📄 পূর্ববর্তী নবীগণ এবং তাদের সহচর
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَكَأَيِّنْ مِّنْ نَّبِي قَتَلَ مَعَهُ رَبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّبِرِينَ.
এবং কত নবী যুদ্ধ করেছে তাদের সাথে বহু আল্লাহ্ ওয়ালা ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তাতে তারা হীনবল হয়নি, দুর্বল হয়নি এবং নত হয়নি। আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন (৩: ১৪৬)।
অর্থাৎ নবীকে হারিয়ে ফেলার কারণে তারা হীনবল হয়ে হয়ে পড়েনি। আর না তারা শত্রুর মুকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর না তারা জিহাদে পরাভূত হয়ে আল্লাহ্ ও তাঁর দীন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে। এটাই হল ধৈর্য। আল্লাহ্ তা'আলা ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন।
وَمَا كَانَ قَولُهُمْ إِلَّا أَنْ قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
এ কথা ব্যতীত তাদের আর কোন কথা ছিল না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপ এবং আমাদের কার্যে সীমা লংঘন তুমি ক্ষমা কর, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখ এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর (৩: ১৪৭)।
ইবন হিশাম বলেন : الرَّبِّيِّينَ এর একবচন হলো رِبِّى আর তারা যে মানাত ইব্ন উদ্দ ইবন তাবিখা ইব্ন ইলয়াছ এর ছেলে যাব্বাকে الرَّابُّ বলতো তার কারণ এই যে, তারা সকলে সমবেত হয়ে পরস্পর মিত্রতাবদ্ধ হয়েছিল।
এ কারণে তারা الرَّابُّ বলে جماعة বা দলসমূহ বুঝায়। الرِّبابُ এর একবচন رَبَّة ও ربَّابَةُ অর্থ পেয়ালা কিংবা লাঠি সমষ্টি। এর সাথেই দলকে তুলনা করা হয়েছে।
যেমন আবূ যুআয়ব হুযালী বলেন:
وَكَانَهُنَّ رِبَابَةٌ وَكَأَنَّةً * يَسُرُّ يَفِيضُ عَلَى الْقِدَاحِ وَيَصْدَعُ
যেন তারা পেয়ালাসমষ্টি। আর যেন সে নরম ও সহজ পেয়ালায় পান করে এবং পরে তা ভেঙ্গে দেয়।
এ পংক্তিটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। কবি উমাইয়া ইবন আবূ সালত বলেন:
حَوْلَ شَيَاطِينِهِمْ أَبَابِيلُ رَبِـيُونُ شَدُّوا سِنَوْراً مَدْسُوراً
তাদের শয়তানগুলোর চারিপাশে সমবেত ঝাঁক, পেরেকযুক্ত বর্ম পরিহিত।
এই লাইনটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশ বিশেষ।
ইবন হিশাম বলেন: الربابة -এর আর একটি অর্থ হলো কাপড়ের টুকরা, যাতে পেয়ালা জড়িয়ে রাখা হয়।
ইবন হিশাম বলেন : السنور অর্থ বর্ম; الدسر অর্থ কড়ার পেরেক। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ ألْوَاحِ وَدُسُرٍ
তখন আমি নূহকে আরোহণ করালাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে (৫৪: ১৩)।
কবি আবূ আখযার হিম্মানী, তামীমের এই কবিতা বলেন:
دِسْراً بأطراف القنا المقوم
মজবুত বর্শার চারিদিক পেরেক দ্বারা শক্ত করে দাও।
ইবন ইসহাক বলেন: আয়াতের অর্থ এই যে, হে মুসলমানগণ, তৎকালীন উম্মতেরা যেমন বলেছিল তোমরাও তেমনি বল। আর মনে রেখ, যা কিছু হয়েছে তোমাদের গুনাহের কারণেই হয়েছে। সুতরাং তারা যেমন ইস্তিগফার করেছে, তোমরাও তেমনিভাবে ইস্তিগফার কর এবং তারা যেমন নিজ দীনের উপর অটল ছিল তোমরাও তেমনিভাবে নিজ দীনের উপর অটল থেকে তা বাস্তবায়িত করতে থাক। আর দীন ছেড়ে পশ্চাদপসরণ করো না। তারা যেমন অবিচল থাকার জন্য দু'আ করেছে, তোমরাও তেমনিভাবে দু'আ কর। তারা যেমন কাফিরদের উপর জয়লাভ করার জন্য দু'আ করেছিল, তোমরাও তেমনিভাবে দু'আ কর। এ সবগুলো ছিল পূর্বযুগের উম্মতের কথা। তাদের নবীরা নিহত হয়েছিল কিন্তু তারা তোমাদের মত আচরণ করেনি।
فَأَتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
এরপর আল্লাহ্ তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার এবং উত্তম পারলৌকিক পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন (৩: ১৪৮)।
📄 কাফিরদের আনুগত্যের পরিণতি
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تُطِيعُوا الَّذِينَ كَفَرُوا يَرُدُّوكُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ فَتَنْقَلِبُوا خَاسِرِينَ.
