📄 মুকীস ইন্ন সুবাবার বাহানা
ইবন ইসহাক বলেন: মুকীস ইব্ন সুবাবা মক্কা থেকে বাহ্যত মুসলিম পরিচয় দিয়ে মদীনায় আসে। তখন সে বলে: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমি মুসলমান হয়ে আপনার নিকট উপস্থিত হয়েছি এবং আমার ভাইকে ভুলবশত হত্যার জন্য রক্তপণ দাবী করতে এসেছি। তার কথামত রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ভাই হিশাম ইব্ন সুবাবার রক্তপণ আদায়ের নির্দেশ দিলেন।¹ তারপর সে অল্প ক'দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট অবস্থান করে। এরপর সে চলে যায় এবং যাবার সময় তার ভাইয়ের হত্যাকারীকে হত্যা করে যায় এবং মুরতাদ হয়ে মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। একথাটি সে তা কবিতায় এভাবে ব্যক্ত করে:
আমার হৃদয়টা শান্ত হলো— যখন সে অক্কা পেয়ে ঢলে পড়লো—ভূমিতে তার গ্রীবার পেশীগুলো থেকে রক্ত ঝরে ঝরে— রঙীন করছিল তার পরিধেয় বস্ত্রগুলোকে।
তাকে হত্যার পূর্বে আমার একটি ভাবনা ছিল— তাকে কেমন করে হত্যা করবো, অহরহ একটা দুশ্চিন্তা আমাকে পীড়া দিত, সে দুশ্চিন্তা আমার শয্যা গ্রহণ ও নিদ্রার পথে— বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তাকে হত্যা করার মাধ্যমে আমি পেয়ে গেছি আমার রক্তপণ, তারপর প্রথম সুযোগেই ছুটে এসেছি আমার দেবদেবীর পানে।
এভাবে আমি গ্রহণ করেছি ফিহরের প্রতিশোধে, আর তার রক্তপণের দায়িত্ব অর্পণ করেছি বনু নাজ্জারের সরদারদের ঘাড়ে যারা দুর্গের দায়িত্বে রয়েছে।
মুকীস ইব্ন সুবাবা আরো বলে:
আমি তলোয়ারের এক আঘাতেই তাকে কাবু করে ফেললাম যদ্বারা পেয়ে গেলাম পূর্ণ রক্তপণ, সে আঘাতে নির্গত হতে থাকে তার উদরের রক্ত ফোঁটায় ফোঁটায় যা উত্থিত হচ্ছিল ঊর্ধ্ব দিকে, আর নিঃশেষিত হচ্ছিল তার দেহের রক্ত। যখন পড়ছিল তার উপর মরণের মার, তখন আমি বলছিলাম : ওহে! বনু বকরের উপর যুলুম করে— কেউ যেন একথা না ভাবে যে, সে নিরাপদ!
টিকাঃ
১. সে নির্দেশ যথারীতি পালিতও হয়।
📄 বনু মুস্তালিকের নিহতগণ
ইব্ন হিশাম বলেন : বনু মুস্তালিক যুদ্ধে مسلمانوں প্রতীকী বাক্য ছিল :
يا منصور ، امت امت
বনু মুস্তালিকের নিহতগণ (‘হে সাহায্যপ্রাপ্ত! মার দাও। মার দাও!!’)
ইব্ন ইসহাক বলেন : সেদিন বনু মুস্তালিকের অনেকেই নিহত হয়। আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) সেদিন তাদের দুই ব্যক্তিকে হত্যা করেন। তারা ছিল—মালিক ও তার পুত্র। আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা)ও সেদিন তাদের একজন অশ্বারোহীকে হত্যা করেন। তার নাম ছিল—আত্মর অথবা উহায়মির।
📄 জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস (রা)
বনূ মুস্তালিকের প্রচুর লোক বন্দীরূপে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর করতলগত হয়। তিনি তাদের মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। সেদিন যারা বন্দী হয়ে এসেছিল, তাদের মধ্যে (পরবর্তীতে) নবী সহধর্মিণী জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবূ যিরার (রা) ছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন্ন জা'ফর ইন্ন যুবায়র, উরওয়া ইন্ন যুবায়রের সূত্রে আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন বনু মুস্তালিকের যুদ্ধে কয়েদীদের ভাগ-বণ্টন করেন, তখন জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস পড়েন সাবিত ইব্ন কায়স ইব্ন শাম্মাস অথবা তাঁর চাচাতো ভাইয়ের অংশে। তিনি তাঁর মালিকের সাথে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার জন্যে আবেদন জানান যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ মুক্তিপণ নিয়ে, তিনি যেন তাঁকে মুক্ত করে দেন। জুয়ায়রিয়া ছিলেন অপূর্ব সুন্দরী এবং রূপ-লাবণ্যের অধিকারিণী মহিলা। যে-ই তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করতো, তার মনই তিনি কেড়ে নিতেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তার মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যাপারে সাহায্যের আবেদন জানালেন।
আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! আমার হুজ্জার দরজায় তাকে দেখেই আমার মনে খটকা লাগে, (আমি তা পছন্দ করে উঠতে পারিনি)। আমি তখনই বুঝতে পারি, আমি তার মধ্যে যে অপূর্ব রূপ-লাবণ্য প্রত্যক্ষ করছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তার মধ্যে তা প্রত্যক্ষ করবেন। জুয়ায়রিয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কক্ষে প্রবেশ করে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমি জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবু যিরার। আমার পিতা হারিস হচ্ছেন তাঁর সম্প্রদায়ের সরদার। আমি যে বিপদে পড়েছি, তা আপনার কাছে গোপন নয়। আমি সাবিত ইব্ কায়স ইব্ন শাম্মাস বা তাঁর চাচাতো ভাইয়ের অংশে পড়েছি। আমি ইতিমধ্যে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তির প্রস্তাব দিয়েছি। আমি এ মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যাপারে আপনার নিকট সাহায্য প্রার্থনার উদ্দেশ্যে এসেছি।