📄 আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য
আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন : وَأَطِيعُوا اللهَ وَالرَّسُولُ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা কৃপালাভ করতে পার (৩: ১৩২)। এখানে সে সব লোকদের নিন্দা করা হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঐসব নির্দেশ অমান্য করেছে, যা উহুদের যুদ্ধে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া হয়েছিল।
وَسَارِعُوا إِلى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ. তোমরা ধাবমান হও আপন প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য (৩: ১৩৩)। অর্থাৎ এ জান্নাত ঐসব লোকদের আবাসস্থল যারা আমার এবং আমার রাসূলের আনুগত্য করে।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّراء والضراء والكظِمِينَ الغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ .
যারা সচ্ছল এবং অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন (৩: ১৩৪)।
অর্থাৎ, এই গুণগুলোই হলো ইহসান। যে-ই এ গুণের অধিকারী হবে, আমি তাকে ভালবাসব। আল্লাহ্ আরো বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إلا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ .
এবং যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে, আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ্ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না (৩: ১৩৫)।
অর্থাৎ তাদের দ্বারা কোন অশ্লীল কাজ হয়ে গেলে কিংবা তারা কোন গুনাহ করে নিজের উপর যুলুম করে ফেললে। তাদের মনে হয় যে আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো নিষেধ করেছেন এবং এগুলো তাদের জন্য হারাম করেছেন। ফলে তারা তওবা ও ইস্তিগফার করে নেয় এবং বুঝে নেয় যে, এসব গুনাহ্ কিংবা অপরাধ শুধুমাত্র আল্লাহই ক্ষমা করতে পারেন।
وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ - আর তারা জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না (৩: ১৩৫)।
অর্থাৎ এরা সেই মুশরিকদের মত নিজেদের গুনাহের উপর অনড় থাকে না। মুশরিকরা তো নিজেদের কুফরের উপর বাড়াবাড়ি করে, অথচ তারা জানে যে, তাদের উপর আমি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা হারাম করেছি। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
أولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مُغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَجَنَّتُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ العملين.
ওরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম! (৩: ১৩৬)।
📄 মিথ্যাশ্রয়ীদের পরিণাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা মুসলমানদের উপর নাযিলকৃত বিপদাপদ, তাদের উপর আপতিত পরীক্ষাসমূহ ও তাদের মাধ্যে যাদেরকে শাহাদতের জন্য মনোনীত করেছেন, তা আলোচনা করেন।
সুতরাং মুসলমানদের সান্ত্বনাদান, তাদের কৃতকর্মের প্রশংসা ও তাদের প্রতিদানের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِكُمْ سُنَنٌ فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ.
তোমাদের পূর্বে বহু বিধানগত হয়েছে, সুতরাং তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ কর এবং দেখ মিথ্যাশ্রয়ীদের কি পরিণাম (৩: ১৩৭)।
অর্থাৎ 'আদ, ছামুদ, লূত ও আসহাবে মাদয়ান যারা আমার রাসূলদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল আমার সাথে শরীক করেছিল। তাদের শাস্তি ও প্রতিশোধে যে সব ঘটনাবলী অতীতে আমি ঘটিয়েছি, তা পর্যবেক্ষণ কর। এখনও যারা তাদের মত আচরণ করবে, তাদের পরিণামও তাই হবে। আসলে আমি তাদেরকে ঢিল দিয়েছি, যাতে মুসলমানদের পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে যে পরাভূত করে কাফিরদের দল সামান্য মজবুত করে দেয়া হয়েছিল, এর কারণে এ ধারণা যেন না হয় যে, আমার ও তোমাদের (মুসলমানদের) শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ নেয়া হবে না।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
هذا بَيَانُ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَمَوْعِظَةٌ لِلْمُتَّقِينَ.
