📄 আয়েশা (রা)-এর অবস্থা
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার নিকট আসেন। আমার পিতামাতা তখন আমার নিকটে ছিলেন। আনসারের একজন মহিলাও তখন আমার নিকটে ছিল। আমি তখন কাঁদছিলাম এবং সে মহিলাটিও আমার সাথে সাথে কাঁদছিল। তিনি বসলেন এবং আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন। তারপর বললেন: "হে আয়েশা! লোকে কী বলাবলি করছে তা নিশ্চয়ই তুমি শুনে থাকবে। লোকে যা বলাবলি করে সেরূপ মন্দ কিছু যদি তুমি করে থাক, তবে আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নিকট তওবা কর! কেননা, আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করে থাকেন।"
আল্লাহর কসম! তিনি এটুকু বলতেই আমার চোখ ফেটে-অশ্রু বেরিয়ে এলো। তারপর তাঁর কোন কথার অনুভূতি আমার রইলো না। অপেক্ষা করছিলাম, আমার পিতামাতা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ কথার জবাব আমার পক্ষ থেকে দেবেন। কিন্তু তাঁরা একটি কথাও বললেন না।
আল্লাহ্র কসম! আমি আমার নিজের কাছে এর চেয়ে তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র ছিলাম যে, আমার ব্যাপারে আল্লাহ্ কুরআন নাযিল করবেন এবং মসজিদসমূহে তা তিলাওয়াত করা হবে ও এর দ্বারা সালাত আদায় করা হবে। তবে আমার দৃঢ় আশা ছিল যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর নিদ্রায় অবশ্যই এমন কোন স্বপ্ন দেখবেন, যাদ্বারা আল্লাহ্ অপপ্রচারকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে আমাকে নির্দোষ প্রতিপন্ন করবেন। কেননা তিনি তো আমার নির্দোষ হওয়া সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। অথবা তিনি যে কোনভাবে এ সংবাদটি তাঁকে আগত করবেন। কিন্তু আমার ব্যাপার কুরআন নাযিল হওয়া! আল্লাহ্র কসম! আমার সত্ত্বা আমার নিকট সে তুলনায় ছিল অনেক ছোট।
📄 চরম ধৈর্য
আয়েশা (রা) বলেন: আমি যখন লক্ষ্য করলাম যে, আমার পিতামাতা কিছু বলছেন না, তখন আমি তাদের বললাম: আপনারা কি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথার জবাব দেবেন না?
তিনি বলেন: তাঁরা দু'জনে বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমরা কিভাবে তাঁর জবাব দেব, তা বুঝতে পারছি না।
তিনি বলেন: আমার জানা মতে, আবু বকরের পরিবারে তখন যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা বিরাজ করছিল, এরূপ দিশাহারা অবস্থা আর কারো ঘরে বা বাড়িতেই ছিল না।
তিনি বলেন: যখন তাঁরা দু'জনে আমার ব্যাপারে মৌনতা অবলম্বন করলেন, তখন আমি মর্মাহত হলাম এবং খুব কান্নাকাটি করলাম। তারপর বললাম: আল্লাহ্র কসম। আপনি যা উল্লেখ করেছেন সে ব্যাপারে আমি কস্মিনকালেও আল্লাহ্র কাছে তওবা করবো না। আল্লাহ্ত্র কসম। আমি সম্যকভাবে জানি, লোকে যা বলাবলি করছে, সে ব্যাপারে আমি যদি স্বীকারোক্তি করি, তবে আল্লাহ্ সম্যক জানেন যে, আমি এ থেকে মুক্ত। সুতরাং যা হয়নি তাই আমাকে বলতে হবে। আর যদি আমি লোকে যা বলাবলি করছে তা অস্বীকার করি, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না।
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর আমি ইয়াকুব (আ)-এর নাম উল্লেখ করতে চাচ্ছিলাম, কিন্তু তা স্মরণ করতে পারলাম না। তখন আমি বললাম আমি বরং তাই বলবো, যা ইউসুফের পিতা বলেছিলেন,
فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللَّهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ -
ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছো সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। (১২: ১৮)
📄 নির্দোষের সুসংবাদ