হে মু'মিনগণ! যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তবে তারা তোমাদেরকে বিপরীত দিকে ফিরিয়ে দিবে এবং তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়বে (৩: ১৪৯)।
অর্থাৎ, তারপর তো তোমরা তোমাদের শত্রুর কাছ থেকে বিফল মনোরথ হবে। এভাবে তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয় বরবাদ হবে।
بَلِ اللَّهُ مَوْلَكُمْ وَهُوَ خَيْرُ النُّصِرِينَ
আল্লাহই তো তোমাদের অভিভাবক এবং তিনিই শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী (৩: ১৫০)।
অর্থাৎ, তোমরা মুখে যা বল, তা যদি সত্যিকার মন থেকে বলে থাক, তবে তোমরা একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলারই আশ্রয় গ্রহণ কর। তিনি ছাড়া আর কারও সাহায্য চেয়ো না এবং তোমরা তোমাদের দীন পরিত্যাগ করে গুমরাহ হয়ে যেও না।
سَتُلْقِى فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ
অচিরেই আমি কাফিরদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করব (৩: ১৫১)।
অর্থাৎ যে ভীতির মাধ্যমে আমি তোমাদের-তাদের উপর বিজয় দান করে থাকি। আমি এজন্যে এরূপ করি যে, তারা কোন দলীল ছাড়া আমার সংগে শরীক স্থির করেছে। সুতরাং তোমরা যে গুনাহ করছো, আমার নির্দেশ অমান্য করেছো এবং নবীর অবাধ্য হয়েছো, এর কারণে তোমাদের উপর যে বিপদ এসেছে, তাতে তোমরা একথা ভেব না যে, পরিশেষে জয় তাদেরই হবে।
وَلَقَدْ صَدَقَكُمْ اللهُ وَعْدَهُ إِذْ تَحُسُّوْ نَهُمْ بِإِذْنِهِ حَتَّى إِذَا فَشِلْتُمْ وَتَنَازَعْتُمْ فِي الْأَمْرِ وَعَصَيْتُمْ مِّنْ بَعْدِ مَا أَرَكُمْ مَّا تُحِبُّوْنَ مِنْكُمْ مَنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا وَمِنْكُمْ مِّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ ثُمَّ صَرَفَكُمْ عَنْهُمْ لِيَبْتَلِيَكُمْ وَلَقَدْ عَفَا عَنْكُمْ وَاللَّهُ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ.
