📄 হাজ্জাজ ইব্ন আল্লাত সুলামীর ঘটনা
ইবন ইসহাক বলেন: খায়বার বিজয় সম্পন্ন হলে হাজ্জাজ ইব্ন আল্লাত সুলামী বাহযী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আলাপ প্রসঙ্গে বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)! মক্কায় আমার সঙ্গিনী উম্মু শায়বা বিন্ত আবু তালহার কাছে আমার কিছু সম্পদ রয়েছে। ঐ মহিলাটি তাঁর সাথেই থাকতেন। তাঁর পুত্র মু'রিদ ইব্ন হাজ্জাজ ঐ মহিলারই গর্ভজাত সন্তান। "আর মক্কায় ব্যবসায়ীদের কাছে আমার-ব্যবসায়ের কিছু মালামাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সুতরাং ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমাকে মক্কায় যাওয়ার অনুমতি দিন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে অনুমতি দিলেন। তিনি বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমার যে কিছু উল্টাপাল্টা বলার প্রয়োজন হবে। তিনি বললেন: বলবে!
হাজ্জাজ বলেন: তারপর আমি বেরিয়ে পড়লাম। যখন মক্কায় পদার্পণ করলাম, তখন আমি সানিয়াতুল বায়যায় কুরায়শের কয়েক ব্যক্তিকে পেলাম, যারা খবরাখবর জানতে চাচ্ছিল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে লোকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। তারা খবর পেয়েছিল যে, তিনি খায়বর যাত্রা করেছেন। তারা সম্যক জানতো যে, খায়বর হচ্ছে হিজাযের উর্বরতম ও জনবহুল সমৃদ্ধ জনপদ। এজন্যে তারা পরম ঔৎসুক্যে ভরে খবরাখবর জানতে চাইতো এবং অশ্বারোহীদের নিকট জিজ্ঞাসাবাদ করতো। তারা যখন আমাকে দেখতে পেল, তখন বলতে লাগল: “এ যে হাজ্জাজ ইব্ন আল্লাত দেখছি। হাজ্জাজ বলেন: আর তারা আমার ইসলাম গ্রহণের সংবাদ জানতো না। তাই বলল, নিশ্চয়ই এর কাছে সংবাদ আছে। আমাদেরকে হে আবূ মুহাম্মদ, সংবাদ দাও, আমরা তো শুনতে পেয়েছি যে, ডাকাতটা খায়বর যাত্রা করেছে। আর এটা হচ্ছে ইয়াহুদী জনপদ এবং হিজাযের সমৃদ্ধতম এলাকা।
হাজ্জাজ বলেন: আমি বললাম, আমিও এরূপ শুনেছি। আমার কাছে এমন সংবাদও আছে যা শুনে তোমরা আনন্দিত হবে। তারপর আমাকে আর পায় কে? কুরায়শরা দল বেঁধে আমার উটের চারপাশে চক্কর লাগাতে লাগাতে বলতে লাগল সে সংবাদটি কী হাজ্জাজ?
হাজ্জাজ বলেন: আমি বললাম এমন শোচনীয় পরাজয়ই সে বরণ করেছে যেমন পরাজয়ের কথা তোমরা কোনদিন শুননি। আর তার সঙ্গী-সাথীরা এমনি শোচনীয়ভাবে নিহত হয়েছে যে, তোমরা এরূপ খুব কমই শুনে থাকবে। আর মুহাম্মদ তাদের হাতে এখন বন্দী। তারা বলাবলি করছে যে, আমরা নিজেরা মুহাম্মদকে হত্যা করবো না। বরং আমরা তাকে মক্কায় পাঠিয়ে দেবো। মক্কাবাসীরা তাদের আত্মীয়-স্বজনের হত্যার প্রতিশোধ স্বরূপ সকলের সামনে তাকে হত্যা করবে।
হাজ্জাজ বলেন: তারপর তারা প্রস্থান করলো এবং গোটা মক্কা জুড়ে শোরগোল হৈ হল্লা করে এখবর প্রচার করতে লাগল।
"তোমাদের কাছে সংবাদ এসেছে, ঐ মুহাম্মদ আসছে কেবল তোমাদের অপেক্ষা। তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, তোমরা তাকে সর্বসমক্ষে প্রকাশ্যে হত্যা করবে।"
হাজ্জাজ বলেন: আমি বললাম, মক্কায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমার অর্থ-সম্পদ উদ্ধারের ব্যাপারে তোমরা আমাকে একটু সাহায্য কর এবং আমার খাতকদেরকে চাপ দিয়ে তা উদ্ধার করে দাও। আমি খায়বরে যেতে চাই এবং পরাজিত মুহাম্মদ ও তার সাথীদের মালপত্র কেনার জন্যে অন্যান্য ব্যবসায়ীর পূর্বেই আমি সেখানে যেতে চাই।
ইবন হিশাম বলেন: কারো কারো বর্ণনায় আছে, মুহাম্মদের 'গনীমত' কিনতে যাওয়ার কথা হাজ্জাজ বলেছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর তারা এত দ্রুত আমার অর্থ-সম্পদগুলো আদায় করে দিল, যত দ্রুত পাওনা আদায়ের কথা আমি কোনদিন কাকেও শুনিনি। তারপর আমি আমার সঙ্গিনীর কাছে গেলাম এবং বললাম তোমার কাছে রক্ষিত আমার অর্থগুলো তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও, আমি খায়বরে যাবো এবং অন্য ব্যবসায়ীরা সেখানে গিয়ে পৌঁছবার আগেই আমি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসার দ্বারা লাভবান হতে চাই।
হাজ্জাজ বলেন: আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব যখন এ সংবাদ শুনতে পেলেন, তখন তিনি আমার কাছে ছুটে এলেন এবং আমার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমি তখন ব্যবসায়ীদের একটি তাঁবুতে অবস্থান করছিলাম। তিনি এসে বললেন: কি হে হাজ্জাজ! তুমি এ কী সংবাদ নিয়ে এলে?
