📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আলী কর্তৃক আমর ইব্‌ন আব্দ উদ্‌দের হত্যা

📄 আলী কর্তৃক আমর ইব্‌ন আব্দ উদ্‌দের হত্যা


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলিমগণ সতর্ক পাহারায় নিযুক্ত থাকলেন।
শত্রুবাহিনীও অবরোধ চালিয়ে গেল। কিন্তু তাদের মধ্যে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হল না। তবে কুরায়শের কতিপয় অশ্বারোহী যথা-আমির ইব্‌ন দুআঈ গোত্রীয় আমর ইব্‌ন আব্দ উদ্দ ইব্‌ন আবু কায়স; ইব্‌ন হিশাম বলেন, তাকে আমর ইব্‌ন আবদ ইবন আবু কায়সও বলা হয়, ইকরামা ইব্‌ন আবু জাহল, হুবায়রা ইব্‌ন আবু ওয়াহাব মাখযুমী ও মুহাবির ইব্‌ন ফিহর গোত্রের কবি যিরার ইব্‌ন খাত্তাব ইব্‌ন মিরদাস অস্ত্র-সজ্জিত হয়ে ঘোড়ায় চড়ে বনূ কিনানার শিবিরে গিয়ে হাযির হলো এবং তাদেরকে বলল: হে বনূ কিনানা! যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। কে কেমন যোদ্ধা আজ তার পরিচয় হবে। এরপর তারা ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটল। কিন্তু পরিখা তাদের সামনে বাঁধা হয়ে দাঁড়াল। তারা পরিখা দেখে বলে উঠল: আল্লাহ্র কসম! এর আগে আরবরা কখনও এরূপ কৌশল অবলম্বন করেনি।
ইবন হিশাম বলেন: বলা হয়ে থাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে পরিখা খননের পরামর্শ দিয়েছিলেন সালমান ফারসী (রা)। জনৈক অভিজ্ঞ ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, খন্দকের যুদ্ধকালে মুহাজিরগণ দাবী করেন-সালমান আমাদের দলের। আনসারগণ বলেন আমাদের দলের। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বিবাদ নিষ্পত্তিকল্পে বললেন: বরং সালমান আমাদের আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: কাফিরদের উক্ত দলটি পরিখার একটি অপ্রশস্ত অংশে এসে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। ঘোড়াগুলো পরিখা পার হয়ে পরিখা ও সালা পর্বতের মাঝখানে একটি জলাভূমিতে এসে পড়ল।
আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) কতিপয় মুসলিমসহ তাদের মুকাবিলার উদ্দেশ্যে বের হয়ে আসলেন। শত্রুবাহিনী ফাঁক দিয়ে পরিখা পার হয়, তাঁরা সেখানে এসে তাদের রুখে দাঁড়ালেন। শত্রুরাও তাদের দিকে ধেয়ে আসল।
আমর ইব্‌ন আব্দ উদ্‌দ বদর যুদ্ধে শরীক ছিল এবং সে যুদ্ধে সে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। যে কারণে সে উহুদ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পারেনি। খন্দকের যুদ্ধে সে তার বিশেষ মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য, একটি চিহ্ন ধারণ করে এসেছিল। সে তার আশ্বারোহী দলসহ মুসলিম সৈন্যদের মুখোমুখী হয়ে প্রতিপক্ষের যে কোন একজনকে তার সাথে দ্বন্দ্বযুদ্ধের আহবান জানালো।
আলী (রা) আমরের ডাকে সাড়া দিলেন। তিনি তাকে বললেন: হে আমর! তুমি না প্রতিজ্ঞা করেছিলে কুরায়শের কোন ব্যক্তি তোমার সামনে দুটো বিকল্প প্রস্তাব করলে তুমি তার একটি অবশ্যই গ্রহণ করবে? সে বলল: হ্যাঁ করেছিলাম।
আলী (রা) বললেন: কাজেই আমি তোমাকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল এবং ইসলামের প্রতি আহবান করছি। সে বলল: আমার এর কোন প্রয়োজন নেই।
তখন আলী (রা) বললেন: তা হলে আমি তোমাকে সম্মুখ যুদ্ধের আহবান করছি।
সে বলল: কেন হে ভাতিজা? আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে হত্যা করতে আগ্রহী নই।
তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি তোমাকে হত্যা করতে চাই। একথায় আমর ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠল। সে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঘোড়াটির রগ কেটে পঙ্গু বানিয়ে দিল। এরপর মুখে একটা থাপ্পড় কষে হযরত আলী (রা)-এর দিকে এগিয়ে এলো। উভয়ের মাঝে দ্বন্দুযুদ্ধ শুরু হল। পালাক্রমে একে অপরকে আঘাত হানতে লাগল। শেষ পর্যন্ত আলী (রা) তাকে হত্যা করে ফেললেন। ফলে তাদের অশ্বারোহী দল পরাস্ত হয়ে পালালো এবং পরিখার এপার হতে বের হয়ে গেল।
ইবন ইসহাক বলেন, এ সম্পর্কেই আলী (রা) বলেছেন:
نصر الحجارة من سفاهة رأيه * و نصرت رب محمد بصوابی
* كالجذع بين دكادك وروابي * كنت المقطر بزنى اتوابى
* ونبيه يا معشر الاحزاب * فصدرت حين تركته متجدلا
وعففت عن اتوابه ولو انني
لا تحسبن الله خاذل دينه
সে নির্বুদ্ধিতার কারণে সাহায্য করল পাথরের আর আমি নিজ সুবিবেচনায় মুহাম্মদ (সা)-এর রবের (দীনের) সাহায্য করেছি।
আমি আনন্দ-ধ্বনি দেই, যখন তাকে বালু আর টিলার মাঝে সোজা শুইয়ে রাখি, কর্তিত খর্জুর বৃক্ষের মত।
আমি ওর কাপড়-চোপড় স্পর্শ করিনি, কিন্তু যদি আমি মারা পড়তাম, তবে সে ঠিকই আমার বস্ত্র খুলে নিত। তোমরা যেন ভেব না, হে সম্মিলিত বাহিনী।
আল্লাহ্ তাঁর দীন ও নবীকে অসহায় অবস্থায় ত্যাগ করবেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: অধিকাংশ কাব্য বিশারদগণ এ কবিতাটি আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা)-এর হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হাসান (রা) কর্তৃক ইকরামার নিন্দা

