📄 আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়ের অবস্থা
ইন্ন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইন্ন শিহাব যুহরী বর্ণনা করেছেন যে, মদীনায় আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ইন্ন সালূলের ব্যক্তিগত ও গোত্রগত এক বিশেষ মর্যাদা ছিল। সেই সুবাদে তার জন্য মসজিদে একটি জায়গা নির্ধারিত ছিল। সেখানে সে বিনা বাধায় দাঁড়িয়ে জুমাআর সালাত আদায় করত। জুমাআর দিন যখন রাসূলুল্লাহ (সা) খুতবার জন্য মিম্বরে বসতেন, তখন সে দাঁড়িয়ে সকলকে লক্ষ্য করে বলত:
হে লোক সকল! এই তো তোমাদের মাঝে আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্ তাঁর মাধ্যমে তোমাদের ইজ্জত-সম্মান দান করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর সাহায্য সহায়তা কর, তাঁর হাতকে শক্তিশালী কর। তাঁর নির্দেশ শোন এবং তাঁর অনুসরণ কর। এরপর সে বসে যেত, তারপর সে উহুদ যুদ্ধে যখন এ কাণ্ড ঘটাল যে, সে তার কিছু লোক নিয়ে যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে এলো। উহুদের যুদ্ধ শেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় ফিরে এলেন, তখন সে আগের অভ্যাস মত দাঁড়িয়ে আগের মত ঘোষণা দিতে চাইলো। তখন মুসলমানরা তাকে বাঁধা দিয়ে চারদিক থেকে তার কাপড় টেনে ধরে বললেন: হে আল্লাহর দুশমন! বস। তুমি এখানে কিছু বলার যোগ্য নও। উহুদ যুদ্ধে যা করার তা করেছো।
তখন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় লোকদের ডিংগিয়ে এই বলতে বলতে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল: আল্লাহর কসম! আমি যেন কোন খারাপ কথা বলে ফেলেছি। আমিতো তাঁর বিষয়টি শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়েছিলাম, এ সময় মসজিদের দরজায় তার সাথে জনৈক আনসার সাহাবীর সাক্ষাৎ হলো। তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: রে হতভাগা! তোমার কি হয়েছে? সে বললো আমিতো তাঁর বিষয়টি শক্তিশালি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাঁর কিছু সংগী আমার সাথে দুর্ব্যবহার করলো। আমি যেন কোন খারাপ কথা বলে ফেলেছি। আমি তো তাঁর বিষয়টি শক্তিশালী করতে চেয়েছিলাম। তিনি বললেন: রে হতভাগা! তুমি ফিরে যাও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমার ক্ষমার জন্য আল্লাহ্র কাছে দু'আ করবেন। সে বললেন: আমি চাইনা যে, তিনি আমার জন্য ইস্তিগফার করুন।
📄 উহুদের যুদ্ধে মুসলমানদের অগ্নি-পরীক্ষা
ইবন ইসহাক বলেন: উহুদের দিনটি ছিল বিপদ ও মুসীবতের দিন, পরীক্ষার দিন। আল্লাহ্ তা'আলা এর দ্বারা মুসলমানদের পরীক্ষা করেন এবং মুনাফিকদের শাস্তি দেন, যারা মুখে ঈমানদার বলে প্রকাশ করতো, কিন্তু তাদের অন্তরে কুফর লুকায়িত ছিল। সেইসাথে সেদিন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে থেকে যাদের প্রতি তিনি অনুগ্রহ করার ইচ্ছা করেন, তাঁদের তিনি শাহাদাত দ্বারা সম্মানিত করেন।
📄 আল্লাহ্ তা'আলা উহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে যে সব আয়াত নাযিল করেন
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ বর্ণনাকারী বলেন; আমাদের কাছে আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইব্ন্ন হিশাম বর্ণনা করছেন। তিনি বলেন: আমাদের কাছে যিয়াদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ বাক্বায়ী মুহাম্মদ ইবন ইসহাক মুত্তালিবী সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উহুদের যুদ্ধ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা পবিত্র কুরআনের যে অংশ নাযিল করেন তা হলো সূরা আল-ইমরানের ৬০টি আয়াত। এই আয়াতগুলোতে ঘটনার বিবরণ এবং আল্লাহ্ তা'আলা যাদের তিরস্কার করেছেন, সে তিরস্কারের আলোচনা রয়েছে।
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীকে লক্ষ্য করে বলেন:
وَإِذْ غَدَوْتَ مِنْ أَهْلِكَ تُبَرِّئُ الْمُؤْمِنِينَ مَقَاعِدَ لِلْقِتَالِ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلَيْمٌ.