হাজ্জাজ বলেন: তখন আমি বললাম, আমার যে সম্পদ আপনার কাছে আমি রেখে গেছি, তা আপনার স্মরণ আছে তো? তিনি বললেন: হ্যাঁ। হাজ্জাজ বলেন: তখন আমি বললাম: আপনি একটু পরে আসুন। আপনার সাথে একান্তে কিছু কথা আছে। আমি এখন আমার পাওনা আদায়ে ব্যস্ত আছি, যেমন আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। তাই, এখন আপনি চলে যান এবং আমার পাওনা আদায় করতে দিন।
হজ্জাজ বলেন: তারপর যখন আমি মক্কায় রক্ষিত আমার সমস্ত পাওনা আদায় করে নিলাম এবং মক্কা ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম, তখন আমি আব্বাসের সাথে গিয়ে দেখা করলাম এবং বললাম: হে ফযলের বাপ! আমার কথাগুলো খুবই গোপন রাখবেন। কেননা, তিন দিন পর্যন্ত আমি লোকজনের অনুসন্ধানের আশঙ্কা করি। তারপর আপনার যা ইচ্ছা হয় বলবেন। জবাবে তিনি বললেন: আমি তাই করবো।
তখন আমি বললাম "আমি আপনার ভাতিজাকে খায়বরবাসীদের রাজকন্যার সাথে বাসর করা অবস্থায় রেখে এসেছি।" তিনি এ দিয়ে সুফিয়া বিন্ত হুয়াইর কথা বুঝাচ্ছিলেন। তিনি খায়বর জয় করে নিয়েছেন এবং তার সমুদয় সম্পদ বের করে নিয়েছেন। এ সব কিছু তাঁর এবং তাঁর সাথীদের মালিকানাধীন।
তখন আব্বাস বলে উঠলেন: তুমি এ সব কী বলছো হে হাজ্জাজ? আমি বললাম: 'আল্লাহর কসম! আমি যা বলছি, সত্যই বলছি। আপনি আমার এ সব কথা গোপন রাখবেন। আর আমি ইতিমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। আমি কেবল আমার অর্থ-সম্পদগুলো নিয়ে যেতে এসেছি, এ আশঙ্কায় যে পাছে তা মারা পড়ে। তিন দিন চলে গেলে ইচ্ছা মত আপনি তা প্রকাশ করতে পারেন।
হাজ্জাজ বলেন: তারপর তৃতীয় দিন যখন উপস্থিত হলো, তখন আব্বাস নকশী শাল গায়ে দিয়ে সুগন্ধি মেখে, লাঠি হাতে কা'বায় এসে পৌছলেন। তিনি কা'বার তওয়াফ করলেন। কুরায়শরা তাঁকে দেখতে পেয়ে বলল: হে ফযলের বাপ! এমন কঠিন বিপদে এরূপ সহনশীলতা! আল্লাহর কসম! এতো বড় তাজ্জব ব্যাপার!
জবাবে তিনি বললেন: আল্লাহর কসম। তোমরা যা শুনেছ, তা ঠিক নয়। মুহাম্মদ খায়বর জয় করেছেন। খায়বরবাসীদের রাজকন্যার সাথে বাসর উদযাপনের অবস্থায় তাঁকে রেখে আসা হয়েছে। ওখানকার সমস্ত ধন-সম্পদ এখন তাঁর এবং তাঁর সহকারীদের করতল গত।
তারা জিজ্ঞাসা করলেন: এ সংবাদটি আপনার কাছে কে নিয়ে এলো? তিনি বললেন: যে তোমাদের কাছে ঐ সংবাদ নিয়ে এসেছে সে-ই। সে মুসলমান হওয়ার পরেই তোমাদের নিকট এসেছিল, তার অর্থ-সম্পদ সে নিয়ে গেছে এবং মুহাম্মদ ও তাঁর সাহাবীদের সাথে আবার মিলিত হওয়ার উদ্দেশ্যে সে চলেও গিয়েছে। সে থাকবেও তাদের সাথেই।
তখন তারা বলে উঠলেন: আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর দুশমন হাতছাড়া হয়ে গেল। আল্লাহর কসম। যদি একটু আঁচ করতে পারতাম, তা হলে তার ও আমাদের মধ্যে একটা বোঝাপড়া হতো! তাকে আমরা দেখিয়ে দিতাম মজাটা!
