📄 উরওয়া ইবন মাস'উদের ভূমিকা
যুহরী (র) তাঁর হাদীসে আরও বলেন: তারপর কুরায়শরা উরওয়া ইবন মাসউদ ছাকাফীকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে প্রেরণ করলো। তখন সে বলল: হে কুরায়ש সম্প্রদায়! তোমরা যাকেই মুহাম্মদের কাছে প্রেরণ করেছ, সে ফেরত আসতেই যে দুর্ব্যবহার ও কটুবাক্যের শিকার হয়েছে, আমি তা লক্ষ্য করেছি। তোমরা সম্যকভাবে জ্ঞাত আছো যে, তোমরা আমার পিতৃস্থানীয় আর আমি হচ্ছি পুত্রতুল্য। আর উরওয়া ছিল সুবাইয়া বিন্ত আব্দ শামসের পুত্র। আর আমি তোমাদের উপর আপতিত বিপদের কথাও শুনেছি এবং আমি আমার সম্প্রদায়ের অনুসারীদের সংঘবদ্ধ করে তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছি।
তখন জবাবে তারা বললেন: তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি আমাদের নিকট অপবাদযোগ্য নও। (অর্থাৎ তোমার প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে, তাই তোমার বেলায় ঐ সব দুর্ব্যবহার ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রযোজ্য নয়)।
তখন উরওয়া বেরিয়ে পড়লো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করলো। তারপর বলল:
"হে মুহাম্মদ! তুমি ইতর শ্রেণীর লোকদের সংঘবদ্ধ করে সাথে নিয়ে এসেছো, যাতে তোমার আত্মীয়-স্বজনকে তাদের সাহায্যে ধ্বংস করতে পার। জেনে রেখো, কুরায়শরা তাদের স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বের হয়ে পড়েছে এবং পরিধানে তাদের চিতাবাঘের চামড়া। আল্লাহ্র নামে তারা প্রতিজ্ঞা করেছে যে, কোনক্রমেই তারা তোমাকে বলপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। আল্লাহর কসম! কাল যদি যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়, তবে এরা তোমাকে একাকী ছেড়ে চলে যাবে।"
রাবী বলেন: আবু বকর সিদ্দীক (রা) তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। উরওয়ার এরূপ মন্তব্য শুনে তিনি তাকে গালি দিয়ে বললেন: কী, আমরা তাঁকে একাকী ছেড়ে চলে যাবো।
উরওয়া তখন বলে উঠলেন: এ কে, হে মুহাম্মদ? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আবু কুহাফার পুত্র। তখন সে বলে উঠলেন: আল্লাহ্র কসম! যদি আমার উপর তোমার পূর্বের কোন অনুগ্রহ না থাকতো, তা হলে এক্ষণি আমি তোমার এ ধৃষ্টতার জবাব দিতাম?। কিন্তু তোমার সে দানের জন্যে এ ধৃষ্টতার কথা ছেড়ে দিলাম।
তারপর সে (আরবদের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাড়িতে হাত রেখে কথাবার্তা বলতে লাগলো।
রাবী বলেন: মুগীরা ইব্ন শু'বা তখন লৌহবর্ম পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উরওয়া যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাড়িতে হাত দিল, তখন তিনি তার হাতে আঘাত করে বললেন: ওহে! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখমণ্ডল থেকে তোর হাত সরিয়ে নে, নতুবা এ হাত আর তোর কাছে ফেরত যাবে না।
তখন উরওয়া বলতে লাগলেন: তোর সর্বনাশ হোক! কী কঠিন দিল ও কঠোর মিযাজ। রাবী বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুচকি হাসলেন। উরওয়া জিজ্ঞাসা করলেন: এ কে, হে মুহাম্মদ?
জবাবে তিনি বললেন: এ হচ্ছে তোমার ভাইয়ের বেটা মুগীরা ইব্ন শু'বা। তখন উরওয়া বলে উঠলো: ওরে গাদ্দার! তোর অপকর্মের ময়লা তো এই গতকাল মাত্র ধৌত হলো!