এটা মানবজাতির জন্য স্পষ্ট বর্ণনা এবং মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত ও উপদেশ। (৩: ১৩৮)
অর্থাৎ এটা লোকদের জন্য ব্যাখ্যা স্বরূপ, যদি তারা হিদায়াত ও উপদেশ গ্রহণ করে নেয়।
هُدًى وَمَوْعِظَةٌ অর্থ নূর ও আদব। لِّلْمُتَّقِينَ অর্থ যে আমার আনুগত্য করে এবং আমার নির্দেশ সম্পর্কে অবগত।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا
তোমরা হীনবল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না (৩: ১৩৯)। অর্থাৎ তোমরা দুর্বল হয়ে পড়ো না এবং তোমাদের এ বিপদের কারণে তোমরা নিরাশ হয়ে যেও না।
وَأَنْتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِنْ كُنْتُمْ مُّؤْمِنِينَ
বরং তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা মু'মিন হও। (৩: ১৩৯)।
অর্থাৎ আমার রাসূল আমার পক্ষ থেকে যা কিছু তোমাদের কাছে এনেছে, যদি তোমরা তা পুরোপুরি সত্য প্রতিপন্ন করতে থাক, তবে বিজয় ও সাহায্য তোমরাই পাবে।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: إِن يَمْسَسْكُمْ قَرْحٌ فَقَدْ مَسَّ الْقَوْمَ قَرْحٌ مِّثْلُهُ وَتِلْكَ الْأَيَّامُ نُدَاوِلُهَا بَيْنَ النَّاسِ
যদি তোমাদের আঘাত লেগে থাকে, তবে অনুরূপ আঘাত তাদেরও তো লেগেছে। মানুষের মধ্যে এই দিনগুলোর পর্যায়ক্রমে আমি আবর্তন ঘটাই (৩: ১৪০)। অর্থাৎ লোকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য একবার কাউকে এবং অন্যবার অন্যকে শক্তি ও রাজত্ব দান করি।
وَلِيَعْلَمَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا وَيَتَّخِذَ مِنْكُمْ شُهَدَاءَ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الظَّلِمِينَ
যাতে আল্লাহ্ মু'মিনগণকে জানতে পারেন এবং তোমাদের মধ্য হতে কতককে শহীদরূপে গ্রহণ করতে পারেন এবং আল্লাহ্ যালিমদের পছন্দ করেন না (৩: ১৪০)। অর্থাৎ আল্লাহ্ মু'মিন ও মুনাফিকদের মাঝে পার্থক্য করার জন্য এবং মু'মিনদের মধ্যে যাদের সৌভাগ্য দান করার ইচ্ছা তাদেরকে শাহাদতের সৌভাগ্য দান করার জন্য এরূপ করেন। আলোচ্য আয়াতে যালিম দ্বারা মুনাফিকদের বুঝানো হয়েছে, যারা মুখে তো ঈমানের কথা প্রকাশ করতো, কিন্তু তাদের অন্তর নাফরমানীতে ভরা ছিল।
وَلِيُمَحِّصَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا
এবং যাতে আল্লাহ্ মু'মিনদেরকে পরিশোধন করতে পারেন (৩: ১৪১)। অর্থাৎ যাতে প্রকৃত মু'মিনদের পরীক্ষা হয়ে যায় এবং একথাও জানা যয়ে যায় যে, তাদের মাঝে কি পরিমাণ সবর, সহনশীলতা ও বিশ্বাস বিদ্যমান রয়েছে।
وَيَمْحَقَ الْكَفِرِينَ
আর যাতে তিনি কাফিরদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে পারেন (৩: ১৪১)। অর্থাৎ যাতে মুনাফিকদের মুখের সে সব কথা বাতিল করতে পারেন, যা তাদের অন্তরে নেই, যার ফলে তাদের মনের লুকায়িত কুফর প্রকাশ পেয়ে যায়।
📄 মুজাহিদীনদের জন্য জান্নাত
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: أَمْ حَسِبْتُمْ أَنْ تَدْخُلُوا الْجَنَّةَ وَلَمَّا يَعْلَمُ اللَّهُ الَّذِينَ جُهَدُوا مِنْكُمْ وَيَعْلَمَ الصَّبِرِينَ
