📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনু কুরায়ষার গনীমতের মাল বণ্টন প্রসংগে

📄 বনু কুরায়ষার গনীমতের মাল বণ্টন প্রসংগে


ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসালমানদের মাঝে বনু কুরায়যার ধন-সম্পদ এবং নারী ও শিশুদের বণ্টন করে দেন। তিনি অশ্বারোহী ও পদাতিকের অংশ সেদিনই স্থির করেন। সর্বমোট গনীমত হতে তিনি এক-পঞ্চমাংশ। (খুমুস) বের করে নেন। অশ্বারোহীকে দিয়েছিলেন তিন ভাগ-এক ভাগ আরোহীর ও দুইভাগ অশ্বের। আর পদাতিককে অর্থাৎ যার ঘোড়া ছিল না, তাকে দেওয়া হয় এক ভাগ। বনু কুরায়যা অভিযানে মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ৩৬টি। এটাই সর্বপ্রথম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যা সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন করা হয় এবং তা থেকে খুমুস পৃথক করা হয়। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) গনীমতের মাল বণ্টনের এ নিয়মই অনুসরণ করেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু কুরায়যার কিছু সংখ্যক বন্দী নিয়ে আবদুল আশহাল গোত্রের লোক সা'দ ইব্‌ন যায়দ আনসারী (রা)-কে নাজদে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে তাদের বিক্রি করে ঘোড়া ও সমরাস্ত্র কিনে আনেন।

ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসালমানদের মাঝে বনু কুরায়যার ধন-সম্পদ এবং নারী ও শিশুদের বণ্টন করে দেন। তিনি অশ্বারোহী ও পদাতিকের অংশ সেদিনই স্থির করেন। সর্বমোট গনীমত হতে তিনি এক-পঞ্চমাংশ। (খুমুস) বের করে নেন। অশ্বারোহীকে দিয়েছিলেন তিন ভাগ-এক ভাগ আরোহীর ও দুইভাগ অশ্বের। আর পদাতিককে অর্থাৎ যার ঘোড়া ছিল না, তাকে দেওয়া হয় এক ভাগ। বনু কুরায়যা অভিযানে মোট ঘোড়ার সংখ্যা ছিল ৩৬টি। এটাই সর্বপ্রথম যুদ্ধলব্ধ সম্পদ, যা সুনির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বণ্টন করা হয় এবং তা থেকে খুমুস পৃথক করা হয়। পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) গনীমতের মাল বণ্টনের এ নিয়মই অনুসরণ করেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু কুরায়যার কিছু সংখ্যক বন্দী নিয়ে আবদুল আশহাল গোত্রের লোক সা'দ ইব্‌ন যায়দ আনসারী (রা)-কে নাজদে প্রেরণ করেন। তিনি সেখানে তাদের বিক্রি করে ঘোড়া ও সমরাস্ত্র কিনে আনেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রায়হানার ইসলাম গ্রহণ

📄 রায়হানার ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নারীদের মধ্য হতে রায়হানা বিন্ত আমর ইব্‌ন খুনাফাকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। রায়হানা ছিলেন আমর ইবন কুরায়যা গোত্রের মহিলা। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁর সংগে ছিলেন। তিনি তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে পর্দানশীন হতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি জবাবে বলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! বরং আপনি আমাকে আপনার মালিকানাধীন করেই রাখুন। এটা আপনার আমার উভয়ের জন্য সহজতর। সুতরাং তিনি তাঁকে সে অবস্থায়ই রেখে দেন।
বাঁদী হওয়ার প্রাক্কালে রায়হানা ইসলামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে ইয়াহুদী ধর্মের উপর অবিচল থাকার ইচ্ছা করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার প্রতি অন্তর-পীড়াবোধ করেন এবং তাকে পাশ কাটিয়ে চলেন। এমতাবস্থায় একদিন নবী (সা) সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি পেছনে চপ্পলের আওয়াজ শুনতে পান। তিনি বললেন: এটা ছালাবা ইব্‌ন সায়ার চপ্পল-ধ্বনি। সে আমার কাছে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুখবর নিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে ছালাবা এসে তাঁর কাছে হাযির হলেন। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুশি হলেন।

ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের নারীদের মধ্য হতে রায়হানা বিন্ত আমর ইব্‌ন খুনাফাকে নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন। রায়হানা ছিলেন আমর ইবন কুরায়যা গোত্রের মহিলা। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁর সংগে ছিলেন। তিনি তাকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে পর্দানশীন হতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি জবাবে বলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! বরং আপনি আমাকে আপনার মালিকানাধীন করেই রাখুন। এটা আপনার আমার উভয়ের জন্য সহজতর। সুতরাং তিনি তাঁকে সে অবস্থায়ই রেখে দেন।
বাঁদী হওয়ার প্রাক্কালে রায়হানা ইসলামের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ করে ইয়াহুদী ধর্মের উপর অবিচল থাকার ইচ্ছা করেন। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার প্রতি অন্তর-পীড়াবোধ করেন এবং তাকে পাশ কাটিয়ে চলেন। এমতাবস্থায় একদিন নবী (সা) সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি পেছনে চপ্পলের আওয়াজ শুনতে পান। তিনি বললেন: এটা ছালাবা ইব্‌ন সায়ার চপ্পল-ধ্বনি। সে আমার কাছে রায়হানার ইসলাম গ্রহণের সুখবর নিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে ছালাবা এসে তাঁর কাছে হাযির হলেন। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রায়হানা ইসলাম গ্রহণ করেছে। এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুশি হলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খন্দক ও বনূ কুরায়যা সম্পর্কে কুরআনে যা নাযিল হয়

📄 খন্দক ও বনূ কুরায়যা সম্পর্কে কুরআনে যা নাযিল হয়