ইবন হিশাম বলেন: উরওয়া তার একথা দ্বারা যা বুঝাতে চেয়েছে তা হলো, মুগীরা ইব্ন শু'বা তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বনূ সাকীফের অন্তর্ভুক্ত বনূ মালিকের তের ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। ফলে, নিহতদের গোত্র বনূ মালিক এবং মুগীরার গোত্র আহনাফের মধ্যে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠে। তারপর উরওয়া নিহত পক্ষকে তেরটি রুক্তপণ দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে।
ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী (র) বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সাথেও ঐরূপ আলাপই করলেন, যা তার পূর্ববর্তী সাথীদের সাথে করেছিলেন। তিনি তাকেও জানিয়ে দেন যে, তিনি যুদ্ধের অভিপ্রায়ে আসেন নি।
📄 খিরাশ ইবন উমাইয়ার কুরায়শদের নিকট গমন
তখন উরওয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট থেকে চলে এলো এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা তাঁর প্রতি কীরূপ আচরণ করে থাকেন তাও তার দৃষ্টি এড়ালো না। তিনি ওযু করলেই তাঁর সাথীরা ওযুর ব্যবহৃত পানি লুফে নেয়ার জন্যে কাড়াকাড়ি করেন। তিনি থুথু ফেলতেই তা নিয়েও তাঁদের মধ্যে কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। তাঁর কোশ মাটিতে পড়ার আগেই তাঁর কাড়াকাড়ি করে লুফে নেন।
তারপর সে ব্যক্তি কুরায়שদের নিকট ফিরে যায় এবং বলে:
يا معشر قريش ، اني قد جئت كسرى في ملكه وقيصر في ملكه - والنجاشي في ملكه ، واني والله ما رأيت ملكا في قوم لا يسلمونه لشئ ابد فروا رايكم -
হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আমি পারস্য সম্রাট কিসরার সাথে তার রাজ্যে গিয়ে দেখেছি, রোম সম্রাট কায়সারকে তাঁর রাজ্যে গিয়ে দেখেছি, আবিসিনিয়ার রাজ নাজ্জাশীকে তার রাজ্যে গিয়ে দেখেছি। আল্লাহ্র কসম! আমি এমন কোন বাদশাহকে দেখিনি, যে তার সম্প্রদায়ের কাছে এতই সম্মানিত, যেমন মুহাম্মদ তাঁর সাহাবীদের কাছে অধিকতর প্রিয় ও সম্মানিত। আর আমি এমন এক সম্প্রদায়কে দেখেছি যারা কোন মূল্যেই এবং কস্মিনকালেও মুহাম্মদকে একাকী ছেড়ে পালিয়ে যাবে না। এমতাবস্থায় তোমরা কি করবে, তা তোমরাই ভেবে চিন্তে ঠিক কর!
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) খিরাশ ইবন উমাইয়া খুযায়ীকে ডেকে পাঠান এবং তাঁকে মক্কার কুরায়শদের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি তাঁকে তাঁর নিজের একটি উটে চড়ান—যার নাম ছিল ছা'লাব। তাঁকে তিনি এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন, যাতে করে তিনি মক্কার সরদারদের কাছে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্যের কথা বলে আসেন। তারা রাসূলুল্লাহর উটটিকে হত্যা করে এবং দূত খিরাশকেও হত্যা করতে উদ্যত হয়। কিন্তু হাবশীরা তাতে বাধা দেয় এবং তারা তাঁকে ছেড়ে দেয়। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ফিরে আসেন।
📄 কুরায়শের লোকজন ধৃত হওয়া প্রসংগে
ইবন ইসহাক বলেন: এমন এক রাবী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, যাঁকে আমি মিথ্যাবাদী হওয়ার অপবাদ দিতে পারি না, তিনি ইব্ন আব্বাস (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম ইকরিমার সূত্রে ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, এরপর কুরায়শরা তাদের চল্লিশ অথবা পঞ্চাশ জন লোককে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করে যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাহিনীর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে এবং তাঁর সাহাবীদের মধ্যকার কাউকে হাতের নাগালে পেলে তাকে হত্যা করে। কিন্তু তারা সকলেই ধৃত হয় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট নীত হয়।
📄 কুরায়শদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতিনিধি উসমান ইব্ন আফফান (রা)
তিনি তাদের ক্ষমা করে দেন এবং ছেড়ে দেন। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাহিনীর প্রতি পাথর ও তীর ছুঁড়েছিল।
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শ সরদারদের কাছে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যার জন্যে পাঠাবার উদ্দেশ্যে উমর ইব্ন খাত্তাব (রা)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! কুরায়শদের পক্ষ থেকে আমার প্রাণের আশঙ্কা রয়েছে। আর মক্কায় আদী ইব্ন কা'ব গোত্রেরও এমন কেউ নেই, যে আমার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। আর কুরায়ശদের বিরুদ্ধে আমার যে জাতক্রোধ রয়েছে এবং আমি যে তাদের বিরুদ্ধে কত কঠোর তা তারা সম্যক অবগত। আমি বরং আমার পরিবর্তে এমন লোকের সন্ধান দেবো, যিনি তাদের কাছে আমার চাইতেও বেশি সম্মানিত ও প্রবল। তিনি হচ্ছে উসমান ইব্ন আফফান (রা)! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে আবু সুফিয়ান এবং অন্যান্য কুরায়ש সরদারদের কাছে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করলেন যে, তিনি যেন তাদের এ মর্মে অবগত করেন যে, তিনি যুদ্ধের অভিপ্রায়ে আসেন নি, বরং তিনি কেবল আল্লাহ্র ঘরের যিয়ারত এবং তাঁর হেরেমের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যেই এসেছেন।