📄 জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস (রা)
বনূ মুস্তালিকের প্রচুর লোক বন্দীরূপে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর করতলগত হয়। তিনি তাদের মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। সেদিন যারা বন্দী হয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে (পরবর্তীতে) নবী সহধর্মিণী জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবূ যিরার (রা) ছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন্ন জা'ফর ইন্ন যুবায়র, উরওয়া ইন্ন যুবায়রের সূত্রে আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে কয়েদীদের ভাগ-বণ্টন করেন, তখন জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস পড়েন সাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস অথবা তাঁর চাচাতো ভাইয়ের অংশে। তিনি তাঁর মালিকের সাথে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্যে আবেদন জানান যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ মুক্তিপণ নিয়ে, তিনি যেন তাঁকে মুক্ত করে দেন। জুয়ায়রিয়া ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী এবং রূপ-লাবণ্যের অধিকারিণী মহিলা। যে-ই তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করতো, তার মনই তিনি কেড়ে নিতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তার মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যাপারে সাহায্যের আবেদন জানালেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! আমার হুজ্জার দরজায় তাকে দেখেই আমার মনে খটকা লাগে, (আমি তা পছন্দ করে উঠতে পারিনি)। আমি তখনই বুঝতে পারি, আমি তার মধ্যে যে অপূর্ব রূপ-লাবণ্য প্রত্যক্ষ করছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তার মধ্যে তা প্রত্যক্ষ করবেন। জুয়ায়রিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কক্ষে প্রবেশ করে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমি জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবু যিরার। আমার পিতা হারিস হচ্ছেন তাঁর সম্প্রদায়ের সরদার। আমি যে বিপদে পড়েছি, তা আপনার কাছে গোপন নয়। আমি সাবিত ইব্ কায়স ইব্ন শাম্মাস বা তাঁর চাচাতো ভাইয়ের অংশে পড়েছি। আমি ইতিমধ্যে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছি। আমি এ মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যাপারে আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনার উদ্দেশ্যে এসেছি।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার জন্যে যদি এর চাইতে উত্তম কোন ব্যবস্থা হয়, তা হলে কেমন হবে? তখন জুয়ায়রিয়া জিজ্ঞাসা করলেন সে ব্যবস্থাটি কী, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)? তিনি বললেন: আমি তোমার মুক্তিপণ পরিশোধ করে দিয়ে তোমাকে বিবাহ করে নেবো। জুয়ায়রিয়া বললেন তাই হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রাসূলাল্লাহ্ (সা)-এর বললেন: তাই করছি।'
টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুয়ায়রিয়ার দিকে দৃষ্টিপাতে করলেন, তাঁর রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হলেন, একটা কী করে সম্ভব হলো? এটা এজন্যে সম্ভব হয়েছে যে, জুয়ায়রিয়া তখন দাসী, তিনি যদি মুক্ত স্বাধীনা নারী হতেন, তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে দিকে মনোযোগ সহকারে দৃষ্টিপাতও করতেন না। কেননা, কোন দাসীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাকরূহ বা না জায়েয নয়। এছাড়া তাঁকে যখন বিবাহ করতে মনস্থ করেছেন তখন তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করা আদৌ অবৈধ নয়। মুগীরা (রা) যখন বিবাহের ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ চেয়েছিলেন তখন তিনি তাঁকে প্রস্তাবিত মেয়েকে দেখে নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন: এটাই ভালবাসা হওয়ার সহায়ক।
📄 হারিসের ইসলাম গ্রহণ এবং স্বেচ্ছায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কন্যাদান
আয়েশা (রা) বলেন: এ সংবাদটি লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবূ যিরারকে বিয়ে করে নিয়েছেন। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলেন: এরা রাসূলুল্লাহ্ নুতন আত্মীয়। তাই যার কাছে যা ছিল, তা উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়ে দিল। তাঁর এ বিবাহের বদৌলতে বনূ মুস্তালিকের একশ' জন বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হলো। তিনি বলেন: এমন কোন মহিলার কথা আমার জানা নেই, যে তার স্ব-সম্প্রদায়ের জন্যে, জুয়ায়রিয়ার চাইতে অধিকতর কল্যাণময়ী ও বরকতময়ী প্রতিপন্ন হয়েছে।
