📄 আল্লাহ্ তা'আলা উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে যে সব আয়াত নাযিল করেন
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বর্ণনাকারী বলেন; আমাদের কাছে আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইব্ন্ন হিশাম বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন: আমাদের কাছে যিয়াদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ বাক্বায়ী মুহাম্মদ ইবন ইসহাক মুত্তালিবী সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উহুদের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের যে অংশ নাযিল করেন তা হলো সূরা আল-ইমরানের ৬০টি আয়াত। এই আয়াতগুলোতে ঘটনার বিবরণ এবং আল্লাহ্ তা'আলা যাদের তিরস্কার করেছেন, সে তিরস্কারের আলোচনা রয়েছে।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন:
وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَرِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلَيْمٌ.
স্মরণ কর, যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের নিকট হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্য মু'মিনদেরকে ঘাঁটিতে বিনস্ত করছিলে; এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ; (৩: ১২১)।
ইব্ন হিশাম বলেন: تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ তাদের জন্য বসার ও অবস্থানের স্থান নির্ধারণ করছিলে। কুমায়ত ইব্ন যায়দ বলেন:
ليتنى كنت قبله * قد تبوأت مضجعا
হায়! যদি আমি তার পূর্বেই শোয়ার জায়গা প্রস্তুত করে নিতাম।
এই পংক্তিটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। (سميع ، عليم) অর্থাৎ তোমরা যা বল, তা তিনি শোনেন এবং তোমরা যা গোপন কর, তা তিনি জানেন।
اذهمتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلاً
যখন তোমাদের মাঝে দু'দলের সাহস হারাবার উপক্রম হয়েছিল (৩: ১২২)।
تَفْشَلًا অর্থ تتخاذلا তোমাদের মনোবল হারাবার উপক্রম হয়েছিল। الطائفتان দু'টি দল অর্থাৎ বনূ সালামা ইব্ন জুশম ইব্ন খাযরাজ ও আওস গোত্রের বনু হারিসা ইব্ন নাবীত, এরাই ছিল সৈন্যদলের উভয় বাহু।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَاللَّهُ وَلِيُّهُا এবং আল্লাহ্ উভয়ের সহায়ক ছিলেন (৩: ১২২)। অর্থাৎ তারা যে সাহস হারা হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছিল, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের থেকে তা দূর করে দেন। এদের এভাবে সাহস হারানোর একমাত্র কারণ ছিল যে, এরা দুর্বল ও কাতর হয়ে পড়েছিল। দীনের ব্যাপারে সংশয়ের কারণে নয়। তখন আল্লাহ্ তা'আলা নিজ রহমতে তাদের অন্তর থেকে থেকে এ অবস্থা দূর করে দেন। ফলে দুর্বলতা থেকে মুক্তি লাভ করে তাঁরা তাদের নবীর সংগে মিলিত হল।
ইব্ন হিশাম বলেন: আসাদ গোত্রের জনৈক পণ্ডিত ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, এ দু'টি দল বলতে লাগল: আমরা যে সাহসহারা হওয়ার উপক্রম হয়েছিলাম তা না হওয়া আমাদের কাছে পছন্দনীয় ছিল না। কারণ সাহসহারা হওয়ার ফলেই তো আল্লাহ্ আমাদের সহায়ক হয়েছেন।
📄 আল্লাহ্ তা'আলার উপর ভরসা
ইবন ইসহাক বলেছেন: আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ .
আল্লাহ্র প্রতিই যেন মু'মিনগণ নির্ভর করে (৩: ১২২)।
অর্থাৎ মু'মিনদের মধ্যে যে ব্যক্তি দুর্বলতা অনুভব করবে, সে যেন আল্লাহ্র উপর ভরসা করে, আল্লাহ্র কাছেই সাহায্য চায়। আল্লাহ্ তাকে তার ব্যাপারে অবশ্যই সাহায্য করবেন। আল্লাহ্ তার পক্ষ হয়ে শত্রু দমন করবেন; এভাবে সে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। তিনি তার থেকে যাবতীয় ক্ষতিকর বিষয়াদি দূর করে দেবেন। তার উদ্দেশ্য সফল করার ক্ষেত্রে শক্তি সঞ্চার করবেন।
وَلَقَدْ نَصَرَ كُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَاَنْتُمْ اَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ.