📄 হাসান (রা) কর্তৃক ইকরামার নিন্দা


ইবন ইসহাক বলেন: আমর নিহত হওয়ার পর ইকরামা ইব্‌ন আবু জাহল যখন পরাজিত হয়ে পালায়, তখন সে নিজ বর্শাটিও ফেলে যায়। এ সম্পর্কে হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) বলেন:
فر والقى لنا رمحه * ووليت تعدو كعدو الطليم
* ولم تلق ظهرك مستأنسا * لعلك عكرم لم تفعل
ما ان تجور عن المعدل كأن قفاك قفا فرعل
সে প্রাণ নিয়ে পালাল, আর সে আমাদের জন্য রেখে গেল নিজ বর্শাটিও। হে ইকরামা! এমন কাজ হয়ত তুমি আর কখনো করনি; তুমি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে উট পাখির মত।
তুমি সাহস নিয়ে একবারও পেছনের দিকে তাকালে না; তোমার ঘাড়টা ঠিক হায়েনার ঘাড়ের মত।
ইব্‌ন হিশাম বলেন : الفرعل অর্থ ছোট ভাল্লুক। বনু কুরায়যা ও খন্দকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবিগণের এবং বনু কুরায়যার সংকেত ছিল
حم لا ينصرون

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর শাহাদত

📄 সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর শাহাদত


ইবন ইসহাক বলেন: বনূ হারিসার আবু লায়লা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সাহল ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন সাহল আনসারী আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, আয়েশা (রা) খন্দকের যুদ্ধের সময় বনূ হারিসার দুর্গে ছিলেন। এটা ছিল মদীনার সবচাইতে সুরক্ষিত দুর্গ। সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা)-এর মাতাও এই দুর্গে তাঁর সংগে ছিলেন।
আয়েশা (রা) বলেন: তখনও আমাদের জন্য পর্দার বিধান নাযিল হয় নি। এ সময় সা'দ একটি সংকীর্ণ বর্ম পরিধান করে, যা থেকে তার বাহু ছিল, সম্পূর্ণ বাইরে, একটি বর্শা হাতে আমাদের সামনে দিয়ে দ্রুত ছুটে যাচ্ছিলেন, আর এই পংক্তি আবৃত্তি করছিলেন:
ليث قليلا يشهد الهيجا جمل * لا بأس بالموت اذا حان الاجل
ক্ষণিক দাঁড়াও, জামাল দেখুক যুদ্ধ কেমন। মৃত্যুর সময় যদি আসে, তবে তাতে ভয় কিসের?
তার মা বললেন: সত্য বটে বৎস। তবে তুমি দেরি করে ফেলেছ। আয়েশা বলেন: আমি বললাম, হে সা'দের মা। সা'দের বর্মটা একটু বড় হলে ভাল ছিল। তখন তিনি বললেন: আপনার কি আশংকা হচ্ছে যে, তাঁর অনাবৃত স্থানে তীর বিদ্ধ হতে পারে?
