📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 নাজিয়ার কবিতা

📄 নাজিয়ার কবিতা


আসলাম গোত্রের লোকেরা 'নাজিয়া' কথিত গীতি কবিতার কিছু পংক্তি সুরসংযোগে গেয়ে শুনান। আমাদের ধারণা, উনিই সেই ব্যক্তি, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তীর নিয়ে কূপে অবতরণ করেছিলেন। আসলাম গোত্রের লোকেরা বলেন: নাজিয়া কূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকদের বালতি ভরে ভরে দিচ্ছিলেন। এমন সময় জনৈক আনসার বালিকা এসে বললেন:
يَا أَيُّهَا الْمَائِحُ دَلْوِي دُونَكَا
اني رَأَيْتَ النَّاسَ يَحْمد ونگا
يُشْنُونَ خَيْرًا وَيُمَجِدُونَكَ
হে ঐ ব্যক্তি, যে লোকদের বালতি ভরে পানি তুলে দিচ্ছে এই যে, নাও আমার বালতিটি। আমি দেখছি, লোক তোমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ, তারা তোমার যশগানে মুখর, তারা তোমার আভিজাত্যের প্রশংসা করছে।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: এক বর্ণনায় আছে-
انِّي رَأَيْتُ النَّاسِ يَمْدَحُونَكَا
অর্থাৎ তাঁর বর্ণনায় يحمدونکا শব্দটির পরিবর্তে يمدحونکا রয়েছে। (অর্থ অভিন্ন)।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: কুয়োর মধ্যে বালতি ভরার কাজে নিয়োজিত অবস্থায়ই নাজিয়া তখন জবাব দিলেন:
قد علمت جارية يمانيه
اني انا المائح واسمى ناجيه
ইয়ানী বালিকা ফেলেছে তাহা জানিয়া, বালতি ভরে দেই আমিই, নামটি আমার নাজিয়া
وطعنة ذات رشاش واهية
طعنتها عند صدور العاديه
ফোয়ারার মত কত যে জখম খুন ছিটায় আপন হাতের বল্লমে আমি দুশমনের সিনায় করেছি ঘা।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বুদায়ল ও খুযায়া গোত্রের লোকদের প্রসংগে

📄 বুদায়ল ও খুযায়া গোত্রের লোকদের প্রসংগে


যুহরী (র) বর্ণনা করেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটু শান্ত হলেন, তখন বুদায়ল ইন্ন ওরকা খাযায়ী তার গোত্রের লোকদের নিয়ে তাঁর খিদমতে উপস্থিত হলেন। তারা তাঁর সংগে আলাপ আলোচনা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনাদের আগমনের হেতু কি? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জানালেন যে, যুদ্ধের কোন অভিপ্রায় তাঁর নেই। নিছক বায়তুল্লাহ্র যিয়ারতের উদ্দেশ্যেই তিনি এসেছেন। একান্তই হারামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই তাঁর উদ্দেশ্য। তিনি তাদের ঠিক সে জবাবই দিলেন, যা তিনি ইতিপূর্বে বিশর ইবন সুফিয়ানকে দিয়েছিলেন।
তারপর খুযায়ী গোত্রের লোকরা কুরায়শদের কাছে ফিরে গিয়ে বললেন:
يا معشر قريش ، انكم تعجلون على محمد ان محمدا لم يأت لقتال وانما جاء زائر هذا البيت
যে কুরায়শ সম্প্রদায়! মুহাম্মদের বিষয়ে তোমরা শুধু শুধুই বাড়াবাড়ি করছো। তিনি তো আদৌ যুদ্ধের অভিপ্রায় আসেননি। তিনি কেবল বায়তুল্লাহর যিয়ারত করতেই এসেছেন।
একথা শুনে কুরায়শরা তাদের উপর ক্ষেপে গেল এবং তাদের অভিযুক্ত করে অশোভনীয় ভাবে তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে লাগলো। তারা বললেন: যদিও তিনি যুদ্ধের অভিপ্রায়ে না এসে থাকেন, তবুও তিনি বলপূর্বক আমাদের এখানে ঢুকে পড়তে পারবেন না। আর এ ব্যাপারে আরবরাও যেন আমাদের সাথে কোন কথাবার্তা না বলে।
যুহরী (র) বলেন: খুযায়ীরা মুসলিম-মুশরিক নির্বিশেষে সকলেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একান্ত অন্তরঙ্গ। মক্কায় যা কিছু ঘটতো, তার কিছুই তারা তাঁর কাছে গোপন রাখতো না।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মিকরায ও হুলায়সের আগমন

