📄 হাসান (রা) কর্তৃক ইকরামার নিন্দা
ইবন ইসহাক বলেন: আমর নিহত হওয়ার পর ইকরামা ইব্ন আবু জাহল যখন পরাজিত হয়ে পালায়, তখন সে নিজ বর্শাটিও ফেলে যায়। এ সম্পর্কে হাসান ইব্ন সাবিত (রা) বলেন:
فر والقى لنا رمحه * ووليت تعدو كعدو الطليم
* ولم تلق ظهرك مستأنسا * لعلك عكرم لم تفعل
ما ان تجور عن المعدل كأن قفاك قفا فرعل
সে প্রাণ নিয়ে পালাল, আর সে আমাদের জন্য রেখে গেল নিজ বর্শাটিও। হে ইকরামা! এমন কাজ হয়ত তুমি আর কখনো করনি; তুমি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে উট পাখির মত।
তুমি সাহস নিয়ে একবারও পেছনের দিকে তাকালে না; তোমার ঘাড়টা ঠিক হায়েনার ঘাড়ের মত।
ইব্ন হিশাম বলেন : الفرعل অর্থ ছোট ভাল্লুক। বনু কুরায়যা ও খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবিগণের এবং বনু কুরায়যার সংকেত ছিল
حم لا ينصرون
📄 সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ হারিসার আবু লায়লা আবদুল্লাহ্ ইব্ন সাহল ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন সাহল আনসারী আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, আয়েশা (রা) খন্দকের যুদ্ধের সময় বনূ হারিসার দুর্গে ছিলেন। এটা ছিল মদীনার সবচাইতে সুরক্ষিত দুর্গ। সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর মাতাও এই দুর্গে তাঁর সংগে ছিলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: তখনও আমাদের জন্য পর্দার বিধান নাযিল হয় নি। এ সময় সা'দ একটি সংকীর্ণ বর্ম পরিধান করে, যা থেকে তার বাহু ছিল, সম্পূর্ণ বাইরে, একটি বর্শা হাতে আমাদের সামনে দিয়ে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলেন, আর এই পংক্তি আবৃত্তি করছিলেন:
ليث قليلا يشهد الهيجا جمل * لا بأس بالموت اذا حان الاجل
ক্ষণিক দাঁড়াও, জামাল দেখুক যুদ্ধ কেমন। মৃত্যুর সময় যদি আসে, তবে তাতে ভয় কিসের?
তার মা বললেন: সত্য বটে বৎস। তবে তুমি দেরি করে ফেলেছ। আয়েশা বলেন: আমি বললাম, হে সা'দের মা। সা'দের বর্মটা একটু বড় হলে ভাল ছিল। তখন তিনি বললেন: আপনার কি আশংকা হচ্ছে যে, তাঁর অনাবৃত স্থানে তীর বিদ্ধ হতে পারে?
দেখতে না দেখতে সা'দের প্রতি একটি তীর নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাতে তার বাহুর ধমনী ছিন্ন হয়ে যায়। আসিম ইবন উমর ইব্ন কাতাদা আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, তীরটি নিক্ষেপ করেছিল আমির ইব্ন লুআঈ গোত্রের হাব্বান ইব্ন কায়স ইব্ন আরিকা। তীর বিদ্ধ হলে সে বলেছিল: এই নাও আমার তীর, আমি আরিকার সন্তান। সা'দ (সা) তাকে বলেন:
আল্লাহ্ তা'আলা তোর চেহারা জাহান্নামে ঘর্মাক্ত করুন। হে আল্লাহ্! আপনি যদি কুরায়শদের সাথে আর কোন যুদ্ধ অবশিষ্ট রেখে থাকেন, তবে আমাকেও জীবিত রাখবেন, যারা আপনার রাসূলকে পীড়া দিয়েছে, তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে এবং দেশ থেকে বের করে দিয়েছে, আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। হে আল্লাহ্! আর যদি আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে থাকেন, তবে এ যখমকে আমার শাহাদতের অছিলা করুন। আর সেই সাথে বনু কুরায়যার ব্যাপারে আমার চোখ জুড়ানোর আগে আমার মৃত্যু দিবেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব ইব্ন মালিকের সূত্রে আমার কাছে এমন এক ব্যক্তি নিম্নের এ তথ্য দিয়েছেন, যার বিশ্বস্ততায় আমার কোন সন্দেহ নেই। তিনি বলেন: সা'দ (রা)-কে সেদিন তীর মেরেছিল মাখযূম গোত্রের মিত্র আবূ উসামা জুশামী। এ সম্পর্কে আবু উমামা ইকরামা ইব্ন আবু জাহলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল:
فداك بأطام المدينة خالد لها بين أثناء المرافق عائد
* * اعكرم هلا لمتنى اذ تقول لي
الست الذي الزمت سعدا مرشة
عليه مع الشمط والعذاري النواهد
عبيدة جمعا منهم اذ يكابد
وآخر مرعوب عن القصد قاصد
قضى نحبه منها سعيد فاعولت
وانت الذي دافعت عنه وقد دعا .