দেখতে না দেখতে সা'দের প্রতি একটি তীর নিক্ষিপ্ত হয় এবং তাতে তার বাহুর ধমনী ছিন্ন হয়ে যায়। আসিম ইবন উমর ইব্‌ন কাতাদা আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, তীরটি নিক্ষেপ করেছিল আমির ইব্‌ন লুআঈ গোত্রের হাব্বান ইব্‌ন কায়স ইব্‌ন আরিকা। তীর বিদ্ধ হলে সে বলেছিল: এই নাও আমার তীর, আমি আরিকার সন্তান। সা'দ (সা) তাকে বলেন:
আল্লাহ্ তা'আলা তোর চেহারা জাহান্নামে ঘর্মাক্ত করুন। হে আল্লাহ্! আপনি যদি কুরায়শদের সাথে আর কোন যুদ্ধ অবশিষ্ট রেখে থাকেন, তবে আমাকেও জীবিত রাখবেন, যারা আপনার রাসূলকে পীড়া দিয়েছে, তাকে মিথ্যাবাদী বলেছে এবং দেশ থেকে বের করে দিয়েছে, আমি তাদের সাথে যুদ্ধ করতে চাই। হে আল্লাহ্! আর যদি আপনি আমাদের ও তাদের মাঝে যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে থাকেন, তবে এ যখমকে আমার শাহাদতের অছিলা করুন। আর সেই সাথে বনু কুরায়যার ব্যাপারে আমার চোখ জুড়ানোর আগে আমার মৃত্যু দিবেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কা'ব ইব্‌ন মালিকের সূত্রে আমার কাছে এমন এক ব্যক্তি নিম্নের এ তথ্য দিয়েছেন, যার বিশ্বস্ততায় আমার কোন সন্দেহ নেই। তিনি বলেন: সা'দ (রা)-কে সেদিন তীর মেরেছিল মাখযূম গোত্রের মিত্র আবূ উসামা জুশামী। এ সম্পর্কে আবু উমামা ইকরামা ইব্‌ন আবু জাহলকে উদ্দেশ্য করে বলেছিল:
فداك بأطام المدينة خالد لها بين أثناء المرافق عائد
* * اعكرم هلا لمتنى اذ تقول لي
الست الذي الزمت سعدا مرشة
عليه مع الشمط والعذاري النواهد
عبيدة جمعا منهم اذ يكابد
وآخر مرعوب عن القصد قاصد
قضى نحبه منها سعيد فاعولت
وانت الذي دافعت عنه وقد دعا .
على حين ما هم جائز عن طريقه
হে ইকরামা! কেন তুমি আমাকে তিরস্কার করলে না, যখন আমাকে বলছিলে-মদীনার দুর্গে খালিদ হবে তোমার মুক্তিপণ?
আমিই কি সা'দকে আঘাত করিনি, ফলে, তার ধমনি কেটে ফিনকি দিয়ে অবিরাম রক্ত ঝরে।
তাতে সা'দ মারা যায়? ফলে ডাক ছেড়ে কাঁদলো কেশ পক্ক বৃদ্ধা, আর স্ফীত বক্ষবিশিষ্ট যুবতীরা।
উরায়দা যখন বিপদে পড়ে তাদের এক দলকে ডেকেছিল।
তখন তুমিই, তো তার প্রাণরক্ষা করেছিলে। আর তখন তোমাদের অবস্থা এই ছিল যে, তোমাদের কেউ পথ ভুলেছিল, কেউ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সঠিক রাস্তা ছেড়ে দিয়েছিলে।
ইন্ন হিশাম বলেন: কথিত আছে যে, সা'দের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেছিল খাফাজা ইব্‌ন আসিম ইব্‌ন হাব্বান।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খন্দকের সম্পর্কে হাসান (রা)-এর বিবরণ