ইবন ইসহাক বলেন: খন্দকের যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সূরা আহযাবের একটি সুদীর্ঘ অংশ নাযিল করেন। তাতে মসলিমদের সংকটপূর্ণ অবস্থা ও তাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর কিভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, মুনাফিকদের উক্তি উদ্ধৃত করার পর তা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودُ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا -
হে মু'মিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এক বাহিনী যা তোমরা দেখনি। তোমরা যা' কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা (৩৩: ৯)।
শত্রুবাহিনী হচ্ছে কুরায়শ, গাতফান ও বনু কুরায়যা। আর আল্লাহ্ তা'আলা ঝঞ্ঝাবায়ুর সাথে যে বাহিনী প্রেরণ করেন তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ القُلُوبُ الحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظنونا
যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উঁচু অঞ্চল ও নীচু অঞ্চল হতে তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল, তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ্ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করছিলে (৩৩: ১০)।
উঁচু অঞ্চল থেকে এসেছিল বনু কুরায়যা, আর নীচু অঞ্চল হতে এসেছিল কুরায়ש ও গাতফান গোত্রের লোকেরা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالاً شَدِيدًا - وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولَهُ الأَ غُرُورًا -
তখন মু'মিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল এবং মুনাফিকরাও যাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তারা বলছিল, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতারণা ব্যতীত কিছুই নয় (৩৩: ১১-১২)।
শেষোক্ত আয়াতে মুআত্তিব ইব্‌ন কুশায়রের উক্তি বিধৃত হয়েছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে:
واذ قالت طائفة منهُمْ يَاهْلَ يَشرِبَ لَا مُقامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا ، وَيَسْتَأْذِنَ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيِّ يَقُولُونَ أَنْ بيُوتُنَا عَورَةٌ وَمَا هِي بِعورَة ، إِنْ يُرِيدُونَ الا فراراً -
এবং তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই। তোমরা ফিরে চল। এবং তাদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত; অথচ ঐগুলো অরক্ষিত ছিল না, আসলে পলায়ন করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য (৩৩: ১৩)।
এ আয়াতে আওস ইব্‌ন কায়যী ও তার সম্প্রদায়ের সমমনা লোকদের কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
وَلَوْ دُخلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُلُوا الفِتْنَةَ لَا تَوْهَا وَمَا تَلْبَثُوا بها الا يسيرا
যদি শত্রুগণ নগরের বিভিন্ন দিক হতে প্রবশে করে তাঁদেরকে বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করত, তারা অবশ্যই তাই করে বসত, তারা তাতে কাল-বিলম্ব করত না (৩৩: ১৪)।
انطارمًا অর্থ মদীনার বিভিন্ন দিক হতে। ইব্‌ন হিশাম বলেন: لاقطار। অর্থ চতুর্দিক এর একৰচন قطر। অনরূপ الانار-ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং তারও একবচন কবি ফারাযদাক তার এক কবিতায় বলেন:
كم من غنى فتح الاله لهم به والخيل مقعية على الاقطار
অন্য বর্ণনায় الاقتار বলা হয়েছে। অর্থ: সেখানে তাদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা খুলে দিয়েছেন কত ঐশ্বর্য। তার চতুর্দিকে অবস্থান নেয় অশ্বারোহী বাহিনী।
سئلو الفتنة অর্থাৎ যদি শিরকে প্রত্যাবর্তন করতে বলা হয়। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولا -
তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অংগীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহ্র সাথে কৃত অংগীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে (৩৩: ১৫)।
এ আয়াতে বনু হারিসার কথা বলা হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে তারাই বনূ সালামার সংগী হয়ে ভীরুতা প্রকাশ করেছিল। এরপর তারা আল্লাহর সাথে এই অংগীকার করে যে, ভবিষ্যতে কখনও.এর পুনরাবৃত্তি করবে না। আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াতে তাদের সে অংগীকারের কথাই উল্লেখ করেছেন:
قُلْ لَنْ يُنْفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِّنَ الْمَوْتِ أو القَتْلِ واذا لا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلا - قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي الله وليا ولا يَعْصِمُكُمْ مِّنَ اللهِ إِنْ أَرَادَ بِكُمْ سُوءًا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ رَحْمَةً ، وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِّنْ دُونِ اللَّهِ نَصِيرًا - قَدْ يَعْلَمُ اللهُ المُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلَمُ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلا - اشحَةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِالسنة حداد أشعة عَلَى الخَيْرِ -
