📄 সাফওয়ান ইব্ন মুআত্তাল (রা)
আয়েশা (রা) বলেন: আমি তখন আমার চাদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি জানতাম, আমাকে যখন তারা খুঁজে পাবে না তখন অবশ্যই তারা আমার দিকে আবার ফিরে আসবে।
তিনি বলেন: আল্লাহর কসম! আমি যখন শায়িত অবস্থায় ছিলাম, তখন সাফওয়ান ইব্ন মুআত্তাল সালমী আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তিনি তাঁর দায়িত্ব পালনের প্রয়োজনে বাহিনী থেকে পিছনে রয়ে গিয়েছিলেন। তিনি লোকজনের সাথে ঐ রাত কাটাননি। তিনি আবছা অন্ধকারে আমাকে দেখতে পান। আমার নিকটে এসেই তিনি থমকে দাঁড়ান। পর্দার বিধান আসার পূর্বে তিনি আমাকে দেখে ছিলেন। তিনি যখন আমাকে দেখতে পেলেন, তখন তিনি 'ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন' বলে উঠলেন। তিনি বললেন: এ যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রী! আমি তখনো আমার চাদর জড়িয়ে থাকলাম। তিনি বললেন: আপনাকে কিসে পিছনে রাখলো? আল্লাহ্ আপনার উপর রহম করুন!
আয়েশা (রা) বলেন: কিন্তু আমি তাঁর সাথে কোন কথাই বললাম না। তিনি তাঁর উট আমার নিকটবর্তী করে দিলেন এবং বললেন: চড়ে বসুন এবং তিনি পিছনের দিকে সবে গেলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি চড়ে বসলাম। তিনি উটের মাথা ধরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললেন-যাতে করে লোকজনকে গিয়ে ধরতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমরা না লোকজনের নাগাল পেলাম, আর না আমার অনুপস্থিতির কথা কারো কাছে ধরা পড়লো। এভাবে ভোর হয়ে গেল এবং লোকজন মঞ্জিলে পৌঁছে অবতরণ করলো। লোকজন যখন স্বস্তির শ্বাস নিল, তখন ঐ ব্যক্তি আমাকে নিয়ে তাদের কাছে গিয়ে উপস্থিত হলেন।
টিকাঃ
২. তিনি বাহিনীর পিছনে চলে তাদের ফেলে আসা দ্রব্যাদি কুড়িয়ে আনার দায়িত্ব পালন করতেন। কেউ কেউ তাঁর ঐদিন পশ্চাতে পড়ার কারণ স্বরূপ বলেছেন: তিনি ছিলেন অত্যন্ত গাঢ় নিদ্রার অধিকারী। নিদ্রামগ্ন থাকার দরুন তিনি সময় মত জাগতে পারেননি বলেই, ঐদিন পিছনে পড়ে যান।
📄 অপবাদের প্রতিক্রিয়া
তারপর আমরা মদীনায় পদার্পণ করলাম। এর অব্যবহিত পরেই আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। বাইরের ওসব কথার কিছুই আমার কানে পৌঁছলো না। লোকদের এ কানাঘুষা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কান পর্যন্ত পৌঁছল। এমন কি আমার পিতামাতার কানেও তা পৌঁছলো। কিন্তু তাঁরা এর বিন্দু বিসর্গও আমার কাছে ব্যক্ত করলেন না। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আচরণের মধ্যে আমি কিছু কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আমার প্রতি তাঁর কোন কোন কোমল আচরণের অনুপস্থিতি লক্ষ্য করলাম। কখনও আমার অসুখ-বিসুখ হলে তিনি আমার প্রতি সহমর্মিতা ও অনুকম্পা প্রদর্শন করতেন। কিন্তু এবারের অসুখের সময় তিনি তেমন কিছু করলেন না। আমার কাছে তা কেমন যেন মনে হল। তিনি যখন আমার কাছে আসতেন, আর আমার আম্মা তখন আমার শুশ্রূষার জন্যে আমার কাছে থাকতেন। তখন তিনি বলতেন: كَيْفَ تيكُمْ-অর্থাৎ 'সে কেমন আছে?' এর বেশী তিনি কিছুই বলতেন না।
📄 প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞানলাভ
ইব্ন হিশাম বলেন: তাঁর আম্মা ছিলেন উম্মু রুম্মান। তাঁর আসর নাম ছিল যায়নাব বিন্ত আব্দ দাহমান। তিনি ছিলেন বনু ফিরাস ইন্ন গানাম ইবন মালিক ইব্ন কিনানার একজন মহিলা।
