকরী বলেন: তাঁর এ তেজোদীপ্ত ভাষণ শুনে সকলে বলে উঠলো: সত্যিই তো, ইব্ন রাওয়াহা যথার্থই বলেছেন।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহার কবিতা তারা থমকে দাঁড়ালে তিনি তাঁর কবিতায় বললেন:
جلبنا الخيل من اجاء وفرع * تغر من الحشيش لها العكوم حذوناها من الصوان سبتا * ازل كأن صفحته اديم اقامت ليلتين على معان * فاعقب بعد فترتها جموم
"আজা ও ফারার গিরিকন্দর থেকে আমরা সে সব অশ্ব নিয়ে বের হয়েছি, যেগুলোকে খাওয়ানো হয় বোঝা বোঝা ঘাস এবং যেগুলোর পায়ে আমরা পরিয়ে দিয়েছি এমন লৌহ পাদুকা যার উপরিভাগ অত্যন্ত মসৃণ এবং চর্মের ন্যায় কোমল। মাআন নামক স্থানে দু'রাত অবস্থান করার পর দুর্বলতা ও স্থবিরতা দূর হয়ে এগুলোর মধ্যে জেগে উঠে নতুন উদ্যম।
فرحنا والجياد مسومات * تنفس في مناخرها السموم فلا وابي مآب لنأتينها * وان كانت بها عرب وروم
তারপর শুরু হয় আমাদের অভিযাত্রা। আমাদের চিহ্নিত অশ্বগুলো তখন নাসারন্ধে গ্রহণ করছিল উষ্ণবায়ু। আমি শপথ করে বলছি, প্রতিপক্ষ আরবের হোক অথবা রোমেরই হোক, মাআবে আমরা পৌঁছবই।
فعبأنا اعنتها فجاءت * عوابس والغبار لها بريم بذى لجب كأن البيض فيه * اذا برزت قوانسها النجوم
তারপর আমরা অশ্বগুলো বাগ টেনে ধরি। ফলে, সেগুলো অত্যন্ত অনীহা সত্ত্বেও, অপ্রসন্ন মুখে এবং ধূলি-ধূসরিত অশ্রুচোখে থমকে দাঁড়ায়।
এসব অশ্ব এমন বিরাট বাহিনীর সাথে এসেছে, যাদের শিরস্ত্রাণগুলো নক্ষত্রমালার মতো চমকাচ্ছিলো।
অবশেষে বিলাসমত্ত জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত মহিলাদেরকে আমাদের বল্লমসমূহ তালাক দিয়ে দিল। এবার তারা ইচ্ছা করলে দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারে অথবা বিধবার জীবনও অতিবাহিত করতে পারে।
ইন হিশাম বলেন: অন্য বর্ণনায় আছে : جلنا الخيل من اجاء فرح এবং ... فعبانا اعنتها পংক্তি দু'টি ইবন ইসহাক বর্ণিত নয়, অন্যের বর্ণিত।
শাহাদতের আগ্রহ
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর মুসলমানরা সম্মুখপানে অগ্রসর হয়। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর আমার কাছে জনৈক রাবী সূত্রে যায়দ ইব্ন আরকাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন: আমি আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহার পোষ্য ইয়াতীম ছিলাম। সে সফরে তিনি আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যান। আমাকে তাঁর বাহনের হাওদার পিছনে বসিয়ে নিয়ে তিনি চলতে শুরু করেন। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তখন ছিল রাতের বেলা। চলার পথে তিনি কতকগুলো পংক্তি সুর করে গেয়ে চলেছিলেন আর আমি তন্ময় হয়ে তা শুনছিলাম। সে পংক্তিগুলো ছিল এরূপ:
اذا اديتني وحملت رحلی * مسيرة اربع بعد الحساء فشأنك انعم وخلاك ذم * ولا ارجع الى اهلي وراثي "হে নক্স! যখন তুমি তোমার হক আদায় করেছ এবং কঙ্করময় ভূমি অতিক্রম করার পর, চার দিনের সফরের জন্যে আমার হাওদা বোঝাই করে দিয়েছ তখন তোমার জন্যে রয়েছে অনেক নিয়ামত। এর অন্যথা করলে তুমি হবে নিন্দনীয়। আমি আর আমার পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে যাবো না।
بارض الشام مشتهى الثواء وجاء المسلمون وغادرونی * وردك كل ذي نسب قريب * الى الرحمن منقطع الاخاء ولا نخل اسا فلها رواء هنالك لا ابالي طلع بعل * এসব মুসলমান আমাকে সিরিয়ার মাটিতে আমার কাঙ্ক্ষিত শাহাদতস্থলে আমাকে রেখে যেতে এসেছে।
হে আমার নক্স, হে আমার মন, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিন্ন করে আমার আত্মীয়-স্বজনরা তোকে দয়াময় আল্লাহর হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। তথায় না কোন নবোক্কুরিত চারাগাছের পরোয়া থাকবে, না থাকবে সবুজ-শ্যামল খেজুর বাগানের পরোয়া, যার শাখাসমূহকে ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে আমি তার ফল চয়ন করবো। (পার্থিব সকল মোহ থেকে আমি মুক্ত থাকবো।)"
যায়দ ইব্ন আরকাম বলেন: তাঁর এ পংক্তিগুলো শুনে আমি কেঁদে ফেলি। তিনি আমাকে তাঁর হস্তস্থিত চাংক দ্বারা মৃদু খোঁচা দিয়ে বললেন: বোকা কোথাকার, তোমার এতে অসুবিধাটা কি যে, আল্লাহ্ আমাকে শাহাদত দান করবেন, আর তুমি আমার বাহনের সামনে পেছনে যেখানে ইচ্ছা বসে ঘরে ফিরে যাবে?