বল, তোমাদের কোন লাভ হবে না যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর এবং সেই ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে। বল, কে তোমাদেরকে আল্লাহ্ হতে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমংগল ইচ্ছা করেন এবং তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে চান কে তোমাদের ক্ষতি করবে? তারা আল্লাহ্ ব্যতীত নিজেদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আল্লাহ্ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণে বাধা দেয় (অর্থাৎ মুনাফিকদের তিনি জানেন) এবং তাদের ভ্রাতৃবর্গকে বলে, আমাদের সঙ্গে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে অংশ নেয় (অর্থাৎ লোক নিন্দা হতে বাঁচার অজুহাত স্বরূপ চলে মাত্র), তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতাবশত (অর্থাৎ তোমাদের প্রতি তারা যে হিংসা-দ্বেষ পোষণ করে সেই হেতু।) যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে মৃত্যু ভয়ে মুচ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। (অর্থাৎ তার প্রভাব ও ভয়ে); কিন্তু যখন বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। (অর্থাৎ তারা এমন সব উক্তি করে যা তোমরা পছন্দ কর না। এর কারণ, তারা আখিরাতের আশাবাদী নয়। আখিরাতের প্রতিদান তাদের মনে উৎসাহ যোগায় না। তাই তারা মৃত্যুকে তেমনি ভয় পায়, যেমন ভয় পায় মৃত্যুর পরে জীবন যারা আশা করে না তারা) (৩৩: ১৬-১৯)।
ইবন হিশাম বলেন : سلقوكم অর্থ তারা তোমাদের প্রতি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করে এবং তা দিয়ে তোমাদেরকে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট দেয়। আরবী পরিভাষায় আছে خطیب سلاق خطیب مسلاق ও خطیب مسلق অর্থাৎ অনলবর্ষী বক্তা। আশা ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন ছা'লাবা তার এক কবিতায় বলেন:
فيهم المجد والسماحة والنجدة فيهم والخاطب السلاق
সম্মান ও মহানুভবতা তাদেরই মাঝে, তাদেরই আছে দুরন্ত সাহস, আর আছে অনলবর্ষী বক্তা।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
يَحْسَبُونَ الْأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا ، وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزَابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بَادُونَ فِي الْأَعْرَابِ يَسْأَلُونَ عَنْ أَنْبَاءكُمْ وَلَوْ كَانُوا فِيكُمْ مَّا قَاتَلُوا إِلا قَلِيلا -
তারা মনে করে, সম্মিলিত বাহিনী চলে যায়নি। যদি সম্মিলিত বাহিনী আবার এসে পড়ে, তখন তারা কামনা করবে যে, ভাল হত যদি তারা যাযাবর মরুবাসীদের সাথে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত। তারা তোমাদের সাথে অবস্থান করলেও তারা যুদ্ধ অল্পই করত (৩৩: ২০)।
এরপর মু'মিনদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةً لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا -
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (৩৩: ২১)।
যাতে তারা রাসূলের ব্যক্তি সত্তা ও তাঁর সম্মানজনক অবস্থান সম্পর্কে উদাসীন না থাকে।
এরপর মু'মিনদের সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহ্ প্রতিশ্রুত পরীক্ষাকে স্বীকার করে নেওয়ার যে মনোবৃত্তি তাদের রয়েছে, সে জন্য তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَ وَمَا زَادَهُمْ الا ايْمَانًا وَتَسليمًا -
মু'মিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলে উঠল, এটা তো তাই যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ্ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল (৩৩: ২২)।
অর্থাৎ তখন বিপদের ধৈর্য, তাকদীরকে মেনে নেওয়া ও সত্যকে গ্রহণ করে নেওয়ার মনোবৃত্তিই তাদের বৃদ্ধি পায়।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ ، فَمِنْهُمْ مِّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مِّنْ يُنْتَظِرُ وَمَا بدلوا تبديلاً -
মু'মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত অংগীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অংগীকারে কোন পরিবর্তন করেনি (৩৩: ২৩)।
قضى نحبه অর্থাৎ সে তার কাজ সমাপ্ত করেছে ও নিজ প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করেছে। এতে বদর ও উহুদ যুদ্ধের শহীদদের কথা বোঝান হয়েছে।
ইবন হিশাম বলেন : قضى نحبه অর্থ-মৃত্যুবরণ করেছে। النحب অর্থ প্রাণ, যেমন আবু উবায়দা বর্ণনা করেছেন। এর বহুবচন نخوب কবি-যুর রিম্মা তার এক কবিতায় বলেন:
عشية فر الحارثيون بعد ما قضى نحبه في ملتقى الخيل هوبر
সেদিন সন্ধ্যাকালে হাওবার রণাঙ্গনে মারা যাওয়ার পর, হারিসিগণ প্রাণভয়ে পালালো।
হাওবার হচ্ছে হারিস ইব্‌ন কা'ব গোত্রের এক ব্যক্তি। কবি এর দ্বারা ইয়াযীদ ইব্‌ন হাওবারকে বুঝিয়েছেন।
এছাড়া النحب শব্দটি মানত অর্থেও আসে। যেমন জারীর ইবন খাতাফী তার এক কবিতায় বলেন:
بطخفة جالدنا الملوك وخيلنا * عشية بسطام جرين على نحب
আমরা লড়াই করেছি বহু রাজার সাথে তিখফা প্রান্তরে, আমাদের ঘোড়াগুলো সন্ধ্যাকালে ধাবিত হয়েছিল বিসতামের দিকে মানত পূরণার্থে।
অর্থাৎ বিসতামকে হত্যা করার মানত ছিল। সে মানত পূর্ণ করা হয়েছে। এখানে বিসতাম বলতে বিসতাম ইব্‌ন্ন কায়স ইবন মাসউদ শায়রানীকে বোঝান হয়েছে। সকলের কাছে সে ইবন যিল-জাদ্দায়ন নামে পরিচিত। আবূ উবায়দা বলেন: সে ছিল রবী'আ ইন নিযার গোত্রের একজন দক্ষ অশ্বারোহী। তিখফা বসরার পথে একটি জায়গার নাম।
النجب-এর আরেক অর্থ-বন্ধক। ফারাযদাক বলেন,
واذ نحبت كلب على الناس اينا * على النحب اعطى للجزيل وافضل
কাল্ব গোত্র যখন লোকের কাছে বন্ধক রাখে, তখন লক্ষ্য করে দেখ, আমাদের মধ্যে কার বন্ধক পরিমাণে বেশি, কে এ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ?
النحب-এর অপর অর্থ-ক্রন্দন। এ অর্থেই আরবরা বলে থাকে : ينتحب অর্থাৎ সে ডাক ছেড়ে কাঁদে। এমনিভাবে প্রয়োজন ও সৎসাহস অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বলা হয় مالی عندهم نحب অর্থাৎ তাদের কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই। মালিক ইব্‌ নুওয়ায়রা ইয়ারবৃঈ বলেন:
ومالي نحب عندهم غير انني * تلمست ما تبغى من الشدن الشجر