على حين ما هم جائز عن طريقه
হে ইকরামা! কেন তুমি আমাকে তিরস্কার করলে না, যখন আমাকে বলছিলে-মদীনার দুর্গে খালিদ হবে তোমার মুক্তিপণ?
আমিই কি সা'দকে আঘাত করিনি, ফলে, তার ধমনি কেটে ফিনকি দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরে।
তাতে সা'দ মারা যায়? ফলে ডাক ছেড়ে কাঁদলো কেশ পক্ক বৃদ্ধা, আর স্ফীত বক্ষবিশিষ্ট যুবতীরা।
উরায়দা যখন বিপদে পড়ে তাদের এক দলকে ডেকেছিল।
তখন তুমিই, তো তার প্রাণরক্ষা করেছিলে। আর তখন তোমাদের অবস্থা এই ছিল যে, তোমাদের কেউ পথ ভুলেছিল, কেউ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সঠিক রাস্তা ছেড়ে দিয়েছিলে।
ইন্ন হিশাম বলেন: কথিত আছে যে, সা'দের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছিল খাফাজা ইব্ন আসিম ইব্ন হাব্বান।
📄 খন্দকের সম্পর্কে হাসান (রা)-এর বিবরণ
ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াহইয়া ইব্ন আবাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র তার পিতা আব্বাদ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: সাফিয়্যা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব হাসান ইব্ন সাবিত (রা)-এর ফারি' নামক দুর্গে ছিলেন। তিনি বলেন, হাসান ইব্ন সাবিতও সেই দুর্গে আমাদের সাথে নারী ও শিশুদের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন: একবার জনৈক ইয়াহুদী আমাদের দুর্গের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। উল্লেখ্য যে, ইয়াহুদী গৌষ্ঠী বনু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ছিন্ন করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তাদের থেকে আমাদের রক্ষা করার মত কোন লোক ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তো মুসলিমদের নিয়ে শত্রুদের সামনা-সামনি ছিলেন। আমাদের কোন বিপদ ঘটলে তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে স্থান ত্যাগ করে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। আমি হাসান কে বললাম: হে হাসান! এই যে ইয়াহুদী লোকটা যাকে দেখছ আমাদের দুর্গের পাশে ঘুরঘুর করছে, আমার আশংকা হয়, সে আমাদের গুপ্ত খবর আমাদের পেছনে অবস্থানকারী ইয়াহূদীদের কাছে পাচার করবে। জানই তো রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজন নিয়ে ওদিকে ব্যস্ত আছেন। কাজেই, তুমি গিয়ে ওটাকে খতম করে এসো।
হাসান বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া! আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি তো জানেন, এটা আমার কাজ নয়।
সাফিয়্যা (রা) বলেন: তার এ উত্তর শুনে বুঝলাম, তাকে দিয়ে কিছু হবে না। অগত্যা আমি একটা খুঁটি তুলে দুর্গের বাইরে নেমে আসলাম এবং তা দিয়ে ইয়াহুদীটাকে এমন এক আঘাত করলাম, যাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। এরপর আমি দুর্গে ফিরে এসে হাসানকে বললাম, এবার আপনি গিয়ে ওর কাপড়-চোপড় যা আছে তা নিয়ে আসেন। সে পুরুষ বলে আমি এটা করতে পারছি না। কিন্তু হাসান (রা) বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া, তার মালামাল আমার কোন দরকার নেই।
📄 মু'আয়ম (রা) কর্তৃক মুশরিকদের প্রতারণা প্রসংগে
ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা যেমন বলেছেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তার সঙ্গিগণ প্রচণ্ড ত্রাসের মাঝ অবস্থান করছিলেন। উপর-নীচ সবদিক থেকে শত্রুবাহিনী তাদের ঘিরে রেখেছিল। আর তারা তাদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে রেখেছিল।