ইন্ন ইসহাক বলেন: আয়েশা (রা) আরো বলেন: শেষ পর্যন্ত আমার মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলো। তখন আমি বললাম 'ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)!' এটা ঐ সময়ের কথা, যখন আমি তাঁর মধ্যে আমার প্রতি একটা বীতরাগ ভাব লক্ষ্য করলাম, আপনি যদি আমাকে অনুমতি দেন, তা হলে আমি আমার আম্মার নিকট চলে যাই; যাতে করে তিনি আমার শুশ্রূষা করতে পারেন। জবাবে তিনি বললেন: এটা তোমার ইচ্ছা।
আয়েশা (রা) বলেন: তারপর আমি আমার আম্মার নিকট স্থানান্তরিত হলাম। আর তখনো আমাকে নিয়ে যা হচ্ছিল, সে ব্যাপারে কিছুই আমার জানা ছিল না। এভাবে কুড়ি দিনের কিছু অধিককাল অতিবাহিত হতে না হতেই আমি দুশ্চিন্তায় অত্যন্ত কাহিল হয়ে পড়লাম। আর আমরা আরব জাতির লোকজন অনারব জাতিসমূহের মত ঘরের মধ্যে শৌচাগার নির্মাণে অভ্যস্ত ছিলাম না। আমরা এটাকে ঘৃণিত গর্হিত বিবেচনা করতাম। প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্যে আমরা মদীনার প্রশস্ত প্রান্তরে চলে যেতাম। মহিলারা তাদের এ প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বেরোতেন রাতের বেলায়। এরূপ এক রাত্রে আমি বেরিয়েছি। তখন আমার সাথে ছিলেন মিস্তার মা-যিনি ছিলেন আবূ রিহিম ইব্ন মুত্তালিব ইন্ন আব্দ মানাফের কন্যা। তাঁর মা ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা)-এর খালা এবং সখর ইবন আমির ইন্ন কা'ব ইব্ তায়ম-এর কন্যা। বৃদ্ধাটি হঠাৎ বলে উঠলেন: মিস্তার সর্বনাশ হোক। তিনি আমার সাথে চলতে গিয়ে পরিধেয় বস্ত্রের খোঁটে হোঁচট খেয়ে এ উক্তিটি করেন। মিস্তাহ ছিল তাঁর লকব, আসল নাম আওফ।
আয়েশা (রা) বলেন: এমন একটি লোক যে হিজরত করেছে, বদরের যুদ্ধে শরীক হয়েছে, তুমি তার ব্যাপারে ভাল কথা বললে না। বৃদ্ধাটি বললেন: তোমার বুঝি সংবাদটি জানা নেই, হে আবু বকর কন্যা?
আয়েশা (রা) বলেন: আমি বললাম কী সে সংবাদ? তখন তিনি অপবাদকারী গোষ্ঠীর বক্তব্য সম্পর্কে আমাকে অবগত করলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আমি বললাম, এই বুঝি ব্যাপার? তিনি জবাব দিলেন: হ্যাঁ, তা-ই।
আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! আমার আর প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা সম্ভব হলো না। আমি ফিরে আসলাম। তারপর থেকে সেই যে কাঁদতে শুরু করলাম, তা আর থামে না। এমন কি এক পর্যায়ে আমার মনে হলো যে, আমার কলিজা ফেটে যাবে।
আয়েশা (রা) বলেন: আমার আম্মাকে আমি বললাম, লোকে এত কথাবার্তা বলাবলি করলো, অথচ আপনি আমার কাছে তার বিন্দু-বিসর্গও প্রকাশ করলেন না!
জবাবে তিনি বলেন: বৎস, আত্মসম্বরণ কর। মন খারাপ করো না! আল্লাহর কসম! এটা কচিৎই হয় যে, কোন সুন্দরী মহিলা এমন কোন পুরুষের ঘর করে, আর পুরুষটি তাঁকে ভালবাসে, অথচ তাঁর ঘরে অন্য সতীনরা থাকে, আর তার বিরুদ্ধে তাদের বা অন্য লোকদের নানারূপ মন্দ কথা না থাকে।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বক্তৃতা
আয়েশা (রা) বলেন: একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোক সমক্ষে খুতবা দিতে দণ্ডায়মান হলেন। আমি সে সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলাম না। চিরাচরিত অভ্যাস অনুযায়ী আল্লাহ্র প্রশংসা করলেন। তারপর তিনি বললেন:
ايها الناس ما بال رجال يؤذوننى فى اهلى ويقولون عليهم غير الحق
হে মানবমণ্ডলী! ঐসব লোকের হলোটা কি, যারা আমাকে আমার পরিবারের ব্যাপারে পীড়া দেয় এবং তাদের ব্যাপারে অহেতুক কথাবার্তা বলে।
والله ما علمت منهم الأخيرا
আল্লাহর কসম! আমি তাদের সম্পর্কে উত্তম বৈ কিছু অবগত নই।
ويقولون ذلك لرجل والله ما علمت منه الاخيرا
এসব বলাবলি করে, যার ব্যাপারে আমি উত্তম বৈ কিছু জানি না।
ولا يدخل بيتا من بيوتي الأوهو معى
আর সে আমার কোন ঘরে, আমার সঙ্গে ছাড়া, একাকী কখনো প্রবেশ করে না।