📄 মা'বাদ খুযায়ীর ঘটনা
ইব্ন ইসহাক বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে বেরিয়ে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে পৌঁছেন, যা ছিল মদীনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত। ইন্ন হিশামের বর্ণনামতে, এসময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় ইবন উম্মু মাকতুমকে শাসক নিযুক্ত করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে সোম, মঙ্গল ও বুধবার অবস্থান করেন। তারপর মদীনায় ফিরে আসেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, এ সময় মা'বাদ ইব্ন আবূ মা'বাদ খুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে থেকে অতিক্রম করছিলেন, তিনি ছিলেন খুযাআ গোত্রীয়। এ গোত্রের মুসলিম, মুশরিক সকলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিশ্বস্ত ও হিতাকাংক্ষী ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তারা তিহামার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন তা তাঁর কাছে গোপন রাখবে না। মা'বাদ তখনও মুশরিক ছিল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলল: হে মুহাম্মদ! আপনার এ বিপদে সত্যি আমরা মর্মাহত। আমরা চাই যে, আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এ কাফিরদের মাঝে হিফাযত করুন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হামরাউল আসাদে থাকা অবস্থাতেই মা'বাদ তাঁর কাছ থেকে চলে গেল এবং রাওহা নামক স্থানে আবু সুফিয়ান ও তার সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ করলো। তখন তারা সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাথীদের উপর পুনরায় আক্রমণ করার জন্য সিদ্ধান্ত করেছিল। তারা বলছিল : আমরা যখন মুহাম্মদের উল্লেখযোগ্য, অভিজাত ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে খতম করে দিয়েছি, তখন তাদের একেবারে মূলোৎপাটন না করে ফিরে যাবো? মোটেই হতে পারে না, বরং অবশিষ্টদের উপরও আক্রমণ করে তাদের শেষ করে যাবো।
আবু সুফিয়ান মা'বাদকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন : কি ব্যাপার মা'বাদ: সে বলল: মুহাম্মদ তাঁর সংগীদেরসহ এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমাদের সন্ধানে বের হয়েছে, যে রকম বাহিনী আমি আর কখনও দেখিনি। তারা তোমাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে। আর সেদিন যারা তাঁর সঙ্গে অংশ গ্রহণ করেনি, তারাও আজ তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত। তারা তোমাদের প্রতি এমন ক্রুদ্ধ, যার দৃষ্টান্ত আমি ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি।
আবু সুফিয়ান বললেন: তোমার সর্বনাশ হোক; তুমি বল কি? মা'বাদ বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমার মনে হয় না, তাদের অশ্বের কপাল দেখার আগে তোমরা এখান থেকে ফিরে যেতে পারবে।
আবু সুফিয়ান পুনরায় বলল: আল্লাহর কসম! তাহলে আমরা এখন তাদের উপর আক্রমণ করে, তাদের অবশিষ্টদেরও মূলোৎপাটন করেই ছাড়বো। তখন মা'বাদ বললেন: আমি তোমাকে এরূপ করতে নিষেধ করছি।
আল্লাহ্র কসম! আমি যা দেখেছি, তা আমাকে কয়েকটি লাইন রচনা করতে বাধ্য করেছে। আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করলেন: কি রচনা করেছো? তখন মা'বাদ বললেন: এই শ্লোক রচনা করেছি:
* كادت تهد من الأصوات راحلتي إذ سالت الارض بالجرد الأبابيل
* تردی باسد گرام لا تنابلة عند اللقاء ولاميل معازيل
* فظلت عدوا أظن الإرض مائلة لما سموا برئيس غير مخذول
* فقلت : ويل ابن حرب من لقائكم إذا تغطمطت البطحاء بالجيل
* اني نذير لأهل البسل ضاحية لكل ذي إربة منهم ومعقول
* من جيش أحمد لا وخش تنابلة وليس يوصف ما انذرت بالقيل
সৈন্যদের তর্জন-গর্জনে আমার উটনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার উপক্রম হল, যখন ভূ-পৃষ্ঠে পালের পর পাল ঘোড়ার সয়লাব বয়ে এলো।
ঐ ঘোড়াগুলো যুদ্ধের সময় তাদের ঐসব আরোহীদের অত্যন্ত দ্রুত নিয়ে যায় যারা ক্ষুদ্রাকায় নয়, অভিজাত, সিংহতুল্য এবং অস্ত্রসজ্জিত।
