📄 ইয়াহুদী কর্তৃক বিভিন্ন দলকে সুসংগঠিত করা
আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যুবায়র ইবন উরওয়া ইন্ন যুবায়র পরিবারের আযাদকৃত গোলাম ইয়াযীদ ইব্ন রূমান এবং এমন এক ব্যক্তি যার বিশ্বস্ততায় আমি সন্দেহ পোষণ করি না, তারা বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব ইবন মালিক, মুহাম্মদ ইব্ন কা'ব কুরাজী, যুহরী, আসিম ইবন উমর ইব্ন কাতাদা ও আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর প্রমুখ উলামা থেকে। তাঁদের সকলের বর্ণনাই খন্দক যুদ্ধ সম্পর্কে। তবে তাঁরা খন্দক যুদ্ধের ঘটনা এক একজন, এক এক অংশ বর্ণনা করেছেন।
তাঁরা বলেন: খন্দক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট ছিল নিম্নরূপ; বনূ নাযীর ও বনূ ওয়াইলের কতিপয় লোক, যথা সালাম ইব্ন আবুল হুকায়ক নাযারী, হুয়ারী ইব্ন আখতার নাযারী, কিননা ইন্ন আবুল হুকায়ক নাযারী, হাওয়া ইব্ন কায়স ওয়াইলী, আবু আম্মার ওয়াইলী প্রমুখ ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দলকে সংঘবদ্ধ করে। তারা মক্কায় গিয়ে কুরায়শদের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্ররোচিত করে।
আর তারা বলে: আমরা মুহাম্মদ (সা)-এর বিরুদ্ধে তোমাদের সক্রিয় সহযোগিতা করব এবং সবাই মিলে তাঁকে সমূলে উৎখাত করব।
কুরায়শরা তাদের বললেন: হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! তোমরা হলে প্রথম কিতাবধারী। মুহাম্মদের সাথে আমাদের বিবাদের কি কারণ, তা তোমাদের জানা আছে। আচ্ছা বল তো, আমাদের ধর্ম উত্তম, না তাঁর ধর্ম?
তারা বললেন: বরং তোমাদের ধর্মই তাঁর ধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট এবং তাঁর মুকাবিলায় তোমরাই সঠিক পথে আছ।
এদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِّنَ الكتب يُؤْمِنُونَ بِالجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلا . أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ وَمَنْ يُلْعَنِ اللَّهُ فَلَنْ تَجِدَ لَهُ نَصِيرًا . أَمْ لَهُمْ نَصِيبٌ مِّنَ الْمُلْكِ فَإِذَا لَا يُؤْتُونَ النَّاسَ نَقِيرًا . أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا أَنْهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ فَقَدْ أَتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الكتب وَالْحِكْمَةَ وَأَتَيْنُهُمْ مُلكًا عَظِيمًا ، فَمِنْهُمْ مِّنْ أَمَنَ بِهِ ۚ وَمِنْهُمْ مِّنْ صَدَّ عَنْهُ وَكَفَى بِجَهَنَّمَ سَعِيرًا .
