📄 কিছু সংখ্যক মুনাফিকের প্ররোচনা
এ সময় আওফ ইব্ন খাযরাজ গোত্রের কতিপয় ব্যক্তি যথা-আল্লাহ্ দুশমন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ইব্ন সালুল, ওয়াদীআ মালিক ইব্ন আবু কাওকাল, সুওয়ায়দ, দাইস প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ বনু নাযীরের কাছে এই মর্মে বার্তা পাঠাল যে, তোমরা অবিচল থাক এবং প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। আমরা কিছুতেই তোমাদের পরিহার করব না। তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হলে আমরা তোমাদের সক্রিয় সহযোগিতা করব। তোমাদের বহিষ্কার করা হলে আমরাও তোমাদের সাথে বের হয়ে যাব। সে মতে বনূ নাযীর তাদের সাহায্যের অপেক্ষায় থাকল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কোন সাহায্য করতে পারলো না। কেননা, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের অন্তরে ভীতি সঞ্চার করে দিলেন। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে অনুরোধ জানাল, যেন বিনা রক্তপাতে তাদেরকে বহিষ্কৃত করা হয়। এই শর্তে যে, তারা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র মুসলমানদের হাতে সমর্পণ করে কেবল সেই পরিমাণ অস্থাবর সম্পত্তি সাথে নিয়ে যাবেন, যা তাদের উট বহন করতে পারে। তিনি তাদের আবেদন রক্ষা করলেন। তারা উটের পিঠে বহনযোগ্য মালামাল নিয়ে গেল। তাদের এক একজন কড়িকাঠ থেকে শুরু করে পুরো ঘরটাই ভেঙে উটের পিঠে তুলে নেয়। এরপর তাদের কতক খায়বরে এবং কতক শামে চলে যায়।
যারা খায়বরে চলে যায়, তাদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিল সাল্লাম ইব্ন আবূ হুকায়ক, কিনানা ইব্ন রাবী ইব্ন আবূ হুকায়কা ও হুয়ায়্য ইব্ন আখতাব। তারা সেখানে গেলে, স্থানীয় অধিবাসীরা তাদের নেতৃত্ব মেনে নিল।
📄 বনূ নাযীর সম্পর্কে কুরআনে যা নাযিল হয়
বনু নাযীর প্রসঙ্গে পূর্ণ সূরা হাশর অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ তা'আলা বনু নাযীরের উপর যে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেন এবং স্বীয় রাসূলকে দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যেভাবে তাদেরকে দমন করেন, এ সূরায় তা বিধৃত হয়েছে। আল্লাহ্ বলেন:
هُوَ الَّذِي أَخْرَجَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ مِنْ دِيَارِهِمْ لأَوَّلِ الْحَشْرِ مَا ظَنَنْتُمْ أَن يَخْرُجُوا وَظَنُّوا أَنَّهُمْ مَا نِعَتُهُمْ حُصُونَهُمْ مِّنَ اللَّهِ فَأَتَاهُمُ اللهُ مِنْ حَيْثُ لَمْ يَحْتَسِبُوا وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ الرُّعْبَ يُخْرِبُونَ بُيُوتَهُمْ بِأَيْدِيهِمْ وَأَيْدِي الْمُؤْمِنِينَ ، فَاعْتَبِرُوا يَأْولِي الْأَبْصَارِ ، وَلَوْلَا أَنْ كَتَبَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ الجَلاءَ لَعَذِّبَهُمْ فِي الدُّنْيَا وَلَهُمْ فِي الْآخِرَةِ عَذَابُ النَّارِ ... مَا قَطَعْتُمْ مِّن لِّينَةٍ أَوْ تَرَكْتُمُوهَا قَائِمَةِ عَلَى أصولها فَبَاذْنِ اللهِ وَلِيُخْرَى الفَاسِقِينَ .