আয়েশা (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখনো ঐ মজলিস ছেড়ে যাননি, এমন সময় আল্লাহ্ পক্ষ থেকে তাঁকে এমন এক অবস্থা আচ্ছন্ন করে ফেললো, যা তাঁকে (ওহী অবতরণের সময়) আচ্ছন্ন করতো। তাঁকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করা হলো। তাঁর মাথার নীচে চামড়ার একটি বালিশ রেখে দেওয়া হলো। যে সময় আমি এসব প্রত্যক্ষ করছিলাম তখন আল্লাহ্র কসম! আমার মনে কোন বিকার বা ভীতি ছিল না। কেননা, আমি তো জানতামই যে, আমি এ দোষ থেকে মুক্ত। আর আল্লাহ্ আমার উপর যুলুম করবেন না। পক্ষান্তরে, আমার আব্বা-আম্মার অবস্থা ছিল এই যে, সেই পবিত্র সত্ত্বার কসম যাঁর হাতে আয়েশার প্রাণ, যতক্ষণ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সেই বিশেষ অবস্থার অবসান না ঘটছিল, ততক্ষণ যেন এ ভয়ে তাঁদের প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাচ্ছিল যে, লোকে যা বলাবলি করছে, পাছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকেও তার সত্যতা প্রতিপন্ন হয়ে যায়।
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সে বিশেষ অবস্থার অবসান হলো। তিনি উঠে বসলেন। শীতের মওসুমেও তাঁর পবিত্র শরীর থেকে মুক্তার দানার মত ঘাম ঝরছিল। তিনি তাঁর ললাটের ঘাম মুছতে মুছতে বললেন:
أبشرى يَا عَائِشَةُ ، فَقَدْ أَنْزَلَ اللهُ بَرَانَتَكَ -
হে আয়েশা! সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ্ তোমার নির্দোষ হওয়ার কথা নাযিল করেছেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি তখন বলে উঠলাম: الحَمْدُ لله "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্রই।"
তারপর তিনি লোকজনের দিকে বের হলেন এবং তাদের লক্ষ্য করে খুতবা দিলেন। তিনি আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনে এ ব্যাপারে যা নাযিল করেছেন তা তাদেরকে তিলাওয়াত করে শুনালেন। তারপর তিনি গর্হিত অপপ্রচারে সর্বাধিক তৎপর মিস্তা ইব্ন উসাদা, হামনা বিন্ত জাহাশ এবং হাসান ইব্ন সাবিতকে অপবাদের নির্ধারিত 'হদ' বেত্রাঘাতের আদেশ প্রদান করলেন এবং যথারীতি সে আদেশ পালিত হলো।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আমার পিতা ইসহাক ইব্ন ইয়াসার বনূ নাজ্জারের কতিপয় লোকের বরাতে বর্ণনা করেছেন যে, আবূ আইউব খালিদ ইব্ন যায়দকে তাঁর স্ত্রী উন্মু আইউব বললেন: ওহে আবু আইউব। লোকে আয়েশা সম্পর্কে কী বলাবলি করছে তাকি আপনি শুনেননি? জবাবে তিনি বললেন: শুনেছি বৈ কি! এটা নিছক অপপ্রচার। তুমি নিজে কি অমন কর্ম করতে পারবে, হে আইউবের মা? মহিলাটি জবাব ছিলেন না, আল্লাহ্র কসম! অমন কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। আবু আইউব বললেন তা হলে আল্লাহর কসম! আয়েশা তোমার তুলনায় অধিকতর পুণ্যবতী! (সুতরাং তাঁর পক্ষে তা আরো বেশী অসম্ভব)।
আয়েশা (রা) বলেন: অপবাদকারীদের কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে যারা গর্হিত অপপ্রচারে অংশ গ্রহণ করেছিল, তাদের কথা উল্লেখ করে যখন কুরআনের আয়াত নাযিল হলো, তাতে আল্লাহ্ তা'আলা বললেন:
إِنَّ الَّذِينَ جَانُو بِالْإِفْكِ عُصْبَةٌ مِّنْكُمْ لَا تَحْسَبُوهُ شَرًّا لَكُمْ بَلْ هُوَ خَيْرٌ لَكُمْ لِكُلِّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ ما اكْتَسَبَ مِنَ الإِثْمِ ، وَالَّذِي تَوَلَّى كَبْرَهُ مِنْهُمْ لَهُ عَذَابٌ عَظِيمٌ -
যারা এ অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল; এই অপবাদকে তোমরা তোমাদের জন্য অনিষ্টকর মনে করো না; বরং এতো তোমাদের জন কল্যাণকর তাদের প্রত্যেকের জন্য আছে তাদের কৃত পাপকর্মের ফল, এবং তাদের মধ্যে যে এই ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছে, তার জন্য আছে কঠিন শাস্তি (২৪: ১১)।
আর এরা হচ্ছেন হাসান ইব্ন সাবিত এবং সাথীরা যারা খারাপ কথা প্রচার করেছিলেন। ইন হিশাম বলেন: এরা হলো আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় ও তার সঙ্গী-সাথীরা। ইবন হিশাম বলেন : وَالَّذِي تَوَلَّى كَبْرَهُ বলতে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়কেই বুঝানো হয়েছে। ইবন ইসহাক ও ইতিপূর্বে হাদীসে এর উল্লেখ করেছেন।
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
لَوْلَا إِذْ سَمِعْتُمُوهُ ظَنَّ الْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بِأَنْفُسِهِمْ خَيْرًا
এ কথা শোনার পর মু'মিন পুরুষ এবং নারীগণ কেন নিজেদের বিষয়ে সৎ ধারণা করেনি এবং বলেনি এটা তো সুস্পষ্ট অপবাদ (১৪: ১২)।
অর্থাৎ তারাও আবু আইউব ও তাঁর সহধর্মিণীর মতো কথা কেন বললো না?
