📘 সিরাতে ইবন হিশাম 📄 খন্দকের সম্পর্কে হাসান (রা)-এর বিবরণ

📄 খন্দকের সম্পর্কে হাসান (রা)-এর বিবরণ


ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন আবাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র তার পিতা আব্বাদ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: সাফিয়্যা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা)-এর ফারি' নামক দুর্গে ছিলেন। তিনি বলেন, হাসান ইব্‌ন সাবিতও সেই দুর্গে আমাদের সাথে নারী ও শিশুদের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন: একবার জনৈক ইয়াহুদী আমাদের দুর্গের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। উল্লেখ্য যে, ইয়াহুদী গৌষ্ঠী বনু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ছিন্ন করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তাদের থেকে আমাদের রক্ষা করার মত কোন লোক ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তো মুসলিমদের নিয়ে শত্রুদের সামনা-সামনি ছিলেন। আমাদের কোন বিপদ ঘটলে তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে স্থান ত্যাগ করে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। আমি হাসান কে বললাম: হে হাসান! এই যে ইয়াহুদী লোকটা যাকে দেখছ আমাদের দুর্গের পাশে ঘুরঘুর করছে, আমার আশংকা হয়, সে আমাদের গুপ্ত খবর আমাদের পেছনে অবস্থানকারী ইয়াহূদীদের কাছে পাচার করবে। জানই তো রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজন নিয়ে ওদিকে ব্যস্ত আছেন। কাজেই, তুমি গিয়ে ওটাকে খতম করে এসো।
হাসান বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া! আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি তো জানেন, এটা আমার কাজ নয়।
সাফিয়্যা (রা) বলেন: তার এ উত্তর শুনে বুঝলাম, তাকে দিয়ে কিছু হবে না। অগত্যা আমি একটা খুঁটি তুলে দুর্গের বাইরে নেমে আসলাম এবং তা দিয়ে ইয়াহুদীটাকে এমন এক আঘাত করলাম, যাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। এরপর আমি দুর্গে ফিরে এসে হাসানকে বললাম, এবার আপনি গিয়ে ওর কাপড়-চোপড় যা আছে তা নিয়ে আসেন। সে পুরুষ বলে আমি এটা করতে পারছি না। কিন্তু হাসান (রা) বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া, তার মালামাল আমার কোন দরকার নেই।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম 📄 মু'আয়ম (রা) কর্তৃক মুশরিকদের প্রতারণা প্রসংগে