হাজ্জাজ বলেন: এর ক'দিন যেতে না যেতেই তাদের কাছে আমার দেওয়া সংবাদের যথার্থতা প্রমাণিত হয়ে গেল।
📄 খায়বার সম্পর্কে হাসানের কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন: খায়বর প্রসঙ্গে যে সমস্ত কবিতা রচিত হয়, তার মধ্যে হাসান ইবন সাবিত (রা)-এর রচিত এ কবিতাটিও ছিল:
بنسما قاتلت خيابر عما ..... موت الهزال غير جميل
খায়বরবাসীরা যা জমিয়েছিল কৃষিজমি ও খেজুরবাগানে তা রক্ষার্থে তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল একান্তই নিম্নমানের। তারা মৃত্যুকে অপছন্দ করে, ফলশ্রুতিতে তাদের হেরেম সমূহকে বৈধ করে নেয়া হয়, তারা যে আচরণ করে তা একান্তই ইতর সুলভ। এরা কি মৃত্যু থেকে পলায়ন করে? কাপুরুষোচিত ও দুর্বলের মৃত্যু- নিশ্চয়ই নয় উত্তম ও কাংক্ষিত মৃত্যু।
📄 আয়মনের পক্ষ থেকে কৈফিয়ত
হাসান ইব্ন সাবিত (রা) আয়মান ইবন উম্মু আয়মন ইবন উবায়দের পক্ষ থেকে কৈফিয়ত দিয়েও কবিতা লিখেন। ইনি খায়বর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন বন্ আওফ ইব্ন খাযরাজ গোত্রের লোক। তাঁর মা উম্মু আয়মন ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আযাদকৃত দাসী। উম্মু আয়মনের আরেকটি পরিচয় হচ্ছে-তিনি উসামা ইব্ন যায়দের মাও বটে। সে মতে, আয়মন উসামা ইব্ন যায়দের বৈপিত্রেয় ভাই। হাসান (রা) তাঁর সে কৈফিয়তমূলক কবিতায় বলেন:
على حين ان قالت لا يمن امة ....... وما كان منه عنده غير ايسر -
আয়ুমনের মা যখন তাকে তিরস্কার করে বলছিলেন- খায়বর যুদ্ধের অশ্বারোহীদের সাথে যোগ না দিয়ে, হে আয়মন! তুই কাপুরুষতা প্রদর্শন করলি।
আসলে সেদিন আয়মন কিন্তু মোটেই কাপুরুষতা প্রদর্শন করেন নি; বরং তাঁর ঘোড়াটি আটা মিশ্রিত নেশাযুক্ত পানি পানে হয়ে পড়েছিল পীড়িত। যদি না তার অশ্বটি সেদিন ব্যাধিগ্রস্ত হতো, তবে অবশ্যই অশ্বারোহীরূপে এমন যুদ্ধই তিনি করতেন, যাতে (ডান হাত ছাড়া) বাম হাতের আর প্রয়োজনই হতো না।
ইব্ন হিশাম বলেন: এ শেষোক্ত পংক্তিটি আবু যায়দ আনসারী আমাকে শুনিয়েছেন, আর বলেছেন যে, আসলে এ পংক্তিটি কা'ব ইবন মালিকের রচিত। আর তিনি এ পংক্তিটি আমাকে শুনিয়েছেন এভাবে: বরং তাঁকে আটকিয়ে ফেলেছে তাঁর ঘোড়ার অবস্থা যদি তা না হতো, তা হলে তিনি কোন ত্রুটি করতেন না।
📄 নাজিয়া ইবন জুনদাব আসলামীর কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন: নাজিয়া ইব্ন জুনদীব আসলামীও অনুরূপ তাঁর কবিতায় বলেন:
কিসের নেশায় বুঁদ হয় রও বান্দারা আল্লাহর? এতো শুধু দেখি পানাহারই যেন হয়ে গেল সারাসার। অর্থচ থাকিবে জান্নাত মাঝে নিয়ামত চমৎকার।
নাজিয়া ইব্ন জুনদাব আসলামী আরো বলেন:
যে আমাকে না চেনার ভান করে, বা পাত্তাই দিতে চায় না, (তার জন্যে আমি পরিচয় দিচ্ছি) পিতা মোর জুনদাব কত প্রতিপক্ষ এমন যে, যুদ্ধকালে তারা অধঃমুখী। তাদের মরদেহে হয় শকুন ও শিয়ালের উৎসব।
ইন হিশাম বলেন: এ পংক্তিটি কিছু শব্দগত পার্থক্যসহ রাবী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন।