📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খায়বরের অভিযান

📄 খায়বরের অভিযান


আমার নিকট আবু মুহাম্মদ আবদুস মালিক ইব্‌ন হিশাম বলেন যে, যিয়াদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ বাক্কীয় মুহাম্মদ ইবন ইসহাক মুত্তালিবী থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুদায়বিয়া থেকে প্রত্যাবর্তন করে যিলহাজ্জ ও মুহাররম মাসের কতেক দিন মদীনায় অবস্থান করেন। সুতরাং ঐ বছরের হজ্জেও মুশরিকরাই মুতাওয়াল্লীরূপে বহাল থাকে। মুহাররমের শেষ দিকে তিনি খায়বর অভিমুখে যাত্রা করেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: এসময় তিনি মদীনায় নুমায়লা ইব্‌ন আবদুল্লাহ লায়সীকে শাসনকর্তা হিসাবে নিযুক্ত করেন। তিনি যুদ্ধের পতাকা আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-এর হাতে অর্পণ করেন। সে পতাকাটি ছিল সাদা বর্ণের।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্‌ন ইবরাহীম ইবন হারিস তায়মী, আবুল হায়সাম নাসর দুহর আসলামীর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তাঁর পিতা তাঁর নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে খায়বর যাত্রাকালে আমির ইব্‌ন আকওয়াকে, যিনি ছিলেন সালমা ইব্‌ন আমর ইব্‌ন আকওয়ার চাচা-বলতে শোনেন: হে আকওয়া তনয় অবতরণ কর এবং আমাদেরকে তোমার হুদীগান' শুনাও। আকওয়ার আসল নাম ছিল সিনান।
রাবী বলেন: সেমতে ইব্‌ন অকিওয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হুদীগান শুনাতে থাকেন। তা ছিল এরূপ:
والله لو لا الله ما اهتدينا ولا تصدقنا ولا صلينا
انا إذا قوم بغوا علينا وان ارادوا فتنة ابينا
فانزلن سكينة علينا وثبت الاقدام ان لاقينا
কসম আল্লাহ্! যদি তাঁর রহমত না হতো। তবে আমরা পেতাম না হিদায়াত, দিতাম না সাদাকা, আর না কায়েম করতাম সালাত।
আমরা সেই সে জাতি— যখন কোন গোষ্ঠী মোদের বিরুদ্ধে উঠে মাতি, বাধায় গণ্ডগোল, তখন আমরা তাদের ঘৃণা করে থাকি।
হে প্রভু, মোদের সান্ত্বনা দাও, কর দয়া বর্ষণ, দাও মোদের স্থিতি ও দৃঢ়তা, যখন বাঁধে কোন রণ!
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন:
يَرْحَمُكَ اللَّهُ
আল্লাহ্ তোমার প্রতি রহমত বর্ষণ করুন।
তখন উমর ইবন খাত্তাব বলে উঠলেন:
وَجَبَتْ وَاللَّهِ يَا رَسُولَ اللَّهِ لَوْ امْتَعْتَنَا بِهِ -
ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তার জন্যে তো শাহাদাত অবধারিত হয়ে গেল। হায়, যদি আমাদেরকে তা দিয়ে ধন্য করতেন।
সত্যি সত্যি সেদিন ইব্‌ন আকওয়া শাহাদাত লাভ করেন। আমার জানা মতে যুদ্ধকালে তাঁর নিজের তরবারি তার প্রতি ফিরে এসে তাঁকে গুরুতরভাবে আহত করে এবং এতেই তিনি শাহাদত লাভ করেন।
মুসলমানদের মধ্যে তাঁর শাহাদতের ব্যাপারে সন্দেহের উদ্রেক হয়। তাঁরা বলাবলি করতে থাকেন, নিজের তরবারির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে সে কি করে শহীদ হয়? এমন কি শেষ পর্যন্ত তাঁর ভাজিতা সালামা ইব্‌ন আমর ইব্‌ন আকওয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন। তিনি তাঁর ব্যাপারে লোকদের জল্পনা-কল্পনার কথাও তাঁকে অবহিত করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বললেন: لشهيد। সে যে শহীদ, তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই। তিনি যথারীতি তাঁর জানাযার সালাত আদায় করেন। তাঁর সাথে সাথে মুসলমানগণ ও তাঁর জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। ফলে তাঁর ব্যাপারে সমস্ত জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে।

টিকাঃ
১. আমাদের দেশের গাড়য়ানদের ভাওয়াইয়া গানের এবং মাঝিদের ভাটিয়ালী গানের মত আরব দেশের উষ্ট্রচালকদের হুদীগান অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং উটের জন্য উৎসাহ বর্ধক গান ছিল। এতে বিনোদন ও সফরের ক্লান্তি লাঘব হতো।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু'আ

