📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পরিখা খনন

📄 পরিখা খনন


কাফিরদের দুরভিসন্ধি ও তদুদ্দেশ্যে তাদের সম্মিলিত আগমনের বার্তা যথাসময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানে পৌঁছল। তিনি তাদের প্রতিরোধকল্পে মদীনার চতুর্পার্শ্বে পরিখা খনন করলেন। আখিরাতের প্রতিদানের প্রতি মুসলিমদের উৎসাহ বর্ধনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজেও খনন কার্যে শরীক থাকলেন। মুসলিমগণ তাঁর সংগে পূর্ণোদ্দমে খননকার্য চালিয়ে গেলেন। তিনি নিজে যেমন তেমনি সাহাবিগণও এতে কঠোর পরিশ্রম করলেন। তবে কতিপয় মুনাফিক এতে গড়িমসি করল। তারা ছোট ছোট কাজের অজুহাতে গা ঢাকা দিতে লাগল, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে না জানিয়ে ও তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে তারা ফাঁকি দিয়ে পরিবারবর্গের কাছে চলে যেতে লাগল। অপরপক্ষে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের মধ্যে কারও কোন জরুরী কাজ দেখা দিলে, তিনি তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোচরীভূত করতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সে প্রয়োজন সেরে আসার অনুমতি দিতেন। এরপর তিনি প্রয়োজন সেরে পুনরায় নিজ কাজে যোগদান করতেন। বস্তুত আখিরাতের সওয়াব ও প্রতিদানই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পরিখা খননকারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত

📄 পরিখা খননকারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত


এরূপ নিষ্ঠাবান মু'মিনদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَاذِنُونَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَاذِنُونَكَ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ ، فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضٍ شَأْنِهِمْ فَأَذَنْ لِمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
তারাই মু'মিন, যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্ঠিগত ব্যাপারে একত্র হলে তারা তার অনুমতি ছাড়া সরে পড়ে না। যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী। অতএব, তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য তোমার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা কর তুমি অনুমতি দিও এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (২৪: ৬২)।
এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল সেইসব মুসলিমদের সম্পর্কে, যারা ছিল আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুগত এবং আখিরাতের সওয়াব ও কল্যাণই ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা আনুগত্যহীন মুনাফিক, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুমতি ব্যতিরেকেই কাজ ছেড়ে চলে যেত, তাদের সম্পর্কে বলেন:
لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না। তোমাদের মধ্যে যারা চুপি-চুপি সরে পড়ে, আল্লাহ্ তাদেরকে জানেন। সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হউক যে, তাদের উপর আপতিত হবে বিপর্যয় অথবা তাদের উপর আপতিত হবে কঠিন শাস্তি (২৪: ৬৩)।
ইবন হিশাম বলেন, اللاذ অর্থ পলায়নকালে কোন বস্তু দ্বারা নিজেকে আবৃত করা। হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) বলেন:
وقريش تفر منا لواذا * ان يقيموا وخفت منها الحلوم
কুরায়শরা আমাদের থেকে গা ঢাকা দিয়ে পালায়। তাদের আর অবস্থানের সাহস নেই। তাদের বুদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।
এটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। ইবন হিশাম বলেন: আমি কাসীদাটি উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কিত কবিতার মাঝে উল্লেখ করেছি।
أَلَا إِنَّ لِله مَا فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ قَدْ يَعْلَمُ مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ
জেনে রাখ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা আল্লাহরই। তোমরা যাতে ব্যাপৃত তা তিনি জানেন (২৪: ৬৪)।
ইবন ইসহাক বলেন : ما انتم عليه তোমরা যাতে ব্যাপৃত) অর্থাৎ তা সততা, না কি কপটতা।
وَيَوْمَ يُرْجَعُونَ إِلَيْهِ فَيُنَبِّهُمْ بِمَا عَمِلُوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করত। আল্লাহ্ সর্ববিষিয়ে সর্বজ্ঞ (২৪: ৬৪)।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খনন কার্যের সময় মুসলিম মুজাহিদগণ যে, কবিতা আবৃত্তি করেন

