📄 খন্দক যুদ্ধের দিন কা'ব (রা) আরো কবিতা
আমরা এমন সংঘবদ্ধ ও সুসংহত বাহিনীর সাহায্যে শত্রুদের মুকাবিলা করি, যারা বিশাল শত্রুবাহিনীকে সমূলেবিনাশ করে-পরিশোধ করে তাদের রক্তপণ।
'এ যেন মাשরিক পাহাড়ের চূড়ায় রক্ত মোক্ষণ আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি প্রস্তুত থাকে দুশমনের সাথে মুকাবেলার উদ্দেশ্যে- শ্বেত বর্ণের পদ বিশিষ্ট গোলাপীবর্ণের চিত্র বিচিত্র হাল্কা গড়নের অশ্ব নিয়ে।
এ অশ্বগুলো অশ্বারোহীদেরকে নিয়ে দ্রুত চলে যেন তারা বীর পুরুষ যুদ্ধকালে কর্দম সৃষ্টিকারী- মৃদু বারিপাতে ক্ষুধার্ত ও জিঘাংসা উঞ্চ সিংহকুল। যুদ্ধের ব্যাপারে এরা পরম নিবেদিত নিষ্ঠাবান গো-ধূলির আঁধারে এরা বর্শা-বল্লমের আঘাতে হরণ করে কত বীর পুরুষের প্রাণ। আল্লাহ্ নির্দেশ দিয়েছেন শত্রুর মুকাবিলায়, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে এসব অশ্ব প্রতিপালনের তিনিই উত্তম তওফীকদাতা।
যাতে এ ঘোড়া তাদের জন্য ক্রোধের কারণ হয়, জিঘাংসায় মত্ত যারা। তাদের অশ্ব যদি পৌঁছে যায় অতি সন্নিকটে দাঁড়াবে সেগুলো গৃহের রক্ষণ তরে সুদৃঢ় প্রাচীরের মতো। মহা-পরাক্রান্ত আল্লাহ্ আমাদের মদদ যোগান ধৈর্যের শক্তি দিয়ে, রণমত্ত হই যবে মোরা শত্রুসনে। করি মোরা আনুগত্য আমাদের নবীর যবে তিনি ডাক দেন সাড়া দেই ডাকেতে, রণমত্ত হই তাঁর ডাকে রহিনা কখনো মোরা পশ্চাতে পরিয়া। কঠিন সঙ্কটকালে যবে নবী করেন আহবান, তুরিতে হাযির মোরা সদনে তাঁর। যখন হেরিতে পাই সমর ভীষণ
অগৌণে ঝাঁপিয়ে পড়ি সেই রণাঙ্গণে সেজন ইত্তেবা করে তরেতে নবীর (তার তো তাই করা চাই।) অনুগত্য হবে তাঁরই এটাই বিহিত- কেননা, দিয়েছি তাঁরে নবীর স্বীকৃতি- আনুগত্য হক তাঁর তাই। সেহেতু মদদ করেন মোদের সতত করেন বৃদ্ধি সম্ভ্রম সম্মান অর্জন করতে তাহা মহানবী বর আমাদের পান তাঁর হস্তস্বরূপ। নিরন্তর নবীরে যারা ঠাওরায় মিথ্যুক- নিশ্চয়ই সত্যকে তাঁরা করে প্রত্যাখ্যান হয়েছে কাফির আল্লাহ্ ভক্ত সাধুজন-পথ পরিহরি বরিয়া নিয়াছে তারা বিভ্রান্তি চরম।
📄 মুসাফি'র শোকগাথা
ইবন ইসহাক বলেন:
আলী ইব্ন আবু তালিবের হাতে আমর ইব্ন আব্দ উদ্দের নিহত হওয়ার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বিলাপ করতে করতে মুসাফি ইব্ন আব্দ মন্নাফ ইব্ন ওয়াহাব ইবন হুযাফা ইব্ জুমূহ বলে:
