📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস

📄 শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস


ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী বলেছেন, তারপর কুরায়শরা সুহায়ল ইবন আমরকে, যে ছিল বনূ আমির ইব্‌ লুই গোত্রের লোক, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট প্রেরণ করেন। তারা তাকে বলে যে, তুমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে সন্ধিস্থাপন কর। তবে সে সন্ধিতে অবশ্যই একথা থাকবে যে, এ বছর তিনি আমাদের এখান থেকে ফিরে যাবেন। কেননা, আল্লাহ্র কসম! আরবরা চিরদিন বলাবলি করবে যে, মুহাম্মদ বলপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করেছেন।
সুহায়ল ইব্‌ন আমর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করলেন। তিনি তাকে আসতে দেখেই বললেন:
قد أراد القوم الصلح حين بعثوا هذا الرجل
"এ লোকটিকে যখন কুরায়শরা প্রেরণ করেছে, তখন তারা যে সন্ধি করতে মনস্থ করেছে, এটা সুনিশ্চিত।"
সুহায়ল যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন সে আলাপ আলোচনা শুরু করলে, সে আলাপ অনেক দীর্ঘ হলো। অনেক বাদানুবাদ হলো। তারপর সন্ধি হবে বলে স্থির হলো। যখন সবকিছু ঠিকঠাক, কেবল লেখাটাই বাকী, এমন সময় উমর ইবন খাত্তাব (রা) দ্রুত সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি আবু বকর (রা)-এর সম্মুখীন হলেন এবং তাঁদের মধ্যে এরূপ কথোপকথন হলো:
উমর : হে আবু বকর। ইনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
আবূ বকর: অবশ্যই।
উমর: আমরা কি মুসলমান নই?
আবু বকর: অবশ্যই।
উমর: ওরা কি মুশরিক নয়?
আবূ বকর: অবশ্যই।
উমর: তা হলে আমাদের দীনের ব্যাপারে কেন আমাদের এই দৈন্য স্বীকার করা?
আবু বকর: হে উমর! তাঁরই আনুগত্য করে যাও, কেননা আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহ্র রাসূল।
উমর: আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।
তারপর উমর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এলেন। তাঁদের মধ্যে তখন যে কথোপকথন হয়, তা এরূপ :
উমর: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি কি আল্লাহ্র রাসূল নন?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: আমরা কি মুসলমান নই?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: ওরা কি মুশরিক নয়?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: তা হলে কেন আমাদের দীনের ব্যাপারে আমরা এ দৈন্য ও হীনতা স্বীকার করবো?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। আমি তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবো না, আর তিনিও আমাকে ধ্বংস করবেন না।
যুহরী (র) বলেন: উমর (রা) প্রায়ই বলতেন, সেদিন আমি যা করেছি, সে ভয়ে আমি এত নামায, রোযা, সাদকা খয়রাত এবং গোলাম আযাদ করেছি যে, শেষ পর্যন্ত আমার মনে আশার সঞ্চার হয়েছে যে, ব্যাপারটি ভালোয় ভালোয় সেরে যাবে।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সন্ধির শর্তাবলী

📄 সন্ধির শর্তাবলী


রাবী বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে ডাকলেন এবং বললেন: লিখ:
বিস্‌মিল্লাহির রাহমানির রাহীম -পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে।
তখন সুহায়ল বলে উঠলেন: এ তো আমরা জানি না, বরং লিখ, 'বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা'। অর্থাৎ হে আল্লাহ্, তোমার নামে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা-ই' লিখ। আলী (রা) তা-ই লিখলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: লিখ, এটা ঐ সন্ধি যা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সুহায়ল ইব্‌ন আমরের সাথে করেছেন। তখনই সুহায়ল আপত্তি করে উঠলেন: আরে, আমি যদি সাক্ষ্য দিতাম যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল, তা হলে তো আর আপনার সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ করতাম না! আপনি নিজের এবং আপনার পিতার নাম লিখুন! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আচ্ছা তাই লিখ: "এটা হচ্ছে সেই সন্ধি, যা মুহাম্মদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ তাঁর প্রতিপক্ষ সুহায়ল ইব্‌ন আমরের সাথে সম্পন্ন করেছেন।"
তাঁরা এ ব্যাপারে সমঝোতায় উপনীত হলেন যে, দশ বছর পর্যন্ত উভয় পক্ষে কোন যুদ্ধ হবে না। লোকজন নিরাপদে থাকতে পারবে। কেউ কারো উপর আক্রমণ করতে পারবে না। অভিভাবকের অনুমতি না নিয়ে কুরায়শের কেউ যদি (মক্কা থেকে) মুহাম্মদের নিকটে (মদীনায়) চলে যায়, তবে তিনি তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু মুহাম্মদের কোন সাথী যদি কুরায়শদের কাছে চলে আসে, তবে তারা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না। নিজেদের অন্তরে যা আছে, তা অন্তরেই থাকবে। তার বহিঃপ্রকাশ করা চলবে না। খিয়ানত বা বিশ্বাসভঙ্গ করা চলবে না।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনু খুযায়া ও বনু বকরের মৈত্রী গ্রহণ