তোমরা কি মনে কর যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে, যখন আল্লাহ্ তোমাদের মধ্যে কে জিহাদ করেছে এবং কে ধৈর্যশীল তা এখনও জানেন না? (৩: ১৪২)। অর্থাৎ তোমরা কি মনে করেছ যে, তোমরা এমনিতেই জান্নাতে চলে যাবে এবং আমার পক্ষ থেকে সম্মানজনক সওয়াব হাসিল করে নিবে, অথচ এখন পর্যন্ত আমি তোমাদেরকে বিপদের মাধ্যমে পরীক্ষা নেইনি। যাতে আমি আমার প্রতি তোমাদের ঈমান আনার কারণে, তোমাদের উপর যে বিপদ আসে, তাতে তোমাদের সবরের নিষ্ঠা এবং বিপদে তোমাদের ধৈর্য ধারণ সম্পর্কে জেনে নিতে পারি। তোমরা শত্রুর সাথে (উহুদ যুদ্ধে) মুখোমুখী হওয়ার আগে ঐ সত্যের জন্য যার উপর তোমরা প্রতিষ্ঠিত শাহাদত লাভের আকাঙ্ক্ষা করছিলে।
অর্থাৎ যারা বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার সুযোগ হারানোর কারণে এবং শাহাদত লাভের আশায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে শত্রুর মুকাবিলায় বের হতে বাধ্য করেছে।
আল্লাহ্ তা'আলা তাদের সম্পর্কে বলেন: وَلَقَدْ كُنْتُمْ تَمَنَّوْنَ الْمَوْتَ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَلْقَوْهُ فَقَدْ رَأَيْتُمُوهُ وَأَنْتُمْ تَنْظُرُونَ
মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়ার পূর্বে তোমরা তা কামনা করতে, এখন তো তোমরা তা স্বচক্ষে দেখলে (৩: ১৪৩)।
অর্থাৎ শত্রুদের হাতের তরবারিতে তোমরা মৃত্যুকে স্বচক্ষে দেখে নিয়েছিলে। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা তা তোমাদের থেকে প্রতিহত করেছেন।
📄 মুহাম্মদ (সা) আল্লাহ্র রাসূল
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ أَفَائِنْ مَّاتَ أَوْ قُتِلَ انْقَلَبْتُمْ عَلَى أَعْقَابِكُمْ وَمَنْ يُنْقَلِبْ عَلَى عَقِبَيْهِ فَلَنْ يَضُرَّ اللهَ شَيْئًا وَسَيَجْزِي اللهُ الشَّكِرِينَ .
মুহাম্মদ একজন রাসূল মাত্র; তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। সুতরাং যদি সে মারা যায় অথবা সে নিহত হয়, তবে তোমরা কি পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে? এবং কেউ পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করবে না বরং আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন (৩: ১৪৪)।
অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম নিহত হয়েছেন এবং মুসলমানদের সাহস হারিয়ে পশ্চাদপসারণ করার কারণে, তোমরা ইসলাম থেকে বিমুখ হয়ে পূর্বের মত কাফির হয়ে যাবে? তোমরা কি শত্রুর সাথে যুদ্ধ জিহাদ করা, আল্লাহ্র কিতাব এবং রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাদের কাছে যে দীন রেখে গেছে, এসব কিছু ছেড়ে দিবে? অথচ সে আমার পক্ষ থেকে যে কিতাব নিয়ে এসেছে তাতে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে যে, সে মৃত্যুবরণ করে তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। আর যে পশ্চাদপসারণ করবে অর্থাৎ দীন থেকে ফিরে যাবে, যে আল্লাহর তা'আলার কোন ক্ষতি সাধন করবে না, অর্থাৎ এতে আল্লাহ্ তা'আলার ইজ্জত, রাজত্ব, সার্বভৌমত্ব ও কুদরতে কোন প্রকার ক্ষতি সাধিত হবে না। আল্লাহ্ তা'আলা কৃতজ্ঞদের পুরস্কৃত করবেন, অর্থাৎ যারা তাঁর আনুগত্য করে এবং তাঁর নির্দেশ মান্য করে তাদের।