📄 মিকরায ও হুলায়সের আগমন


রাবী বলেন: এরপর কুরায়শরা মিকরায ইবন হাম্স ইব্‌ন আখইয়াফ নামক বনু আমির ইব্‌ন লুয়াই গোত্রের এক ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট প্রেরণ করলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন লোকটিকে তাঁর দিকে আসতে দেখতে পেলেন তখন বলে উঠলেন:
هذا رجل غادر
-এ লোকটি কিন্তু চালবাজ।
যখন সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট আসলো এবং কথাবার্তা বললো, তখন তিনি তাকে বুদায়র ও তাঁর সাথীদের যা বলেছিলেন, তা-ই বললেন। তখন সে ব্যক্তিও কুরায়שদের কাছে ফিরে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে যা বললেন, তা তাদের অবহিত করলো।
তারপর কুরায়শরা হুলায়স ইব্‌ন আলকاما অথবা ইব্‌ন যুব্বানকে যিনি তখন হাবশীদের সরদার ছিলেন এবং হারিস ইব্‌ন আব্দ মানাত ইব্‌ন কিনানা গোত্রের লোক ছিলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে প্রেরণ করলো। তাকে দেখেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন:
ان هذا من قوم يتألهون فابعثوا الهدى في وجهه حتى يراه -
এ লোকটি হচ্ছে একটি ইবাদতকারী গোত্রের লোক। সুতরাং কুরবানীর জন্তুগুলো তার দিকে নিয়ে যাও, যাতে সে তা দেখতে পায়।
যখন ঐ ব্যক্তি কুরবানীর জন্তুগুলোকে গলায় প্রতীকসহ প্রান্তরের এক দিক থেকে তাঁর দিকে একের পর এক আসতে দেখতে পেলো আর সে লক্ষ্য করলো যে, একটানা বাঁধা থাকার ফলে তাদের লোমগুলো ঝরে গেছে, তখন সে আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) পর্যন্ত না পৌঁছেই কুরায়শদের দিকে ফিরে গেল এবং তাদের তা অবহিত করলো।
রাবী বলেন: তখন তারা তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন:
اجلس فانما انت اعرابي لا علم لك -
বসে পড়ো হে! তুমি একটা আস্ত গেয়ো-গোঁয়ার, জ্ঞানবুদ্ধি বলতে তোমার কিছুই নেই।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু বকর বর্ণনা করেন। এতে হুলায়স ক্রুদ্ধ হন এবং বলেন:
"হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম! আমরা এ জন্যে তোমাদের সাথে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ হইনি এবং এ জন্যে চুক্তি করিনি যে, কেউ বায়তুল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে আসলেও তাকে বাঁধা দেওয়া হবে। সেই পবিত্র সত্তার কসম! যাঁর হাতে হুলায়সের প্রাণ, হয় তোমরা মুহাম্মদ যে উদ্দেশ্যে এসেছেন তাতে বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না, নতুবা আমি হাবশীদের নিয়ে তোমাদের থেকে পৃথক হয়ে যাবো।"
রাবী বলেন: তখন তারা বললো, আচ্ছা হুলায়স! একটু থামো দেখি, আমরা একটা সিদ্ধান্তে আসি, যাতে আমরা সকলে সম্মত হতে পারি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উরওয়া ইবন মাস'উদের ভূমিকা