📄 বনু খুযায়া ও বনু বকরের মৈত্রী গ্রহণ


যাদের ইচ্ছা তারা মুহাম্মদের সাথে চুক্তিবদ্ধ বা মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে, আর যাদের ইচ্ছা হয় তারা কুরায়শদের সাথে চুক্তিবদ্ধ বা মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে। এতে কোন পক্ষের হস্তক্ষেপ করা চলবে না।
সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হতে না হতেই বনু খুযায়া দ্রুত এগিয়ে এসে ঘোষণা করলো আমরা মুহাম্মদের সাথে মৈত্রী বন্ধন আবদ্ধ হলাম। ওদিকে বনূ বকর দ্রুত এগিয়ে এসে ঘোষণা করলো, আমরা কুরায়শদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করলাম।
আপনারা এবার মক্কায় প্রবেশ না করে ফেরত চলে যাবেন। আগামী বছর আমরা মক্কা থেকে বেরিয়ে যাবো, তখন আপনি আপনার সাথীদের নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করবেন এবং তিন দিন এখানে অবস্থান করবেন। আপনাদের সাথে আরোহীদের অস্ত্র-শস্ত্র থাকবে। তলোয়ার কোষবদ্ধ থাকবে, এর অন্যথা করে প্রবেশ করা চলবে না।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ জুন্দল ইব্‌ন সুহায়লের ঘটনা

📄 আবূ জুন্দল ইব্‌ন সুহায়লের ঘটনা


রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সুহায়ল ইব্‌ন আমরকে নিয়ে সন্ধিপত্র লেখানোর কাজে ব্যস্ত, এমনি সময় সুহায়লের পুত্র আবূ জন্দল শিকল পরিহিত অবস্থায় এসে পৌঁছলেন এবং তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকটে পৌঁছবার সুযোগ হলো।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেহেতু ইতিপূর্বে মক্কা বিজয়ের বিষয়টি স্বপ্নে দেখেছিলেন, তাই সফরে বের হওয়ার সময় সাহাবীদের মনে বিজয় সম্পর্কে কোন দ্বিধাদ্বন্দু ছিল না। তারপর যখন তারা সন্ধি ও প্রত্যাবর্তন লক্ষ্য করলেন এবং ব্যাপারটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য কত কষ্টকর হয়েছে তাও তারা অবলোকন করলেন, তখন তাঁদের অস্থিরতার অন্ত ছিল না। অন্তর্জালায় তাঁরা তখন জ্বলে পুড়ে শেষ হচ্ছিলেন।
সুহায়ল যখন আবূ জন্দলকে দেখতে পেলো, তখন সে তার নিকটবর্তী হল এবং সজোরে তাঁকে চপেটাঘাত করলো এবং জোরে তার গলা চেপে ধরলো। তারপর বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার ও আমার মধ্যে সন্ধি চূড়ান্ত হয়ে গেছে। তারপরেই কিন্তু এর আগমন হয়েছে।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি যথার্থই বলেছো। তারপর সুহায়ল আবূ জন্দলকে টানা হেঁচড়া শুরু করে দিল যাতে সে তাঁকে কুরায়শদের মধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তখন আবূ জন্দল উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করে বলতে লাগলেন:
يَا مَعْشَرَ الْمُسْلِمِينَ أَأَرَدُّ إِلَى الْمُشْرِكِينَ يَفْتَنُونِي فِي دِينِي ؟
হে মুসলিম সম্প্রদায়! আমাকে কি মুশরিকদের হাতে পুনরায় তুলে দেওয়া হবে, আর তারা আমার দীন বরবাদ করবে?
এতে মুসলমানদের মর্মপীড়া আরো বৃদ্ধি পেলো। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন:
یا ابا جندل فاصبر واحتسب فان الله جاعل لك ولمن معك من المستضعفين فرجا و مخرجا وانا قد عقدنا بيننا وبين القوم صلحا واعطيناهم على ذلك واعطونا عهد الله وانا. لانغدر بهم .
হে আবূ জন্দল। ধৈর্যধারণ কর এবং বিনিময়ে সওয়াবের আশা রাখ, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমার এবং তোমার দুর্বল মুসলমান সাথীদের জন্যে নিষ্কৃতির বন্দোবস্ত করে দেবেন। আমাদের এবং ঐ সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি চুক্তির বন্ধনে আমরা আবদ্ধ হয়েছি। আর এ ব্যাপারে আমরা এবং তারা আল্লাহর নামে পরস্পরে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, আর এ ব্যাপারে আমি বিশ্বাস ভঙ্গ করতে চাই না।
রাবী বলেন: এ সময় উমর ইবন খাত্তাব (রা) লাফ দিয়ে আবূ জন্দলের কাছে গেলেন এবং বললেন: সবর করো, হে আবু জন্দল! এরা হচ্ছে অংশীবাদী পৌত্তলিক। এদের রক্ত তো কুকুরের রক্তের মত। এ বলে তিনি তরবারির হাতল তাঁর নিকটবর্তী করে দিলেন।
রাবী বলেন: পরবর্তীকালে উমর (রা) বলতেন, আমার আশা ছিল, আবূ জন্দল তলোয়ার ধরবে এবং তার পিতার ভবলীলা সাঙ্গ করবে, কিন্তু সে ব্যক্তি তার পিতার দিকেই খেয়াল করলো, আর এভাবে সন্ধির কার্যকারিতা শুরু হলো।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00