📄 খনন কার্যের সময় মুসলিম মুজাহিদগণ যে, কবিতা আবৃত্তি করেন


ইবন ইসহাক বলেন, বহু পরিশ্রমের পর মুসলিমগণ পরিখা খনন শেষ করলেন। জুআয়ল নামক একজন মুসলিমকে নিয়ে সেদিন তাঁরা সমবেত কণ্ঠে রণোদ্দীপক কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুআয়লের নাম পরিবর্তন করে আমর রেখেছিলেন। তাঁকে নিয়ে যে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তা এরূপ:
سماه من بعد جعيل عمرا * وكان للبائس يوما ظهرا .
রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুআয়লের নাম পাল্টিয়ে 'আমর' রাখেন। সেদিন তিনি দুর্বলদের জন্য শক্তিতে পরিণত হন।
যখন সাহাবীরা 'আমরান' বলতেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁদের সংগে 'আমরান' বলতেন, আর যখন তারা 'যাহরান' বলতেন তখন তিনিও যাহরান বলতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পরিখা খননের সময় মুজিযার প্রকাশ

📄 পরিখা খননের সময় মুজিযার প্রকাশ


ইবন ইসহাক বলেন: পরিখা খনন সম্বন্ধে আমি বহু ঘটনা শুনেছি, যা আল্লাহ্ তা'আলার পক্ষ হতে তাঁর রাসূলের সমর্থন ও তাঁর নবুওয়াতের প্রত্যয়নকল্পে সংঘটিত হয়েছিল। সে সব ঘটনা মুসলিমগণ স্বচক্ষে দেখেছিলেন।
জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ (রা) বর্ণনা করতেন: একটা বৃহদাকার শক্ত পাথর তাদের পরিখা খননে সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। তাঁরা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অবহিত করেন। তখন তিনি একটি পাত্রে পানি আনতে বললেন। পানি আনা হলে তিনি তাতে থুথু ফেলে আল্লাহ্র ইচ্ছামত দু'আ করলেন। তারপর উক্ত পাথরে সে পানি ঢেলে দিলেন। সেখানে উপস্থিত লোকেরা বলেন: আল্লাহ্র কসম! যিনি তাঁকে সত্য নবী করে পাঠিয়েছেন, পানি ঢালা মাত্র। পাথরটা নরম বালুর স্তূপে পরিণত হয়ে গেল। কোদাল বা কুড়াল তাতে সহজে বসে যেত।
ইবন ইসহাক বলেন: সাঈদ ইব্‌ন মীনা আমার কাছে বর্ণনা করেন, বাশীর ইবন সা'দের এক কন্যা, তথা প্রখ্যাত সাহাবী নু'মান ইব্‌ন বাশীর (রা)-এর বোন বলেন, আমার মা আমরাহ বিন্ত রাওয়াহা আমাকে ডেকে আমার কাপড়ে এক মুষ্ঠি খেজুর ঢেলে দিলেন। তারপর বললেন: হে আমার প্রিয় কন্যা, তুমি এগুলো তোমার পিতা এবং তোমার মামা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহার কাছে নিয়ে যাও। তারা দুপুরের আহার করবে। আমি সেগুলো নিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমি তাঁদের খোঁজাখুঁজি করছি, এমন সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে আমার দেখা হলো। তিনি বললেন: খুকি! এই দিকে এসো! তোমার কাছে ওগুলো কি? আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এগুলো খেজুর। আমার মা এগুলো আমার পিতা বাশীর ইবন সা'দ ও মামা আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রাওয়াহার কাছে পৌঁছানোর জন্য আমাকে পাঠিয়েছেন। তারা এ দিয়ে দুপুরের আহার করবেন। তিনি বললেন: আমার কাছে নিয়ে এসো। তখন আমি সেগুলো তাঁর দু'হাতে তুলে দিলাম। কিন্তু তা পরিমাণে এতই কম ছিল যে, তাঁর হাত ভরেনি।
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) একটি কাপড় বিছাতে বললেন। তা বিছান হলো। তিনি খেজুরগুলো সে কাপড়ের উপর রেখে ছড়িয়ে দিলেন। তারপর পার্শ্বে উপস্থিত একজনকে বললেন: পরিখা খননকারীদের সকলকে ডাক, তারা দুপুরের আহার সেরে যাক। কিছুক্ষণের মধ্যে সকলে উপস্থিত হয়ে হয়ে গেলেন এবং সে খেজুর খাওয়া শুরু করলেন। কিন্তু আশ্চর্য তাঁরা যতই খান, খেজুর ততই বাড়তে থাকে। অবশেষে পরিখা খননকারিগণ যখন পেট পুরে খেয়ে উঠলেন, তখনও কাপড়ের চারপাশ থেকে খেজুর উপছে পড়ছিল'।