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِذْ تَلَقَّوْنَهُ بِالْسِنَتِكُمْ وَتَقُولُونَ بِأَفْوَاهِكُمْ مَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَتَحْسَبُونَهُ هَيْنًا وَهُوَ عِنْدَ اللَّهِ عَظِيمٌ .
যখন তোমরা মুখে মুখে এটা ছড়াচ্ছিলে এবং এমন বিষয় মুখে উচ্চারণ করছিলে যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না এবং তোমরা একে তুচ্ছ গণ্য করেছিলে, যদিও আল্লাহর নিকট এটা ছিল গুরুতর বিষয় (২৪: ১৫)।
📄 আবূ বকর (রা) ও মিসতা প্রসংগে
যখন আয়েশা (রা) এবং অপপ্রচারকারীদের ব্যাপারে উক্ত বর্ণনা কুরআনে অবতীর্ণ হলো, তখন আবূ বকর (রা), যিনি আত্মীয়তা ও মিসতাহর অভাব-অনটনের দিকে লক্ষ্য করে তার জন্যে অর্থ ব্যয় করতেন, তিনি বলে উঠলেন : আল্লাহর কসম! আর কস্মিনকালেও আমি মিসতার জন্যে না অর্থ ব্যয় করবো, আর না তার কোন উপকার সাধন করবো। কেননা, সে আয়েশা (রা)-এর বিরুদ্ধে অপপ্রচার করেছে এবং আমাদেরকে দারুন বিপাকে ফেলেছে। আয়েশা (রা) বলেন: তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করলেন:
وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ وَالسَّعَةِ أَنْ يُؤْتُوا أولى القربى وَالْمَسَاكِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ فِي سَبِيلِ الله وَلِيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا .
তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তাঁরা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহ্ রাস্তায় যারা গৃহ ত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না। তারা যেন ওদের ক্ষমা করে এবং ওদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে (২৪: ২২)।
الا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللهُ لَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
তোমারা কি চাও না যে, আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করেন? আর আল্লাহ্র ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (২৪: ২২)।
وَلَا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ : কুরআনে বর্ণিত : وَلا يَأْتَلِ أُولُوا الْفَضْلِ مِنْكُمْ -অর্থে এসেছে।
ইমরাউল কায়স ইবন হাজর কিন্দী তাঁর কবিতায় এক ব্যবহার করেছেন এভাবে:
الارب خصم فيك الوى رددته نصبح على تعذاله غير مؤتل
"শোন! তোমার ব্যাপারে শত্রুতাপোষণকারী ও ঝগড়াকারী এমন অনেক লোককে আমি প্রতিহত করেছি, যারা আমাকে তোমার ভালবাসার কারণে ভর্ৎসনা ও তিরস্কার করার ক্ষেত্রে কোনরূপ ত্রুটি করেনি।”
ইবন ইসহাক বলেন, আয়েশা (রা) বলেন: তখন আবু বকর (রা) বলে উঠলেন :
بلى وَاللَّهِ إِنِّي لَأُحِبُّ أَن يُغْفِرَ اللَّهُ لِي -
"হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই ভালবাসি যে, আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করে দিন।"
তারপর তিনি মিস্তাহকে আগের মত খরচ দিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি বললেন: وَاللَّهُ لَا أَنْزَعُهَا مِنْهُ أَبْدَا
"আল্লাহর কসম! আমি কখনো তা তার থেকে কেড়ে নেবো না।"