📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ফেরেশতা দিয়ে সাহায্যের সুসংবাদ

📄 ফেরেশতা দিয়ে সাহায্যের সুসংবাদ


إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ اَلَنْ يَكْفِيكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَثَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُنْزَلِينَ. بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَا نُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ أَلْفَ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُسَوَّمِيْنَ.
স্মরণ কর, যখন তুমি মু'মিনদের বলছিলে, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সহায়তা করবেন? হ্যাঁ, নিশ্চয়, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং সাবধান হয়ে চল, আর তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের উপর আক্রমণ করে তাহলে আল্লাহ্ পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন (৩: ১২৪-১২৫)।
অর্থাৎ (আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,) তোমরা যদি আমার শত্রুর মুকাবিলায় ধৈর্যধারণ কর এবং আমার নির্দেশ পালন কর, আর এ সময় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ করে বসে, তখন আমি পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করব।
ইবন হিশাম বলেন : مُسَومين অর্থ مُعْلِمِينَ অর্থাৎ চিহ্নিত। হাসান ইব্‌ন আবুল হাসান বসরী (র) থেকে আমাদের কাছে এ তথ্য পৌঁছেছে। তিনি বলেন: সেসব ফেরেশতাদের ঘোড়াগুলোর লেজ ও ললাটে সাদা পশমী সুতার চিহ্ন ছিল। তবে ইন্ন ইসহাক বলেন: বদরের যুদ্ধে ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল সাদা পাগড়ী। (ইবন হিশাম বলেন) বদরের আলোচনা প্রসঙ্গে আমি এ কথা উল্লেখ করেছি।
سيمًا অর্থ আলামত, চিহ্ন।
পবিত্র কুরআনে আছে: سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ .
অর্থাৎ তাদের মুখমণ্ডলে, সিজদার হিহ্ন থাকবে (৪৮: ২৯)।
এখানে سَيَمَاهُمْ অর্থ عَلَامَتُهُمْ তাদের চিহ্নসমূহ, অর্থাৎ তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র উল্লেখ আছে: حِجَارَةً مِّنْ سِجِّيلٍ مَنْضُورٍ ، مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ .
অর্থাৎ এবং আমি তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর, কঙ্কর যা তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত ছিল (১১: ৮২-৮৩)।
এখানেও مُسَوَّمَةٌ অর্থ مُعَلَمَةٌ চিহ্নিত।
(ইবন হিশাম বলেন:) আমার কাছে হাসান ইব্‌ন আবুল হাসান বসরী (র) সূত্রে এ তথ্য পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন যে, সে পাথরগুলোতে এমন কিছু নির্দশন ছিল, যা প্রমাণ করছিল যে, তা দুনিয়ার পাথর নয় বরং তা ছিল আযাবের পাথর।
রুবা ইব্‌ন আজ্জাজ বলেন:
فالان تبلى مبي الجياد السهم * وَلَا تُجَارِينِي إِذا ما سَوَّمُوا
و شخصت إبصارهم وأجدموا
এখন আমাকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উত্তম ঘোড়া পরীক্ষায় ফেলে এবং তারা আমাকে নিষ্কৃতি দেয় না, যখন তাদের উপর চিহ্ন লাগানো হয়, আর তাদের চোখ বিস্ফারিত হয় এবং তারা দ্রুত চলে যায়।
এগুলো তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
مُسَوَّمَةٌ শব্দটি مَرْعَيّة )যে জন্তুকে চরানো হয়) অর্থে ব্যবহার হয়।
পবিত্র কুরআনে আছে: وَالْخَيْلُ الْمُسَوَّمَةِ অর্থাৎ আর চিহ্নিত অশ্বরাজি (৩:১৪)।
شَجَرُ فِيْهِ تُسَيْمُونَ অর্থাৎ যাতে তোমরা পশুচারণ করিয়ে থাক (১৬: ১০)।
আরবরা বলে থাকে : سوم خيله وأبله ، وأسامها অর্থাৎ সে তার ঘোড়া ও উটসমূহ চরালো। কুমায়ত ইন্ন যায়দ আবৃত্তি করেন:
راعيا كان مسجحا ففقدنا * ه وفقد المسيم هلك السوام
তিনি ছিলেন উত্তমরূপে রাখালের দায়িত্ব পালনকারী, আমরা তাকে হারালাম আর রাখলকে হারানো মানেই পশু পাল ধ্বংস হওয়া।
ইবন হিশাম বলেন: مسجحا অর্থ উত্তমরূপে রাখালের দায়িত্ব পালনকারী। এই পংক্তিটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাহায্য কেবল আল্লাহ্রই