আমর ইব্ন আব্দ ছিলেন সেই অশ্বারোহী যিনি সর্বপ্রথম মাযাদ অতিক্রম করেছিলেন। তিনি ছিলেন ইয়ালীলের অশ্বারোহী মহান চরিত্রের অধিকারী, উদারচিত্ত দুঃসাহসী যুদ্ধকামী, ভয়ে যিনি পিছপা হতেন না কখনো।
তোমরা সম্যক অবহিত আছ হে — যখন তোমাদের সম্মুখ থেকে পালিয়ে যায় অন্যরা *(কুরায়ש ও গাতফান যোদ্ধারা) আমর ইব্ন আবদ্ উদ্দ তখনও ত্বরা করেননি। এমন কি যখন চতুর্দিক থেকে শত্রু সৈন্যরা তাকে ঘিরে নিল তারা সবাই ছিল তার হত্যা পিয়াসী, তখনো ছিল না তাঁর মধ্যে কোন বিকার। সিলা পাহাড়ের দক্ষিণে, বর্শা বল্লমের ঝাঁক এমন এক অশ্বারোহীকে ঘিরে ফেললো, যার মধ্যে ছিল না একটুও দুর্বলতা বা আত্মসমর্পণের আগ্রহ। হে আলী! তুমি বনূ গালিবের অশ্বরোহীকে ডেকে • দ্বন্দুযুদ্ধে তারে করেছিলেন আহ্বান, • সিলা পাহাড়ের দক্ষিণ প্রান্তরে। হায়! যদি সে নাহি দিত তাতে সাড়া। যাও আলী তুমি, (হত্যা করেছ বটে) কিন্তু ধন্য হওনি তুমি- তার মত গর্বিত হয়ে আর না করেছো তুমি কভু তার মতো সঙ্কট মুকাবিলা। বনূ গালিবের সে অশ্বারোহী তরে জান মোর কুরবান, মৃত্যুর উষ্ণতাকে যে জন বরি নিল মাথা পেতে, অকুণ্ঠে, অকাতরে।
• বলি আমি সে বীরের কথা, আপন অশ্ব নিয়ে- • পাড়ি দিল যে মাযাদের প্রান্তর, প্রতিশোধ নিতে সেইসব বাহিনীর কোন দিন যারা হয়নিকো হতমান। এগিয়ে সে বীর দেয় নিকো পিছুটান।
📄 মুসাফি'র আরো ভর্ৎসনাগাথা
আমরের সঙ্গী সাথীরূপে যে সব অশ্বারোহী সৈন্য যুদ্ধে গিয়েছিল, আর যারা তাকে পরিত্যাগ করে পালিয়ে এসেছিল, তাদের প্রতি ভর্ৎসনা করে মুসাফি' আরো বলেন:
আমর ইব্ন আবদের সাথে মুকাবিলার উদ্দেশ্যে নীত হয়েছিল যে অশ্বারোহী দল; যাদের পায়ে ছিল লৌহ পাদুকা, তারা তাদের ঘোড়ার বাগডোর ধরতেই আমরের অশ্বারোহীরা যুদ্ধে পিছটান দিয়ে- চম্পট দিল রণক্ষেত্র থেকে। তারা এমন এক বীর পুরুষকে মাঠে নিঃসঙ্গ ছেড়ে গেল, যিনি ছিলেন তাদের মধ্যে স্তম্ভস্বরূপ, আর যিনি ছিলেন তাদের মধ্যে প্রথম ব্যক্তি। আমি বিস্মিত,
আর বিস্মিত আমি এজন্যে যে, আমি স্বপক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি। আর দিনের হে আলী!