এবং বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ্ তো তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর (৩: ১২৩)।
অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় কর, এটাই তাঁর নিয়ামতের শুকর। আল্লাহ্ তা'আলা বদরের দিন তোমাদের সাহায্য করেন, অথচ সেদিন তোমরা সংখ্যায় ছিলে কম, শক্তিতে ছিলে দুর্বল।
📄 ফেরেশতা দিয়ে সাহায্যের সুসংবাদ
إِذْ تَقُولُ لِلْمُؤْمِنِينَ اَلَنْ يَكْفِيكُمْ أَنْ يُمِدَّكُمْ رَبُّكُمْ بِثَلَثَةِ أَلْفِ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُنْزَلِينَ. بَلَى إِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَا نُوكُمْ مِنْ فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُمْ بِخَمْسَةِ أَلْفَ مِّنَ الْمَلَئِكَةِ مُسَوَّمِيْنَ.
স্মরণ কর, যখন তুমি মু'মিনদের বলছিলে, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয় যে, তোমাদের প্রতিপালক প্রেরিত তিন হাজার ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সহায়তা করবেন? হ্যাঁ, নিশ্চয়, যদি তোমরা ধৈর্যধারণ কর এবং সাবধান হয়ে চল, আর তারা দ্রুতগতিতে তোমাদের উপর আক্রমণ করে তাহলে আল্লাহ্ পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন (৩: ১২৪-১২৫)।
অর্থাৎ (আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,) তোমরা যদি আমার শত্রুর মুকাবিলায় ধৈর্যধারণ কর এবং আমার নির্দেশ পালন কর, আর এ সময় শত্রুরা তোমাদের উপর আক্রমণ করে বসে, তখন আমি পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করব।
ইবন হিশাম বলেন : مُسَومين অর্থ مُعْلِمِينَ অর্থাৎ চিহ্নিত। হাসান ইব্ন আবুল হাসান বসরী (র) থেকে আমাদের কাছে এ তথ্য পৌঁছেছে। তিনি বলেন: সেসব ফেরেশতাদের ঘোড়াগুলোর লেজ ও ললাটে সাদা পশমী সুতার চিহ্ন ছিল। তবে ইন্ন ইসহাক বলেন: বদরের যুদ্ধে ফেরেশতাদের চিহ্ন ছিল সাদা পাগড়ী। (ইবন হিশাম বলেন) বদরের আলোচনা প্রসঙ্গে আমি এ কথা উল্লেখ করেছি।
سيمًا অর্থ আলামত, চিহ্ন।
পবিত্র কুরআনে আছে: سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ .
অর্থাৎ তাদের মুখমণ্ডলে, সিজদার হিহ্ন থাকবে (৪৮: ২৯)।
এখানে سَيَمَاهُمْ অর্থ عَلَامَتُهُمْ তাদের চিহ্নসমূহ, অর্থাৎ তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র উল্লেখ আছে: حِجَارَةً مِّنْ سِجِّيلٍ مَنْضُورٍ ، مُسَوَّمَةً عِنْدَ رَبِّكَ .
অর্থাৎ এবং আমি তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পাথর, কঙ্কর যা তোমার প্রতিপালকের নিকট চিহ্নিত ছিল (১১: ৮২-৮৩)।
এখানেও مُسَوَّمَةٌ অর্থ مُعَلَمَةٌ চিহ্নিত।
(ইবন হিশাম বলেন:) আমার কাছে হাসান ইব্ন আবুল হাসান বসরী (র) সূত্রে এ তথ্য পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন যে, সে পাথরগুলোতে এমন কিছু নির্দশন ছিল, যা প্রমাণ করছিল যে, তা দুনিয়ার পাথর নয় বরং তা ছিল আযাবের পাথর।
রুবা ইব্ন আজ্জাজ বলেন:
فالان تبلى مبي الجياد السهم * وَلَا تُجَارِينِي إِذا ما سَوَّمُوا
و شخصت إبصارهم وأجدموا
এখন আমাকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উত্তম ঘোড়া পরীক্ষায় ফেলে এবং তারা আমাকে নিষ্কৃতি দেয় না, যখন তাদের উপর চিহ্ন লাগানো হয়, আর তাদের চোখ বিস্ফারিত হয় এবং তারা দ্রুত চলে যায়।
এগুলো তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
مُسَوَّمَةٌ শব্দটি مَرْعَيّة )যে জন্তুকে চরানো হয়) অর্থে ব্যবহার হয়।
পবিত্র কুরআনে আছে: وَالْخَيْلُ الْمُسَوَّمَةِ অর্থাৎ আর চিহ্নিত অশ্বরাজি (৩:১৪)।
شَجَرُ فِيْهِ تُسَيْمُونَ অর্থাৎ যাতে তোমরা পশুচারণ করিয়ে থাক (১৬: ১০)।
আরবরা বলে থাকে : سوم خيله وأبله ، وأسامها অর্থাৎ সে তার ঘোড়া ও উটসমূহ চরালো। কুমায়ত ইন্ন যায়দ আবৃত্তি করেন:
راعيا كان مسجحا ففقدنا * ه وفقد المسيم هلك السوام
তিনি ছিলেন উত্তমরূপে রাখালের দায়িত্ব পালনকারী, আমরা তাকে হারালাম আর রাখলকে হারানো মানেই পশু পাল ধ্বংস হওয়া।
ইবন হিশাম বলেন: مسجحا অর্থ উত্তমরূপে রাখালের দায়িত্ব পালনকারী। এই পংক্তিটি তার একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
📄 সাহায্য কেবল আল্লাহ্রই
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَمَا جَعَلَهُ اللهُ إِلَّا بُشْرَى لَكُمْ وَلِتَطْمَئِنَّ قُلُوبُكُمْ بِهِ وَمَا النَّصْرُ إِلَّا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ.