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে সাঈদ ইব্‌ন্ন মীনা জারির ইন্ন আবদুল্লাহ্ (রা)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সংগে পরিখা খননে শরীক ছিলাম। আমার একটি ছোট ছাগল ছিল তেমন মোটাতাজাও নয়। মনে মনে বললাম: এ ছাগল দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য আহারের ব্যবস্থা করলে ভাল ছিল। আমি আমার স্ত্রীকে আয়োজন করতে বললাম। সে কিছু যব পিষে তা দিয়ে কিছু রুটি তৈরি করল এবং আমি সে ছাগলটি যবাই করলাম। আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য ছাগলটি ভুনা করলাম। খননকার্যে আমাদের নিয়ম ছিল, দিনভর কাজ করতাম এবং সন্ধ্যা হলে বাড়ি ফিরে আসতাম। সেদিন সন্ধ্যাবেলা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) পরিখাস্থল হতে প্রস্থান করতে যাচ্ছিলেন, তখন আমি বললাম: ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)! আমার একটি ছোট ছাগল ছিল, সেটি আপনার জন্য ভুনা করেছি, আর কিছু যবের রুটি তৈরী করেছি। আশা করি আপনি আমার সংগে আমার বাড়ি যাবেন। জাবির (রা) বলেন: আমার ইচ্ছা ছিল নবী (সা) একাই আসুন। কিন্তু আমি একথা বলা মাত্রই তিনি বললেন: অবশ্যই। তারপর একজনকে নির্দেশ দিলেন, সকলকে ডাক দিয়ে বল, তোমরা আল্লাহর রাসূলের সংগে জাবির ইবন আবদুল্লাহর বাড়িতে দাওয়াত খেতে চল। আমি 'ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজিউন' পড়লাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সকলকে নিয়ে আমার বাড়ি আসলেন। তাঁরা এসে বসার পর আমরা উক্ত খাদ্য-দ্রব্য তাঁর সামনে বের করলাম। তিনি বিস্‌মিল্লাহ্ বলে খাওয়া শুরু করলেন। স্থান সংকুলান হচ্ছিল না বিধায় পালাক্রমে এক একদল এসে খেয়ে যাচ্ছিল। এভাবে পরিখা খননকারীদের সকলেই সে খাবার তৃপ্তি সহকারে খেলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমি শুনেছি সালমান ফারসী (সা) বলেছেন, আমি পরিখার এক প্রান্তে খননকার্যে লিপ্ত ছিলাম। সহসা একটি কঠিন পাথর আমার সামনে পড়লো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার কাছেই ছিলেন। তিনি দেখলেন, আমি বারবার কোদাল মারছি, কিন্তু পাথরটির কোন কিনারা করতে পারছি না। তিনি এসে আমার হাত থেকে কোদাল নিলেন এবং পাথরটির উপর সজোরে আঘাত করলেন। ফলে পাথর থেকে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বের হলো। আমি বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনার উপর আমার পিতামাতা কুরবান হোক, বলুন তো আপনি আঘাত করার সময় প্রতিবারই যে আগুনের ফুলকি ছোটে এর কারণ কি? তিনি বললেন: তুমি কি এটা দেখেছ, হে'সালমান? আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি দেখেছি।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: প্রথম চমকে আল্লাহ্ তা'আলা আমার জন্য ইয়ামান বিজয়ের ইংগিত প্রদান করেন। দ্বিতীয় চমকে শাম ও পশ্চিম দেশ এবং তৃতীয়টি দ্বারা পূর্বদেশ বিজয়ের ইংগিত দেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আবূ হুরায়রা (রা)-এর সূত্রে এমন এক ব্যক্তি, যার বিশ্বস্ততায় আমার কোন সন্দেহ নেই, আমার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, উমর (রা), উসমান (রা) ও পরবর্তী খলীফার যুগে যখন এসব দেশ বিজিত হয়, তখন আবু হুরায়রা (রা) বলতেন: তোমরা যা ইচ্ছা জয় করতে থাক। আল্লাহ্র কসম, যাঁর হাতে আবু হুরায়রার প্রাণ, তোমরা যেসব দেশ জয় করেছ এবং কিয়ামত পর্যন্ত আরও যা জয় করবে, তার চাবি আল্লাহ্ তা'আলা পূর্বেই মুহাম্মদ (সা)-এর হাতে অর্পণ করেছেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00