তিনিই কিতাবীদের মধ্যে যারা কাফির তাদেরকে প্রথম সমাবেশেই তাদের আবাসভূমি হতে বিতাড়িত করেছিলেন। তোমরা কল্পনাও করনি যে, তারা নির্বাসিত হবে এবং তারা মনে করেছিল তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলো তাদেরকে আল্লাহ্ হতে রক্ষা করবে। কিন্তু আল্লাহর শাস্তি এমন এক দিক হতে আসল যা তাদের ধারণাতীত এবং তাদের অন্তরে তা ত্রাসের সঞ্চার করল। তারা ধ্বংস করে ফেলল। নিজেদের ঘর-বাড়ি নিজেদের হাতে এবং মু'মিনদের হাতেও। অতএব হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিগণ! তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। আল্লাহ্ (তাঁর পক্ষ হতে তাদের শাস্তি স্বরূপ) তাদের নির্বাসনের সিদ্ধান্ত না করলে তাদেরকে পৃথিবীতে অন্য শাস্তি দিতেন এবং (সেই সঙ্গে) পরকালে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি। এটা এই জন্য যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং কেউ আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করলে আল্লাহ্ তো শাস্তি দানে কঠোর। তোমরা যে খেজুর গাছগুলো কেটে ফেলেছ এবং যেগুলো কাণ্ডের উপর স্থির রেখে দিয়েছ তা তো আল্লাহরই অনুমতিক্রমে। তা এই জন্য যে, আল্লাহ্ পাপাচারীদেরকে লাঞ্ছিত করবেন (৫৯: ২-৫)।
اللينة অর্থ আজওয়া ব্যতীত অন্যান্য খেজুর গাছ। فباذن الله অর্থাৎ খেজুর গাছ কাটা কোন নাশকতামূলক কাজ ছিল না, বরং তা কাটা হয়েছিল আল্লাহর নির্দেশে এবং এতদদ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে শাস্তি প্রদান করেছিলেন।
ইবন হিশাম বলেন : اللينة শব্দটি الالوان হতে উদ্ভূত। বারনিয়্যা ও আজওয়া ব্যতীত অন্যান্য খেজুর গাছকে 'লীনা' বলা হয়। আবু উবায়দা এরূপই বর্ণনা করেছেন। যু'র-রিম্মা বলেন:
كان فتودي فوقها عش طائر * على لينة سوقاء تهفو جنوبها
আমার তৈজসপত্র হাওদার উপর যেন একটি পাখির বাসা, যা স্থাপিত খেজুর গাছের শক্ত ডালের উপর, যার চারদিক থরথর করে কাঁপে।'
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
وَمَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْ جَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ وَلَكِنَّ اللَّهَ يُسَلِّطُ رُسُلَهُ عَلَى مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
আল্লাহ্ তাদের (অর্থাৎ বনু নাযীরের) নিকট হতে তাঁর রাসূলকে যে 'ফায়' দিয়েছেন তার জন্য তোমরা অশ্বে কিংবা উষ্ট্রে আরোহণ করে যুদ্ধ করনি। আল্লাহ্ তো যার উপর ইচ্ছা তাঁর রাসূলদেরকে কর্তৃত্ব দান করেন। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সর্ব শক্তিমান (৫৯:৬)।
ইবন হিশাম বলেন : اوجفتم অর্থ তোমরা অভিযান করেছ এবং সফরের কষ্ট স্বীকার করেছ। আমির ইব্ন সাসা'আ গোত্রীয় তামীম ইব্ন উবায়্য ইব্ন মুকবিল বলেন:
مداويد بالبيض الحديث صقالها * عن الركب احيانا اذا الركب اوجفوا
সে সদ্য শাণিত তরবারি দ্বারা নিজ বাহিনীকে শত্রু হতে রক্ষা করে যখন সে বাহিনী অভিযান চালায়।
এটি তার যুদ্ধকালীন সময়ের একটি কবিতার অংশবিশেষ।
আবূ যায়দ তাঈ, যার নাম হলো হারমালা ইন্ন মুনযির বলেন:
مستفات كانهن قنا الهند * لطول الوجيف جدب المرود ...