ইবন হিশাম বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন জুয়ায়রিয়াসহ মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং যাতুল জায়শ নামক স্থানে উপনীত হন তখন তিনি জুয়ায়রিয়াকে আমানতস্বরূপ জনৈক আনসারীর হাতে অর্পণ করেন এবং সযত্নে তাঁর দেখাশুনা করার জন্যে তাঁকে তাগিদ দেন। তারপর তিনি মদীনায় পদার্পণ করেন। এরপর তার পিতা হারিস ইব্ন আবূ যিরার তাঁর কন্যার মুক্তিপণসহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে এসে হাযির হন। তিনি যখন আকীক নামক স্থানে এসে পৌঁছেন তখন কন্যার মুক্তিপণ স্বরূপ সাথে আনীত দু'টি উটের জন্যে তাঁর বড় মায়া হয়। তিনি তা আকীকের একটি গিরিকন্দরে লুকিয়ে রেখে দেন। তারপর নবী (সা)-এর খিদমতে এসে বলেন: হে মুহাম্মদ! আমার কন্যা আপনার করতলগত। এই নেন তার মুক্তিপণ গ্রহণ করুন এবং তাকে মুক্ত করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: ওহে! আকীকের অমুক অমুক গিরিকন্দরে যে দু'টি উট লুকিয়ে রেখে এসেছো, সেগুলো কোথায়? তখন হারিস বলে উঠলেন:
اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله فوا الله ما اطلع على ذلك الا الله
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আর নিশ্চয়ই আপনি, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ ছাড়া ঐ ব্যাপারটি আর কারোই জানা নেই।
তৎক্ষণাৎ হারিস ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর দুই পুত্রও তাঁর সাথে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর সাথে আগত তাঁর সম্প্রদায়ের আরো কতিপয় ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি ঐ দু'টি উট নিয়ে আসতে লোক পাঠালেন। তারা উট দু'টি নিয়ে এলো। তিনি উট দু'টি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে তুলে দিলেন। তিনি তাঁর কন্যা জুয়ায়রিয়াকে তাঁর হাতে ন্যস্ত করলেন। তিনিও যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি পাকাপোক্ত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যথারীতি তাঁর পিতার কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। তাঁর পিতা তাঁকে যথারীতি বিবাহ দিলেন। চার শ' দিরহাম তাঁর মোহর নির্ধারিত হলো।
📄 ওয়ালীদ ইব্ন উকবা ও বনু মুস্তালিক: একটি ভুল বুঝাবুঝি
ইন্স ইসহাক বলেন: ইয়াযীদ ইব্ন রূমান আমার নিকট বর্ণনা করেন, মুস্তালিক গোত্রের লোকজনের ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওয়ালীদ ইব্ন উকবা ইব্ন আবূ মুঈত (রা)-কে তাদের নিকট, তাঁর প্রতিনিধিরূপে প্রেরণ করেন। তাঁর আগমন সংবাদ পেয়ে তারা অশ্বারোহণ করে তাঁর দিকে এগিয়ে আসে। তিনি ভড়কে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ফিরে আসেন এবং তাঁকে বলেন যে, ঐ সম্প্রদায়ের লোকজন তাঁকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে এবং তাদের প্রতিশ্রুত সাদকা প্রদানে তারা অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে, মুসলমানদের মধ্যে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রার আলোচনা বহুলভাবে হতে থাকে। এমন কি শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা)ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করতে মনস্থ করেন। এমন সময় তাদের একটি প্রতিনিধি দল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলে যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা যখন আপনার প্রেরিত প্রতিনিধির কথা শুনতে পেলাম, তখন আমরা তাঁর সম্মানার্থে তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম এবং তাঁর কাছে আমাদের প্রতিশ্রুত সাদকা অর্পণ করতে মনস্থ করলাম। কিন্তু তিনি ত্বরিৎ গতিতে ফিরে এলেন। তারপর আমরা জানতে পারলাম যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ ধারণা দিয়েছেন যে, আমরা নাকি তাঁকে হত্যা করতে বেরিয়েছিলাম। অথচ আল্লাহ্র কসম! আমরা এ উদ্দেশ্যে বের হইনি। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের ব্যাপারে নাযিল করলেন:
بَايُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ جَائَكُمْ فَاسِقٌ بِنَبَإٍ فَتَبَيَّنُوا أَنْ تُصِيبُوا قَوْمًا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوا عَلَى مَا فَعَلْتُمْ نَادِمِينَ - وَاعْلَمُوا أَنَّ فِيكُمْ رَسُولَ اللَّهِ لَوْ يُطِيعُكُمْ فِي كَثِيرٍ مِنَ الْأَمْرِ لَعَنِتُمْ -
“হে মু'মিনগণ! যদি কোন ফাসিক তোমাদের নিকট কোন বার্তা আনে, তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞতাবশত তোমরা কোন সম্প্রদায়কে ক্ষতিগ্রস্ত না কর এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। তোমরা জেনে রাখ যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্র রাসূল রয়েছেন; তিনি বহু বিষয়ে তোমাদের কথা শুনলে توমরাই কষ্ট পেতে। কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের নিকট ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং তাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন; আর কুফরী, পাপচার ও অবাধ্যতাকে তোমাদের নিকট অপ্রিয় করেছেন। ওরাই সৎপথ অবলম্বনকারী (৪৯:৬-৭)।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর এ সফর থেকে প্রত্যাবর্তন করেন। ইন্ন হিশাম বলেন: যুহরী (র)-এর সূত্রে এমন এক বর্ণনাকারী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, যাঁকে আমি মিথ্যাচারের জন্যে অপবাদ দিতে পারি না-তিনি উরওয়া থেকে, তিনি আয়েশা (রা) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি যখন মদীনার নিকট এসে পৌঁছান, আর এ সময় আয়েশা (রা) ও তাঁর সংগে এ সফরে ছিলেন, তখন অপবাদকারীরা তাঁর ব্যাপারে নানা অপপ্রচারের লিপ্ত হয়।