📄 প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ
ইব্ন হিশাম বলেন: তাঁর আম্মা ছিলেন উম্মু রুম্মান। তাঁর আসর নাম ছিল যায়নাব বিন্ত আব্দ দাহমান। তিনি ছিলেন বনু ফিরাস ইন্ন গানাম ইবন মালিক ইব্ন কিনানার একজন মহিলা।
ইন্ন ইসহাক বলেন: আয়েশা (রা) আরো বলেন: শেষ পর্যন্ত আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তখন আমি বললাম 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)!' এটা ঐ সময়ের কথা, যখন আমি তাঁর মধ্যে আমার প্রতি একটা বীতরাগ ভাব লক্ষ্য করলাম, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন, তা হলে আমি আমার আম্মার নিকট চলে যাই; যাতে করে তিনি আমার শুশ্রূষা করতে পারেন। জবাবে তিনি বললেন: এটা তোমার ইচ্ছা।
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর আমি আমার আম্মার নিকট স্থানান্তরিত হলাম। আর তখনো আমাকে নিয়ে যা হচ্ছিল, সে ব্যাপারে কিছুই আমার জানা ছিল না। এভাবে কুড়ি দিনের কিছু অধিককাল অতিবাহিত হতে না হতেই আমি দুশ্চিন্তায় অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়লাম। আর আমরা আরব জাতির লোকজন অনারব জাতিসমূহের মত ঘরের মধ্যে শৌচাগার নির্মাণে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমরা এটাকে ঘৃণিত গর্হিত বিবেচনা করতাম। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্যে আমরা মদীনার প্রশস্ত প্রান্তরে চলে যেতাম। মহিলারা তাদের এ প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বেরোতেন রাতের বেলায়। এরূপ এক রাত্রে আমি বেরিয়েছি। তখন আমার সাথে ছিলেন মিস্তার মা-যিনি ছিলেন আবূ রিহিম ইব্ন মুত্তালিব ইন্ন আব্দ মানাফের কন্যা। তাঁর মা ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর খালা এবং সখর ইবন আমির ইন্ন কা'ব ইব্ তায়ম-এর কন্যা। বৃদ্ধাটি হঠাৎ বলে উঠলেন: মিস্তার সর্বনাশ হোক। তিনি আমার সাথে চলতে গিয়ে পরিধেয় বস্ত্রের খোঁটে হোঁচট খেয়ে এ উক্তিটি করেন। মিস্তাহ ছিল তাঁর লকব, আসল নাম আওফ।
আয়েশা (রা) বলেন: এমন একটি লোক যে হিজরত করেছে, বদরের যুদ্ধে শরীক হয়েছে, তুমি তার ব্যাপারে ভাল কথা বললে না। বৃদ্ধাটি বললেন: তোমার বুঝি সংবাদটি জানা নেই, হে আবু বকর কন্যা?
আয়েশা (রা) বলেন: আমি বললাম কী সে সংবাদ? তখন তিনি অপবাদকারী গোষ্ঠীর বক্তব্য সম্পর্কে আমাকে অবগত করলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি বললাম, এই বুঝি ব্যাপার? তিনি জবাব দিলেন: হ্যাঁ, তা-ই।
আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! আমার আর প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা সম্ভব হলো না। আমি ফিরে আসলাম। তারপর থেকে সেই যে কাঁদতে শুরু করলাম, তা আর থামে না। এমন কি এক পর্যায়ে আমার মনে হলো যে, আমার কলিজা ফেটে যাবে।
আয়েশা (রা) বলেন: আমার আম্মাকে আমি বললাম, লোকে এত কথাবার্তা বলাবলি করলো, অথচ আপনি আমার কাছে তার বিন্দু-বিসর্গও প্রকাশ করলেন না!