তা রশি দ্বারা বাঁধা, যেন তা হিন্দুস্তানের বর্শা, বিশুষ্ক চারণভূমিতে দীর্ঘক্ষণ বিচরণের কারণে।
আবু যায়দের প্রকৃত নাম হারমালা ইন্ন মুনযির। এটি তার একটি কবিতার অংশবিশেষ।
ইবন হিশাম বলেন, السناف অর্থ রশি, উঠের পেটে বাঁধা কাপড়ের থলে। الوجيف অর্থ হৃৎপিণ্ডের বা কলিজার স্পন্দন।
কায়স ইব্ন খাতীম জাফারী তার একটি কবিতায় বলেন:
انا وان قدموا التي علموا * اكبادنا من ورائهم تجف
তারা যা জানে তা যদি অগ্রবর্তী করে, তবে তাদের পশ্চাতে আমাদের কলিজা শুকিয়ে যাবে।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
مَا أَفَاءَ اللهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ وَلذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاء مِنْكُم وَمَا أَتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا -
আল্লাহ্ এই জনপদবাসীদের নিকট হতে তার রাসূলকে যা কিছু দিয়েছেন, তা আল্লাহর, তাঁর রাসূলের স্বজনদের এবং ইয়াতীমদের, অভাবগ্রস্ত ও পথচারীদের, যাতে তোমাদের মধ্যে যারা বিত্তবান, কেবল তাদের মধ্যেই ঐশ্বর্য আবর্তন না করে। রাসূল তোমাদেরকে যা দেন তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেন তা হতে বিরত থাক (৫৯: ৭)।
ইবন ইসহাক বলেন:
مَا أَفَاءُ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ مِنْ أَهْلِ الْقُرَى فَلِلَّهِ وَلِلرَّسُولِ .
-এর অর্থ, মুসলিমগণ যেসব এলাকায় সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে জয় করে, সেখান থেকে তারা যা লাভ করে, তা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ...।
এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ মুসলমানদের মাঝে বণ্টন করার নিয়ম শিক্ষা দিয়েছেন। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
الم تَرَ إِلَى الَّذِينَ نَافَقُوا يَقُولُونَ لِاخْوَانِهِمُ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ .
তুমি কি দেখনি মুনাফিকদেরকে (অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়্য ও তার সাঙ্গপাঙ্গ এবং তাদের অনুরূপ চরিত্রের লোকদেরকে), তারা কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে (অর্থাৎ বনূ নযীরকে) বলে (৫৯: ১১)।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
كَمَثَلِ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ قَرِيبًا ذَاقُوا وَبَالَ أَمْرِهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ ، كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنْسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِئُ مِنْكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبِّ الْعَالَمِينَ.
তাদের তুলনা, তাদের অব্যবহতি পূর্বে যারা নিজেদের কৃতকর্মের শাস্তি আস্বাদন করেছে তারা (অর্থাৎ বনূ কায়নুকা) তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। এদের তুলনা শয়তানের মত, যে মানুষকে বলে কুফরী কর, এরপর যখন সে কুফরী করে শয়তান তখন বলে: তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আমি জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করি। ফলে তাদের উভয়েরই পরিণাম হবে জাহান্নাম। সেথায় তারা স্থায়ী হবে এবং এটাই যালিমদের কর্মফল (৫৯: ১৫-১৭)।
📄 বনূ নাযীর সম্পর্কিত কবিতাবলী
বনূ নাযীর প্রসঙ্গে রচিত কবিতাসমূহের মধ্যে ইব্ন লুকায়ম আবসীর কবিতা উল্লেখযোগ্য। যথা:
اهلی فداء لامرئ غيرها لك * احل اليهود بالحسن المزنم
আমার পরিবারবর্গ সেই অমর ব্যক্তির প্রতি উৎসর্গিত, যিনি ইয়াহুদীদেরকে পরদেশে নির্বাসন দিয়েছেন।
يقيلون في جمر الغضاة وبدلوا * اهيضت غودي بالودي المكمم
এখন তারা গাযা বৃক্ষের জলন্ত কয়লার উপর দ্বিপ্রহরের নিদ্রা যায়। উদীর উঁচু ভূমির পরিবর্তে তারা ছোট ছোট খেজুর গাছ বিশিষ্ট নিম্নভূমি লাভ করেছে।
فان يك ظني صادقا بمحمد * روا خيله بين الصلاو يرمرم
যদি মুহাম্মদ সম্পর্কে আমার ধারণা সঠিক হয়, তবে তোমরা তাঁর বাহিনীকে দেখবে সালা ও ইয়ারামরামের মাঝখানে।
يوم بها عمرو بن بهئة أنهم * عدو وماحى صديق كمجرم
তিনি সে বাহিনী দ্বারা আমর ইব্ন বুহছাকে বহিষ্কার করবেন, আসলে তারা ঘোরতম শত্রু। বন্ধু কি শত্রুতুল্য হতে পারে?