তাদের কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই, তবে আমি তালাশ করি, যা লাল চৌখা শুদূনী উট তালাশ করে।
বনু তায়ম লাত ইব্‌ন সা'লাবা ইব্‌ন উকাবা ইব্‌ন সা'ব ইব্‌ন আলী ইব্‌ন বকর ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের নাহার ইব্‌ন তাওসিআ বলেন :
نجى يوسف الثقفى ركض * دراك بعد ما وقع اللواء
لو ادركنه لقضين نحبا * به ولكل مخطأة وقاء
ইউসুফ সাকাফীকে রক্ষা করে ছিল অবিরাম দৌড়, তাঁর ঝাণ্ডা পতনের পর।
যদি অশ্বারোহী দল তার নাগাল পেত, তবে তাকে দিয়ে কী কম তাদের প্রয়োজন মেটাতো। বস্তুতা চায়। যে-কোন ভুল-ত্রুটিকারীর একটা বাঁচার উপায়ও থাকে।
النحب-এর আরেক অর্থ মৃদু গতিতে গমন।
ইবন ইসহাক বলেন : ومنهم من بينتظر অর্থ, অনেকে আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য ও সাথীদের মত শাহাদতের অপেক্ষা করছে। وما بدلوا تبديلا অর্থাৎ তারা তাদের দীনের ব্যাপারে কোন সংশয় পোষণ করে না ও দ্বিধা রাখে না এবং তার পরিবর্তে অন্য কোন ধর্মাদর্শ গ্রহণ করে না।
এরপর আল্লাহ্ বলেন : ليَجْزِيَ اللهُ الصَّادِقِينَ بصدقهمْ وَيُعَذِّبَ المُنَافِقِينَ إِن شَاءَ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا - وَرَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا - وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِّنْ أَهْلِ الكتاب من صَيَاصِيهِم -
কারণ আল্লাহ্ সত্যবাদিগণকে পুরষ্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্য এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ্ কাফিরদেরকে (অর্থাৎ কুরায়ש ও গাতফানীদেরকে)। ক্রুদ্ধাবস্থায় বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন। যুদ্ধে মু'মিনদের জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট, আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী, কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে সাহায্য করেছিল (অর্থাৎ বনু কুরায়যা) তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ হতে অবতরণে বাধ্য করলেন (৩৩: ২৪-২৬)।
الصياصی অর্থ-দুর্গ ও কেল্লা যাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: বনু আসাদ ইব্‌ন খুযায়মার শাখা বনু হাসহাসের গোলাম সুহায়মের এক কবিতায় আছে:
واصبحت الثيران صرعي واصبحت * نساء تميم يبتدرن الصياصيا
তাদের ষাঁড়গুলো সব মরে পড়ে থাকলো, আর বনু তামীমের নারীরা সব দুর্গের দিকে দৌঁড়াল।
الصياصي -এর আরেক অর্থ শিং। নাবিগা জাদী তাঁর এক কবিতায় বলেন:
وسادة رهطى حتى بقي * ت فردا كصيصية الاعضب
আমার গোত্র প্রধানগণ সকলেই মারা গেছেন, আর আমি একা ভাঙা শিঙের মত পড়ে আছি।
আবূ দুওয়াদ ইয়াদীর এক কবিতায় আছে:
فذعرنا سحم الصياصي بايديه * ن نضح من الكحيل وقار
পাহাড়ী ছাগলের কালো শিঙ দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। তাদের সামনের পায়ে আলকাতরা ও মেটে তেলের মিশ্রণ ছিল।
তাঁতীর কাপড় বোনার কাঁটাকেও الصياصی বলা হয়। আবু উবায়দা হতে এরূপ বর্ণিত আছে। তিনি আমার কাছে জুשম ইব্‌ন মু'আবিয়া ইব্‌ন বাক্ ইব্‌ন ওয়াযিন গোত্রীয় কবি দুরায়দ ইব্‌ন সিম্মার একটি পংক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এ অর্থ সপ্রমাণ করেন। তাতে কবি বলেন:
نظرت اليه والرماح تنوشه * كوقع الصياضي في النسيج الممدد
আমি তার দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম একের পর এক বর্শা তার গাঁয় গেঁথে যাচ্ছে, যেমন বোনা কাপড়ে কাঁটা গেঁথে যায়।
মোরগের পায়ে পেছন দিকে যে আংগুল গজায় তাকেও الصياصی বলে, যা দেখতে ছোট শিঙের মত। এমনিভাবে الصياصی -র এক অর্থ মূল। আবূ উবায়দা বলেন: আরবগণ বলে থাকে جذ الله صيصيته অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তার মূলোৎপাটন করুন।
وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا -
এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার, করলেন; এখন তোমরা তাদের কতককে হত্যা করছ এবং কতককে করছ বন্দী। অর্থাৎ পুরুষদের হত্যা করছ এবং শিশু ও নারীদের বন্দী করছ (৩৩: ২৬)।
وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَّمْ تَطْؤُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا -
এবং তোমাদেরকে অধিকারী করলেন তাদের ভূমি, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমির, যা তোমরা এখনও পদানত করনি (অর্থাৎ খায়বরের)। আল্লাহ্ সর্ব-বিষয়ে সর্বশক্তিমান (৩৩: ২৭)।

ইবন ইসহাক বলেন: খন্দকের যুদ্ধ ও বনু কুরায়যা সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সূরা আহযাবের একটি সুদীর্ঘ অংশ নাযিল করেন। তাতে মসলিমদের সংকটপূর্ণ অবস্থা ও তাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর কিভাবে আল্লাহ্ তাদেরকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, মুনাফিকদের উক্তি উদ্ধৃত করার পর তা তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا نِعْمَةَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ جَاءَتْكُمْ جُنُودُ فَأَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا وَجُنُودًا لَمْ تَرَوْهَا وَكَانَ اللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرًا -
হে মু'মিনগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল এবং আমি তাদের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলাম ঝঞ্ঝাবায়ু এবং এক বাহিনী যা তোমরা দেখনি। তোমরা যা' কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা (৩৩: ৯)।
