📄 মুজাহিদীনদের জন্য জান্নাত
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ جُهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّبِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনও জানেন না? (৩: ১৪২)। অর্থাৎ তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে এবং আমার পক্ষ থেকে সম্মানজনক সওয়াব হাসিল করে নিবে, অথচ এখন পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা নেইনি। যাতে আমি আমার প্রতি তোমাদের ঈমান আনার কারণে, তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তাতে তোমাদের সবরের নিষ্ঠা এবং বিপদে তোমাদের ধৈর্য ধারণ সম্পর্কে জেনে নিতে পারি। তোমরা শত্রুর সাথে (উহুদ যুদ্ধে) মুখোমুখী হওয়ার আগে ঐ সত্যের জন্য যার উপর তোমরা প্রতিষ্ঠিত শাহাদত লাভের আকাঙ্ক্ষা করছিলে।
অর্থাৎ যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হারানোর কারণে এবং শাহাদত লাভের আশায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে শত্রুর মুকাবিলায় বের হতে বাধ্য করেছে।
আল্লাহ্ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন: وَلَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَلْقَوْهُ فَقَدْ رَأَيْتُمُوهُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ
মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে তোমরা তা কামনা করতে, এখন তো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে (৩: ১৪৩)।
অর্থাৎ শত্রুদের হাতের তরবারিতে তোমরা মৃত্যুকে স্বচক্ষে দেখে নিয়েছিলে। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা তা তোমাদের থেকে প্রতিহত করেছেন।
📄 মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্র রাসূল
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَائِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يُنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللهُ الشَّكِرِينَ .
মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা সে নিহত হয়, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করবে না বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন (৩: ১৪৪)।
অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন এবং মুসলমানদের সাহস হারিয়ে পশ্চাদপসারণ করার কারণে, তোমরা ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে পূর্বের মত কাফির হয়ে যাবে? তোমরা কি শত্রুর সাথে যুদ্ধ জিহাদ করা, আল্লাহ্র কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাদের কাছে যে দীন রেখে গেছে, এসব কিছু ছেড়ে দিবে? অথচ সে আমার পক্ষ থেকে যে কিতাব নিয়ে এসেছে তাতে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, সে মৃত্যুবরণ করে তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যে পশ্চাদপসারণ করবে অর্থাৎ দীন থেকে ফিরে যাবে, যে আল্লাহর তা'আলার কোন ক্ষতি সাধন করবে না, অর্থাৎ এতে আল্লাহ্ তা'আলার ইজ্জত, রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব ও কুদরতে কোন প্রকার ক্ষতি সাধিত হবে না। আল্লাহ্ তা'আলা কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন, অর্থাৎ যারা তাঁর আনুগত্য করে এবং তাঁর নির্দেশ মান্য করে তাদের।
📄 মৃত্যুর সময় নির্ধারিত
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا كَانَ لِنَفْسٍ أَنْ تَمُوْتَ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ كِتَابًا مُؤَجَّلاً
আল্লাহ্ অনুমতি ব্যতীত কারও মৃত্যু হতে পারে না, যেহেতু তার মেয়াদ অবধারিত (৩: ১৪৫)।
অর্থাৎ নবী করীম (সা)-এর মৃত্যুর একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে, যখন সে নির্ধারিত সময় এসে যাবে তখন তাঁর মৃত্যু হবে। যখন আল্লাহ্ তা'আলা অনুমতি দিবেন তখনই তা ঘটবে।
وَمَنْ يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَنْ يُرِدْ ثَوَابَ الْآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّكِرِينَ.
কেউ পার্থিব পুরস্কার চাইলে আমি তাকে তার কিছু দেই এবং কেউ পারলৌকিক পুরস্কার চাইলে আমি তাকে তার কিছু এবং শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করব (৩: ১৪৫)।
অর্থাৎ তোমাদের মধ্যে যারা একমাত্র দুনিয়াতেই কামনা করে এবং আখিরাতের প্রতি তাদের কোন আগ্রহ নেই, আমি তাদের ভাগ্য মুতাবিক রিযিক দান করি, তার চেয়ে বেশী সে কিছুই পায় না। আর আখিরাতে তার কোন অংশ থাকে না। পক্ষান্তরে যে আখিরাতের লাভ খুঁজে আমি তাকে আখিরাতের অংশ দান করি এবং সাথে সাথে দুনিয়াতেও তার রিযিক নির্ধারিত করে দেই। এই প্রতিদান কৃতজ্ঞদের জন্য অর্থাৎ মুত্তাকীদের জন্য।
📄 পূর্ববর্তী নবীগণ এবং তাদের সহচর
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَكَأَيِّنْ مِّنْ نَّبِي قَتَلَ مَعَهُ رَبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّبِرِينَ.