অর্থ; তুমি কি তাদেরকে দেখনি যাদেরকে কিতাবের এক অংশ দেওয়া হয়েছিল, তারা 'জিব্ত' ও তাগূতে' বিশ্বাস করে? তারা কাফিরদের সম্বন্ধে বলে, এদেরই পথ মু'মিনদের অপেক্ষা প্রকৃষ্টতর। এরাই তারা যাদেরকে আল্লাহ্ লানত করেছেন এবং আল্লাহ্ যাকে লানত করেন, তুমি কখনও তার কোন সাহায্যকারী পাবে না। তবে কি রাজত্বে তাদের কোন অংশ আছে? সে ক্ষেত্রেও তো তারা কাউকে এক কপর্দকও দেবে না। অথবা আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদেরকে ঈর্ষা করে? ইবরাহীমের বংশধরকেও তো কিতাব ও হিকমত প্রদান করেছিলাম এবং তাদেরকে বিশাল রাজ্য দান করেছিলাম। অতঃপর তাদের কতক তাতে বিশ্বাস করেছিল এবং কতক তা হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। দগ্ধ করার জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট (৪: ৫১-৫৫)।
তাদের মন্তব্য শুনে কুরায়শরা ভীষণ খুশি হল। ফলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ প্রস্তাবও তারা সানন্দে গ্রহণ করল এবং এতে সকলে একমত হয়ে প্রস্তুতি গ্রহণও শুরু করে দিল।
এরপর এ ইয়াহুদী প্রতিনিধি দলটি কায়স আয়লানের শাখা গাতফান গোত্রের কাছে গেল এবং তাদেরকেও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আহবান জানাল। আরও জানালো যে, এ ব্যাপারে তারা তাদের সহযোগিতা করবে এবং কুরায়শদের কাছে এ প্রস্তাব দিলে তারা তা সানন্দে গ্রহণ করে নিয়ে তজ্জন্য প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছে। ফলে গাতফান গোত্রও তাদের সাথে যোগ দিল。
টিকাঃ
১. জিব্ত হলো প্রতিমার নাম এবং আল্লাহ্ ব্যতীত সকল পূজিত সত্তা।
২. তাগুতের অর্থ সীমালংঘনকারী, বিভ্রান্তকারী। শয়তান, কল্পিত দেব-দেবী এবং যাবতীয় বিভ্রান্তিকর উপায় উপকরণ তাগুতের অন্তর্ভুক্ত।
📄 সম্মিলিত বাহিনীর যুদ্ধযাত্রা
ইবন ইসহাক বলেন: সম্মিলিত বাহিনী যুদ্ধে রওনা হল। কুরায়শদের নেতৃত্বে ছিল আবূ সুফিয়ান ইবন হাব। বনু গাতফানের শাখা ফাযারা গোত্রের নেতা ছিল উয়ায়না ইবন হিস্ন ইব্ন হুযায়ফা ইন্ন বদর; বনূ মুরা শাখার নেতা ছিল হারিস ইব্ন আওফ ইব্ন আবু হারিসা মুত্রী এবং বনূ আশজরা শাখা হতে যোগদানকারী সৈন্যদের নেতৃত্বে ছিল মিসআর ইব্ন রুখায়লা ইবন নুওয়ায়রা ইব্ন তারীফ ইব্ন সুহমা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন হিলাল ইব্ন খালাওয়া ইব্ন আলজা ইবন রাব্ছ ইব্ন গাতফান।
📄 পরিখা খনন
কাফিরদের দুরভিসন্ধি ও তদুদ্দেশ্যে তাদের সম্মিলিত আগমনের বার্তা যথাসময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কানে পৌঁছল। তিনি তাদের প্রতিরোধকল্পে মদীনার চতুর্পার্শ্বে পরিখা খনন করলেন। আখিরাতের প্রতিদানের প্রতি মুসলিমদের উৎসাহ বর্ধনের উদ্দেশ্যে তিনি নিজেও খনন কার্যে শরীক থাকলেন। মুসলিমগণ তাঁর সংগে পূর্ণোদ্দমে খননকার্য চালিয়ে গেলেন। তিনি নিজে যেমন তেমনি সাহাবিগণও এতে কঠোর পরিশ্রম করলেন। তবে কতিপয় মুনাফিক এতে গড়িমসি করল। তারা ছোট ছোট কাজের অজুহাতে গা ঢাকা দিতে লাগল, এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে না জানিয়ে ও তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে তারা ফাঁকি দিয়ে পরিবারবর্গের কাছে চলে যেতে লাগল। অপরপক্ষে নিষ্ঠাবান মুসলিমদের মধ্যে কারও কোন জরুরী কাজ দেখা দিলে, তিনি তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর গোচরীভূত করতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে সে প্রয়োজন সেরে আসার অনুমতি দিতেন। এরপর তিনি প্রয়োজন সেরে পুনরায় নিজ কাজে যোগদান করতেন। বস্তুত আখিরাতের সওয়াব ও প্রতিদানই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য।