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু'আ


ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে এমন এক রাবী বর্ণনা করেছেন। যাকে আমি মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিতে পারি না; তিনি আতা ইব্‌ন আবু মারওয়ান আসলামী থেকে, তিনি তাঁর পিতা থেকে, তিনি আবূ মাতাবন্ন আমর থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বরের নিকটবর্তী হলেন, তখন তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেন, আর এ সময় আমিও তাঁদের সঙ্গে ছিলাম : قفُوا- তোমরা থামো! তারপর তিনি বললেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ السَّمَوَاتِ وَمَا أَظْلَلْنَ وَرَبُّ الْأَرْضِينَ وَمَا أَقْلَلْنَ وَرَبُّ الشَّيَاطِينُ وَمَا أَضْلَلْنَ وَرَبِّ الرِّياحُ وَمَا أَذْرَيْنَ - فَإِذَا نَسَأَلُكَ خَيْرَ هٰذِهِ الْقَرْيَةِ وَخَيْرَ أَهْلِهَا وَخَيْرَ مَا فِيْهَا وَنَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّهَا وَشَرِّ أَهْلِهَا وَشَرِّ مَا فِيْهَا -
হে আল্লাহ! হে ঐ সত্তা, যিনি আসমান ও তার ছায়াতলে যা কিছু রয়েছে তার প্রতিপালক! হে ঐ সত্তা, যিনি যমীন ও তার, মধ্যে যা কিছু উৎপন্ন হয়, তার প্রতিপালক! হে ঐ সত্তা, শয়তান ও তার দ্বারা পথভ্রষ্টদের যিনি প্রতিপালক! হে ঐ সত্তা, যিনি বায়ুমণ্ডল ও তার দ্বারা উড়িয়ে নেওয়া বস্তুর প্রতিপালক : আমরা তোমার কাছে এ জনপদের এবং এর বাসিন্দাদের মধ্যে নিহিত মঙ্গল প্রার্থনা করছি এবং এর মধ্যে থাকা সমস্ত মঙ্গলের প্রার্থনাও তোমার কাছে করছি! আমরা এর বাসিন্দাদের এবং এর মধ্যে সমস্ত অমঙ্গল থেকে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
তারপর তিনি বললেন : بِسْمِ اللهِ আদ্‌উমু তোমরা আল্লাহর নামে অগ্রসর হও! রাবী বলেন : যে কোন জনপদে প্রবেশের সময় রাসুলুল্লাহ (সা) এ দু'আটি পড়তেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খায়বরবাসীদের পলায়ন

📄 খায়বরবাসীদের পলায়ন


ইবন ইসহাক বলেন : আমি যাকে অপবাদ দিতে পারি না, এমন একজন রাবী আমার কাছে আনাস ইবন মালিকের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে মনস্থ করতেন, তখন তাদের উপর তিনি প্রত্যুষে আক্রমণ চালাতেন। যদি কোন জনপদে পৌঁছে ভোরে আযান শুনতে পেতেন, তা হলে তিনি আক্রমণ থেকে বিরত থাকতেন। আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তা হলে আক্রমণ চালাতেন। আমরা রাতের বেলা খায়বরে গিয়ে অবতরণ করলাম। রাসুলুল্লাহ (সা) সেখানে রাত্রীযাপন করলেন। প্রত্যুষে সেখানে তিনি আযান শুনতে পেলেন না। তখন তিনি বাহনে আরোহণ করলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে সাথে বাহনে আরোহণ করলাম। আমি নিজে আবু তালহার সাথে সহ-আরোহী হলাম। আমরা রাসুলুল্লাহ (সা)-এর এতই গা ঘেঁষে পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছিলাম যে, আমার পা রাসুলুল্লাহ (সা) পবিত্র পদযুগল স্পর্শ করতে লাগলো। আমরা লক্ষ্য করলাম, খায়বরের কর্মজীবী লোকেরা প্রত্যুষে ঘর থেকে কর্মস্থলের দিকে বেরিয়ে পড়েছে। সঙ্গে তাদের বেলচা ও টুকরী রয়েছে। তারা যখন রাসুলুল্লাহ (সা) ও লোক-লশকর দেখতে পেলো, তখন তারা বলাবলি করতে লাগলো যে, ঐ যে মুহাম্মদ ও তাঁর পঞ্চবাহিনী দেখা যাচ্ছে। তখন তারা পলায়ন দিকে দৌড়ে পালালো। তখন রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন :
اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِيْنَ -
আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ, খায়বর উজাড় হয়ে গেল। আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের আঙিনায় অবতীর্ণ হই, তখন ঐ সম্প্রদায়ের সকালের আর্তনাদ হয় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, যাদেরকে সর্তক করা হয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট হুমায়দ সূত্রে হারূন, আনাস (রা) থেকে এরূপ বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১. লোক-লশকরকে পঞ্চবাহিনী বলার কারণ হলো : সে যুগে সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ বাহিনীতে পাঁচটি সৈন্য দলের সমাহার থাকতো : (১) অগ্রবর্তী বাহিনী, (২) দক্ষিণ বাহিনী, (৩) বাম দিকের বাহিনী, (৪) মধ্যবর্তী বাহিনী ও (৫) পশ্চাৎবর্তী বাহিনী।