যখন তুমি আমরকে আহবান করলে মল্ল যুদ্ধে, নিঃসংকোচে তাৎক্ষণিকভাবে তিনি সাড়া দিলেন তাতে। আমার নিকট থেকে দূরে সরে যেয়ো না হে আলী! কেননা, তার নিহত হওয়ায় আমি আহত, মৃত্যুর পূর্বে এমনি এক সঙ্কটের আমি সম্মুখীন মৃত্যুর চাইতে যা আমার জন্যে গুরুতর। তাই এখন আর আমার মৃত্যুভয় নেই, লড়তে লড়তে মরে যাবো তাতে কুচপরোয়া নেই। আর পশ্চাৎগামী পালিয়ে আসা হুবায়রা, ঠিক যুদ্ধ চলাকালে পালিয়ে এলো, এই ভয়ে যে, লোকে তাকে কতল করে ফেলবে। আর যিরার
যার উপস্থিতিতে রণক্ষেত্র ছিল উষ্ণ সরগরম, সেও এমনভাবে পালিয়ে এলো, যেমন করে পালায় কোন নিরস্ত্র দুর্জন।
📄 হুবায়রার কৈফিয়ত ও আমরের জন্যে তার বিলাপগাথা
ইবন ইসহাক বলেন: হুবায়রা ইব্ন আবু ওয়াহাব তার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের কৈফিয়ত দিয়ে এবং আলীর হাতে আমর এর হত্যা প্রসঙ্গ বর্ণনা করে, তার জন্যে বিলাপ করতে করতে বলে:
মুহাম্মদ ও তাঁর সাথীবৃন্দ। আমার জীবনের শপথ করে বলছি: আমি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিনি কাপুরুষতা হেতু অথবা মৃত্যু ভয়ে। বরং আমি নিজেই পাল্টে দিয়েছি নিজের ব্যাপারটি, যখন দেখলাম, আমার তলোয়ার অথবা তীর চালনায় কোনই ফায়দা নেই। যখন লক্ষ্য করলাম, অগ্রযাত্রার কোন অবকাশই নেই, তখন সে সিংহীর মত থমকে দাঁড়ানোই সমীচীনবোধ করলাম, যার শাবক রয়েছে; আর যে প্রতিপক্ষের সাথে লড়াই করা থেকে নিবৃত্ত থাকে যখন দেখে যে কোন কৌশলই কার্যকর হবার মতো নয়- নেই অগ্রসর হওয়ারও কোন উপায়, আর এটাই তো আমার পূর্ব আচরিত রীতি পদ্ধতি। তুমি কোন দিনই দূর হবে না (আমাদের মন থেকে) হে আমর!
তুমি জীবিতই থাকো অথবা তুমি মারা যাও না কেন, প্রশংসা তোমার মত লোকের আমার মত লোকদের নিকট প্রাপ্য। তুমি কোনদিন দূর হবে না আমাদের অন্তর থেকে, হে 'আমর!
তুমি বেঁচে থাকো, অথবা মৃত্যুই বরণ কর না কেন, সম্ভ্রান্ত, কুলশীল।
কে আজ ফিরাবে বল্লমের ঘায়, অশ্বরোহী হানাদারে- হে আমর তুমি বিনে?
উল্লসিত উটের মতো যারা যুদ্ধ নিয়ে গর্ব করে থাকে, তারা আজ কার বীরত্ব নিয়ে গর্ব করবে? সেখানে যদি আজ ইব্ন আব্দ থাকতেন, তা হলে তিনি তা দেখতেন, আর করতেন সঙ্কটের সুরাহা। দুর হও আলী।
তোমার এ অবস্থান যা তুমি এমন এক বীরপুরুষের বিরুদ্ধে নিয়েছ, তা সুনজরে দেখতে পারি না; যে ছিল করিৎকর্মা, অগ্রে আক্রমণকারী, বীর পুরুষ। এর দ্বারা তুমি সফলকাম হওনি তোমার গর্বের জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট হয়েছে যে তার পাদুকাস্খলনের ফলে তুমি আমৃত্যু নিরাপদ হয়ে গেলে।