📄 যুদ্ধের জন্য বায়'আত
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন উসমান নিহত হয়েছেন বলে খবর পেলেন, তখন তিনি বললেন:
لا نبرح حتى نناجز القوم -
এ সম্প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এ স্থান ত্যাগ করবো না।
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকদের বায়'আতের জন্য আহবান জানালেন। বৃক্ষের নীচে বায়'আতে রিদওয়ান অনুষ্ঠিত হলো। লোকেরা বলে থাকে যে, সেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের নিকট থেকে মৃত্যুর জন্য বায়'আত গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ বলতেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের নিকট থেকে মৃত্যুর জন্য বায়'আত গ্রহণ করেন নি, বরং তিনি এ মর্মে বায়'আত নিয়েছিলেন যে, আমরা পলায়ন করবো না।
যখন লোকদের থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বায়'আত গ্রহণ করলেন, তখন বনু সালামা গোত্রের জাদ ইব্ন কায়স ব্যতীত উপস্থিত সকল মুসলমানই সেদিন বায়'আতে আবদ্ধ হলেন, অন্য কেউই আর পিছিয়ে ছিলেন না। জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা) বলতেন: আল্লাহর কসম! আমি যেন দিব্যি দেখতে পাচ্ছি, জাদ ইব্ন কায়স তার উটনীর বগলের পাশ ঘেঁষে লোকের দৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকটে আসছেন, আর চুপিসারে তাঁর কানে কানে বলছেন: উসমানের ব্যাপারে যা রটেছে তা যথার্থ নয়।
📄 সর্বপ্রথম বায়'আত গ্রহণকারী ব্যক্তি
ইব্ন হিশাম বলেন: ওয়াকী ইসমাঈল ইব্ন আবূ খালিদ শা'আবীর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি বায়'আতে রিদওয়ানের বায়'আতে আবদ্ধ হন, তিনি হলেন আবু সিনান আসাদ্দী।
ইব্ন হিশাম বলেন: আমি যাঁকে বিশ্বস্ত বিবেচনা করি, এমন একজন রাবী সহীহ্ সনদে বর্ণনাকারীদের বরাতে আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, ইব্ন আবু মূলায়কা ইব্ন আবু উমর (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে উসমান (রা)-এর পক্ষ থেকে এভাবে বায়'আত গ্রহণ করেন যে, তিনি তাঁর এক হাত অপর হাতের উপর রাখেন।
📄 শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস
ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী বলেছেন, তারপর কুরায়শরা সুহায়ল ইবন আমরকে, যে ছিল বনূ আমির ইব্ লুই গোত্রের লোক, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট প্রেরণ করেন। তারা তাকে বলে যে, তুমি মুহাম্মদের কাছে গিয়ে সন্ধিস্থাপন কর। তবে সে সন্ধিতে অবশ্যই একথা থাকবে যে, এ বছর তিনি আমাদের এখান থেকে ফিরে যাবেন। কেননা, আল্লাহ্র কসম! আরবরা চিরদিন বলাবলি করবে যে, মুহাম্মদ বলপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করেছেন।
সুহায়ল ইব্ন আমর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আগমন করলেন। তিনি তাকে আসতে দেখেই বললেন:
قد أراد القوم الصلح حين بعثوا هذا الرجل
"এ লোকটিকে যখন কুরায়শরা প্রেরণ করেছে, তখন তারা যে সন্ধি করতে মনস্থ করেছে, এটা সুনিশ্চিত।"
সুহায়ল যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হলো, তখন সে আলাপ আলোচনা শুরু করলে, সে আলাপ অনেক দীর্ঘ হলো। অনেক বাদানুবাদ হলো। তারপর সন্ধি হবে বলে স্থির হলো। যখন সবকিছু ঠিকঠাক, কেবল লেখাটাই বাকী, এমন সময় উমর ইবন খাত্তাব (রা) দ্রুত সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি আবু বকর (রা)-এর সম্মুখীন হলেন এবং তাঁদের মধ্যে এরূপ কথোপকথন হলো:
উমর : হে আবু বকর। ইনি কি আল্লাহর রাসূল নন?