আল্লাহ্ তোমাদের সাথে তার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছিলেন, যখন তোমরা আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে তাদেরকে বিনাশ করছিলে, যে পর্যন্ত না তোমরা সাহস হারালে এবং নির্দেশ সম্বন্ধে মতভেদ সৃষ্টি করলে, আর যা তোমরা ভালবাস তা তোমাদের দেখবার পর তোমরা অবাধ্য হলে। তোমাদের কতক ইহকাল চাচ্ছিল এবং কতক পরকাল চাচ্ছিল। এরপর তিনি পরীক্ষা করার জন্য তোমাদের তাদের হতে ফিরিয়ে দিলেন। অবশ্য তিনি তোমাদের ক্ষমা করলেন এবং আল্লাহ্ মু'মিনদের প্রতি অনুগ্রহশীল (৩: ১৫২)।
অর্থাৎ আমি তোমাদের শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে তোমাদের সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তা তখনই পূরণ করে দিয়েছি। যখন তোমরা আমার নির্দেশে তরবারি দিয়ে তাদের হত্যা করছিলে আমি তোমাদের হাতকে তাদের উপর প্রবল করে নিয়েছিলাম এবং তাদের হাতকে তোমাদের থেকে ফিরিয়ে রেখেছিলাম।
ইবন হিশাম বলেন : الْحس অর্থ মূলোৎপাটন করা حَسَتُ الشَّيْئَ অর্থাৎ আমি তরবারি বা অন্য কিছু দিয়ে তার মূলসহ উৎপাটন করেছি।
কবি জরীর বলেন
تحسهم السيوف كما تسامى * حريق النار في الأجرم الحصيد
তরবারি তাদের মূলোৎপাটন করছিল, যেমন কাটা শুকানো গাছের কারণে আগুন উদ্দীপিত হয়।
এই পংক্তিটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
কবি রুবাহ ইবন আজ্জাজ বলেন :
اذا شكونا سنة جسوسا * تاكل بعد الأخضر اليبيسا
যখন আমরা সমূলে গ্রাসকারী দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করছিলাম, যা সবুজগুলো খাওয়ার পর শুকনোগুলোও খেয়ে শেষ করছিল।
এই পংক্তি দুটো তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
ইবন ইসহাক বলেন : حَتَّى إذا فشلتم অর্থাৎ যখন তোমরা মনোবল হারালে এবং تَنَازَعْتُمْ في الأمر আমার নির্দেশের ব্যাপারে মতানৈক্য করলে; অর্থাৎ তোমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম যে নির্দেশ দিয়েছিল এবং যে দায়িত্ব তোমাদের উপর অর্পণ করেছিল, তা তোমরা পরিত্যাগ করেছিলে। এর দ্বারা তীরন্দাজদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
وَعَصَيْتُمْ مِّنْ بَعْدِ مَا أَرْكُمْ مَّا تُحِبُّونَ আর তোমরা যা ভালবাস তা তোমাদের দেখানোর পর তোমরা অবাধ্য হলে। অর্থাৎ নিশ্চিত বিজয়ের পর, এবং কুরায়শদের তাদের মহিলাদের এবং ধন-সম্পদ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার পর।
مِنْكُمْ مِّنْ يُرِيدُ الدُّنْيَا তোমাদের কতক ইহকাল চাচ্ছিল' অর্থাৎ যারা পার্থিব লুটতরাজ করার ইচ্ছা করছিল এবং যে আনুগত্যের উপর আখিরাতের সওয়াব নির্ভরশীল তা বর্জন করছিল।
مِنْكُمْ مِّنْ يُرِيدُ الْآخِرَةَ আর কতক পরকাল চাচ্ছিল' অর্থাৎ যারা আল্লাহর পথে জিহাদই করছিল এবং আখিরাতে আল্লাহর কাছে উত্তম সওয়াবের আশা করছিল। তারা পার্থিব লোভ-লালসায় বশবর্তী হয়ে, তাদের যা করতে নিষেধ করা হয়েছিল, তা তারা করেনি। মারাত্মক অন্যায়কে ক্ষমা করে দিয়েছেন তোমাদের নবী আর আল্লাহ্ তোমাদের এ নির্দেশ অমান্য করার কারণে তিনি তোমাদের ধ্বংস করেননি। বরং আল্লাহ্ তা'আলা এরপরও নিজ অনুগ্রহ তোমাদের উপর অব্যাহত রেখেছেন। এরপর আল্লাহ্ বলেন: مِنَ اللَّهِ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ . অর্থাৎ আল্লাহ্ তা'আলা মু'মিনদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, এ জগতে তাদের শিক্ষা দেয়ার জন্য শাস্তি দান করেছেন। তাদের শাস্তি দেওয়া পূর্ণ অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাদের ঈমানের কারণে তিনি দয়াপরবশ হয়ে গুনাহের জন্য তাদের মূলে ধ্বংস করেননি।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের তাদের নবীকে ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তিরস্কার করছেন। তিনি তাদের ডাকছিলেন, আর তারা তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
إِذْ تُصْعِدُونَ وَلَا تَلْوُونَ عَلَى أَحَدٍ وَ الرَّسُولُ يَدْعُوكُمْ فِي أُخْرَكُمْ فَأَثَابَكُمْ غَمَّا بِغَمٍ لِّكَيْلاَ تَحْزَنُواْ عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا مَا أَصَابَكُمْ .