শত্রুবাহিনী হচ্ছে কুরায়শ, গাতফান ও বনু কুরায়যা। আর আল্লাহ্ তা'আলা ঝঞ্ঝাবায়ুর সাথে যে বাহিনী প্রেরণ করেন তাঁরা ছিলেন ফেরেশতা। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِذْ جَاءُوكُمْ مِنْ فَوْقِكُمْ وَمِنْ أَسْفَلَ مِنْكُمْ وَإِذْ زَاغَتِ الْأَبْصَارُ وَبَلَغَتِ القُلُوبُ الحَنَاجِرَ وَتَظُنُّونَ بِاللَّهِ الظنونا
যখন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমাগত হয়েছিল উঁচু অঞ্চল ও নীচু অঞ্চল হতে তোমাদের চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল, তোমাদের প্রাণ হয়ে পড়েছিল কণ্ঠাগত এবং তোমরা আল্লাহ্ সম্বন্ধে নানাবিধ ধারণা পোষণ করছিলে (৩৩: ১০)।
উঁচু অঞ্চল থেকে এসেছিল বনু কুরায়যা, আর নীচু অঞ্চল হতে এসেছিল কুরায়ש ও গাতফান গোত্রের লোকেরা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
هُنَالِكَ ابْتُلِيَ الْمُؤْمِنُونَ وَزُلْزِلُوا زِلْزَالاً شَدِيدًا - وَإِذْ يَقُولُ الْمُنَافِقُونَ وَالَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ مَرَضٌ مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولَهُ الأَ غُرُورًا -
তখন মু'মিনগণ পরীক্ষিত হয়েছিল এবং তারা ভীষণভাবে প্রকম্পিত হয়েছিল এবং মুনাফিকরাও যাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তারা বলছিল, আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা প্রতারণা ব্যতীত কিছুই নয় (৩৩: ১১-১২)।
শেষোক্ত আয়াতে মুআত্তিব ইব্‌ন কুשায়রের উক্তি বিধৃত হয়েছে। এরপর ইরশাদ হচ্ছে:
واذ قالت طائفة منهُمْ يَاهْلَ يَشرِبَ لَا مُقامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا ، وَيَسْتَأْذِنَ فَرِيقٌ مِّنْهُمُ النَّبِيِّ يَقُولُونَ أَنْ بيُوتُنَا عَورَةٌ وَمَا هِي بِعورَة ، إِنْ يُرِيدُونَ الا فراراً -
এবং তাদের একদল বলেছিল, হে ইয়াসরিববাসী! এখানে তোমাদের কোন স্থান নেই। তোমরা ফিরে চল। এবং তাদের মধ্যে একদল নবীর নিকট অব্যাহতি প্রার্থনা করে বলছিল, আমাদের বাড়ি-ঘর অরক্ষিত; অথচ ঐগুলো অরক্ষিত ছিল না, আসলে পলায়ন করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য (৩৩: ১৩)।
এ আয়াতে আওস ইব্‌ন কায়যী ও তার সম্প্রদায়ের সমমনা লোকদের কথা বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
وَلَوْ دُخلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُلُوا الفِتْنَةَ لَا تَوْهَا وَمَا تَلْبَثُوا بها الا يسيرا
যদি শত্রুগণ নগরের বিভিন্ন দিক হতে প্রবশে করে তাঁদেরকে বিদ্রোহের জন্য প্ররোচিত করত, তারা অবশ্যই তাই করে বসত, তারা তাতে কাল-বিলম্ব করত না (৩৩: ১৪)।
انطارمًا অর্থ মদীনার বিভিন্ন দিক হতে। ইব্‌ন হিশাম বলেন: لاقطار। অর্থ চতুর্দিক এর একৰচন قطر। অনরূপ الانار-ও একই অর্থে ব্যবহৃত হয় এবং তারও একবচন কবি ফারাযদাক তার এক কবিতায় বলেন:
كم من غنى فتح الاله لهم به والخيل مقعية على الاقطار
অন্য বর্ণনায় الاقتار বলা হয়েছে। অর্থ: সেখানে তাদের জন্য আল্লাহ্ তা'আলা খুলে দিয়েছেন কত ঐশ্বর্য। তার চতুর্দিকে অবস্থান নেয় অশ্বারোহী বাহিনী।
سئلو الفتنة অর্থাৎ যদি শিরকে প্রত্যাবর্তন করতে বলা হয়। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولا -
তারা তো পূর্বেই আল্লাহর সাথে অংগীকার করেছিল যে, তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। আল্লাহ্র সাথে কৃত অংগীকার সম্বন্ধে অবশ্যই জিজ্ঞাসা করা হবে (৩৩: ১৫)।
এ আয়াতে বনু হারিসার কথা বলা হয়েছে। উহুদ যুদ্ধে তারাই বনূ সালামার সংগী হয়ে ভীরুতা প্রকাশ করেছিল। এরপর তারা আল্লাহর সাথে এই অংগীকার করে যে, ভবিষ্যতে কখনও.এর পুনরাবৃত্তি করবে না। আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াতে তাদের সে অংগীকারের কথাই উল্লেখ করেছেন:
قُلْ لَنْ يُنْفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِّنَ الْمَوْتِ أو القَتْلِ واذا لا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلا - قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي الله وليا ولا يَعْصِمُكُمْ مِّنَ اللهِ إِنْ أَرَادَ بِكُمْ سُوءًا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ رَحْمَةً ، وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِّنْ دُونِ اللَّهِ نَصِيرًا - قَدْ يَعْلَمُ اللهُ المُعَوِّقِينَ مِنْكُمْ وَالْقَائِلِينَ لِإِخْوَانِهِمْ هَلَمُ إِلَيْنَا وَلَا يَأْتُونَ الْبَأْسَ إِلَّا قَلِيلا - اشحَةً عَلَيْكُمْ فَإِذَا جَاءَ الخَوْفُ رَأَيْتَهُمْ يَنْظُرُونَ إِلَيْكَ تَدُورُ أَعْيُنُهُمْ كَالَّذِي يُغْشَى عَلَيْهِ مِنَ الْمَوْتِ فَإِذَا ذَهَبَ الْخَوْفُ سَلَقُوكُمْ بِالسنة حداد أشعة عَلَى الخَيْرِ -
বল, তোমাদের কোন লাভ হবে না যদি তোমরা মৃত্যু অথবা হত্যার ভয়ে পলায়ন কর এবং সেই ক্ষেত্রে তোমাদেরকে সামান্যই ভোগ করতে দেওয়া হবে। বল, কে তোমাদেরকে আল্লাহ্ হতে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমংগল ইচ্ছা করেন এবং তিনি যদি তোমাদের প্রতি অনুগ্রহ করতে চান কে তোমাদের ক্ষতি করবে? তারা আল্লাহ্ ব্যতীত নিজেদের কোন অভিভাবক ও সাহায্যকারী পাবে না। আল্লাহ্ অবশ্যই জানেন, তোমাদের মধ্যে কারা তোমাদেরকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণে বাধা দেয় (অর্থাৎ মুনাফিকদের তিনি জানেন) এবং তাদের ভ্রাতৃবর্গকে বলে, আমাদের সঙ্গে এসো। তারা অল্পই যুদ্ধে অংশ নেয় (অর্থাৎ লোক নিন্দা হতে বাঁচার অজুহাত স্বরূপ চলে মাত্র), তোমাদের ব্যাপারে কৃপণতাবশত (অর্থাৎ তোমাদের প্রতি তারা যে হিংসা-দ্বেষ পোষণ করে সেই হেতু।) যখন বিপদ আসে তখন তুমি দেখবে মৃত্যু ভয়ে মুচ্ছাতুর ব্যক্তির মত চক্ষু উল্টিয়ে তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। (অর্থাৎ তার প্রভাব ও ভয়ে); কিন্তু যখন