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার জন্যে যদি এর চাইতে উত্তম কোন ব্যবস্থা হয়, তা হলে কেমন হবে? তখন জুয়ায়রিয়া জিজ্ঞাসা করলেন সে ব্যবস্থাটি কী, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)? তিনি বললেন: আমি তোমার মুক্তিপণ পরিশোধ করে দিয়ে তোমাকে বিবাহ করে নেবো। জুয়ায়রিয়া বললেন তাই হোক, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রাসূলাল্লাহ্ (সা)-এর বললেন: তাই করছি।'
টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুয়ায়রিয়ার দিকে দৃষ্টিপাতে করলেন, তাঁর রূপ-লাবণ্যে মুগ্ধ হলেন, একটা কী করে সম্ভব হলো? এটা এজন্যে সম্ভব হয়েছে যে, জুয়ায়রিয়া তখন দাসী, তিনি যদি মুক্ত স্বাধীনা নারী হতেন, তবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে দিকে মনোযোগ সহকারে দৃষ্টিপাতও করতেন না। কেননা, কোন দাসীর প্রতি দৃষ্টিপাত করা মাকরূহ বা না জায়েয নয়। এছাড়া তাঁকে যখন বিবাহ করতে মনস্থ করেছেন তখন তাঁর প্রতি দৃষ্টিপাত করা আদৌ অবৈধ নয়। মুগীরা (রা) যখন বিবাহের ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ চেয়েছিলেন তখন তিনি তাঁকে প্রস্তাবিত মেয়েকে দেখে নেয়ার পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন: এটাই ভালবাসা হওয়ার সহায়ক।
📄 হারিসের ইসলাম গ্রহণ এবং স্বেচ্ছায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কন্যাদান
আয়েশা (রা) বলেন: এ সংবাদটি লোকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লো যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুয়ায়রিয়া বিন্ত হারিস ইব্ন আবূ যিরারকে বিয়ে করে নিয়েছেন। তখন লোকেরা বলাবলি করতে লাগলেন: এরা রাসূলুল্লাহ্ নুতন আত্মীয়। তাই যার কাছে যা ছিল, তা উপঢৌকন স্বরূপ পাঠিয়ে দিল। তাঁর এ বিবাহের বদৌলতে বনূ মুস্তালিকের একশ' জন বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হলো। তিনি বলেন: এমন কোন মহিলার কথা আমার জানা নেই, যে তার স্ব-সম্প্রদায়ের জন্যে, জুয়ায়রিয়ার চাইতে অধিকতর কল্যাণময়ী ও বরকতময়ী প্রতিপন্ন হয়েছে।
ইবন হিশাম বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন জুয়ায়রিয়াসহ মুস্তালিকের যুদ্ধ থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং যাতুল জায়শ নামক স্থানে উপনীত হন তখন তিনি জুয়ায়রিয়াকে আমানতস্বরূপ জনৈক আনসারীর হাতে অর্পণ করেন এবং সযত্নে তাঁর দেখাশুনা করার জন্যে তাঁকে তাগিদ দেন। তারপর তিনি মদীনায় পদার্পণ করেন। এরপর তার পিতা হারিস ইব্ন আবূ যিরার তাঁর কন্যার মুক্তিপণসহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে এসে হাযির হন। তিনি যখন আকীক নামক স্থানে এসে পৌঁছেন তখন কন্যার মুক্তিপণ স্বরূপ সাথে আনীত দু'টি উটের জন্যে তাঁর বড় মায়া হয়। তিনি তা আকীকের একটি গিরিকন্দরে লুকিয়ে রেখে দেন। তারপর নবী (সা)-এর খিদমতে এসে বলেন: হে মুহাম্মদ! আমার কন্যা আপনার করতলগত। এই নেন তার মুক্তিপণ গ্রহণ করুন এবং তাকে মুক্ত করে দিন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: ওহে! আকীকের অমুক অমুক গিরিকন্দরে যে দু'টি উট লুকিয়ে রেখে এসেছো, সেগুলো কোথায়? তখন হারিস বলে উঠলেন:
اشهد ان لا اله الا الله وانك محمد رسول الله فوا الله ما اطلع على ذلك الا الله
আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আর নিশ্চয়ই আপনি, হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ ছাড়া ঐ ব্যাপারটি আর কারোই জানা নেই।
তৎক্ষণাৎ হারিস ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর দুই পুত্রও তাঁর সাথে ইসলাম গ্রহণ করলেন। তাঁর সাথে আগত তাঁর সম্প্রদায়ের আরো কতিপয় ব্যক্তিও ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি ঐ দু'টি উট নিয়ে আসতে লোক পাঠালেন। তারা উট দু'টি নিয়ে এলো। তিনি উট দু'টি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে তুলে দিলেন। তিনি তাঁর কন্যা জুয়ায়রিয়াকে তাঁর হাতে ন্যস্ত করলেন। তিনিও যথারীতি ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তাঁর ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি পাকাপোক্ত হয়ে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যথারীতি তাঁর পিতার কাছে তাঁর বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। তাঁর পিতা তাঁকে যথারীতি বিবাহ দিলেন। চার শ' দিরহাম তাঁর মোহর নির্ধারিত হলো।