স্মরণ কর, যখন তুমি তোমার পরিজনবর্গের নিকট হতে প্রত্যুষে বের হয়ে যুদ্ধের জন্য মু'মিনদেরকে ঘাঁটিতে বিনস্ত করছিলে; এবং আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ; (৩: ১২১)।
ইব্ন হিশাম বলেন: تُبَوِّئُ الْمُؤْمِنِينَ অর্থাৎ তাদের জন্য বসার ও অবস্থানের স্থান নির্ধারণ করছিলে। কুমায়ত ইব্ন যায়দ বলেন:
ليتنى كنت قبله * قد تبوأت مضجعا
হায়! যদি আমি তার পূর্বেই শোয়ার জায়গা প্রস্তুত করে নিতাম।
এই পংক্তিটি তার দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ। (سميع ، عليم) অর্থাৎ তোমরা যা বল, তা তিনি শোনেন এবং তোমরা যা গোপন কর, তা তিনি জানেন।
اذهمتْ طَائِفَتَانِ مِنْكُمْ أَنْ تَفْشَلاً
যখন তোমাদের মাঝে দু'দলের সাহস হারাবার উপক্রম হয়েছিল (৩: ১২২)।
تَفْشَلًا অর্থ تتخاذلا তোমাদের মনোবল হারাবার উপক্রম হয়েছিল। الطائفتان দু'টি দল অর্থাৎ বনূ সালামা ইব্ন জুশম ইব্ন খাযরাজ ও আওস গোত্রের বনু হারিসা ইব্ন নাবীত, এরাই ছিল সৈন্যদলের উভয় বাহু।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وَاللَّهُ وَلِيُّهُا এবং আল্লাহ্ উভয়ের সহায়ক ছিলেন (৩: ১২২)। অর্থাৎ তারা যে সাহস হারা হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছিল, আল্লাহ্ তা'আলা তাদের থেকে তা দূর করে দেন। এদের এভাবে সাহস হারানোর একমাত্র কারণ ছিল যে, এরা দুর্বল ও কাতর হয়ে পড়েছিল। দীনের ব্যাপারে সংশয়ের কারণে নয়। তখন আল্লাহ্ তা'আলা নিজ রহমতে তাদের অন্তর থেকে থেকে এ অবস্থা দূর করে দেন। ফলে দুর্বলতা থেকে মুক্তি লাভ করে তাঁরা তাদের নবীর সংগে মিলিত হল।
ইব্ন হিশাম বলেন: আসাদ গোত্রের জনৈক পণ্ডিত ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, এ দু'টি দল বলতে লাগল: আমরা যে সাহসহারা হওয়ার উপক্রম হয়েছিলাম তা না হওয়া আমাদের কাছে পছন্দনীয় ছিল না। কারণ সাহসহারা হওয়ার ফলেই তো আল্লাহ্ আমাদের সহায়ক হয়েছেন।
📄 আল্লাহ্ তা'আলার উপর ভরসা
ইবন ইসহাক বলেছেন: আল্লাহ্ তা'আলা বলেন: وعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ .
আল্লাহ্র প্রতিই যেন মু'মিনগণ নির্ভর করে (৩: ১২২)।
অর্থাৎ মু'মিনদের মধ্যে যে ব্যক্তি দুর্বলতা অনুভব করবে, সে যেন আল্লাহ্র উপর ভরসা করে, আল্লাহ্র কাছেই সাহায্য চায়। আল্লাহ্ তাকে তার ব্যাপারে অবশ্যই সাহায্য করবেন। আল্লাহ্ তার পক্ষ হয়ে শত্রু দমন করবেন; এভাবে সে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। তিনি তার থেকে যাবতীয় ক্ষতিকর বিষয়াদি দূর করে দেবেন। তার উদ্দেশ্য সফল করার ক্ষেত্রে শক্তি সঞ্চার করবেন।
وَلَقَدْ نَصَرَ كُمُ اللهُ بِبَدْرٍ وَاَنْتُمْ اَذِلَّةٌ فَاتَّقُوا اللهَ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ.
এবং বদরের যুদ্ধে যখন তোমরা হীনবল ছিলে, আল্লাহ্ তো তোমাদের সাহায্য করেছিলেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর (৩: ১২৩)।
অর্থাৎ আল্লাহকে ভয় কর, এটাই তাঁর নিয়ামতের শুকর। আল্লাহ্ তা'আলা বদরের দিন তোমাদের সাহায্য করেন, অথচ সেদিন তোমরা সংখ্যায় ছিলে কম, শক্তিতে ছিলে দুর্বল।