📄 খন্দকের সম্পর্কে হাসান (রা)-এর বিবরণ


ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন আবাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন যুবায়র তার পিতা আব্বাদ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: সাফিয়্যা বিন্ত আবদুল মুত্তালিব হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা)-এর ফারি' নামক দুর্গে ছিলেন। তিনি বলেন, হাসান ইব্‌ন সাবিতও সেই দুর্গে আমাদের সাথে নারী ও শিশুদের পাহারায় নিযুক্ত ছিলেন। তিনি বলেন: একবার জনৈক ইয়াহুদী আমাদের দুর্গের আশেপাশে ঘুরঘুর করছিল। উল্লেখ্য যে, ইয়াহুদী গৌষ্ঠী বনু কুরায়যা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি ছিন্ন করে কাফিরদের সাথে যুদ্ধে যোগদান করেছিল। তাদের থেকে আমাদের রক্ষা করার মত কোন লোক ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তো মুসলিমদের নিয়ে শত্রুদের সামনা-সামনি ছিলেন। আমাদের কোন বিপদ ঘটলে তাঁদের পক্ষে সম্ভব ছিল না, সে স্থান ত্যাগ করে আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসা। আমি হাসান কে বললাম: হে হাসান! এই যে ইয়াহুদী লোকটা যাকে দেখছ আমাদের দুর্গের পাশে ঘুরঘুর করছে, আমার আশংকা হয়, সে আমাদের গুপ্ত খবর আমাদের পেছনে অবস্থানকারী ইয়াহূদীদের কাছে পাচার করবে। জানই তো রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকজন নিয়ে ওদিকে ব্যস্ত আছেন। কাজেই, তুমি গিয়ে ওটাকে খতম করে এসো।
হাসান বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া! আল্লাহ্ আপনাকে ক্ষমা করুন। আপনি তো জানেন, এটা আমার কাজ নয়।
সাফিয়্যা (রা) বলেন: তার এ উত্তর শুনে বুঝলাম, তাকে দিয়ে কিছু হবে না। অগত্যা আমি একটা খুঁটি তুলে দুর্গের বাইরে নেমে আসলাম এবং তা দিয়ে ইয়াহুদীটাকে এমন এক আঘাত করলাম, যাতে তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গেল। এরপর আমি দুর্গে ফিরে এসে হাসানকে বললাম, এবার আপনি গিয়ে ওর কাপড়-চোপড় যা আছে তা নিয়ে আসেন। সে পুরুষ বলে আমি এটা করতে পারছি না। কিন্তু হাসান (রা) বললেন: হে আবদুল মুত্তালিব তনয়া, তার মালামাল আমার কোন দরকার নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00