📄 কুরায়শ বাহিনীর আগমন
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরিখা খনন শেষ করতেই কুরায়শ বাহিনী এসে পড়ে। তারা জরূফ ও যুগাবার মাঝখানে রূমার স্রোত-সংযোগস্থলে শিবির স্থাপন করে। তাদের সাথে ছিল দশ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ এবং কিনানা ও তিহামা হতে যোগদানকারী সৈন্য। ওদিকে গাতফানীরা তাদের নাজদী অনুসারীদের নিয়ে উহুদের পাশে যানাবনাকমায় এসে অবস্থান নিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও সাহাবীদের নিয়ে বের হয়ে পড়লেন। তিনি সালা' পর্বতকে পেছনে রেখে শিবির স্থাপন করলেন। তাঁর সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার। তাঁর ও শত্রু সৈন্যর মাঝখানে থাকল পরিখা।
ইবন হিশাম বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় ইবন উম্মু মাকতুম (রা)-কে মদীনার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
ইন্ন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশে নারী ও শিশুদের দুর্গের ভেতর হিফাযতে রাখা হয়।
📄 হুয়াঈ ইব্ন আখতাব কর্তৃক কা'ব ইব্ন আসাদকে প্ররোচনাদান
ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্র দুশমন হুয়াঈ ইব্ন আখতাব বনূ কুরায়যার নেতা কা'ব ইব্ন আসাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেল। কা'ব ইব্ন আসাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল এবং সে তা রক্ষা করতে কৃৎসংকল্প ছিল। হুয়াঈ ইব্ন আখতাবের আগমন সংবাদ শুনেই সে তার দুর্গের ফটক বন্ধ করে দিল। হুয়াঈ ভিতরে প্রবেশের অনুমতি চাইল। কিন্তু সে দরজা খুলতে অস্বীকার করল।
হুয়াঈ চিৎকার করে বলল: হে কা'ব! তোমার কি হলো, দরজা খোল। কা'ব তাকে ধিক্কার দিয়ে বলল: হে হুয়াঈ তুমি, একটি অলক্ষুণে লোক। মুহাম্মদের সংগে আমার চুক্তি আছে। আমি তো সে চুক্তি কিছুতেই ভাঙ্গব না। আমি তাঁকে সর্বদা ওয়াদা রক্ষাকারী ও বিশ্বস্তই পেয়েছি।
হুয়াঈ তাকে ধিক্কার দিয়ে বলল: দরজা খোল না—তোমার সাথে কথা আছে। কিন্তু কা'ব বললেন: আমি কিছুতেই দরজা খোলব না।
হুয়াঈ বলল: আল্লাহ্র কসম! বুঝেছি, আমি তোমার উপাদেয় খাবারে ভাগ বসাব বলেই দরজা বন্ধ করে রেখেছ।
এতে কা'ব ক্রুদ্ধ হয়ে দরজা খুলে দিল। হুয়াঈ বলল: আশ্চর্য! আমি মহাশক্তি ও বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমার সাক্ষাৎ করতে এসেছি, আর তোমার এই আচরণ। আমি এসেছি কুরায়শদের নিয়ে তাদের নেতাদের সহ। রূমার স্রোত-সংযোগস্থলে আমি তাদের মোতায়েন করে এসেছি। আর গাতফান গোত্র তাদের নেতা ও প্রধানদের নিয়ে উহুদের দিকে যানাব নাকমায় শিবির স্থাপন করেছে। তারা আমাকে এই অঙ্গীকার দিয়েছে যে, আমরা যৌথ আক্রমণে মুহাম্মদ ও তাঁর সাথিদের সমূলে উৎখাত না করে প্রস্থান করব না।
রাবী বলেন: কা'ব বলল, আল্লাহর কসম! তুমি আমার কাছে নিয়ে এসেছ যুগ-যুগান্তের লজ্জা, আর পানিবিহীন মেঘ—যা শুধু গর্জে আর চমকায়, কিন্তু বর্ষে না মোটেই। ছিঃ ছিঃ হুয়াঈ। তুমি আমাকে এর মধ্যে টেনো না। আমি এসবে নেই। আমি মুহাম্মদ থেকে কখনও কোনরূপ বিশ্বাসঘাতকতা ও ওয়াদা খেলাফী পাইনি।
📄 কা'ব ইবন আসাদের অংগীকার ভংগ সম্পর্কে
