📄 উহুদ যুদ্ধে শহীদদের মর্যাদা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইসমাঈল ইবন উমাইয়া আবূ যুবায়ের সূত্রে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন:
উহুদের যুদ্ধে যখন তোমাদের ভাইয়েরা শহীদ হলো, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ সবুজ পাখীর মধ্যে রাখলেন। ঐ রূহসমূহ জান্নাতের নহরে আসে এবং সেই সব নহরের গাছের ফল ভক্ষণ করে এবং আরশের ছায়ায় সোনার বাতির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে।
যখন সে রূহগুলো খাদ্য ও পানীয়র সুঘ্রাণ এবং নিজেদের বাসস্থানের সৌন্দর্য দেখতে পেলো, তখন তারা বললেন : হায়! যদি আমাদের ভাইয়েরা জানত যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সংগে কি সদাচরণ করেছেন, তবে তারা জিহাদের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করতো না এবং তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যেত না। এ প্রসংগে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তোমাদের পক্ষ থেকে এ বার্তা আমি তাদের পৌঁছে দেব। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন: وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ . (١٦٩ : ٣)
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে হারিছ ইব্ ফুযায়েল মাহমূদ ইব্ন লবীদ আনসারী সূত্রে ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
'বারিক' জান্নাতের দরজার একটি নহর। শহীদগণ সে নহরের উপর একটি সবুজ গম্বুজে অবস্থান করেন। সকাল-সন্ধ্যা জান্নাত থেকে তাদের রিযিক পৌঁছতে থাকে।
ইব্ন ইসহাক বলেন: আমার কাছে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তাঁকে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, জবাবে তিনি বলেন:
"উহুদ যুদ্ধে তোমাদের ভাইয়েরা নিহত হওয়ার পর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ সবুজ পাখির উদরে রেখে দিলেন। এই রূহগুলো জান্নাতের নহরে আগমন করে তার ফল ভক্ষণ করে, আরশের ছায়ায় সোনার বাতির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কাছে আত্মপ্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করেন: يَا عِبَادِي : مَا تَشْتَهُونَ فَأَزِيدَكُمْ . হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও? আমি তোমাদের আরও বেশী দান করব। তখন রূহগুলো জবাব দেয়- ربَّنَا لَا فَوْقَ مَا أَعْطَيْتَنَا - الْجَنَّةَ نَاكُلُ مِنْهَا حَيْثُ شِئْنَا . হে আমার রব! আপনি আমাদের যা কিছু দান করেছেন তার চাইতে বেশী কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা সেখানে আহার-বিহার করি।
আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলেন: হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও? আমি আরও বাড়িয়ে দেব? তারা বলেন: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের যা দিয়েছেন, এর চাইতে বেশী আর কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে রয়েছি, যেখানে ইচ্ছা আহার-বিহার করি। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলেন: হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও, আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব? তারা বলে: হে আমাদের রব! আপনি যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে রয়েছি, যেখানে ইচ্ছা আহার-বিহার করি। তবে এতটুকু আমরা চাই যে, আমাদের রূহগুলো আমাদের শরীরে ফিরিয়ে দিয়ে আবার আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হোক, যাতে আমরা পুনরায় আপনার পথে জিহাদ করে আর একবার শহীদ হতে পারি।
📄 আবদুল্লাহ্ ইবন উমর (রা) সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উক্তি
ইব্ন ইসহাক বলেন: জনৈক বন্ধু আমাকে বলেছেন যে, আবদুল্লাহ্ ইব্ন মুহাম্মদ ইব্ন 'আকীল' জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্ (রা)-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন:
হে জাবির! আমি তোমাকে সুসংবাদ শুনাব কি? জাবির (র) বলেন, আমি বললাম: হে আল্লাহ্ নবী! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন: উহুদে তোমার পিতা যে স্থানে শহীদ হয়েছিল, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে সে জায়গাতেই জীবিত করে জিজ্ঞাসা করেছিল: হে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমর! আমার কি ধরনের আচরণ তুমি পছন্দ করবে? সে বলেছিল: হে আমার রব! আমি পছন্দ করি যে আপনি আমাকে আবার দুনিয়াতে পাঠিয়ে দিন, যাতে আমি আর একবার আপনার জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হই।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আমর ইবন উবায়দ হাসান (রা) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন এমন কোন মু'মিন নেই, যে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার পর চাইবে যে, দুনিয়ার সব কিছু দেওয়া সত্ত্বেও তাকে আবার দুনিয়াতে ফেরত পাঠানো হোক, শহীদ ছাড়া, সে চাইবে যে, তাকে দুনিয়াতে ফেরত পাঠানো হোক, যাতে সে আল্লাহ্র পথে জিহাদ করে পুনরায় শহীদ হতে পারে।
📄 যাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে গিয়েছিল
ইব্ন ইসহাক বলেন: الَّذِينَ اسْتَجَابُوا لِلَّهِ وَالرَّسُولِ مِنْ بَعْدِ مَا أَصَابَهُمُ الْقَرْحُ
জখম হওয়ার পর যারা আল্লাহ্ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দিয়েছে (৩: ১৭২)।
অর্থাৎ ঐসব মু'মিন যারা উহুদের যুদ্ধের পরের দিন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সংগে জখমের ব্যথা-যন্ত্রণা থাকা সত্ত্বেও হামরাউল আসাদে গিয়েছিল।
لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا مِنْهُمْ وَاتَّقَوْا أَجْرٌ عَظِيمُ الَّذِينَ قَالَ لَهُمُ النَّاسُ إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيْمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ .
তাদের মধ্যে যারা সৎকার্য করে এবং তাকওয়া অবলম্বন করে চলে, তাদের জন্য মহাপুরস্কার রয়েছে। এদেরকে লোকেরা বলেছিল: তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় কর। কিন্তু এটা তাদের ঈমান দৃঢ়তর করেছিল এবং তারা বলেছিল; আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক (৩: ১৭২-১৭৩)।
মুসলমানদের যারা এ জাতীয় কথা বলেছিল তারা হলো: আবদুল কায়িসের কিছু লোক, যারা আবু সুফিয়ানের সাথে আলোচনা করার পর মুসলমানদের বলেছিল যে, আবু সুফিয়ান ও অন্যান্যরা প্রচুর সরঞ্জাম প্রস্তুত করেছে। তারা পুনরায় তোমাদের উপর আক্রমণ করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
فَانْقَلَبُوا بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ لَّمْ يَمْسَسْهُمْ سُوءُ وَاتَّبَعُوا رِضْوَانَ اللَّهِ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَظِيمٍ.
তারপর তারা আল্লাহর অবদান ও অনুগ্রহসহ ফিরে এসেছিল, কোন অনিষ্ট তাদের স্পর্শ করেনি এবং আল্লাহ্ যাতে রাযী, তারা তারই অনুসরণ করেছিল এবং আল্লাহ্ মহা-অনুগ্রহশীল (৩: ১৭৪)।
কেননা, তিনি তাদেরকে শত্রুর সাথে পুনরায় সংঘর্ষ হওয়া থেকে হিফাযত করেন।
إِنَّمَا ذَلِكُمُ الشَّيْطَنُ يُخَوِّفُ أَوْلِيَاءَ فَلَا تَخَافُوهُمْ وَخَافُوْنِ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ .
শয়তানই তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায় সুতরাং যদি তোমরা মু'মিন হও, তবে তোমরা তাদের ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর (৩: ১৭৫)।
📄 দুঃখিত না হওয়া প্রসংগে
وَلَا يَحْزُنْكَ الَّذِينَ يُسَارِعُوعُنَ فِي الْكُفْرِ أَنَّهُمْ لَنْ يَضُرُّوا اللَّهَ شَيْئًا يُرِيدُ اللَّهُ أَلَا يَجْعَلَ لَهُمْ حَظًّا فِي الْآخِرَةِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ إِنَّ الَّذِينَ اشْتَرَوا الكُفْرَ بِالْإِيْمَانِ لَنْ يَضُرُّ واللَّهَ شَيْئًا وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ. وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ خَيْرٌ لِّأَنْفُسِهِمْ إِنَّمَا نُمْلِي لَهُمْ لِيَزْدَادُوا إِثْمًا وَلَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ مَا كَانَ اللَّهُ لِيَذَرَ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى مَا أَنْتُمْ عَلَيْهِ حَتَّى يَمِيرَ الْخَبِيْتَ مِنَ الطَّيِّبِ وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُطْلِعَكُمْ عَلَى الْغَيْبِ وَلَكِنَّ اللهَ يَجْتَبِي مِنْ رَّسُلِهِ مَنْ يَشَاءُ فَآمِنُوا بِاللَّهِ وَرُسُلِهِ وَإِنْ تُؤْمِنُوا وَتَتَّقُوا فَلَكُمْ أَجْرٌ عَظِيمٌ .
যারা কুফরীতে ত্বরিতগতি, তাদের আচরণ যেন তোমাকে দুঃখ না দেয় (অর্থাৎ মুনাফিকরা) তারা কখনও আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ্ আখিরাতে তাদের কোন অংশ দিবার ইচ্ছা করেন না। তাদের জন্য মহাশাস্তি রয়েছে। যারা ঈমানের বিনিময়ে কুফরী ক্রয় করেছে, তারা কখনও আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। তাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি রয়েছে। কাফিররা যেন কিছুতেই মনে না করে যে, আমি অবকাশ দেই তাদের মঙ্গলের জন্য; আমি অবকাশ দিয়ে থাকি যাতে তাদের পাপ বৃদ্ধি পায় এবং তাদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে। অসৎকে সৎ হতে পৃথক না করা পর্যন্ত তোমরা (অর্থাৎ কাফির মুনাফিক), যে অবস্থায় রয়েছো, আল্লাহ্ মু'মিনদের সেই অবস্থায় ছেড়ে দিতে পারেন না। অদৃশ্যের সম্পর্কে তোমাদেরকে আল্লাহ্ অবহিত করার নন (অর্থাৎ ঐ ব্যাপারে, যাতে আল্লাহ্ তোমাদের পরীক্ষা করতে চান, যাতে তোমরা বেঁচে থাকো)। তবে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলগণের মধ্যে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলগণের উপর ঈমান আনো, তোমরা ঈমান আনলে ও তাকওয়া অবলম্বন করে চললে (অর্থাৎ বিরত হয়ে তওবা করলে) তোমাদের জন্য মহাপুরষ্কার রয়েছে (৩: ১৭৬-১৭৯)।