বিপদ চলে যায় তখন তারা ধনের লালসায় তোমাদেরকে তীক্ষ্ণ ভাষায় বিদ্ধ করে। (অর্থাৎ তারা এমন সব উক্তি করে যা তোমরা পছন্দ কর না। এর কারণ, তারা আখিরাতের আশাবাদী নয়। আখিরাতের প্রতিদান তাদের মনে উৎসাহ যোগায় না। তাই তারা মৃত্যুকে তেমনি ভয় পায়, যেমন ভয় পায় মৃত্যুর পরে জীবন যারা আশা করে না তারা) (৩৩: ১৬-১৯)।
ইবন হিশাম বলেন : سلقوكم অর্থ তারা তোমাদের প্রতি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি করে এবং তা দিয়ে তোমাদেরকে মানসিক যন্ত্রণা ও কষ্ট দেয়। আরবী পরিভাষায় আছে خطیب سلاق خطیب مسلاق ও خطیب مسلق অর্থাৎ অনলবর্ষী বক্তা। আশা ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন ছা'লাবা তার এক কবিতায় বলেন:
فيهم المجد والسماحة والنجدة فيهم والخاطب السلاق
সম্মান ও মহানুভবতা তাদেরই মাঝে, তাদেরই আছে দুরন্ত সাহস, আর আছে অনলবর্ষী বক্তা।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
يَحْسَبُونَ الْأَحْزَابَ لَمْ يَذْهَبُوا ، وَإِنْ يَأْتِ الْأَحْزَابُ يَوَدُّوا لَوْ أَنَّهُمْ بَادُونَ فِي الْأَعْرَابِ يَسْأَلُونَ عَنْ أَنْبَاءكُمْ وَلَوْ كَانُوا فِيكُمْ مَّا قَاتَلُوا إِلا قَلِيلا -
তারা মনে করে, সম্মিলিত বাহিনী চলে যায়নি। যদি সম্মিলিত বাহিনী আবার এসে পড়ে, তখন তারা কামনা করবে যে, ভাল হত যদি তারা যাযাবর মরুবাসীদের সাথে থেকে তোমাদের সংবাদ নিত। তারা তোমাদের সাথে অবস্থান করলেও তারা যুদ্ধ অল্পই করত (৩৩: ২০)।
এরপর মু'মিনদের সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةً لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا -
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ (৩৩: ২১)।
যাতে তারা রাসূলের ব্যক্তি সত্তা ও তাঁর সম্মানজনক অবস্থান সম্পর্কে উদাসীন না থাকে।
এরপর মু'মিনদের সত্যনিষ্ঠা ও আল্লাহ্ প্রতিশ্রুত পরীক্ষাকে স্বীকার করে নেওয়ার যে মনোবৃত্তি তাদের রয়েছে, সে জন্য তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَمَّا رَأَ الْمُؤْمِنُونَ الْأَحْزَابَ قَالُوا هَذَا مَا وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَصَدَقَ اللَّهُ وَرَسُولَهُ وَ وَمَا زَادَهُمْ الا ايْمَانًا وَتَسليمًا -
মু'মিনগণ যখন সম্মিলিত বাহিনীকে দেখল তখন তারা বলে উঠল, এটা তো তাই যার প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল আমাদের দিয়েছিলেন এবং আল্লাহ্ও তাঁর রাসূল সত্যই বলেছিলেন। আর এতে তাদের ঈমান ও আনুগত্যই বৃদ্ধি পেল (৩৩: ২২)।
অর্থাৎ তখন বিপদের ধৈর্য, তাকদীরকে মেনে নেওয়া ও সত্যকে গ্রহণ করে নেওয়ার মনোবৃত্তিই তাদের বৃদ্ধি পায়।
مِنَ الْمُؤْمِنِينَ رِجَالٌ صَدَقُوا مَا عَاهَدُوا اللهَ عَلَيْهِ ، فَمِنْهُمْ مِّنْ قَضَى نَحْبَهُ وَمِنْهُمْ مِّنْ يُنْتَظِرُ وَمَا بدلوا تبديلاً -
মু'মিনদের মধ্যে কতক আল্লাহ্র সাথে তাদের কৃত অংগীকার পূর্ণ করেছে। তাদের কেউ কেউ শাহাদত বরণ করেছে এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অংগীকারে কোন পরিবর্তন করেনি (৩৩: ২৩)।
قضى نحبه অর্থাৎ সে তার কাজ সমাপ্ত করেছে ও নিজ প্রতিপালকের কাছে প্রত্যাবর্তন করেছে। এতে বদর ও উহুদ যুদ্ধের শহীদদের কথা বোঝান হয়েছে।
ইবন হিশাম বলেন : قضى نحبه অর্থ-মৃত্যুবরণ করেছে। النحب অর্থ প্রাণ, যেমন আবু উবায়দা বর্ণনা করেছেন। এর বহুবচন نخوب কবি-যুর রিম্মা তার এক কবিতায় বলেন:
عشية فر الحارثيون بعد ما قضى نحبه في ملتقى الخيل هوبر
সেদিন সন্ধ্যাকালে হাওবার রণাঙ্গনে মারা যাওয়ার পর, হারিসিগণ প্রাণভয়ে পালালো।
হাওবার হচ্ছে হারিস ইব্‌ন কা'ব গোত্রের এক ব্যক্তি। কবি এর দ্বারা ইয়াযীদ ইব্‌ন হাওবারকে বুঝিয়েছেন।
এছাড়া النحب শব্দটি মানত অর্থেও আসে। যেমন জারীর ইবন খাতাফী তার এক কবিতায় বলেন:
بطخفة جالدنا الملوك وخيلنا * عشية بسطام جرين على نحب
আমরা লড়াই করেছি বহু রাজার সাথে তিখফা প্রান্তরে, আমাদের ঘোড়াগুলো সন্ধ্যাকালে ধাবিত হয়েছিল বিসতামের দিকে মানত পূরণার্থে।
অর্থাৎ বিসতামকে হত্যা করার মানত ছিল। সে মানত পূর্ণ করা হয়েছে। এখানে বিসতাম বলতে বিসতাম ইব্‌ন্ন কায়স ইবন মাসউদ শায়রানীকে বোঝান হয়েছে। সকলের কাছে সে ইবন যিল-জাদ্দায়ন নামে পরিচিত। আবূ উবায়দা বলেন: সে ছিল রবী'আ ইন নিযার গোত্রের একজন দক্ষ অশ্বারোহী। তিখফা বসরার পথে একটি জায়গার নাম।
النجب-এর আরেক অর্থ-বন্ধক। ফারাযদাক বলেন,
واذ نحبت كلب على الناس اينا * على النحب اعطى للجزيل وافضل
কাল্ব গোত্র যখন লোকের কাছে বন্ধক রাখে, তখন লক্ষ্য করে দেখ, আমাদের মধ্যে কার বন্ধক পরিমাণে বেশি, কে এ ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ?
النحب-এর অপর অর্থ-ক্রন্দন। এ অর্থেই আরবরা বলে থাকে : ينتحب অর্থাৎ সে ডাক ছেড়ে কাঁদে। এমনিভাবে প্রয়োজন ও সৎসাহস অর্থেও শব্দটি ব্যবহৃত হয়। বলা হয় مالی عندهم نحب অর্থাৎ তাদের কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই। মালিক ইব্‌ নুওয়ায়রা ইয়ারবৃঈ বলেন:
ومالي نحب عندهم غير انني * تلمست ما تبغى من الشدن الشجر
তাদের কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই, তবে আমি তালাশ করি, যা লাল চৌখা শুদূনী উট তালাশ করে।
বনু তায়ম লাত ইব্‌ন সা'লাবা ইব্‌ন উকাবা ইব্‌ন সা'ব ইব্‌ন আলী ইব্‌ন বকর ইব্‌ন ওয়াইল গোত্রের নাহার ইব্‌ন তাওসিআ বলেন :
نجى يوسف الثقفى ركض * دراك بعد ما وقع اللواء
لو ادركنه لقضين نحبا * به ولكل مخطأة وقاء
ইউসুফ সাকাফীকে রক্ষা করে ছিল অবিরাম দৌড়, তাঁর ঝাণ্ডা পতনের পর।
যদি অশ্বারোহী দল তার নাগাল পেত, তবে তাকে দিয়ে কী কম তাদের প্রয়োজন মেটাতো। বস্তুতা চায়। যে-কোন ভুল-ত্রুটিকারীর একটা বাঁচার উপায়ও থাকে।
النحب-এর আরেক অর্থ মৃদু গতিতে গমন।