কিন্তু হুয়াঈ তাকে অবিরাম ফুসলাতেই থাকল। অবশেষে কা'ব নরম হয়ে গেল। হুয়াঈ তাকে এই শর্তে রাযী করতে সক্ষম হল যে, কুরায়শ ও গাতফানরা যদি মুহাম্মদকে কিছু করতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়, তবে হুয়াঈ কা'বের দুর্গে প্রবেশ করবে এবং তার সাথে একই ভাগ্য বরণ নেবে। এভাবে কা'ব ইব্ন আসাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে প্রদত্ত অঙ্গীকার ভঙ্গ করল এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তার মাঝে সম্পাদিত চুক্তি ছিন্ন করে ফেলল।
যথাসময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলিমদের কাছে কা'বের বিশ্বাসঘাতকতার সংবাদ পৌঁছে গেল। তিনি ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য আওস গোত্রের নেতা সা'দ ইব্ন মু'আয ইব্ন নু'মান (রা), খাযাজ গোত্রের নেতা সা'দ ইবন উবাদা ইব্ন দুলায়ম (রা), যিনি বনূ সাঈদ, ইব্ন কা'ব ইব্ন খাযরাজের লোক ছিলেন এবং তাদের সাথে হারিস ইব্ন খাযরাজ গোত্রের আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) ও আমর ইব্ন আওফ গোত্রের খাউওয়াত ইব্ন জুবায়র (রা)-কে পাঠালেন। তিনি তাদেরকে বললেন, গিয়ে দেখ তাদের সম্পর্কে আমরা যে সংবাদ পেয়েছি, তা সত্য কি না। সত্য হলে আমাকে এমন এক সংকেতে তা জানাবে যা কেবল আমি বুঝতে পারি। সাবধান! মানুষের মনোবল নষ্ট করবে না। পক্ষান্তরে তারা যদি চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে, তবে সকলের সামনে তা প্রকাশ্যে বর্ণনা করবে।
প্রতিনিধি দল সেখানে গিয়ে দেখলেন অবস্থা তাঁরা যা শুনেছিলেন তা চেয়েও খারাপ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সম্পর্কে তারা নানরূপ কটুক্তি পর্যন্ত করে থাকে। তারা অবজ্ঞাভরে বলে: রাসূল আবার কে? মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি বা অঙ্গীকার নেই।
সা'দ ইব্ন মু'আয ছিলেন রাগী মানুষ! তিনি তাদেরকে গালমন্দ করলেন। প্রতিউত্তরে তারাও গালাগালি করল। সা'দ ইবন উবাদা (রা) তাঁকে এই বলে নিরস্ত করলেন, রেখে দাও। ওদের গালাগালি করে কাজ নেই। তাদের ও আমাদের মাঝে যা পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তা আরও গুরুতর। গালাগালিতে শোধ হবে না।
দুই সা'দ ও তাঁদের সঙ্গিগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ফিরে এসে তাঁকে সালাম দিয়ে বললেন: আদাল ও কারা অর্থাৎ আদাল ও কারা গোত্র-রাজী'তে যেমন খুবায়ব ও তাঁর সাথীদের সাথে বেঈমানী করেছিল, এরাও তেমনি বেঈমানী করেছে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহু আকবার। হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমাদের জন্য খোশখবর।
এ সময় পরিস্থিতি সঙ্গীন হয়ে দাঁড়াল। চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। উপরে নীচ সব দিক হতে শত্রুরা তাঁদেরকে ঘিরে ফেলল। বিশ্বাসীদের মনে নানা রকম ধারণার সৃষ্টি হতে লাগল। মুনাফিকদের কপটতা প্রকাশ হয়ে যেতে লাগল। এমন কি বনু আমর ইব্ন আওফ-এর মুআত্তাব ইব্ন কুশায়র তো বলেই ফেলল যে, মুহাম্মদ স্বপ্ন দেখাত আমরা কায়সার ও কিসরার ধনরাশি ভোগ করব; কিন্তু এখন আমরা নির্ভয়ে মল ত্যাগ করতেও যেতে পারি না।
ইবন হিশাম বলেন: আমি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি মুআত্তাব ইব্ন কুশায়র মুনাফিক ছিলেন না, বরং তিনি বদর যুদ্ধে শরীক একজন নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন।
ইব্ন ইসহাক বলেন: হারিসা ইব্ন হারিস গোত্রের আওস ইব্ন কায়যী তাঁর গোত্রের একটি বড়সড় সমাবেশে বলে উঠলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা)! আমাদের ঘর-বাড়ি অরক্ষিত এবং শত্রুর মুখে। আপনি অনুমতি দিন আমরা বাড়ি চলে যাই। কারণ আমাদের বাড়ি মদীনার বাইরে।
