📄 উসায়দ ইবন হুযায়লের পরামর্শ
আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ইব্ন সালূল যখন শুনতে পেল যে, যায়দ ইব্ন আরকাম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তার কাছ থেকে শোনা কথাগুলো বলে দিয়েছেন, তখন সে তাঁর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আল্লাহ্ নামে হলফ করে বলল: 'ও যা' বলেছে, আমি তা বলিনি। সে তার সম্প্রদায়ের মধ্যে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য হতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তখন তাঁর আনসার সাহাবীদের মধ্যে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁরা ইব্ন উবায়ের মুখ রক্ষার উদ্দেশ্যে তার সাফাই স্বরূপ বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! ঐ ছেলে মানুষটির হয়তো তার কথার মধ্যে এরূপ একটা ধারণা হয়েছে। আসলে হয়তো সে তিনি কি বলেছেন, তা ঠিক স্মরণও রাখতে পারেনি।"
ইব্ন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন যাত্রার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে যাত্রা শুরু করলেন। তখন উসায়দ ইব্ন হুযায়র তাঁর সংগে দেখা করলেন। তিনি তাঁকে নবীর জন্য যথোপযুক্ত সম্মান প্রদর্শন ও অভিবাদন করে বললেন: হে আল্লাহর নবী! আল্লাহ্র কসম, আপনি অসময়ে যাত্রা করছেন। এমন অসময়ে তো আপনি কখনো যাত্রা করেন না! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর জবাবে বললেন: তোমাদের সাথীটি কি বলেছে, তা কি তুমি শুনতে পাওনি? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: কোন্ সাথীটি, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তিনি জবাব দিলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়।
উসায়দ জিজ্ঞাসা করলেন: সে কী বলেছে? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সে বলেছে, যখন সে মদীনায় ফিরে যাবে তখন অপেক্ষাকৃত সম্মানিতরা, অপেক্ষাকৃত হীনদেরকে মদীনা থেকে বের করেই তবে ছাড়াবে। তখন উসায়দ ইব্ন হুযায়র বললেন: আল্লাহ্র কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি চাইলে তাকে (ঘাড়ে ধরে) মদীনা থেকে বের করে দিতে পারবেন। আল্লাহর কসম! সেই হীন, আর আপনি সম্মানিত ও প্রবল পরাক্রান্ত।
তারপর তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এর প্রতি একটু নম্র আচরণ করবেন। আল্লাহ্র কসম! আল্লাহ্ আপনাকে এমন এক সময় আমাদের মধ্যে নিয়ে এলেন, যখন তার স্বজাতি তার জন্যে মোতির মালা গাঁথছিল যে তাঁকে তারা সম্মানিত করবে। (যা আর পরে বাস্তবায়িত হয়ে উঠেনি।) তাই সে ধারণা করে যে, আপনি তার রাজত্বটি ছিনিয়ে নিয়েছেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মপন্থা
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেদিন পুরাদিন সফর অব্যাহত রাখেন, এমন কি সন্ধ্যা হয়ে যায়। তারপর সারা রাত ধরে কাফিলার যাত্রা অব্যাহত রাখেন, এমন কি ভোর হয়ে যায়। তারপর দিনের আলো দেখা দেয়, এমন কি রৌদ্রের উত্তাপে তাঁদের কষ্ট হতে থাকে। তারপর তিনি সদলবলে অবতরণ করেন। মাটির স্পর্শ পেতেই লোকজন গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এরূপ করার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, লোকেরা গতকাল যে অপ্রীতিকর আলোচনায় মগ্ন হয়ে পড়েছিল, অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়ের প্রসঙ্গ নিয়ে সবাই মেতে উঠেছিল; তা থেকে তাদের দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ করা, যাতে তারা সে আলোচনার ফুরসৎই আর না পায়।
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকদের নিয়ে পুনরায় হিজাযের দিকে যাত্রা করলেন। অবশেষে নকীর সামান্য উপরের দিকে অবস্থিত হিজাযের একটি ঝর্ণার নিকট অবতরণ করলেন। এই ঝর্ণাটির নাম ছিল বুকাআ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন যাত্রা শুরু করেন, তখন এক প্রচণ্ড বায়ুপ্রবাহ বইতে থাকে। লোকদের তাতে কষ্ট হতে থাকে এবং তারা রীতিমত ভয় পেয়ে যায়। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন:
لَا تَخَافُوهَا فَانَّمَا هَبَّتْ لِمَوْتِ عَظِيْمٍ مِّنْ عُظَمَاءِ الْكُفَّارِ
"তোমরা এতে ভয় পেয়ো না। কাফিরদের একজন গণ্যমান্য নেতার মৃত্যুর জন্যে এ ঝড়ো হাওয়া প্রবাহিত হচ্ছে।"
তারপর তাঁরা যখন মদীনায় পদার্পণ করলেন, তখন জানা গেল যে, অন্যতম ইয়াহূদী নেতা এবং মুনাফিকদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বনু কায়নুকার রিফাআ ইব্ন যায়দ ইব্ন তাবৃতের ঐদিন মৃত্যু হয়েছে।
📄 ইবন উবায়ের ব্যাপারে ওহী অবতীর্ণ হলো
এবার ইব্ন উবায় ও তার মত মুনাফিকদের ব্যাপারে কুরআনের একটি সূরা নাযিল হলো, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা তাদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করলেন। এ সূরাটি নাযিল হতেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) যায়দ ইব্ন আরকামের কান ধরে বললেন:
هَذَا الَّذِي أَوْفَى اللَّهُ بِأُذُنِهٖ
"এ সেই, যার কানের সাথে আল্লাহ্ স্বয়ং একাত্মতা ঘোষণা করলেন।"
আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়র পুত্র আবদুল্লাহর কানেও এ সংবাদটি পৌঁছলো, যাঁর পিতার ব্যাপারে এ সূরাটি নাযিল হয়।
📄 পিতার ব্যাপারে ইবন উবায়ের পুত্র আবদুল্লাহ্র ভূমিকা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আসিম ইব্ন কাতাদা বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে আরয করলেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)! আমি যতদূর জানতে পেরেছি, আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়ের ব্যাপারে আপনি যা অবগত হয়েছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে আপনি তাকে হত্যা করতে মনস্থ করেছেন। আপনি যদি একান্তই তা করতে চান, তা হলে আমাকে নির্দেশ দেন, আমিই তার মস্তক আপনার দরবারে এনে উপস্থিত করবো।
আল্লাহ্র কসম! খায়রাজের প্রতিটি লোকে জানে, তাদের মধ্যে আমার মত পিতৃভক্ত আর একটিও নেই। আমার আশঙ্কা হয়, পাছে আপনি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে এ আদেশ দেন, আর সে তাকে হত্যা করে লোক সমাজে ঘোরাফেরা করবে, আর আমি আমার মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পেরে, শেষ পর্যন্ত একজন কাফিরের জন্য একজন মু'মিনকেই না হত্যা করে বসি। আর পরিণামে জাহান্নামে যাই। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমরা বরং তার সাথে নম্র ব্যবহার করব এবং যাবৎ সে আমাদের সঙ্গে থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাকে উত্তমভাবে সঙ্গ দিয়ে যাব।