عليهن ابطال مساعير في الوغى * يهزون اطراف الوشيج المقوم
সে বাহিনীতে থাকবে বীর অশ্বারোহী দল, যারা রণক্ষেত্রে দাবানল সৃষ্টি করবে, তারা আন্দোলিত করবে ঋজু বর্শার ফলক।
وكل رقيق الشفر بن مهند * تورتن من ازمان عاد وجرهم
তারা আন্দোলিত করবে দোধারী শাণিত হিন্দুস্থানের তৈরি তরবারি, যা তাঁরা আদ ও জুরহাম গোত্র হতে বংশ পরম্পরায় লাভ করেছে।
فمن مبلغ عنى قريشا رسالة * فهل بعدهم فى المجد من متكرم
কে পৌঁছে দেবে কুরায়শদের কাছে আমার এই বার্তা যে, তাদের পরেও কি দুনিয়াতে সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী কেউ আছে?
بان اخاكم فاعلمن محمدا * تليد الندى بين الحجون وزمزم
তাদের বল জেনে রাখ, তোমাদের ভাই মুহাম্মদ হাজুন ও যমযমের মাঝখানে দানশীলতা ও মহানুভবতার এক শ্রেষ্ঠ দৃষ্টান্ত।
قدينوا اله بالحق تجسم اموركم * وتسموا من الدينا الى كل معظم
অতএব তোমরা তাঁর আনুগত্য স্বীকার কর, তা হলে তোমাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে। আর তোমরা বিশ্ব জগতে গৌরবের শীর্ষে পৌঁছতে পারবে।
نبی تلاقته من الله رحمة * ولا تسالوه امرغيب مرجم
তিনি নবী, তাঁর প্রতি বর্ষিত হয় আল্লাহর রহমত। তোমরা তাঁর কাছে কাল্পনিক অদৃশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর না।
فقد كان في بدر لعمري عبرة * لكم يا قريش والقليب الملمم
কসম, বদরের ঘটনায় তোমাদের জন্য শিক্ষা নিহিত রয়েছে। হে কুরায়শ! লক্ষ্য কর তোমাদের লাশে ভরা সে কুয়ার দিকে।
عذاة اتي في الخزرجية عامدا * اليكم مطيعا للعظيم المكرم
মুহাম্মদ (সা) বনু খাযরাজকে সাথে নিয়ে সেদিন প্রভাতে তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য যেখানে উপনীত হয়েছিলেন, তিনি মহান আল্লাহর নির্দেশে সেখানে পৌঁছেছিলেন।
معانا بروح القدس ينكى عدوه * رسولا من الرحمن حقا بمعلم
তিনি জিবরাঈল কর্তৃক সাহায্যপ্রাপ্ত ছিলেন, যিনি শত্রুদের মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করছিলেন। তিনি সত্য রাসূল হিসাবে মহান আল্লাহর তরফ থেকে এ উঁচু ভূমিতে পৌঁছেছিলেন।
رسولا من الرحمن يتلو كتابه * فلما أثار الحق لم يتعلم
তিনি রহমানের রাসূল, তিনি তার কিতাব পাঠ করেন। যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো, তখন আর কোন দ্বিধা-সংশয় রইলো না।
زاری امره یزداد في كل موطن * علوا لامر حمه الله محكم
আমি দেখছি, তাঁর কাজ ক্রমেই সর্বত্র বিস্তার লাভ করছে, এগিয়ে চলেছে উন্নতির দিকে যা আল্লাহ্ তাঁর জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন।
কারও মতে এ কবিতাটি কায়স ইব্ন বাহ্ ইব্ন তারীফ রচিত।