ইবন ইসহাক বলেন : ومنهم من بينتظر অর্থ, অনেকে আল্লাহর প্রতিশ্রুত সাহায্য ও সাথীদের মত শাহাদতের অপেক্ষা করছে। وما بدلوا تبديلا অর্থাৎ তারা তাদের দীনের ব্যাপারে কোন সংশয় পোষণ করে না ও দ্বিধা রাখে না এবং তার পরিবর্তে অন্য কোন ধর্মাদর্শ গ্রহণ করে না।
এরপর আল্লাহ্ বলেন : ليَجْزِيَ اللهُ الصَّادِقِينَ بصدقهمْ وَيُعَذِّبَ المُنَافِقِينَ إِن شَاءَ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا - وَرَدَّ اللهُ الَّذِينَ كَفَرُوا بِغَيْظِهِمْ لَمْ يَنَالُوا خَيْرًا وَكَفَى اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ الْقِتَالَ وَكَانَ اللَّهُ قَوِيًّا عَزِيزًا - وَأَنْزَلَ الَّذِينَ ظَاهَرُوهُمْ مِّنْ أَهْلِ الكتاب من صَيَاصِيهِم -
কারণ আল্লাহ্ সত্যবাদিগণকে পুরষ্কৃত করেন তাদের সত্যবাদিতার জন্য এবং তাঁর ইচ্ছা হলে মুনাফিকদেরকে শাস্তি দেন অথবা তাদেরকে ক্ষমা করেন। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আল্লাহ্ কাফিরদেরকে (অর্থাৎ কুরায়ש ও গাতফানীদেরকে)। ক্রুদ্ধাবস্থায় বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করলেন। যুদ্ধে মু'মিনদের জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট, আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান, পরাক্রমশালী, কিতাবীদের মধ্যে যারা তাদেরকে সাহায্য করেছিল (অর্থাৎ বনু কুরায়যা) তাদেরকে তিনি তাদের দুর্গ হতে অবতরণে বাধ্য করলেন (৩৩: ২৪-২৬)।
الصياصی অর্থ-দুর্গ ও কেল্লা যাতে তারা আশ্রয় নিয়েছিল।
ইব্‌ন হিশام বলেন: বনু আসাদ ইব্‌ন খুযায়মার শাখা বনু হাসহাসের গোলাম সুহায়মের এক কবিতায় আছে:
واصبحت الثيران صرعي واصبحت * نساء تميم يبتدرن الصياصيا
তাদের ষাঁড়গুলো সব মরে পড়ে থাকলো, আর বনু তামীমের নারীরা সব দুর্গের দিকে দৌঁড়াল।
الصياصي -এর আরেক অর্থ শিং। নাবিগা জাদী তাঁর এক কবিতায় বলেন:
وسادة رهطى حتى بقي * ت فردا كصيصية الاعضب
আমার গোত্র প্রধানগণ সকলেই মারা গেছেন, আর আমি একা ভাঙা শিঙের মত পড়ে আছি।
আবূ দুওয়াদ ইয়াদীর এক কবিতায় আছে:
فذعرنا سحم الصياصي بايديه * ن نضح من الكحيل وقار
পাহাড়ী ছাগলের কালো শিঙ দেখে আমরা ভয় পেয়ে গেলাম। তাদের সামনের পায়ে আলকাতরা ও মেটে তেলের মিশ্রণ ছিল।
তাঁতীর কাপড় বোনার কাঁটাকেও الصياصی বলা হয়। আবু উবায়দা হতে এরূপ বর্ণিত আছে। তিনি আমার কাছে জুשম ইব্‌ন মু'আবিয়া ইব্‌ন বাক্ ইব্‌ন ওয়াযিন গোত্রীয় কবি দুরায়দ ইব্‌ন সিম্মার একটি পংক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এ অর্থ সপ্রমাণ করেন। তাতে কবি বলেন:
نظرت اليه والرماح تنوشه * كوقع الصياضي في النسيج الممدد
আমি তার দিকে লক্ষ্য করে দেখলাম একের পর এক বর্শা তার গাঁয় গেঁথে যাচ্ছে, যেমন বোনা কাপড়ে কাঁটা গেঁথে যায়।
মোরগের পায়ে পেছন দিকে যে আংগুল গজায় তাকেও الصياصی বলে, যা দেখতে ছোট শিঙের মত। এমনিভাবে الصياصی -র এক অর্থ মূল। আবূ উবায়দা বলেন: আরবগণ বলে থাকে جذ الله صيصيته অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা তার মূলোৎপাটন করুন।
وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ فَرِيقًا تَقْتُلُونَ وَتَأْسِرُونَ فَرِيقًا -
এবং তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার, করলেন; এখন তোমরা তাদের কতককে হত্যা করছ এবং কতককে করছ বন্দী। অর্থাৎ পুরুষদের হত্যা করছ এবং শিশু ও নারীদের বন্দী করছ (৩৩: ২৬)।
وَأَوْرَثَكُمْ أَرْضَهُمْ وَدِيَارَهُمْ وَأَمْوَالَهُمْ وَأَرْضًا لَّمْ تَطْؤُوهَا وَكَانَ اللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرًا -
এবং তোমাদেরকে অধিকারী করলেন তাদের ভূমি, ঘর-বাড়ি ও ধন-সম্পদের এবং এমন ভূমির, যা তোমরা এখনও পদানত করনি (অর্থাৎ খায়বরের)। আল্লাহ্ সর্ব-বিষয়ে সর্বশক্তিমান (৩৩: ২৭)।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সা'দ (রা) ইন্তিকালে তার প্রতি প্রদর্শিত সম্মান

📄 সা'দ (রা) ইন্তিকালে তার প্রতি প্রদর্শিত সম্মান


ইবন ইসহাক বলেন: বনু কুরায়যা সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার পর সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর যখমের অবনতি ঘটে। অবশেষে এতে তিনি শাহাদত বরণ করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: মু'আয ইব্‌ন রিফা'আ যুরাকী তার গোত্রের জনৈক নির্ভরযোগ্য লোক হতে বর্ণনা করেন যে, সা'দ ইবন মু'আয (রা)-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে গভীর রাতে হযরত জিবরাঈল (আ) একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: হে মুহাম্মদ! কে এই মৃত ব্যক্তি, যার জন্য আকাশের সকল দুয়ার খুলে দেওয়া হলো এবং কেঁপে উঠলো আল্লাহর আরশ'? রাবী বলেন: একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) দ্রুত কাপড় সামলাতে সামলাতে সা'দ (রা)-এর দিকে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখেন তাঁর ইন্তিকাল হয়ে গেছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর (র) আমরাহ বিন্ত আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আয়েশা (রা) মক্কা হতে ফিরছিলেন। উসায়দ ইব্‌ন হ্যায়র (রা) তাঁর সংগে ছিলেন। পথি মধ্যে উসায়দ তাঁর এক স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ পেলেন। তিনি শোকে আকুল হয়ে পড়েন। আয়েশা (রা) তাঁকে সান্ত্বনাদানের জন্য বললেন: হে আবু ইয়াহ্ইয়া! আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি একটি স্ত্রীলোকের জন্য শোকে আকুল হচ্ছেন, অথচ আপনার এমন একজন চাচাত ভাই ইন্তিকাল করেছেন, যার জন্য আল্লাহর আরש পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে?