📄 সাহায্য কেবল আল্লাহ্রই


আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا جَعَلَهُ اللهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ.
আল্লাহ্ তো এটাকে কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ ও তোমাদের চিত্ত-প্রশান্তির-হেতু করেছেন এবং সাহায্য শুধু পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতেই হয় (৩: ১২৬)।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: আমার যে সব ফেরেশতা সৈন্য তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেছি, তা শুধু এ জন্য যে তোমাদের অন্তরে যেন প্রশান্তি লাভ হয়। কেননা, তোমাদের দুর্বলতা আমার জানা রয়েছে, আর সাহায্য তো একমাত্র আমার কাছ থেকেই হতে পারে। কেননা, একমাত্র আমিই তো ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। আর এটা এজন্যে যে, মর্যাদা ও হুকুম করার অধিকার একমাত্র আমারই, আমার কোন সৃষ্টির নয়।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
لِيَقْطَعَ طَرَفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَوْ يَكْبِتَهُمْ فَيَنْقَلِبُوا خَائِبِينَ.
কাফিরদের এক অংশকে নিশ্চিহ্ন করার অথবা লাঞ্ছিত করার জন্য, ফলে তারা নিরাশ হয়ে ফিরে যায় (৩: ১২৭)।
অর্থাৎ যাতে তিনি মুশরিকদের কতককে হত্যার মাধ্যমে ধ্বংস করে দেন, তাদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার লক্ষ্যে অথবা তাদের ব্যর্থ মনোরথ করে ফিরিয়ে দেন অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছে তাদের ব্যর্থ করে ফিরিয়ে দেন। তারা যা আশা করেছিল তার কিছুই তারা লাভ করতে পারেনি।
ইবন হিশম বলেন : يَكْبُتَهُمْ অর্থাৎ তিনি তাদের কঠিন পেরেশানীতে ফেলে দেবেন এবং তাদের উদ্দেশ্য পণ্ড করে দেবেন।
কবি যুররুম্মাহ্ বলেন:
ما انس من شجن لا أنس موقفنا * في حيرة بين مسرور و مكبوت
দুঃখ আমি যতই ভুলে যাই, কিন্তু সে পরিস্থিতির কথা আমি ভুলি না, যা ছিল আনন্দ ও পরাজয়ের মধ্যবর্তী হতভম্বতার অবস্থা।
يَكْبُتَهُمْ (এর আর একটি অর্থ হলো: তাদের অধোমুখে ফেলে দেবেন।
ইন্ন ইসহাক বলেন: এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظُلِمُونَ .
তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন-এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছুই নেই, কারণ তারা যালিম (৩: ১২৮)।
অর্থাৎ আমার বান্দাদের ব্যাপারে তোমার কোন নির্দেশ চলতে পারে না। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমি তোমাকে যে নির্দেশ দেই অথবা দয়া পরবশ হয়ে তাদের ক্ষমা করে দেই; তবে ইচ্ছা করলে আমি তাদের ক্ষমা করতে পারি; কিংবা ইচ্ছা করলে আমি তাদের গুনাহের কারণে শাস্তি দিতে পারি। আর এটা আমার হক।
فَأَنَّهُمْ ظَلَمُونَ অর্থাৎ তারা আমার অবাধ্য হয়ে এ শাস্তির যোগ্য হয়েছে।
وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থাৎ আল্লাহ্ আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের গুনাহ্ করা সত্ত্বেও তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের প্রতি রহম করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সুদ হারাম হওয়া সম্পর্কে