জবাবে তিনি বলেন: বৎস, আত্মসম্বরণ কর। মন খারাপ করো না! আল্লাহর কসম! এটা কচিৎই হয় যে, কোন সুন্দরী মহিলা এমন কোন পুরুষের ঘর করে, আর পুরুষটি তাঁকে ভালবাসে, অথচ তাঁর ঘরে অন্য সতীনরা থাকে, আর তার বিরুদ্ধে তাদের বা অন্য লোকদের নানারূপ মন্দ কথা না থাকে।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বক্তৃতা
আয়েশা (রা) বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোক সমক্ষে খুতবা দিতে দণ্ডায়মান হলেন। আমি সে সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলাম না। চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন। তারপর তিনি বললেন:
ايها الناس ما بال رجال يؤذوننى فى اهلى ويقولون عليهم غير الحق
হে মানবমণ্ডলী! ঐসব লোকের হলোটা কি, যারা আমাকে আমার পরিবারের ব্যাপারে পীড়া দেয় এবং তাদের ব্যাপারে অহেতুক কথাবার্তা বলে।
والله ما علمت منهم الأخيرا
আল্লাহর কসম! আমি তাদের সম্পর্কে উত্তম বৈ কিছু অবগত নই।
ويقولون ذلك لرجل والله ما علمت منه الاخيرا
এসব বলাবলি করে, যার ব্যাপারে আমি উত্তম বৈ কিছু জানি না।
ولا يدخل بيتا من بيوتي الأوهو معى
আর সে আমার কোন ঘরে, আমার সঙ্গে ছাড়া, একাকী কখনো প্রবেশ করে না।
📄 ইবন উবায় এবং হামনা বিন্ত জাহাশ প্রসংগে
আয়েশা (রা) বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ইব্ন সালূলের ওখানে তার খাযরাজ গোত্রীয় কতিপয় সঙ্গী-সাথী-মিস্তাহ ও হামনা বিন্ত জাহাশের প্রচারিত অপবাদের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর হামনার এতে অংশ গ্রহণের কারণ হলো, তার বোন যয়নাব বিন্ত জাহাশ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রীরূপে তাঁর গৃহে ছিলেন। আর তিনি ছাড়া তাঁর অন্য কোন স্ত্রীই আমার সমপর্যায়ের ছিলেন না। কিন্তু যয়নাবকে আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দীনদারীসহ হিফাযত করেন। তিনি উত্তম বৈ কোন খারাপ মন্তব্য করেন নি। পক্ষান্তরে হামনা bিন্ত জাহাশ যথেষ্ট অপপ্রচার চালায়। সে তার বোনের খাতিরে আমার প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করতো। ফলে, এর দ্বারা সে দুর্ভাগ্যের অধিকারিণী হয়।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন উপরোক্ত বক্তব্য দিলেন, তখন উসায়দ ইবন হুযায়র দাঁড়িয়ে বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! ওরা যদি আওস বংশীয় হয়ে থাকে, তবে আমরা তার জন্যে যথেষ্ট। আর যদি ওরা আমাদের খাযরাজ গোত্রীয় ভাইদের মধ্য থেকে হয়ে থাকে, তা হলে আপনি আমাদের আদেশ দিন, আল্লাহর কসম! এমতাবস্থায় তাদের গর্দান উড়িয়ে দেয়াই সমীচীন হবে।"
তাঁর প্রতিবাদের সা'দ ইবন উবাদা উঠে দাঁড়ালেন। ইতিপূর্বে তাঁকে একজন সদাচারী ব্যক্তি বলে মনে করা হতো। তিনি বলে উঠলেন: "ওহে! আল্লাহর কসম! তুমি সঠিক বলোনি। এদের গর্দান উড়ানো যাবে না। আল্লাহ্ কসম! ওরা খাযরাজ গোত্রীয় বলেই তুমি এমনটি বলেছ, যদি ওরা তোমার স্ব-গোত্রীয় আওস হতো, তবে তুমি তা বলতে না।"
জবাবে উসায়দ বললেন: আল্লাহ্র কসম! তুমি মিথ্যা বলছো। বরং তুমি নিজেও একজন মুনাফিক এবং মুনাফিকদের পক্ষ থেকেই তুমি লড়ছো।
আয়েশা (রা) বলেন: লোকদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হলো। এমন কি আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্রে দাঙ্গা বেঁধে যাওয়ার উপক্রম হল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) মিম্বর থেকে অবতরণ করলেন এবং তিনি আমার নিকট আসলেন।
📄 রাসুলুল্লাহ্ (সা)-এর জিজ্ঞাসাবাদ
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) ও উসামা ইব্ন যায়দ (রা)-কে ডেকে তাঁদের পরামর্শ জানতে চাইলেন। এঁদের মধ্যে উসামা আমার প্রশংসাই করলেন এবং উত্তম কথাই বললেন। তারপর তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনার পরিবার, আমরা তো তাঁর সম্পর্কে উত্তম বৈ কিছুই জানি না। এটা একটা অপপ্রচার ও মিথ্যাচার। আর আলী (রা) বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্! মেয়ে লোকতো প্রচুর রয়েছে। আর আপনার এ সামর্থ্যও রয়েছে যে, একজনের বদলে অপরজন নিয়ে আসবেন। আর আপনি দাসীকে জিজ্ঞেস করুন, সে আপনাকে সত্য সত্য সব বলে দেবে।"
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞাসাবাদের উদ্দেশ্যে বারী'রাকে ডাকলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আলী ইব্ন আবু তালিব তার পাশে এসে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি তাকে ভীষণ প্রহার করলেন এবং বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সত্য সত্য সব বলবি।
সে বলল: আল্লাহর কসম! উত্তম ছাড়া তাঁর সম্পর্কে আর কিছুই আমি জানি না। আমি তো আয়েশার মধ্যে কোন দোষই খুঁজে পাই না। তবে হ্যাঁ, আমি যখন রুটির জন্যে, খামীর তৈরি করি, আর তাঁকে একটু দেখতে বলি, তখন তিনি সেদিকে খেয়াল না করে নিদ্রায় বিভোর হয়ে পড়েন আর এদিকে ছাগী এসে তা খেয়ে ফেলে।