ইব্ন হিশাম বলেন: এটা কায়স ইব্ন বাহর আলজাঈর কবিতা। এতে উল্লিখিত আমর ইব্ন বুহছা হচ্ছে বনু গাতফান গোত্রের লোক। بالحسى المزنم শব্দ ইবন ইসহাক ছাড়া অন্য কারও সূত্রে বর্ণিত।
ইবন ইসহাক বলেন: আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-ও বনূ নাযীরের বহিষ্কার এবং কা'ব ইবন আশরাফের হত্যা সম্পর্কে একটি কবিতা রচনা করেন।
ইব্ন হিশাম বলেন: কোন কোন কাব্য বিশেষজ্ঞের মতে এ কবিতাটি আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর নয়। বরং অন্য কোন মুসলিমের। আমি তাদের মধ্যে এমন একজনকেও পাইনি যে এটাকে আলী (রা)-এর কবিতা বলে স্বীকার করে। কবিতাটি এইরূপ:
عرفت ومن يعتدل يعرف * وايقنت حقا ولم اصدف
আমি সত্য জেনে ফেলেছি, আর যে সঠিক বুদ্ধির অধিকারী সেও একদিন জানবে, আমি সত্যে বিশ্বাস এনেছি, আর আমি কখনও মুখ ফিরিয়ে নেইনি।
عن الكلم المحكم الآي من * لدى الله ذي الرأفة الأراف
সেই সুদৃঢ় বাণী হতে যা অবতীর্ণ হয়েছে-মহা দয়াবান, করুণাময় আল্লাহর নিকট হতে।
رسائل تدرس في المؤمنين * بهن اصطفى احمد المصطفى
সে তো এমন বার্তা, যা পঠিত হয় মু'মিনদের মাঝে সে বাণীর জন্য আল্লাহ্ মনোনীত করে নিয়েছেন আহমদ মুস্তফাকে।
فاصبح احمد فينا عزيزا * عزيز المقامة والموقف
ফলে আহমদ (সা) আমাদের কাছে সমাদৃত, তাঁর মান-মর্যাদা আমাদের অন্তরে সুপ্রতিষ্ঠিত।
فيا ايها الموعدوه سفاها * ولم يأت جورا ولم يعنف
অতএব, হে ঐ সমস্ত লোক, যারা নির্বুদ্ধিতাবশত তাঁকে ভয় দেখাচ্ছ, অথচ তিনি কোন যুলুম ও দুর্ব্যবহার করেননি।
الستم تخافون ادنى العذاب * وما امن الله كالاخوف
তোমরা কি আল্লাহ্ লাঞ্ছনাকর শাস্তিকে ভয় কর না? যে ব্যক্তি আল্লাহর পক্ষ হতে নিরাপত্তাপ্রাপ্ত, সে তো তার মত নয়, যার জীবন ভয় ও ত্রাসের মধ্যে অতিবাহিত হয়।
وان تصرعوا تحت اسيافه * كمصرع كعب ابي الاشرف
তোমরা কি ভয় কর না যে, তোমাদের তাঁর তরবারির নীচে ধরাশায়ী করে হত্যা করা হবে, যেমন করা হয়েছিল কা'ব ইব্ন আশরাফকে?
غداة رأى الله طغيانه * واعرض كالجمل الاجنف
(আর কা'বকে সেদিন হত্যা করা হয়েছিল) যে দিন আল্লাহ্ দেখলেন যে তার অবাধ্যতা সীমা ছাড়িয়ে গেছে এবং সে অবাধ্য উটের মত সত্য দীন থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।
ফানযাল জিবরীল ফী ক্বাতলিহ * বুহয়ী ইলা আবদিহী মুলাত্বফ
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা কা'বকে হত্যা করার ব্যাপারে জিবরাঈল (আ)-কে ওহী সহ নিজ প্রিয়ভাজন বান্দা মুহাম্মদ (সা)-এর কাছে পাঠান।
কুদুসির রাসূলু রাসূলা লাহ্ * বিয়াবিয়্যাজু যী হীবাতিন মুরাহফ
সে মতে আল্লাহর রাসূল তাঁর একজন প্রতিনিধির হাতে গোপনে একটি চকচকে শাণিত তরবারি তুলে দিলেন।
ফাবাতাত উয়ূনুন লাহু মি'ওয়ালাতুন * মাতায়্যু ইয়ান'ই কা'বুন লাহা তাযরিফ