এবং কত নবী যুদ্ধ করেছে তাদের সাথে বহু আল্লাহ্ ওয়ালা ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তাতে তারা হীনবল হয়নি, দুর্বল হয়নি এবং নত হয়নি। আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন (৩: ১৪৬)।
অর্থাৎ নবীকে হারিয়ে ফেলার কারণে তারা হীনবল হয়ে হয়ে পড়েনি। আর না তারা শত্রুর মুকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর না তারা জিহাদে পরাভূত হয়ে আল্লাহ্ ও তাঁর দীন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে। এটাই হল ধৈর্য। আল্লাহ্ তা'আলা ধৈর্যশীলদের ভালবাসেন।
وَمَا كَانَ قَولُهُمْ إِلَّا أَنْ قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَفِرِينَ.
এ কথা ব্যতীত তাদের আর কোন কথা ছিল না। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের পাপ এবং আমাদের কার্যে সীমা লংঘন তুমি ক্ষমা কর, আমাদের পা সুদৃঢ় রাখ এবং কাফির সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদের সাহায্য কর (৩: ১৪৭)।
ইবন হিশাম বলেন : الرَّبِّيِّينَ এর একবচন হলো رِبِّى আর তারা যে মানাত ইব্ন উদ্দ ইবন তাবিখা ইব্ন ইলয়াছ এর ছেলে যাব্বাকে الرَّابُّ বলতো তার কারণ এই যে, তারা সকলে সমবেত হয়ে পরস্পর মিত্রতাবদ্ধ হয়েছিল।
এ কারণে তারা الرَّابُّ বলে جماعة বা দলসমূহ বুঝায়। الرِّبابُ এর একবচন رَبَّة ও ربَّابَةُ অর্থ পেয়ালা কিংবা লাঠি সমষ্টি। এর সাথেই দলকে তুলনা করা হয়েছে।
যেমন আবূ যুআয়ব হুযালী বলেন:
وَكَانَهُنَّ رِبَابَةٌ وَكَأَنَّةً * يَسُرُّ يَفِيضُ عَلَى الْقِدَاحِ وَيَصْدَعُ
যেন তারা পেয়ালাসমষ্টি। আর যেন সে নরম ও সহজ পেয়ালায় পান করে এবং পরে তা ভেঙ্গে দেয়।
এ পংক্তিটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। কবি উমাইয়া ইবন আবূ সালত বলেন:
حَوْلَ شَيَاطِينِهِمْ أَبَابِيلُ رَبِـيُونُ شَدُّوا سِنَوْراً مَدْسُوراً
তাদের শয়তানগুলোর চারিপাশে সমবেত ঝাঁক, পেরেকযুক্ত বর্ম পরিহিত।
এই লাইনটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশ বিশেষ।
ইবন হিশাম বলেন: الربابة -এর আর একটি অর্থ হলো কাপড়ের টুকরা, যাতে পেয়ালা জড়িয়ে রাখা হয়।
ইবন হিশাম বলেন : السنور অর্থ বর্ম; الدسر অর্থ কড়ার পেরেক। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَحَمَلْنَاهُ عَلَى ذَاتِ ألْوَاحِ وَدُسُرٍ
তখন আমি নূহকে আরোহণ করালাম কাষ্ঠ ও কীলক নির্মিত এক নৌযানে (৫৪: ১৩)।
কবি আবূ আখযার হিম্মানী, তামীমের এই কবিতা বলেন:
دِسْراً بأطراف القنا المقوم
মজবুত বর্শার চারিদিক পেরেক দ্বারা শক্ত করে দাও।
ইবন ইসহাক বলেন: আয়াতের অর্থ এই যে, হে মুসলমানগণ, তৎকালীন উম্মতেরা যেমন বলেছিল তোমরাও তেমনি বল। আর মনে রেখ, যা কিছু হয়েছে তোমাদের গুনাহের কারণেই হয়েছে। সুতরাং তারা যেমন ইস্তিগফার করেছে, তোমরাও তেমনিভাবে ইস্তিগফার কর এবং তারা যেমন নিজ দীনের উপর অটল ছিল তোমরাও তেমনিভাবে নিজ দীনের উপর অটল থেকে তা বাস্তবায়িত করতে থাক। আর দীন ছেড়ে পশ্চাদপসরণ করো না। তারা যেমন অবিচল থাকার জন্য দু'আ করেছে, তোমরাও তেমনিভাবে দু'আ কর। তারা যেমন কাফিরদের উপর জয়লাভ করার জন্য দু'আ করেছিল, তোমরাও তেমনিভাবে দু'আ কর। এ সবগুলো ছিল পূর্বযুগের উম্মতের কথা। তাদের নবীরা নিহত হয়েছিল কিন্তু তারা তোমাদের মত আচরণ করেনি।
فَأَتَاهُمُ اللَّهُ ثَوَابَ الدُّنْيَا وَحُسْنَ ثَوَابِ الآخِرَةِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ.
এরপর আল্লাহ্ তাদেরকে পার্থিব পুরস্কার এবং উত্তম পারলৌকিক পুরস্কার দান করেন। আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন (৩: ১৪৮)।