📄 মু'আয়ম (রা) কর্তৃক মুশরিকদের প্রতারণা প্রসংগে


ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা যেমন বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তার সঙ্গিগণ প্রচণ্ড ত্রাসের মাঝ অবস্থান করছিলেন। উপর-নীচ সবদিক থেকে শত্রুবাহিনী তাদের ঘিরে রেখেছিল। আর তারা তাদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে রেখেছিল।
এরপর নু'আয়ম ইব্‌ন מסউদ ইব্‌ন আমির ইব্‌ন উনায়ফ ইব্‌ন সালাবা ইব্‌ন কুনফুয ইব্‌ন হিলাল ইব্‌ন খালাওয়া ইব্‌ন আশজা ইব্‌ন রায়ছ ইব্‌ন গাতফান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তো ইসলাম গ্রহণ করেছি, কিন্তু আমার সম্প্রদায় সেটা জানে না। আপনি আমাকে যে কোন হুকুম করতে পারেন।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি আমাদের মধ্যে একা। তুমি যদি পারো তাদের মাঝে গিয়ে পরস্পরে বিভেদ সৃষ্টি করে দাও। কেননা, যুদ্ধ মাত্রই তো প্রতারণা।
'নু'আয়ম ইবন মাসউদ বের হয়ে পড়লেন। তিনি প্রথমে বনু কুরায়যার কাছে গেলেন। ইসলামের পূর্বে তিনি তাদের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনি তাদের বললেন: হে বনু কুরায়যা! তোমাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতা তোমাদের তো জানা আছে।
তারা বলল: তুমি সত্য বলেছ। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ নেই।
তিনি বললেন: কুরায়শ ও গাতফানের অবস্থা তোমাদের মত নয়। এটা তোমাদের দেশ। এখানেই তোমাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও অবলা নারীরা রয়েছে। তোমরা তাদের অন্যত্র সরাতে পারবে না। কুরায়ש ও গাতফানরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছে। তোমরাও তাদের সহযোগিতা করছ। তাদের দেশ ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন এখানে নেই। কাজেই তাদের অবস্থা তোমাদের মত নয়। তারা সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করবে। পক্ষান্তরে অবস্থা প্রতিকূল দাঁড়ালে তারা দেশে ফিরে যাবে এবং তোমাদেরকে তোমাদের দেশে মুহাম্মদের মুঠোর মধ্যে ছেড়ে যাবে। তাঁর সংগে বোঝাপড়া করার শক্তি একাকী তোমাদের নেই। সুতরাং আমার পরামর্শ, তাদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় লোককে তোমাদের কাছে বন্ধক না রাখা পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করো না। মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে, তাদের সাথে তোমাদের চুক্তির নিশ্চয়তা স্বরূপ, সে লোকগুলোকে তোমরা তোমাদের মাঝে যিম্মী করে রাখবে। যুদ্ধ শেষে তাদের ছেড়ে দেবে। তারা বলল: অতি উত্তম পরামর্শ।
এরপর তিনি কুরায়শদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হারব ও তার সাথের অন্যান্য কুরায়ש নেতৃবৃন্দকে বললেন: আপনাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ও মুহাম্মদের সাথে আমার সম্পর্কহীনতার কথা তো আপনাদের জানা আছে। আমার কানে একটা সংবাদ পৌছেছে, যা একজন শুভাকাংক্ষী হিসাবে আপনাদেরকে জানানো আমি কর্তব্য বলে মনে করছি। তবে আমার কথা আপনারা গোপন রাখবেন। তারা বলল অবশ্যই। তিনি বললেন: আপনারা হয়ত জানেন না মুহাম্মদের সাথে চুক্তিভংগ করে ইয়াহুদীরা এখন অনুতপ্ত। তারা এই মর্মে তাঁর কাছে লোক পাঠিয়েছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত। এখন তাঁর প্রতিবিধানস্বরূপ আমরা কৌশলে কুরায়শ ও গাতফানদের বিশিষ্ট নেতাদের ধরে যদি আপনার হাতে সমর্পণ করি, তবে কি আপনি খুশি হবেন? আপনি তাদের ইচ্ছামত হত্যা করবেন। এরপর আমরা আপনার সাথে মিলে যৌথ আক্রমণ করে তাদের অবশিষ্টদের মূলোৎপাটন করব।
মুহাম্মদ (সা) তাদের এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। কাজেই ইয়াহুদীরা আপনাদের কতিপয় নেতাকে যিম্মী স্বরূপ রাখার জন্য আপনাদের কাছে লোক পাঠাতে পারে। সাবধান, আপনারা একটি লোককেও তাদের হাতে ছেড়ে দেবেন না।
এরপর, তিনি গাতফান গোত্রের কাছে গেলেন। তাদের বললেন হে গাতফান গোত্র। তোমরা আমার মূল, আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী এবং আমার সব চাইতে প্রিয় মানুষ। তোমরা আমাকে সন্দেহ কর এরূপ ধারণা আমার নেই। তারা বলল সত্যিই বলেছ, তুমি আমাদের কাছে সন্দেহভাজন নও। তিনি বললেন তাহলে আমার কথা গোপন রাখবে তো? তারা বলল: নিশ্চয় রাখবো। কিন্তু বিষয়টি কি? তিনি কুরায়שদের যা যা বলেছিলেন, তাদের কেউ তাই বললেন এবং তাদেরকেও কুরায়শদের মত সতর্ক করলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম 📄 মুশরিকদের প্রতি আল্লাহ্ যা নাযিল করেন