ইবন ইসহাক বলেন: হাসান বসরী (র)-এর সূত্রে জনৈক বিশ্বস্ত ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: সা'দ (রা) স্থূলকায় ছিলেন। কিন্তু লোকে যখন তাঁর লাশ বহন করে নিচ্ছিল, তখন বেশ হালকা মনে হচ্ছিল। মুনাফিকরা মন্তব্য করল সে তো অত্যন্ত ভারী মানুষ ছিল, কিন্তু এত হালকা লাশ আমরা তো কখনও বহন করিনি। একথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন: তোমাদের ছাড়াও তো তার আরও বহনকারী ছিল। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন সা'দের রূহ পেয়ে ফেরেশতারা আনন্দিত হয় এবং তাঁর জন্য আল্লাহ্র আরশ কেঁপে ওঠে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মু'আয ইব্‌ন রিফা'আ মাহমূদ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন আমর ইব্‌ন জীমূহ সূত্রে জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: সা'দ (রা)-কে দাফন করার সময় আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। দাফন শেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলে উঠলেন সুবহানাল্লাহ্। উপস্থিত লোকেরাও বলে উঠলো সুবহানাল্লাহ্। তারপর তিনি বললেন: আল্লাহু আকবার। সঙ্গে সঙ্গে সকলে বললেন: আল্লাহু আকবার। এরপর তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। সুবহানাল্লাহ্ বলার কারণ কি? তিনি বললেন: এই নেক্কার লোকটির প্রতি কবর সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। এরপর আল্লাহ্ তাঁর জন্য তা প্রশস্ত করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর, ইন্তিকালে সত্তর হাযার ফেরেশতা নাযিল হয়, যাঁরা এর আগে আর কোন দিন যমীনে অবতরণ করেনি। কথিত আছে যে, তাঁর কবর থেকে মিশক-আম্বরের ঘ্রাণ বের হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন: যদি কেউ কবরে পেষণের আযাব থেকে পরিত্রাণ পেত, তবে অবশ্যই সা'দ তা থেকে নিষ্কৃতি পেত।

ইবন ইসহাক বলেন: বনু কুরায়যা সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়ার পর সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর যখমের অবনতি ঘটে। অবশেষে এতে তিনি শাহাদত বরণ করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: মু'আয ইব্‌ন রিফা'আ যুরাকী তার গোত্রের জনৈক নির্ভরযোগ্য লোক হতে বর্ণনা করেন যে, সা'দ ইবন মু'আয (রা)-এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে গভীর রাতে হযরত জিবরাঈল (আ) একটি রেশমী পাগড়ী মাথায় দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন: হে মুহাম্মদ! কে এই মৃত ব্যক্তি, যার জন্য আকাশের সকল দুয়ার খুলে দেওয়া হলো এবং কেঁপে উঠলো আল্লাহর আরশ'? রাবী বলেন: একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) দ্রুত কাপড় সামলাতে সামলাতে সা'দ (রা)-এর দিকে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখেন তাঁর ইন্তিকাল হয়ে গেছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর (র) আমরাহ বিন্ত আবদুর রহমানের সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: আয়েশা (রা) মক্কা হতে ফিরছিলেন। উসায়দ ইব্‌ন হ্যায়র (রা) তাঁর সংগে ছিলেন। পথি মধ্যে উসায়দ তাঁর এক স্ত্রীর মৃত্যু সংবাদ পেলেন। তিনি শোকে আকুল হয়ে পড়েন। আয়েশা (রা) তাঁকে সান্ত্বনাদানের জন্য বললেন: হে আবু ইয়াহ্ইয়া! আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি একটি স্ত্রীলোকের জন্য শোকে আকুল হচ্ছেন, অথচ আপনার এমন একজন চাচাত ভাই ইন্তিকাল করেছেন, যার জন্য আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে?
ইবন ইসহাক বলেন: হাসান বসরী (র)-এর সূত্রে জনৈক বিশ্বস্ত ব্যক্তি আমার নিকট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: সা'দ (রা) স্থূলকায় ছিলেন। কিন্তু লোকে যখন তাঁর লাশ বহন করে নিচ্ছিল, তখন বেশ হালকা মনে হচ্ছিল। মুনাফিকরা মন্তব্য করল সে তো অত্যন্ত ভারী মানুষ ছিল, কিন্তু এত হালকা লাশ আমরা তো কখনও বহন করিনি। একথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পৌঁছলে তিনি বললেন: তোমাদের ছাড়াও তো তার আরও বহনকারী ছিল। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন সা'দের রূহ পেয়ে ফেরেশতারা আনন্দিত হয় এবং তাঁর জন্য আল্লাহ্র আরশ কেঁপে ওঠে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মু'আয ইব্‌ন রিফা'আ মাহমূদ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন আমর ইব্‌ন জীমূহ সূত্রে জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: সা'দ (রা)-কে দাফন করার সময় আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। দাফন শেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলে উঠলেন সুবহানাল্লাহ্। উপস্থিত লোকেরাও বলে উঠলো সুবহানাল্লাহ্। তারপর তিনি বললেন: আল্লাহু আকবার। সঙ্গে সঙ্গে সকলে বললেন: আল্লাহু আকবার। এরপর তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। সুবহানাল্লাহ্ বলার কারণ কি? তিনি বললেন: এই নেক্কার লোকটির প্রতি কবর সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল। এরপর আল্লাহ্ তাঁর জন্য তা প্রশস্ত করে দিয়েছেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: এর সমার্থক একটি হাদীস আয়েশা (রা) হতেও বর্ণিত আছে। তাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন: কবর একটি চাপ দেবেই। তা থেকে নিস্তার পেলে সা'দ ইব্‌ন মু'আয বেঁচে গেছে।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: সা'দ সম্পর্কে জনৈক আনসার সাহাবী বলেন:
وما اهتز عرش الله من موت هالك * سمعنا به الا لسعد ابي عمرو
আমরা শুনিনি কারও মৃত্যুতে আল্লাহ্ আরশ প্রকম্পিত হয়েছে। একমাত্র আবূ আমর সা'দ (রা) ছাড়া।
সা'দ (রা)-এর লাশ যখন তুলে নেওয়া হচ্ছিল, তখন তাঁর মা কুরায়শা বিন্ত রাফি ইব্‌ন মু'আবিয়া ইব্‌ন উবায়দ ইব্‌ন সা'লাবা ইব্‌ন আব্দ ইব্‌ন আবজার (খুদরা) ইব্‌ন আওফ ইব্‌ন হারিস ইব্‌ন খাযরাজ কেঁদে কেঁদে বলছিলেন:
ويل ام سعد سعدا صرامة وحداً وسو ددا ومجدا * وفارسا معداً يقدها ما قدم * سد به مسدا
হায়, উম্মু সা'দ হারালো সা'দকে। হারালো সে সাহসী ও তেজস্বী ব্যক্তিকে। হারালো সে মহাসম্মানিত নেতাকে এবং এমন অশ্বারোহী সৈনিককে যে সদা প্রস্তুত থাকতো। যাকে যে কোন প্রয়োজনস্থলে দাঁড় করানো যেত আর যে শত্রুর মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সব রোদনকারিণীই কিছু না কিছু মিথ্যা বলে, কেবল সা'দের রোদনকারিণী ছাড়া।

টিকাঃ
১. রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর, ইন্তিকালে সত্তর হাযার ফেরেশতা নাযিল হয়, যাঁরা এর আগে আর কোন দিন যমীনে অবতরণ করেনি। কথিত আছে যে, তাঁর কবর থেকে মিশক-আম্বরের ঘ্রাণ বের হচ্ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরো বলেন: যদি কেউ কবরে পেষণের আযাব থেকে পরিত্রাণ পেত, তবে অবশ্যই সা'দ তা থেকে নিষ্কৃতি পেত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00