📄 সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধযাত্রা
ইবন ইসহাক বলেন: সম্মিলিত বাহিনী যুদ্ধে রওনা হল। কুরায়শদের নেতৃত্বে ছিল আবূ সুফিয়ান ইবন হাব। বনু গাতফানের শাখা ফাযারা গোত্রের নেতা ছিল উয়ায়না ইবন হিস্ন ইব্ন হুযায়ফা ইন্ন বদর; বনূ মুরা শাখার নেতা ছিল হারিস ইব্ন আওফ ইব্ন আবু হারিসা মুত্রী এবং বনূ আশজরা শাখা হতে যোগদানকারী সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিল মিসআর ইব্ন রুখায়লা ইবন নুওয়ায়রা ইব্ন তারীফ ইব্ন সুহমা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন হিলাল ইব্ন খালাওয়া ইব্ন আলজা ইবন রাব্ছ ইব্ন গাতফান।
📄 পরিখা খনন
কাফিরদের দুরভিসন্ধি ও তদুদ্দেশ্যে তাদের সম্মিলিত আগমনের বার্তা যথাসময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানে পৌঁছল। তিনি তাদের প্রতিরোধকল্পে মদীনার চতুর্পার্শ্বে পরিখা খনন করলেন। আখিরাতের প্রতিদানের প্রতি মুসলিমদের উৎসাহ বর্ধনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজেও খনন কার্যে শরীক থাকলেন। মুসলিমগণ তাঁর সংগে পূর্ণোদ্দমে খননকার্য চালিয়ে গেলেন। তিনি নিজে যেমন তেমনি সাহাবিগণও এতে কঠোর পরিশ্রম করলেন। তবে কতিপয় মুনাফিক এতে গড়িমসি করল। তারা ছোট ছোট কাজের অজুহাতে গা ঢাকা দিতে লাগল, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে না জানিয়ে ও তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে তারা ফাঁকি দিয়ে পরিবারবর্গের কাছে চলে যেতে লাগল। অপরপক্ষে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের মধ্যে কারও কোন জরুরী কাজ দেখা দিলে, তিনি তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোচরীভূত করতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সে প্রয়োজন সেরে আসার অনুমতি দিতেন। এরপর তিনি প্রয়োজন সেরে পুনরায় নিজ কাজে যোগদান করতেন। বস্তুত আখিরাতের সওয়াব ও প্রতিদানই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
📄 পরিখা খননকারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত
এরূপ নিষ্ঠাবান মু'মিনদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَاذِنُونَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَاذِنُونَكَ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ ، فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضٍ شَأْنِهِمْ فَأَذَنْ لِمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
তারাই মু'মিন, যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্ঠিগত ব্যাপারে একত্র হলে তারা তার অনুমতি ছাড়া সরে পড়ে না। যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী। অতএব, তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য তোমার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা কর তুমি অনুমতি দিও এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (২৪: ৬২)।
এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল সেইসব মুসলিমদের সম্পর্কে, যারা ছিল আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুগত এবং আখিরাতের সওয়াব ও কল্যাণই ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা আনুগত্যহীন মুনাফিক, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুমতি ব্যতিরেকেই কাজ ছেড়ে চলে যেত, তাদের সম্পর্কে বলেন:
لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না। তোমাদের মধ্যে যারা চুপি-চুপি সরে পড়ে, আল্লাহ্ তাদেরকে জানেন। সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হউক যে, তাদের উপর আপতিত হবে বিপর্যয় অথবা তাদের উপর আপতিত হবে কঠিন শাস্তি (২৪: ৬৩)।
ইবন হিশাম বলেন, اللاذ অর্থ পলায়নকালে কোন বস্তু দ্বারা নিজেকে আবৃত করা। হাসান ইব্ন সাবিত (রা) বলেন:
وقريش تفر منا لواذا * ان يقيموا وخفت منها الحلوم
কুরায়শরা আমাদের থেকে গা ঢাকা দিয়ে পালায়। তাদের আর অবস্থানের সাহস নেই। তাদের বুদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।
এটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। ইবন হিশাম বলেন: আমি কাসীদাটি উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কিত কবিতার মাঝে উল্লেখ করেছি।
أَلَا إِنَّ لِله مَا فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ قَدْ يَعْلَمُ مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ
জেনে রাখ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা আল্লাহরই। তোমরা যাতে ব্যাপৃত তা তিনি জানেন (২৪: ৬৪)।
ইবন ইসহাক বলেন : ما انتم عليه তোমরা যাতে ব্যাপৃত) অর্থাৎ তা সততা, না কি কপটতা।
وَيَوْمَ يُرْجَعُونَ إِلَيْهِ فَيُنَبِّهُمْ بِمَا عَمِلُوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করত। আল্লাহ্ সর্ববিষিয়ে সর্বজ্ঞ (২৪: ৬৪)।
📄 খনন কার্যের সময় মুসলিম মুজাহিদগণ যে, কবিতা আবৃত্তি করেন
ইবন ইসহাক বলেন, বহু পরিশ্রমের পর মুসলিমগণ পরিখা খনন শেষ করলেন। জুআয়ল নামক একজন মুসলিমকে নিয়ে সেদিন তাঁরা সমবেত কণ্ঠে রণোদ্দীপক কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুআয়লের নাম পরিবর্তন করে আমর রেখেছিলেন। তাঁকে নিয়ে যে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন, তা এরূপ:
سماه من بعد جعيل عمرا * وكان للبائس يوما ظهرا .
রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুআয়লের নাম পাল্টিয়ে 'আমর' রাখেন। সেদিন তিনি দুর্বলদের জন্য শক্তিতে পরিণত হন।
যখন সাহাবীরা 'আমরান' বলতেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁদের সংগে 'আমরান' বলতেন, আর যখন তারা 'যাহরান' বলতেন তখন তিনিও যাহরান বলতেন।