📄 মুশরিকদের প্রতি আল্লাহ্ যা নাযিল করেন


হিজরী পঞ্চম সালের শাওয়াল মাস। শনিবার রাত। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষে এদিন আল্লাহ্ সে মহিমা এভাবে প্রকাশ পায়। আবু সুফিয়ান ইব্‌ন হাব ও গাতফান গোত্রের নেতৃবৃন্দ বনু কুরায়যার কাছে ইকরামা ইব্‌ন আবু জাহলকে কুরায়শ ও গাতফানের কতিপয় প্রতিনিধিসহ প্রেরণ করেন। তারা গিয়ে বনু কুরায়যাকে বলল: আমরা তো এখানকার বাসিন্দা নই। আমাদের ঘোড়া-উট মরে যাচ্ছে। কাজেই, আর কালক্ষেপণ না করে চলো যাই মুহাম্মদের সাথে চূড়ান্ত বোঝাপড়া করে ফেলি, চিরতরে খতম করে দেই।
ইয়াহুদীরা বলল: আজ শনিবার দিন। এদিনে আমরা কোন কিছু করি না। আমাদের কতক লোক এদিনের অশ্রদ্ধা করে যে শাস্তি ভোগ করেছে, তা তোমাদের অজানা নয়। তদুপরি আমরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবার নই, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের কতিপয় লোক আমাদের কাছে যিম্মী রাখবে। মুহাম্মদের মূলোৎপাটন না করা পর্যন্ত তারা আমাদের কাছে যিম্মী হয়ে থাকবে। কারণ, আমাদের আশংকা হয়, যুদ্ধ প্রচণ্ডাকার ধারণ করলে এবং তাতে তোমরা বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলে, তোমরা নিজ দেশে চলে যাবে; আর আমাদেরকে আমাদের দেশে মুহাম্মদের হাতে ছেড়ে যাবে। অথচ তাঁর সাথে লড়বার ক্ষমতা আমাদের নেই। প্রতিনিধিবর্গ বনু কুরায়যার উত্তর নিয়ে কুরায়ש ও বনূ গাতফানের কাছে ফিরে গেল। সব শুনে তারা বলে উঠল: আল্লাহ্র কসম, নু'আয়ম ইবন מסউদের কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তারা বনু কুরায়যার কাছে বলে পাঠাল আল্লাহ্র কসম! আমরা আমাদের একটা লোকও তোমাদের হাতে সমর্পণ করব না। এখন তোমাদের যদি ইচ্ছা থাকে তা হলে বের হয়ে আস এবং যুদ্ধ কর।
এই বার্তা পেয়ে বনু কুরায়যাও বলল: নু'আয়ম ইবন מסউদ যা বলেছিল তা তো সত্যই দেখছি। যুদ্ধ করাই ওদের অভিপ্রায়। এরপর ফলাফল ভাল হলে সুযোগের সদ্ব্যবহার করবে, আর যদি বিপরীত হয়, তবে তারা নিজ দেশে চলে যাবে আর আমাদেরকে অসহায় অবস্থায় শত্রুর মুখে ছেড়ে যাবে। সুতরাং আমাদের উচিত কুরায়শ ও গাতফানের কাছে লোক পাঠিয়ে জানিয়ে দেওয়া যে, আল্লাহ্র কসম। তোমরা আমাদের হাতে যিম্মী না রাখলে আমরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তোমাদের সহযোগিতা করব না। সুতরাং তারা তাই করল।
কুরায়শ ও গাতফান গোত্র বনু কুরায়যার দাবী প্রত্যাখ্যান করল। এভাবে আল্লাহ্ তা'আলা সম্মিলিত বাহিনীর ঐক্য নস্যাৎ করে দিলেন। সেই সাথে নেমে এলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রচণ্ড শীতের রজনীতে আল্লাহ্ তা'আলা সুতীব্র শৈত্য প্রবাহ ছেড়ে দিলেন। তাদের রান্নার হাড়ি-পাতিল উড়ে গেল। তাঁবু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম 📄 মুশরিকদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর

📄 মুশরিকদের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ-খবর


তাদের মতানৈক্যের কথা যথাসময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পৌঁছে গেল। তিনি জানতে পারলেন, আল্লাহ্ তা'আলা কিভাবে সম্মিলিত বাহিনীর ঐক্য চূর্ণ করে দিয়েছেন। তিনি বিশ্বস্ত সাহাবী হুযায়ফা ইব্‌ন ইয়ামানকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন দেখ এসো, এদের রাতে কি ঘটেছে।
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন্ন কা'ব কুরাজীর সূত্রে ইয়াযীদ ইব্‌ন যিয়াদ বর্ণনা করেন, কৃষ্ণার জনৈক ব্যক্তি হুযায়ফা ইব্‌ন ইয়ামান (রা)-কে জিজ্ঞাসা করেছিল, হে আবূ আবদুল্লাহ্! আপনি কি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখেছেন? তাঁর সাহচর্য লাভ করেছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ বৎস। সে বলল তা আপনারা কিভাবে চলতেন? তিনি বললেন: আল্লাহর কসম, আমাদের সে জীবন ছিল ভীষণ কষ্টের।
লোকটি বলল: আল্লাহর কসম! আমরা তাঁকে পেলে পায়ে ধূলো লাগতে দিতাম না; মাথায় করে রাখতাম।
হুযায়ফা (রা) বললেন: ভাতিজা, আল্লাহর কসম, আমার চোখে এখনও ভাসছে সেই রাত্রের কথা-রাসূলুল্লাহ্ (সা) দীর্ঘক্ষণ ধরে সালাত আদায় করলেন। এরপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন: কে আছ শত্রু শিবিরে গিয়ে তাদের গতিবিধি দেখবে এবং ফিরে এসে আমাদেরকে তা অবগত করবে? তিনি এই ফিরে আসার সাথে শর্ত লাগিয়ে বললেন: আমি আল্লাহ্ কাছে প্রার্থনা করব, এটা যে করবে সে যেন জান্নাতে আমার সঙ্গী হয়।
তখন প্রচণ্ড ভয়-ত্রাসে সকলে কম্পমান। সেই সাথে দুর্দান্ত ক্ষুধা, অসহনীয় শৈত্য প্রবাহ। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ কথায় সাহস করে কেউ দাঁড়াল না। এরপর তিনি আমাকেই ডাকলেন।
• অগত্যা আমাকে উঠতেই হলো। তিনি বললেন: হে হুযায়ফা। তুমি গিয়ে তাদের শিবিরে প্রবেশ কর এবং লক্ষ্য করে দেখ, তারা কি করছে। সাবধান, আমার কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত আর কোন কিছু করবে না।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية