📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয় প্রসংগে

📄 উহুদ যুদ্ধের বিপর্যয় প্রসংগে


তারপর আল্লাহ্ সে সব মুসীবতের কথা, যা মুসলমানদের উপর উহুদ যুদ্ধে আপতিত হয়েছিল, তার উল্লেখ করে বলেন: أوَلَمَّا أَصَابَتْكُمْ مُصِيبَةٌ قَدْ أَصَبْتُمْ مُثْلَيْهَا قُلْتُمْ أَنَّى هذا قُلْ هُوَ مِنْ عِндِ أَنْفُسِكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.
কি ব্যাপার। যখন তোমাদের উপর মুসীবত আসলো, তখন তোমরা বললেন, এটা কোত্থেকে আসলো? অথচ তোমরা তো দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে। বল, এটা তোমাদের নিজেদেরই নিকট হতো; আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান (৩: ১৬৫)।
অর্থাৎ তোমাদের ভুলের কারণেই যদি তোমাদের ভাইদের উপর কোন বিপদ আসে, তবে তাতে কি আসে যায়। এর পূর্বে বদর প্রান্তরে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তাতে তোমরা তাদের কতল ও বন্দী করে তাদের উপর দ্বিগুণ বিপদ ঘটিয়েছিলে। তোমরা ভুলে গেলে তোমাদের গুনাহের কথা এবং তোমাদের নবী তোমাদের যে নির্দেশ দিয়েছিল, তোমরা তার বিরোধিতা করেছিলে, একথা কি তোমরা ভুলে গেলে?
إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা আপন বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা শাস্তি দিতে কিংবা ক্ষমা করতে পূর্ণ সক্ষম।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا أَصَابَكُمْ يَوْمَ التَقَى الْجَمْعَنِ فَبِإِذْنِ اللهِ وَلِيَعْلَمُ الْمُؤْمِنِينَ. وَلِيَعْلَمَ الَّذِينَ نَافَقُوا
যে দিন দু'দল পরস্পরের সম্মুখীন হয়েছিল, সেদিন তোমাদের উপর যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তা আল্লাহ্রই হুকুমে; এটা মু'মিনদেরকে জানবার জন্য এবং মুনাফিকদের জানবার জন্য (৩: ১৬৬-৬৭)।
অর্থাৎ যা তোমাদের এবং তোমাদের শত্রুপক্ষের মাঝে মুকাবিলার সময় ঘটেছিল তা আমার হুকুমেই ঘটেছিল। এ ঘটনা তখন ঘটেছিল, যখন তোমরা যা করার তা করলে আমার সাহায্য ও প্রতিশ্রুতি আসার পর, যাতে মু'মিন আর মুনাফিকের মাঝে পার্থক্য হয়ে যায়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুনাফিকদের অবস্থা

📄 মুনাফিকদের অবস্থা


এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَقِيلَ لَهُمْ تَعَالُوا قَاتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِدْفَعُوا قَالُوا لَوْ نَعْلَمُ قِتَالَا لَا اتَّبَعْنَكُمْ .
এবং তাদের বলা হয়েছিল, 'এসো তোমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ কর অথবা প্রতিরোধ কর।' তারা বলেছিল, 'যদি জানতাম যে, যুদ্ধ হবে তবে নিশ্চিতভাবে তোমাদের অনুসরণ করতাম' (৩: ১৬৭)।
অর্থাৎ আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উবায় ও তার অনুচররা উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সঙ্গ ছেড়ে ফিরে এসেছিল। তারা তখন বলেছিল, আমরা যদি জানতে পারতাম এবং আমাদের এ বিশ্বাস হত যে, নিশ্চিত যুদ্ধ সংঘটিত হবে, তবে আমরা তোমাদের সাথে অবশ্যই যেতাম এবং তোমাদের পক্ষ হয়ে লড়াই করতাম। কিন্তু, আমাদের ধারণা ছিল যুদ্ধ সংঘটিত হবে না। আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের এ গোপন নিফাক স্পষ্টরূপে প্রকাশ করে দিয়ে বলেছেন:
هُمْ لِلْكُفْرِ يَوْمَئِذٍ أَقْرَبُ مِنْهُمْ لِلْإِيْمَانِ يَقُولُونَ بِأَفْوَاهِهِمْ مَّا لَيْسَ فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ أَعْلَمُ بِمَا يَكْتُمُونَ الَّذِينَ قَالُوا لِإِخْوَانِهِمْ وَقَعَدُوا لَوْ أَطَاعُونَا مَا قُتِلُوا قُلْ فَادْرَءُوا عَنْ أَنْفُسِكُمُ الْمَوْتَ إِنْ كُنْتُمْ صدقين .
সেদিন তারা ঈমান অপেক্ষা কুফরীর নিকটতর ছিল। যা তাদের অন্তরে নাই তারা তা মুখে বলে; তারা যা গোপন রাখে আল্লাহ্ তা বিশেষভাবে অবহিত। যারা ঘরে বসে রইলো এবং তাদের ভাইদের সম্বন্ধে বলল যে, তারা তাদের কথামত চললে নিহত হতো না, তাদের বল, 'যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে নিজেদের মৃত্যু হতে রক্ষা কর' (৩: ১৬৭-১৬৮)।
অর্থাৎ মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। যদি তোমরা তোমাদের থেকে মৃত্যুকে প্রতিহত করতে পার, তবে তা কর। জিহাদ থেকে ফিরে থাকাই ছিল, তাদের মূল লক্ষ্য। আর এর মূলে ছিল তাদের নিফাকী। দুনিয়াতে বেশী দিন বেঁচে থাকার লক্ষ্যে এবং মৃত্যু থেকে বাঁচার জন্য তারা আল্লাহ্র রাস্তায় জিহাদ করাকে পরিত্যাগ করেছিল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 জিহাদের প্রেরণা

📄 জিহাদের প্রেরণা


তারপর আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর মাধ্যমে মু'মিনদের জিহাদের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেন এবং জিহাদে জীবন দেওয়া সহজ এ কথা উল্লেখ করে বলেন:
وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ - فَرِحِيْنَ بِمَا أَنْهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ وَيَسْتَبْشِرُونَ بِالَّذِينَ لَمْ يَلْحَقُوا بِهِمْ مِّنْ خَلْفِهِمْ أَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ .
যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদের কখনো মৃত মনে করো না। বরং তারা জীবিত এবং তাদের প্রতিপালকের নিকট হতে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত। আল্লাহ্ নিজ অনুগ্রহে তাদের যা দিয়েছেন, তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পিছনে যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি, তাদের জন্য আনন্দ প্রকাশ করে; এজন্য যে, তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না (৩: ১৬৯-১৭০)।
অর্থাৎ আল্লাহর পথে যারা নিহত হয়েছে, তুমি তাদের মৃত মনে করো না। আমি তাদের জীবিত করেছি, জান্নাতের আনন্দ ও আয়েশে তাদের রিযিকদান করা হয়। তাদের জিহাদের বিনিময়ে আল্লাহ্ তা'আলা যে অনুগ্রহ করেছেন, তাতে এরা অত্যন্ত আনন্দিত ও প্রফুল্ল।
يَسْتَبْشِرُونَ بِنِعْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ وَفَضْلٍ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُؤْمِنِينَ.
আল্লাহ্র অবদান ও অনুগ্রহের জন্য তারা আনন্দ প্রকাশ করে এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ্ মু'মিনদের শ্রমফল নষ্ট করেন না (৩: ১৭১)। কেননা, তারা দেখে নিয়েছে অঙ্গীকার পূরণ ও বিরাট প্রতিদান।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উহুদ যুদ্ধে শহীদদের মর্যাদা

📄 উহুদ যুদ্ধে শহীদদের মর্যাদা


ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইসমাঈল ইবন উমাইয়া আবূ যুবায়ের সূত্রে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন:
উহুদের যুদ্ধে যখন তোমাদের ভাইয়েরা শহীদ হলো, তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ সবুজ পাখীর মধ্যে রাখলেন। ঐ রূহসমূহ জান্নাতের নহরে আসে এবং সেই সব নহরের গাছের ফল ভক্ষণ করে এবং আরশের ছায়ায় সোনার বাতির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে।
যখন সে রূহগুলো খাদ্য ও পানীয়র সুঘ্রাণ এবং নিজেদের বাসস্থানের সৌন্দর্য দেখতে পেলো, তখন তারা বললেন : হায়! যদি আমাদের ভাইয়েরা জানত যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের সংগে কি সদাচরণ করেছেন, তবে তারা জিহাদের ব্যাপারে অনীহা প্রকাশ করতো না এবং তারা যুদ্ধের ময়দান থেকে পালিয়ে যেত না। এ প্রসংগে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন, তোমাদের পক্ষ থেকে এ বার্তা আমি তাদের পৌঁছে দেব। তখন আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন: وَلَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاءٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ . (١٦٩ : ٣)
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে হারিছ ইব্‌ ফুযায়েল মাহমূদ ইব্‌ন লবীদ আনসারী সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
'বারিক' জান্নাতের দরজার একটি নহর। শহীদগণ সে নহরের উপর একটি সবুজ গম্বুজে অবস্থান করেন। সকাল-সন্ধ্যা জান্নাত থেকে তাদের রিযিক পৌঁছতে থাকে।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আমার কাছে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তাঁকে এ আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, জবাবে তিনি বলেন:
"উহুদ যুদ্ধে তোমাদের ভাইয়েরা নিহত হওয়ার পর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের রূহ সবুজ পাখির উদরে রেখে দিলেন। এই রূহগুলো জান্নাতের নহরে আগমন করে তার ফল ভক্ষণ করে, আরশের ছায়ায় সোনার বাতির কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। আল্লাহ্ তা'আলা তাদের কাছে আত্মপ্রকাশ করে জিজ্ঞাসা করেন: يَا عِبَادِي : مَا تَشْتَهُونَ فَأَزِيدَكُمْ . হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও? আমি তোমাদের আরও বেশী দান করব। তখন রূহগুলো জবাব দেয়- ربَّنَا لَا فَوْقَ مَا أَعْطَيْتَنَا - الْجَنَّةَ نَاكُلُ مِنْهَا حَيْثُ شِئْنَا . হে আমার রব! আপনি আমাদের যা কিছু দান করেছেন তার চাইতে বেশী কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা সেখানে আহার-বিহার করি।
আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলেন: হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও? আমি আরও বাড়িয়ে দেব? তারা বলেন: হে আমাদের রব! আপনি আমাদের যা দিয়েছেন, এর চাইতে বেশী আর কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে রয়েছি, যেখানে ইচ্ছা আহার-বিহার করি। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা পুনরায় তাদের সামনে আত্মপ্রকাশ করে বলেন: হে আমার বান্দারা! তোমরা কি চাও, আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব? তারা বলে: হে আমাদের রব! আপনি যা দিয়েছেন তার চাইতে বেশী কিছু চাই না। আমরা জান্নাতে রয়েছি, যেখানে ইচ্ছা আহার-বিহার করি। তবে এতটুকু আমরা চাই যে, আমাদের রূহগুলো আমাদের শরীরে ফিরিয়ে দিয়ে আবার আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হোক, যাতে আমরা পুনরায় আপনার পথে জিহাদ করে আর একবার শহীদ হতে পারি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00