আবূ বকর: অবশ্যই।
উমর: আমরা কি মুসলমান নই?
আবু বকর: অবশ্যই।
উমর: ওরা কি মুশরিক নয়?
আবূ বকর: অবশ্যই।
উমর: তা হলে আমাদের দীনের ব্যাপারে কেন আমাদের এই দৈন্য স্বীকার করা?
আবু বকর: হে উমর! তাঁরই আনুগত্য করে যাও, কেননা আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহ্র রাসূল।
উমর: আমিও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি অবশ্যই আল্লাহর রাসূল।
তারপর উমর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এলেন। তাঁদের মধ্যে তখন যে কথোপকথন হয়, তা এরূপ :
উমর: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি কি আল্লাহ্র রাসূল নন?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: আমরা কি মুসলমান নই?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: ওরা কি মুশরিক নয়?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): অবশ্যই।
উমর: তা হলে কেন আমাদের দীনের ব্যাপারে আমরা এ দৈন্য ও হীনতা স্বীকার করবো?
রাসূলুল্লাহ্ (সা): আমি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। আমি তাঁর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করবো না, আর তিনিও আমাকে ধ্বংস করবেন না।
যুহরী (র) বলেন: উমর (রা) প্রায়ই বলতেন, সেদিন আমি যা করেছি, সে ভয়ে আমি এত নামায, রোযা, সাদকা খয়রাত এবং গোলাম আযাদ করেছি যে, শেষ পর্যন্ত আমার মনে আশার সঞ্চার হয়েছে যে, ব্যাপারটি ভালোয় ভালোয় সেরে যাবে।
📄 সন্ধির শর্তাবলী
রাবী বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-কে ডাকলেন এবং বললেন: লিখ:
বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম -পরম করুণাময় ও দয়ালু আল্লাহর নামে।
তখন সুহায়ল বলে উঠলেন: এ তো আমরা জানি না, বরং লিখ, 'বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা'। অর্থাৎ হে আল্লাহ্, তোমার নামে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: 'বি-ইসমিকা আল্লাহুম্মা-ই' লিখ। আলী (রা) তা-ই লিখলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: লিখ, এটা ঐ সন্ধি যা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সুহায়ল ইব্ন আমরের সাথে করেছেন। তখনই সুহায়ল আপত্তি করে উঠলেন: আরে, আমি যদি সাক্ষ্য দিতাম যে, আপনি আল্লাহ্র রাসূল, তা হলে তো আর আপনার সাথে যুদ্ধ বিগ্রহ করতাম না! আপনি নিজের এবং আপনার পিতার নাম লিখুন! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আচ্ছা তাই লিখ: "এটা হচ্ছে সেই সন্ধি, যা মুহাম্মদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ তাঁর প্রতিপক্ষ সুহায়ল ইব্ন আমরের সাথে সম্পন্ন করেছেন।"
তাঁরা এ ব্যাপারে সমঝোতায় উপনীত হলেন যে, দশ বছর পর্যন্ত উভয় পক্ষে কোন যুদ্ধ হবে না। লোকজন নিরাপদে থাকতে পারবে। কেউ কারো উপর আক্রমণ করতে পারবে না। অভিভাবকের অনুমতি না নিয়ে কুরায়শের কেউ যদি (মক্কা থেকে) মুহাম্মদের নিকটে (মদীনায়) চলে যায়, তবে তিনি তাকে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু মুহাম্মদের কোন সাথী যদি কুরায়শদের কাছে চলে আসে, তবে তারা তাকে ফেরত দিতে বাধ্য থাকবে না। নিজেদের অন্তরে যা আছে, তা অন্তরেই থাকবে। তার বহিঃপ্রকাশ করা চলবে না। খিয়ানত বা বিশ্বাসভঙ্গ করা চলবে না।