📄 সুদ হারাম হওয়া সম্পর্কে


এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا الرِّبُوا أَضْعَافًا مُضَاعَفَةٌ
হে মু'মিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেও না (৩: ১৩০)। অর্থাৎ যখন তোমরা বিধর্মী ছিলে, তখন তোমাদের ধর্মকর্তৃক হারামকৃত যে সব বস্তু তোমরা ভক্ষণ করতে, এখন আল্লাহ্ত্কর্তৃক হিদায়েতপ্রাপ্ত হয়ে, ইসলামে দীক্ষিত হওয়ার পর, তা ভক্ষণ করো না।
وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার (৩: ১৩০)। অর্থাৎ আল্লাহর আনুগত্য কর, আশা করা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের যে শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, তা থেকে তোমরা পরিত্রাণ পাবে এবং তিনি যে সওয়াবের প্রতি তোমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন, তা তোমরা লাভ করতে পারবে।
وَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ এবং তোমরা সেই আগুনকে ভয় করো, যা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে (৩: ১৩১)। অর্থাৎ আমাকে অস্বীকারকারীদের জন্য যে জাহান্নام আবাসস্থল হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সুতরাং তাকে ভয় কর।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য

📄 আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য


আল্লাহ্ তা'আলা আরও বলেন : وَأَطِيعُوا اللهَ وَالرَّسُولُ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা কৃপালাভ করতে পার (৩: ১৩২)। এখানে সে সব লোকদের নিন্দা করা হয়েছে যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ঐসব নির্দেশ অমান্য করেছে, যা উহুদের যুদ্ধে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া হয়েছিল।
وَسَارِعُوا إِلى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَوتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ. তোমরা ধাবমান হও আপন প্রতিপালকের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে, যার বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের ন্যায়, যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকীদের জন্য (৩: ১৩৩)। অর্থাৎ এ জান্নাত ঐসব লোকদের আবাসস্থল যারা আমার এবং আমার রাসূলের আনুগত্য করে।
আল্লাহ্ তা'আলা আরো বলেন:
الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّراء والضراء والكظِمِينَ الغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ .
যারা সচ্ছল এবং অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে এবং যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল; আল্লাহ্ সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন (৩: ১৩৪)।
অর্থাৎ, এই গুণগুলোই হলো ইহসান। যে-ই এ গুণের অধিকারী হবে, আমি তাকে ভালবাসব। আল্লাহ্ আরো বলেন:
وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنْفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ وَمَنْ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إلا اللهُ وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ .
এবং যারা কোন অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে, আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ্ ব্যতীত কে পাপ ক্ষমা করবে? এবং তারা যা করে ফেলে, জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না (৩: ১৩৫)।
অর্থাৎ তাদের দ্বারা কোন অশ্লীল কাজ হয়ে গেলে কিংবা তারা কোন গুনাহ করে নিজের উপর যুলুম করে ফেললে। তাদের মনে হয় যে আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো নিষেধ করেছেন এবং এগুলো তাদের জন্য হারাম করেছেন। ফলে তারা তওবা ও ইস্তিগফার করে নেয় এবং বুঝে নেয় যে, এসব গুনাহ্ কিংবা অপরাধ শুধুমাত্র আল্লাহই ক্ষমা করতে পারেন।
وَلَمْ يُصِرُّوا عَلَى مَا فَعَلُوا وَهُمْ يَعْلَمُونَ - আর তারা জেনে শুনে তারই পুনরাবৃত্তি করে না (৩: ১৩৫)।
অর্থাৎ এরা সেই মুশরিকদের মত নিজেদের গুনাহের উপর অনড় থাকে না। মুশরিকরা তো নিজেদের কুফরের উপর বাড়াবাড়ি করে, অথচ তারা জানে যে, তাদের উপর আমি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা হারাম করেছি। এরপর আল্লাহ্ বলেন:
أولَئِكَ جَزَاؤُهُمْ مُغْفِرَةٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَجَنَّتُ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ خَلِدِينَ فِيهَا وَنِعْمَ أَجْرُ العملين.
ওরাই তারা, যাদের পুরস্কার তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে ক্ষমা এবং এমন জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কত উত্তম! (৩: ১৩৬)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00