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর সে সফরেরই কোন এক পর্যায়ে আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা এ পংক্তিটিও সুর করে গাইলেন: يا زيد زيد العملات الذبل * تطاول الليل هديت فانزل হে যায়দ-ঐ সব দ্রুতগামী উষ্ট্রীর মালিক যায়দ-যেগুলো উপর্যুপরি সফরে দুর্বল, কাহিল হয়ে পড়েছে। অনেক রাত হয়ে গেছে। তোমাকে সরল পথ প্রদর্শন করা হোক, সত্বর তুমি নেমে পড় (এবং লড়াই শুরু করে আমার শাহাদতের আকাঙক্ষা পূরণ করে দাও!)
📄 রোমকবাহিনী এবং তাদের মিত্রদের সাথে সম্মুখযুদ্ধ
যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) মুসলিম বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়ে মা'আন নামক স্থানে অবতরণ করেন। এ সময় তিনি এবং তাঁর সঙ্গীরা সংবাদ পেলেন যে, হিরাক্লিয়াস এক লক্ষ রোমক সৈন্য এবং লাখ্ম, জুযام, কায়ন, বাহরা ও বালী প্রভৃতি গোত্রের এক লক্ষ আরব সৈন্যসহ মাআব নামক স্থানে শিবির স্থাপন করেছেন। মুসলিম বাহিনী যখন এ সংবাদ পেলেন তখন তাঁরা মা'আনে দুই রাত অপেক্ষা করলেন। তারপর তাঁরা পরস্পর পরামর্শ করলেন। কেউ কেউ বললেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে পত্র মারফত আমাদের শত্রু সৈন্যের সংখ্যাধিক্যের কথা অবহিত করি। তিনি হয় আমাদের সাহায্যের জন্য অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণ করবেন, অথবা অন্য কোন নির্দেশ দেবেন, আমরা তা পালন করবো।
📄 যায়দ ইবন হারিসা (রা)-এর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর আমার কাছে আবূ আওয়ান ইব্ন সাঈদ ইব্ন যায়দ ইব্ন আমর ইব্ন নুফায়ল সূত্রে বর্ণনা করেছেন, তারপর মুসলিম বাহিনী শত্রুদের দিকে অগ্রসর হয়ে মুতার উপকণ্ঠে গিয়ে উপস্থিত হলেন। এখানে শত্রুরাও তাদের দিকে অগ্রসর হয়ে আসলো। এরপর মুসলিম বাহিনী মুতার সন্নিকটস্থ একটি জনপদে গিয়ে সমবেত হলো। সেখানে শত্রুদের মুকাবিলার জন্য তাঁরা প্রস্তুত হলেন। মুসলিম বাহিনীর ডান দিকে কুতবা ইব্ন কাতাদা উযরীকে এবং বামদিকে উবাদা ইব্ন মালিক আনসারীকে নিযুক্ত করা হলো।
তারপর উভয় পক্ষ সংঘর্ষে লিপ্ত হলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পতাকা হাতে নিয়ে যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) প্রাণপণে যুদ্ধ করতে লাগলেন। অবশেষে তিনি বর্শাবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) খালিদ ইব্ন ওয়ালীদকে' একটি ঝাণ্ডা প্রদান করেছিলেন। এটি ছিল কালো বর্ণের।
টিকাঃ
১. খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা) তখনও মুসলমান হননি। পরবর্তীকালে মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পূর্বে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।
📄 জা'ফর (রা)-এর শাহাদত
যায়দ (রা)-এর শাহাদতের পর জা'ফর (রা) ঝাণ্ডা হাতে তুলে নেন এবং প্রাণপণে যুদ্ধ করতে থাকেন। যুদ্ধ করতে করতে যখন তিনি শত্রুদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়লেন, তখন তিনি তাঁর শাহবা নামক অশ্ব থেকে লাফিয়ে পড়েন এবং সেটিকে হত্যা করে ফেলেন। ইসলামে তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি তাঁর অশ্বকে এভাবে হত্যা করেন। এ সম্পর্কে কা'ব ইবন মালিক (রা) একটি কবিতা রচনা করেন। ইবন হিশাম বলেন: আমি যাকে নির্ভরযোগ্য মনে করি, এমন এক ব্যক্তি আমাকে কা'ব ইব্ন মালিকের সে কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন। তাতে তিনি বলেন:
يا حبذا الجنة واقترابها * طيبة وباردا شرابها
والروم روم قد دنا عذابها * كافرة بعيدة أنسابها
على إذ لاقيتها ضرابها
যাতে তিনি বলতে পারেন: ওহে! আমার প্রিয় বন্ধু! কত সুন্দর জান্নাত ও কী মনোরম তার পানীয়! আর রোমকরা কতই না নিকটবর্তী হয়েছে, যারা কাফির! সময় এসেছে তাদের সাথে মুকাবিলার। তোমরা এগিয়ে এসো এবং তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়!