অবশেষে যখন কা'বের মৃত্যু সংবাদ ঘোষিত হল, তখন বিলাপকারিণী নারীরা সজোরে ক্রন্দন করে অশ্রু ঝরালো।
ওয়াকুলনা লিআহমাদু যারনা ক্বালীলা * ফা আন্না মিনান্নাওহি লাম নাশ্তাফি
তারা বলল, হে আহমদ (সা)! আমাদের কাঁদতে দিন, বিলাপে আমরা এখনও পরিতৃপ্ত হইনি।
ফাখালাহুম সুম্মা ক্বলা আজ'ইনূ * ওয়াহুরা 'আলা রাগমিল আনফি
তিনি তাদের কিছুক্ষণ অবকাশ দিলেন, পরে বললেন, আর নয়, এবার এখান থেকে গ্লানি নিয়ে চলে যাও।
ওয়া আজলী আননাযীর ইলা গুরবা * ওয়াকানূ বিদারী যী যুখরুফ
তিনি বনু নাযীরকে নির্বাসিত করলেন, অথচ তারা জাঁকজমকপূর্ণ আবাসস্থানে বসবাস করতো।
ইলা আজরা'আতি রাওয়াফি ওয়া হুম * 'আলা কুল্লি যী ওয়া বারিং আ'জাফ
তিনি তাদের বহিষ্কার করে পাঠালেন আযরু'আতের দিকে, তখন তাদের দুর্দশার ছিল একশেষ। আহত ও কৃশকায় উটের পিঠে চড়ে তারা একজনের পিছে আরেকজন চড়ে যাচ্ছিল।
📄 এর জবাবে ইয়াহূদী সিমাকের কবিতা
এর জবাবে ইয়াহূদী সিমাক আবৃত্তি করলেন:
আন তাফহারূ ফা হুয়া ফখরুল্লাকুম * বিমাকতালি কা'বি আবীল আশরাফ
গাদাতা 'আযওতুম 'আলা হাতাফিহী * ওয়া লাম ইয়া'তি 'ইন্দা ওয়া লাম ইউখলিফ
ফি'লুল লাওয়ালী ওয়া সারফুদ দুহুরি * ইয়াদিনু মিনাল 'আদিলিল মুনসিফ
বিকাতলিন নাযীরি ওয়া আহলাফিহা * ওয়া 'আকরুন নাখিলা ওয়া লাম তুকাতিফ
ফা ইন লা আমুত তাতিকুম বিল ক্বানা * ওয়া কুল্লু হুসামিম মা'য়ান মুরাহফ
বিকাফ্ফি কুম্মিয়্যিন বিহী ইয়াহতামী * মাতা ইয়ুলকি ক্বারনান লাহু ইয়াতলাফ
মা'আল ক্বাওমি সখরুন ওয়া আশইয়্যা'উহু * ইযা গাওয়ারাল ক্বাওমু লাম ইয়াদ'আফ
কালাইসুম বিরুজ্জি হাত্তা গীলতান * আখী গাবাতিন হা-সা-র আজওয়াফ
কা'বকে হত্যা করে যদি তোমরা গর্ববোধ কর তবে তা করতে পার। তোমরা তো তাকে হত্যা করেছ সেই দিন, যেদিন তোমরা বের হয়েছিলে তার রক্তের নেশায়, অথচ সে কোন বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, ওয়াদাখেলাফ করেনি।
রজনীযোগে আপতিত বিপর্যয় ও কালচক্র সেই ন্যায়পরায়ণ ও ইনসাফকারীর প্রতিও আঘাত হানতে পারে-
যিনি বনূ নাযীর ও তার মিত্রদেরকে হত্যা করেছেন। আর কেটে সাফ করেছেন তাদের খেজুর বাগান, এখনও যার ফল তোলা হয় নি।
যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে আমি বর্শা আর এমন তরবারি নিয়ে, তোমাদের সম্মুখীন হব, যা হবে অত্যন্ত শাণিত ও কর্তনকারী।
তা শোভা পাবে এমন সাহসী যোদ্ধার হাতে, যা নিয়ে সে লড়াই করবে অমিততেজে, আর শত্রুকে ধ্বংস করবে।
তাদের সাথে থাকে সাখর (আবু সুফিয়ান) ও তার দলের লোক; আর সাখর যে দলে থাকে, তাদের মনে কোন ভয়-ভীতি থাকে না।
সে তো তারাজ পর্বতের সিংহের মত, যে নিজের ঝোপঝাড় সুরক্ষিত রেখে বনে শিকার করে বেড়ায় এবং শিকার ছিঁড়ে ফেড়ে নিজের উদর পূর্তি করে।