📄 গাতফান গোত্রের সাথে সন্ধির চেষ্টা
রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুশরিকরা বিশ দিনেরও কিছু বেশীকাল-প্রায় একমাস যাবত নিজ নিজ অবস্থানে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান করলেন। অবরোধ, প্রস্তর নিক্ষেপ ও তীর চালনা ব্যতীত বিশেষ কোন যুদ্ধ হল না।
ইবন ইসহাক বলেন: ইবন উমর ইব্ন কাতাদা এবং অনুরূপ আরও এক ব্যক্তি, যার বিশ্বস্ততায় আমার কোন সন্দেহ নেই, এঁরা মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম ইবন উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন শিহাব যুহরী (র)-এর সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, যখন মুসলিম বাহিনী সঙ্গীন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলো, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) গাতফান গোত্রের দুই নেতা উয়ায়না ইব্ন হিস্স ইন্ন হুযায়ফা ইব্ন বদর ও হারিস ইব্ন আওফ ইব্ন আবু হারিছা মুরীর কাছে এই প্রস্তাব দিয়ে লোক পাঠালেন যে, তারা তাদের লোকজন নিয়ে ফিরে গেলে তাদেরকে মদীনায় উৎপন্ন খেজুরের এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করা হবে। সেমতে উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির আলোচনা চলল। এমন কি সন্ধিপত্র লেখাও হয়ে গেল। কেবল সাক্ষ্য ও সীল-দস্তখতই যা বাকি। আর সবই সমাপ্ত। বাকি কাজ চূড়ান্ত করার আগে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সা'দ ইব্ন মু'আয ও সা'দ ইব্ন উবাদার (রা)-এর কাছে তাদের মতামত চেয়ে পাঠালেন।
দুই সা'দ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এটা কি আপনার নিজের ইচ্ছা, না আল্লাহ্ নির্দেশ-যা আমাদের জন্য শিরোধার্য, না আমাদের দিকে তাকিয়ে আপনি এটা করছেন?
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: বরং তোমাদের দিকে তাকিয়েই আমি এটা করতে চাচ্ছি। আমি দেখলাম, আরবগণ সম্মিলিতভাবে একই ধনুক হতে তোমাদের উপর তীর বর্ষণ করেছে। তারা তোমাদেরকে চতুর্দিক হতে বেষ্টন করে রেখেছে। আমি যে-কোন উপায়ে তোমাদের প্রতি তাদের শক্তিমত্ততা ভেঙ্গে দিতে চাই।
সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) উঠে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা এবং ওরা ছিলাম এমন জাতি যারা আল্লাহ্র শরীক স্থির করতাম, দেব-দেবীর পূজা করতাম। আমরা আল্লাহকে চিনতাম না। তাঁর ইবাদত করতাম না। কিন্তু সেই সময়েও আতিথেয়তা কিংবা ক্রয়-সূত্র ছাড়া ওরা আমাদের একটি খেজুরের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে সাহস পেত না। আর আজ যখন আল্লাহ্ তা'আলা আমাদেরকে ইসলাম দ্বারা সম্মানিত করেছেন, আমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন এবং ইসলাম ও আপনার দ্বারা আমাদের শক্তিবৃদ্ধি করেছেন, তখন আমরা ওদেরকে কর দেব? আল্লাহর কসম, এরূপ সন্ধির আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। তাদেরকে আমরা তরবারি ছাড়া কিছুই দেব না। এভাবে আমরা, তাদের ও আমাদের মাঝে, আল্লাহর ফয়সালারই অপেক্ষা করব।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: ঠিক আছে তোমার কথাই থাকল। তখন সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) চুক্তি পত্রটি হাতে নিয়ে তার লেখা মুছে ফেললেন। তারপর বললেন তারা আমাদের বিরুদ্ধে যা পারে করুক।