📄 উরওয়া ইবন মাস'উদের ভূমিকা


যুহরী (র) তাঁর হাদীসে আরও বলেন: তারপর কুরায়শরা উরওয়া ইবন মাসউদ ছাকাফীকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে প্রেরণ করলো। তখন সে বলল: হে কুরায়ש সম্প্রদায়! তোমরা যাকেই মুহাম্মদের কাছে প্রেরণ করেছ, সে ফেরত আসতেই যে দুর্ব্যবহার ও কটুবাক্যের শিকার হয়েছে, আমি তা লক্ষ্য করেছি। তোমরা সম্যকভাবে জ্ঞাত আছো যে, তোমরা আমার পিতৃস্থানীয় আর আমি হচ্ছি পুত্রতুল্য। আর উরওয়া ছিল সুবাইয়া বিন্‌ত আব্দ শামসের পুত্র। আর আমি তোমাদের উপর আপতিত বিপদের কথাও শুনেছি এবং আমি আমার সম্প্রদায়ের অনুসারীদের সংঘবদ্ধ করে তোমাদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছি।
তখন জবাবে তারা বললেন: তুমি ঠিকই বলেছ। তুমি আমাদের নিকট অপবাদযোগ্য নও। (অর্থাৎ তোমার প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে, তাই তোমার বেলায় ঐ সব দুর্ব্যবহার ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য প্রযোজ্য নয়)।
তখন উরওয়া বেরিয়ে পড়লো এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করলো। তারপর বলল:
"হে মুহাম্মদ! তুমি ইতর শ্রেণীর লোকদের সংঘবদ্ধ করে সাথে নিয়ে এসেছো, যাতে তোমার আত্মীয়-স্বজনকে তাদের সাহায্যে ধ্বংস করতে পার। জেনে রেখো, কুরায়শরা তাদের স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বের হয়ে পড়েছে এবং পরিধানে তাদের চিতাবাঘের চামড়া। আল্লাহ্র নামে তারা প্রতিজ্ঞা করেছে যে, কোনক্রমেই তারা তোমাকে বলপূর্বক মক্কায় প্রবেশ করতে দেবে না। আল্লাহর কসম! কাল যদি যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়, তবে এরা তোমাকে একাকী ছেড়ে চলে যাবে।"
রাবী বলেন: আবু বকর সিদ্দীক (রা) তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিছনে উপবিষ্ট ছিলেন। উরওয়ার এরূপ মন্তব্য শুনে তিনি তাকে গালি দিয়ে বললেন: কী, আমরা তাঁকে একাকী ছেড়ে চলে যাবো।
উরওয়া তখন বলে উঠলেন: এ কে, হে মুহাম্মদ? জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আবু কুহাফার পুত্র। তখন সে বলে উঠলেন: আল্লাহ্র কসম! যদি আমার উপর তোমার পূর্বের কোন অনুগ্রহ না থাকতো, তা হলে এক্ষণি আমি তোমার এ ধৃষ্টতার জবাব দিতাম?। কিন্তু তোমার সে দানের জন্যে এ ধৃষ্টতার কথা ছেড়ে দিলাম।
তারপর সে (আরবদের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাড়িতে হাত রেখে কথাবার্তা বলতে লাগলো।
রাবী বলেন: মুগীরা ইব্‌ন শু'বা তখন লৌহবর্ম পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। উরওয়া যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দাড়িতে হাত দিল, তখন তিনি তার হাতে আঘাত করে বললেন: ওহে! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মুখমণ্ডল থেকে তোর হাত সরিয়ে নে, নতুবা এ হাত আর তোর কাছে ফেরত যাবে না।
তখন উরওয়া বলতে লাগলেন: তোর সর্বনাশ হোক! কী কঠিন দিল ও কঠোর মিযাজ। রাবী বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুচকি হাসলেন। উরওয়া জিজ্ঞাসা করলেন: এ কে, হে মুহাম্মদ?
জবাবে তিনি বললেন: এ হচ্ছে তোমার ভাইয়ের বেটা মুগীরা ইব্‌ন শু'বা। তখন উরওয়া বলে উঠলো: ওরে গাদ্দার! তোর অপকর্মের ময়লা তো এই গতকাল মাত্র ধৌত হলো!
ইবন হিশাম বলেন: উরওয়া তার একথা দ্বারা যা বুঝাতে চেয়েছে তা হলো, মুগীরা ইব্‌ন শু'বা তাঁর ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বনূ সাকীফের অন্তর্ভুক্ত বনূ মালিকের তের ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলেন। ফলে, নিহতদের গোত্র বনূ মালিক এবং মুগীরার গোত্র আহনাফের মধ্যে যুদ্ধের দাবানল জ্বলে উঠে। তারপর উরওয়া নিহত পক্ষকে তেরটি রুক্তপণ দিয়ে বিষয়টি মিটমাট করে।
ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী (র) বলেন, তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সাথেও ঐরূপ আলাপই করলেন, যা তার পূর্ববর্তী সাথীদের সাথে করেছিলেন। তিনি তাকেও জানিয়ে দেন যে, তিনি যুদ্ধের অভিপ্রায়ে আসেন নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00