স্মরণ কর, তোমরা যখন উপরের দিকে ছুটে ছিলে এবং পিছন ফিরে কারও প্রতি লক্ষ্য করছিলে না, আর রাসূল তোমাদের পিছন দিক হতে আহবান করছিল, ফলে তিনি তোমাদের বিপদের উপর বিপদ দিলেন যাতে তোমরা যা হারিয়েছ অথবা যে বিপদ তোমাদের উপর এসেছে, তার জন্য তোমরা দুঃখিত না হও (৩: ১৫৩)।
অর্থাৎ বিপদের পর বিপদ আসতে লাগলো যেমন তোমাদের কতক ভাই নিহত হলো শত্রুরা তোমাদের উপর প্রবল হলো এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিহত হওয়ার গুজব শুনে তোমাদের মাঝে এক হতাশার সঞ্চার হলো, এটাই ছিল যা একের পর এক পেরেশানী তোমাদের উপর আসতে লাগলো, যাতে তোমরা তোমাদের স্বচক্ষে বিজয় দেখার পর তা হারিয়ে যাওয়ার কারণে এবং তোমাদের ভাইদের নিহত হওয়ার কারণে, তোমরা দুঃখিত না হও। পরিশেষে আমি এভাবে তোমাদের সে বিপদ দুশ্চিন্তা দূর করে দিয়েছি। আল্লাহ্ বলেন: وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ 'তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা বিশেষভাবে অবহিত' (৩: ১৫৩)।
আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের যে হতাশা ও বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, তা এই যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিহত হওয়া সম্পর্কে শয়তানের গুজব আল্লাহ্ তা'আলা নাকচ করেছেন। এরপর মুসলমানরা যখন তাদের রাসূল (সা)-কে নিজেদের মাঝে জীবিত পেল, তখন তাদের শত্রুর উপর জয়লাভের পর পরাস্ত হওয়ার দুঃখ এবং ভাইদের নিহত হওয়াজনিত মর্মবেদনা লাঘব হয়ে গেল। আর তারা দেখতে পেল যে, আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিহত হওয়া থেকে হিফাযত করেছেন।
ثُمَّ أَنْزَلَ عَلَيْكُمْ مِّنْ بَعْدِ الْغَمِّ آمَنَةً نُّعَاسًا يُغْشَى طَائِفَةً مِّنْكُمْ وَطَائِفَةٌ قَدْ أَهَمَّتْهُمْ أَنْفُسُهُمْ يَظُنُّونَ بِالله غَيْرَ الْحَقِّ ظَنَّ الْجَاهِلِيَّةِ يَقُولُونَ هَلْ لَّنَا مِنَ الْأَمْرِ مِنْ شَيْءٍ قُلْ إِنْ الْأَمْرَ كُلَّهُ لِلَّهِ يُخْفُونَ فِي انْفُسِهِمْ مَا لَا يُبْدُونَ لَكَ يَقُولُوْنَ لَوْ كَانَ لَنَا مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ مَا قُتِلَنَا هُهُنَا قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ لَبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ وَلِيَبْتَلِيَ اللهُ مَا فِي صُدُورِكُمْ وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ .
আর দুঃখের পর তিনি তোমাদের প্রদান করলেন প্রশান্তি-তন্দ্রারূপে, যা তোমাদের একদলকে আচ্ছন্ন করেছিলো এবং একদল জাহিলী যুগের অজ্ঞের ন্যায় আল্লাহ্ সম্বন্ধে অবাস্তব ধারণা করে নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করেছিল এই বলে যে, আমাদের কি কোন অধিকার আছে? বল, সমস্ত বিষয় আল্লাহ্রই ইখতিয়ারে। যা তারা তোমার নিকট প্রকাশ করে না, তারা তাদের অন্তরে তা গোপন রাখে, আর বলে, এই ব্যাপারে আমাদের কোন অধিকার থাকলে আমরা এই স্থানে নিহত হতাম না।' বল, 'যদি তোমরা তোমাদের গৃহে অবস্থান করতে তবুও নিহত হওয়া যাদের জন্য-অবধারিত ছিল, তারা নিজেদের মৃত্যুস্থানে বের হত।' এটা এজন্য যে আল্লাহ্ তোমাদের বক্ষে যা আছে তা পরীক্ষা করেন ও তোমাদের অন্তরে যা আছে তা পরিশোধন করেন। অন্তরে যা আছে আল্লাহ্ সে সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত (৩: ১৫৪)।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর প্রতি আস্থাশীলদের উপর তন্দ্রা নাযিল করেন, ফলে তারা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে। অপরপক্ষে, মুনাফিকরা নিজেরাই নিজেদেরকে উদ্বিগ্ন করলো এবং আল্লাহ্ তা'আলা সম্পর্কে নির্বোধসুলভ ও অবাস্তব ধারণা পোষণ করলো; আর তারা এরূপ করছিল মৃত্যুর ভয়ে। কারণ, তাদের আখিরাতে পুনরুত্থিত হওয়ার উপর বিশ্বাস ছিল না। আল্লাহ্ তা'আলা মুনাফিকদের পরস্পর তিরস্কার এবং এ বিপদের কারণে তাদের আক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তাঁর নবীকে বলেন:
قُلْ لَوْ كُنْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ
হে নবী! আপনি বলে দিন যদি তোমরা আপন ঘরেই অবস্থান করতে (৩: ১৫৪)।
আর এ যুদ্ধের ময়দানে হাযির না হতে, সেখানে আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের গোপন রহস্য প্রকাশ করে দিয়েছেন।
لبَرَزَ الَّذِينَ كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقَتْلُ إِلَى مَضَاجِعِهِمْ
তবুও নিহত হওয়া যাদের জন্য অবধারিত ছিল, তারা নিজেদের মৃত্যুস্থানে বের হত।
وَلِيُمَحِّصَ مَا فِي قُلُوبِكُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ .
এটা এজন্য যে, আল্লাহ্ তোমাদের অন্তরে যা আছে, তা পরিশোধন করেন। অন্তরে যা আছে আল্লাহ্ সে সম্পর্কে বিশেষভাবে অবহিত (৩: ১৫৪)।
অর্থাৎ তারা তাদের মনে যেসব বিষয় তোমাদের থেকে গোপন রেখেছে, তা আল্লাহ্র কাছে গোপন নয়। আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يُأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَكُونُوا كَالَّذِيْنَ كَفَرُوا وَقَالُوا لاخْوَانِهِمْ إِذَا ضَرَبُوا فِي الْأَرْضِ أَوْ كَانُوا غُزَّى لَوْ كَانُوا عِنْدَنَا مَا مَاتُوا وَمَا قُتِلُوا لِيَجْعَلَ اللهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ وَاللَّهُ يُحْيِ وَيُمِيتُ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ.