📄 পরিখা খননকারীদের সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত
এরূপ নিষ্ঠাবান মু'মিনদের সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِذَا كَانُوا مَعَهُ عَلَى أَمْرٍ جَامِعٍ لَمْ يَذْهَبُوا حَتَّى يَسْتَاذِنُونَهُ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَاذِنُونَكَ أُولَئِكَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَرَسُولِهِ ، فَإِذَا اسْتَأْذَنُوكَ لِبَعْضٍ شَأْنِهِمْ فَأَذَنْ لِمَنْ شِئْتَ مِنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمُ اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ -
তারাই মু'মিন, যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং রাসূলের সঙ্গে সমষ্ঠিগত ব্যাপারে একত্র হলে তারা তার অনুমতি ছাড়া সরে পড়ে না। যারা তোমার অনুমতি প্রার্থনা করে, তারাই আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলে বিশ্বাসী। অতএব, তারা তাদের কোন কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য তোমার অনুমতি চাইলে তাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা কর তুমি অনুমতি দিও এবং তাদের জন্য আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু (২৪: ৬২)।
এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছিল সেইসব মুসলিমদের সম্পর্কে, যারা ছিল আল্লাহ্ ও রাসূলের অনুগত এবং আখিরাতের সওয়াব ও কল্যাণই ছিল তাদের লক্ষ্যবস্তু।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা আনুগত্যহীন মুনাফিক, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অনুমতি ব্যতিরেকেই কাজ ছেড়ে চলে যেত, তাদের সম্পর্কে বলেন:
لا تَجْعَلُوا دُعَاءَ الرَّسُولِ بَيْنَكُمْ كَدُعَاءِ بَعْضِكُمْ بَعْضًا قَدْ يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ يَتَسَلَّلُونَ مِنْكُمْ لِوَاذًا فَلْيَحْذَرِ الَّذِينَ يُخَالِفُونَ عَنْ أَمْرِهِ أَنْ تُصِيبَهُمْ فِتْنَةٌ أَوْ يُصِيبَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ -
রাসূলের আহবানকে তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি আহবানের মত গণ্য করো না। তোমাদের মধ্যে যারা চুপি-চুপি সরে পড়ে, আল্লাহ্ তাদেরকে জানেন। সুতরাং যারা তাঁর আদেশের বিরুদ্ধাচরণ করে, তারা সতর্ক হউক যে, তাদের উপর আপতিত হবে বিপর্যয় অথবা তাদের উপর আপতিত হবে কঠিন শাস্তি (২৪: ৬৩)।
ইবন হিশাম বলেন, اللاذ অর্থ পলায়নকালে কোন বস্তু দ্বারা নিজেকে আবৃত করা। হাসান ইব্ন সাবিত (রা) বলেন:
وقريش تفر منا لواذا * ان يقيموا وخفت منها الحلوم
কুরায়শরা আমাদের থেকে গা ঢাকা দিয়ে পালায়। তাদের আর অবস্থানের সাহস নেই। তাদের বুদ্ধি হ্রাস পেয়েছে।
এটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। ইবন হিশাম বলেন: আমি কাসীদাটি উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কিত কবিতার মাঝে উল্লেখ করেছি।
أَلَا إِنَّ لِله مَا فِي السَّمَوتِ وَالْأَرْضِ قَدْ يَعْلَمُ مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ
জেনে রাখ, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তা আল্লাহরই। তোমরা যাতে ব্যাপৃত তা তিনি জানেন (২৪: ৬৪)।
ইবন ইসহাক বলেন : ما انتم عليه তোমরা যাতে ব্যাপৃত) অর্থাৎ তা সততা, না কি কপটতা।
وَيَوْمَ يُرْجَعُونَ إِلَيْهِ فَيُنَبِّهُمْ بِمَا عَمِلُوا وَاللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ
যেদিন তারা তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে, সেদিন তিনি তাদেরকে জানিয়ে দিবেন তারা যা করত। আল্লাহ্ সর্ববিষিয়ে সর্বজ্ঞ (২৪: ৬৪)।