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যাকে অপবাদ দিতে পারি না, এমন একজন রাবী আমার কাছে আনাস ইবন মালিকের সূত্রে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ যখন কোন সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ পরিচালনা করতে মনস্থ করতেন, তখন তাদের উপর তিনি প্রত্যুষে আক্রমণ চালাতেন। যদি কোন জনপদে পৌঁছে ভোরে আযান শুনতে পেতেন, তা হলে তিনি আক্রমণ থেকে বিরত থাকতেন। আর যদি আযান শুনতে না পেতেন, তা হলে আক্রমণ চালাতেন। আমরা রাতের বেলা খায়বরে গিয়ে অবতরণ করলাম। রাসুলুল্লাহ (সা) সেখানে রাত্রীযাপন করলেন। প্রত্যুষে সেখানে তিনি আযান শুনতে পেলেন না। তখন তিনি বাহনে আরোহণ করলেন এবং আমরাও তাঁর সাথে সাথে বাহনে আরোহণ করলাম। আমি নিজে আবু তালহার সাথে সহ-আরোহী হলাম। আমরা রাসুলুল্লাহ (সা)-এর এতই গা ঘেঁষে পাশাপাশি এগিয়ে যাচ্ছিলাম যে, আমার পা রাসুলুল্লাহ (সা) পবিত্র পদযুগল স্পর্শ করতে লাগলো। আমরা লক্ষ্য করলাম, খায়বরের কর্মজীবী লোকেরা প্রত্যুষে ঘর থেকে কর্মস্থলের দিকে বেরিয়ে পড়েছে। সঙ্গে তাদের বেলচা ও টুকরী রয়েছে। তারা যখন রাসুলুল্লাহ (সা) ও লোক-লশকর দেখতে পেলো, তখন তারা বলাবলি করতে লাগলো যে, ঐ যে মুহাম্মদ ও তাঁর পঞ্চবাহিনী দেখা যাচ্ছে। তখন তারা পলায়ন দিকে দৌড়ে পালালো। তখন রাসুলুল্লাহ (সা) বললেন :
اللهُ أَكْبَرُ خَرِبَتْ خَيْبَرُ إِنَّا إِذَا نَزَلْنَا بِسَاحَةِ قَوْمٍ فَسَاءَ صَبَاحُ الْمُنْذَرِيْنَ -
আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ, খায়বর উজাড় হয়ে গেল। আমরা যখন কোন সম্প্রদায়ের আঙিনায় অবতীর্ণ হই, তখন ঐ সম্প্রদায়ের সকালের আর্তনাদ হয় অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, যাদেরকে সর্তক করা হয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট হুমায়দ সূত্রে হারূন, আনাস (রা) থেকে এরূপ বর্ণনা করেছেন।

টিকাঃ
১. লোক-লশকরকে পঞ্চবাহিনী বলার কারণ হলো : সে যুগে সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ বাহিনীতে পাঁচটি সৈন্য দলের সমাহার থাকতো : (১) অগ্রবর্তী বাহিনী, (২) দক্ষিণ বাহিনী, (৩) বাম দিকের বাহিনী, (৪) মধ্যবর্তী বাহিনী ও (৫) পশ্চাৎবর্তী বাহিনী।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পথের মঞ্জিলসমূহ

📄 পথের মঞ্জিলসমূহ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তখন তিনি ইসর পাহাড়ের পথ ধরে অগ্রসর হন। সেখানে তিনি একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সাহবায় গিয়ে পৌঁছেন। তারপর সদলবলে রাজী প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। এ মঞ্জিলটি খায়বর ও গাতফানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, এ ভাবে তাঁরা গাতফান ও খায়বরবাসীদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে যাবেন। ফলে, গাতফানবাসীরা খায়বরবাসীদের কোনরূপ সাহায্য বা রসদপত্র পৌঁছাতে সমর্থ হবে না। কেননা, গাতফানবাসীরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে খায়বরবাসীদের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল।

ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন খায়বরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, তখন তিনি ইসর পাহাড়ের পথ ধরে অগ্রসর হন। সেখানে তিনি একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর সাহবায় গিয়ে পৌঁছেন। তারপর সদলবলে রাজী প্রান্তরে শিবির স্থাপন করেন। এ মঞ্জিলটি খায়বর ও গাতফানের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। উদ্দেশ্য ছিল এই যে, এ ভাবে তাঁরা গাতফান ও খায়বরবাসীদের মধ্যে অন্তরায় হয়ে যাবেন। ফলে, গাতফানবাসীরা খায়বরবাসীদের কোনরূপ সাহায্য বা রসদপত্র পৌঁছাতে সমর্থ হবে না। কেননা, গাতফানবাসীরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে খায়বরবাসীদের সমর্থক ও সাহায্যকারী ছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00