এরপর নু'আয়ম ইব্ন מסউদ ইব্ন আমির ইব্ন উনায়ফ ইব্ন সালাবা ইব্ন কুনফুয ইব্ন হিলাল ইব্ন খালাওয়া ইব্ন আশজা ইব্ন রায়ছ ইব্ন গাতফান রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি তো ইসলাম গ্রহণ করেছি, কিন্তু আমার সম্প্রদায় সেটা জানে না। আপনি আমাকে যে কোন হুকুম করতে পারেন।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি আমাদের মধ্যে একা। তুমি যদি পারো তাদের মাঝে গিয়ে পরস্পরে বিভেদ সৃষ্টি করে দাও। কেননা, যুদ্ধ মাত্রই তো প্রতারণা।
'নু'আয়ম ইবন মাসউদ বের হয়ে পড়লেন। তিনি প্রথমে বনু কুরায়যার কাছে গেলেন। ইসলামের পূর্বে তিনি তাদের একজন বন্ধু ছিলেন। তিনি তাদের বললেন: হে বনু কুরায়যা! তোমাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ও অন্তরঙ্গতা তোমাদের তো জানা আছে।
তারা বলল: তুমি সত্য বলেছ। তোমার বিরুদ্ধে আমাদের কাছে কোন অভিযোগ নেই।
তিনি বললেন: কুরায়শ ও গাতফানের অবস্থা তোমাদের মত নয়। এটা তোমাদের দেশ। এখানেই তোমাদের ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি ও অবলা নারীরা রয়েছে। তোমরা তাদের অন্যত্র সরাতে পারবে না। কুরায়ש ও গাতফানরা মুহাম্মদের বিরুদ্ধে লড়তে এসেছে। তোমরাও তাদের সহযোগিতা করছ। তাদের দেশ ধন-সম্পদ ও পরিবার-পরিজন এখানে নেই। কাজেই তাদের অবস্থা তোমাদের মত নয়। তারা সুযোগ পেলে তার সদ্ব্যবহার করবে। পক্ষান্তরে অবস্থা প্রতিকূল দাঁড়ালে তারা দেশে ফিরে যাবে এবং তোমাদেরকে তোমাদের দেশে মুহাম্মদের মুঠোর মধ্যে ছেড়ে যাবে। তাঁর সংগে বোঝাপড়া করার শক্তি একাকী তোমাদের নেই। সুতরাং আমার পরামর্শ, তাদের কতিপয় নেতৃস্থানীয় লোককে তোমাদের কাছে বন্ধক না রাখা পর্যন্ত তোমরা তাদের সাথে মিলিত হয়ে যুদ্ধ করো না। মুহাম্মদের সাথে যুদ্ধের ব্যাপারে, তাদের সাথে তোমাদের চুক্তির নিশ্চয়তা স্বরূপ, সে লোকগুলোকে তোমরা তোমাদের মাঝে যিম্মী করে রাখবে। যুদ্ধ শেষে তাদের ছেড়ে দেবে। তারা বলল: অতি উত্তম পরামর্শ।
এরপর তিনি কুরায়শদের সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তিনি আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব ও তার সাথের অন্যান্য কুরায়ש নেতৃবৃন্দকে বললেন: আপনাদের সাথে আমার বন্ধুত্ব ও মুহাম্মদের সাথে আমার সম্পর্কহীনতার কথা তো আপনাদের জানা আছে। আমার কানে একটা সংবাদ পৌছেছে, যা একজন শুভাকাংক্ষী হিসাবে আপনাদেরকে জানানো আমি কর্তব্য বলে মনে করছি। তবে আমার কথা আপনারা গোপন রাখবেন। তারা বলল অবশ্যই। তিনি বললেন: আপনারা হয়ত জানেন না মুহাম্মদের সাথে চুক্তিভংগ করে ইয়াহুদীরা এখন অনুতপ্ত। তারা এই মর্মে তাঁর কাছে লোক পাঠিয়েছে যে, আমরা আমাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত। এখন তাঁর প্রতিবিধানস্বরূপ আমরা কৌশলে কুরায়শ ও গাতফানদের বিশিষ্ট নেতাদের ধরে যদি আপনার হাতে সমর্পণ করি, তবে কি আপনি খুশি হবেন? আপনি তাদের ইচ্ছামত হত্যা করবেন। এরপর আমরা আপনার সাথে মিলে যৌথ আক্রমণ করে তাদের অবশিষ্টদের মূলোৎপাটন করব।
মুহাম্মদ (সা) তাদের এ প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেছেন। কাজেই ইয়াহুদীরা আপনাদের কতিপয় নেতাকে যিম্মী স্বরূপ রাখার জন্য আপনাদের কাছে লোক পাঠাতে পারে। সাবধান, আপনারা একটি লোককেও তাদের হাতে ছেড়ে দেবেন না।
এরপর, তিনি গাতফান গোত্রের কাছে গেলেন। তাদের বললেন হে গাতফান গোত্র। তোমরা আমার মূল, আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী এবং আমার সব চাইতে প্রিয় মানুষ। তোমরা আমাকে সন্দেহ কর এরূপ ধারণা আমার নেই। তারা বলল সত্যিই বলেছ, তুমি আমাদের কাছে সন্দেহভাজন নও। তিনি বললেন তাহলে আমার কথা গোপন রাখবে তো? তারা বলল: নিশ্চয় রাখবো। কিন্তু বিষয়টি কি? তিনি কুরায়שদের যা যা বলেছিলেন, তাদের কেউ তাই বললেন এবং তাদেরকেও কুরায়শদের মত সতর্ক করলেন।