আল্লাহ্ তো এটাকে কেবল তোমাদের জন্য সুসংবাদ ও তোমাদের চিত্ত-প্রশান্তির-হেতু করেছেন এবং সাহায্য শুধু পরাক্রান্ত প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হতেই হয় (৩: ১২৬)।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: আমার যে সব ফেরেশতা সৈন্য তোমাদের জন্য নির্ধারিত করেছি, তা শুধু এ জন্য যে তোমাদের অন্তরে যেন প্রশান্তি লাভ হয়। কেননা, তোমাদের দুর্বলতা আমার জানা রয়েছে, আর সাহায্য তো একমাত্র আমার কাছ থেকেই হতে পারে। কেননা, একমাত্র আমিই তো ক্ষমতা ও শক্তির অধিকারী। আর এটা এজন্যে যে, মর্যাদা ও হুকুম করার অধিকার একমাত্র আমারই, আমার কোন সৃষ্টির নয়।
এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
لِيَقْطَعَ طَرَفًا مِّنَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَوْ يَكْبِتَهُمْ فَيَنْقَلِبُوا خَائِبِينَ.
কাফিরদের এক অংশকে নিশ্চিহ্ন করার অথবা লাঞ্ছিত করার জন্য, ফলে তারা নিরাশ হয়ে ফিরে যায় (৩: ১২৭)।
অর্থাৎ যাতে তিনি মুশরিকদের কতককে হত্যার মাধ্যমে ধ্বংস করে দেন, তাদের থেকে প্রতিশোধ নেয়ার লক্ষ্যে অথবা তাদের ব্যর্থ মনোরথ করে ফিরিয়ে দেন অর্থাৎ তাদের মধ্যে যারা অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছে তাদের ব্যর্থ করে ফিরিয়ে দেন। তারা যা আশা করেছিল তার কিছুই তারা লাভ করতে পারেনি।
ইবন হিশম বলেন : يَكْبُتَهُمْ অর্থাৎ তিনি তাদের কঠিন পেরেশানীতে ফেলে দেবেন এবং তাদের উদ্দেশ্য পণ্ড করে দেবেন।
কবি যুররুম্মাহ্ বলেন:
ما انس من شجن لا أنس موقفنا * في حيرة بين مسرور و مكبوت
দুঃখ আমি যতই ভুলে যাই, কিন্তু সে পরিস্থিতির কথা আমি ভুলি না, যা ছিল আনন্দ ও পরাজয়ের মধ্যবর্তী হতভম্বতার অবস্থা।
يَكْبُتَهُمْ (এর আর একটি অর্থ হলো: তাদের অধোমুখে ফেলে দেবেন।
ইন্ন ইসহাক বলেন: এরপর আল্লাহ্ তা'আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে লক্ষ্য করে বলেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظُلِمُونَ .
তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন অথবা তাদেরকে শাস্তি দিবেন-এ বিষয়ে তোমার করণীয় কিছুই নেই, কারণ তারা যালিম (৩: ১২৮)।
অর্থাৎ আমার বান্দাদের ব্যাপারে তোমার কোন নির্দেশ চলতে পারে না। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আমি তোমাকে যে নির্দেশ দেই অথবা দয়া পরবশ হয়ে তাদের ক্ষমা করে দেই; তবে ইচ্ছা করলে আমি তাদের ক্ষমা করতে পারি; কিংবা ইচ্ছা করলে আমি তাদের গুনাহের কারণে শাস্তি দিতে পারি। আর এটা আমার হক।
فَأَنَّهُمْ ظَلَمُونَ অর্থাৎ তারা আমার অবাধ্য হয়ে এ শাস্তির যোগ্য হয়েছে।
وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ অর্থাৎ আল্লাহ্ আল্লাহ্ তা'আলা বান্দাদের গুনাহ্ করা সত্ত্বেও তাদের ক্ষমা করে দেন এবং তাদের প্রতি রহম করেন।