হে মু'মিনগণ! তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা কুফরী করে ও তাদের ভাইরা যখন দেশে দেশে সফর করে অথবা যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তাদের সম্পর্কে বলে, 'তারা যদি আমাদের নিকট থাকত, তবে তারা মরত না এবং নিহত হত না।' ফলে আল্লাহ্ এটাই তাদের মনস্তাপে পরিণত করেন, আল্লাহই জীবনদান করেন ও মৃত্যু ঘটান; তোমরা যা কর আল্লাহ্ তার সম্যক দ্রষ্টা। (৩: ১৫৬)।
📄 আল্লাহ্র রাস্তায় জীবনদান সম্পর্কে
অর্থাৎ সে সব মুনাফিকের মত হয়ো না, যারা তাদের ভাইদের আল্লাহ্ পথে জিহাদ করতে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী সফর করতে বাধা প্রদান করে এবং তাদের কেউ মৃত্যুবরণ করলে কিংবা নিহত হলে বলে যে, 'এরা আমাদের কথা মানলে মৃত্যুবরণ করত না নিহতও হতো না।
لِيَجْعَلَ اللَّهُ ذَلِكَ حَسْرَةً فِي قُلُوبِهِمْ
ফলে আল্লাহ্ এটাই তাদের মনস্তাপে পরিণত করেন (৩: ১৫৬)। তাদের প্রতিপালকের প্রতি তাদের বিশ্বাস গৌণ হওয়ার কারণে তারা এরূপ করে।
وَاللَّهُ يُحْي وَيُمِيتُ
আল্লাহই জীবনদান করেন এবং মৃত্যু ঘটান।
তিনি নিজ কুদরতে তার মৃত্যুর সময় থেকে যতটুকু ইচ্ছা বিলম্বিত করেন, আর যতটুকু ইচ্ছা তরান্বিত করেন।
وَلَئِن قُتِلْتُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ أَوْ مُتُمْ لَمَغْفِرَةٌ مِّنَ اللهِ وَرَحْمَةٌ خَيْرٌ مِّمَّا يَجْمَعُونَ
তোমরা আল্লাহ্র পথে নিহত হলে অথবা মৃত্যুবরণ করলে, যা তারা জমা করে আল্লাহর ক্ষমা এবং দয়া অবশ্য তা অপেক্ষা শ্রেয় (৩: ১৫৭)।
অর্থাৎ মৃত্যু তো অবধারিত, এ থেকে কেউ-ই রেহাই পাবে না। সুতরাং আল্লাহর পথের মৃত্যু ঐ দুনিয়া থেকে উত্তম, যা সঞ্চয় করার জন্য এই মুনাফিকরা জিহাদে অংশ গ্রহণ করা থেকে পেছনে থাকে এবং মৃত্যুকে ভয় করে। কেননা, তারা মরে গেলে কিংবা নিহত হলে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে বঞ্চিত হবে। এদের আখিরাতের কোন চিন্তা নেই।
وَلَئِن مُّتُّمْ أَوْ قُتِلْتُمْ لَا إِلَى اللَّهِ تُحْشَرُونَ .
এবং তোমাদের মৃত্যু হলে অথবা তোমরা নিহত হলে আল্লাহরই নিকট তোমাদের একত্র করা হবে (৩: ১৫৮)।
অর্থাৎ সর্বাবস্থায়ই যখন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে, তখন দুনিয়ার চাকচিক্যে তোমাদের ধোঁকায় পড়া উচিত নয়। আর তোমাদের নিকট জিহাদ এবং জিহাদে শরীক হওয়ার কারণে আল্লাহ্ যে সাওয়াবের প্রতি তোমাদের উৎসাহিত করেছেন, তার প্রতি তোমাদের আগ্রহশীল হওয়া উচিত।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কোমল স্বভাব সম্পর্কে
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنْتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لَا نُفَضُّوا مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِهِ فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكَّلِينَ
আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে। যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে তবে তারা তোমার আশপাশ হতে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদেরকে ক্ষমা কর এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। এরপর তুমি কোন সংকল্প করলে আল্লাহ্র উপর নির্ভর করবে; যারা নির্ভর করে আল্লাহ্ তাদের ভালবাসেন (৩: ১৫৯)।
এখানে আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের সাথে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নম্র স্বভাবের ও ধৈর্য-সহ্যের কথা উল্লেখ করেছেন কেননা, তারা হলো দুর্বল। আল্লাহ্ কর্তৃক ফরযকৃত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যে ত্রুটি হওয়ামাত্রই কঠোরতা অবলম্বন করা হলে তারা তা বরদাশত করতে সক্ষম হতো না। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলছেন, فَاعْفُ عَنْهُمْ তুমি তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা কর। وَاسْتَغْفِرْ لَهُمْ অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা মু'মিন, তাদের দ্বারা যখন কোন গুনাহ্ হয়ে যায় তখন তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর وَشَاوِرُهُمْ فِي الْأَمْرِ এবং কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। যাতে একথা তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, তুমি তাদের কথা শোন এবং তাদের সাহায্য গ্রহণ কর; যদিও তাদের পরামর্শ ও সাহায্য নেয়ার তোমার কোন প্রয়োজন নেই, তবে তুমি দীনের ব্যাপারে তাদের মন জয় করার জন্যই এরূপ করবে।