এ দৃশ্য দেখে আমি দ্রুত পালালাম। আমার মনে হচ্ছিল, তখন ঐ ভূখণ্ড যেন কাঁপছে, যখন সজ্জিত দীর্ঘদেহী সিংহদল, তাদের অপরাজেয় নেতার সংগে অগ্রসর হচ্ছিল।
আমি বললাম: ইন্ন হারবের কপাল মন্দ যে, সে তোমাদের (মুসলমানদের) সংগে মুকাবিলা করবে। আর আমি যখন একথা বলছি, তখন প্রস্তরময় যমীন মুসলিম সেনাদলের পদচারণায় প্রকম্পিত হচ্ছিল।
আমি কুরায়শদের বরং সকল বিবেকবান ও সচেতন ব্যক্তিকে আহমাদ (সা)-এর ঐ সৈন্যদলের থেকে সতর্ক করছি, যারা তুচ্ছ ও ক্ষুদ্রাকায় নয়।
আর আমি যে বিষয়ে সতর্ক করছি, তা যেন নিছক মুখের কথা বলে মনে না করা হয়।
📄 আবু সুফিয়ানের পয়গাম
আবু সুফিয়ানের কাছ দিয়ে আবদুল কায়সের একটি দল অতিক্রম করল, সে তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন: কোথায় যাচ্ছ? তারা জবাব দিল মদীনার দিকে। আবু সুফিয়ান পুনরায় জিজ্ঞাসা করলেন: কেন? তারা জবাব দিল : নিছক ঘুরাফিরার উদ্দেশ্যে। আবু সুফিয়ানে বললেন: তোমরা কি আমার পক্ষ থেকে মুহাম্মদকে একটা পয়গাম পৌঁছে দিবে, যা আমি তোমাদের মাধ্যমে পৌঁছাতে চাই? যদি তোমরা তা কর, তবে এর বিনিময়ে আমি তোমাদের উকাযে পৌঁছার পর কিসমিস দিব।
তারা বলল: আচ্ছা, ঠিক আছে। তখন আবু সুফিয়ান বলল: তাঁর সংগে তোমাদের সাক্ষাৎ হলে বলবে যে, আমরা তাঁর এবং তাঁর অবশিষ্ট লোকদের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে পুনরায় তাদের দিকে ফিরে আসার জন্য বদ্ধপরিকর হয়েছি। এই আরোহী দল হামরাউল আসাদে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে আবূ সুফিয়ানের এ পয়গাম পৌঁছে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
"আল্লাহ্-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনিই উত্তম সাহায্যকারী।"
📄 সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার পরামর্শ
ইব্ন হিশাম বলেন, আমাদের কাছে আবু উবায়দা বর্ণনা করেছেন যে, যখন আবু সুফিয়ান ইন্ন হাব উহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে যাচ্ছিল, তখন সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অবশিষ্ট সাথীদের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে পুনরায় মদীনায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা করলো। কিন্তু তখন সাফওয়ান ইবন উমাইয়া ইব্ন খালাফ তাদেরকে বলল তোমরা এমনটি করো না। মুসলমানরা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে আছে। আমাদের ভয় হচ্ছে যে, তাদের এবারকার লড়াই আগের চাইতে ভিন্ন ধরনের হবে। সুতরাং তোমরা ফিরে যাও। তার এ কথায় কুরায়শরা ফিরে গেল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ সংবাদ পেয়ে বললেন:
والذي نفسي بيده ، لقد سومت لهم حجارة ، لوصبحوا بها لكانوا كامس الذاهب
ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন। আল্লাহ্র পক্ষ থেকে শাস্তি স্বরূপ তাদের জন্য পাথর চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। যদি সকালে তারা সেই পাথরগুলোর সম্মুখীন হতো, তবে তারা গতকালের মত নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো।
📄 আবূ উয্যার হত্যা
আবূ উবায়দা বলেন: মদীনায় ফেরার পূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ এলাকাতে মু'আবিয়া ইব্ন মুগীরা ইব্ন আবুল 'আস ইব্ন উমাইয়া ইবন আব্দ শাম্সকে গ্রেফতার করলেন, যে ছিল আবদুল মালিক ইব্ন মারওয়ানের নানা অর্থাৎ তার মা আয়েশা-এর পিতা। আর গ্রেফতার করলেন আবূ উয্যা জুমহীকে ইতিপূর্বে আবূ উয্যাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বদর যুদ্ধে গ্রেফতার করেছিলেন। কিন্তু কোন পণ ছাড়াই তাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন সে বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্, আমাকে ক্ষমা করে দিন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আল্লাহ্র কসম! এখন তুমি মক্কায় গিয়ে একথা গর্ব করে বলতে পারবে না যে, আমি মুহাম্মদ (সা)-কে দুবার ধোঁকা দিয়েছি। একথা বলে তিনি যুবায়র (রা)-কে নির্দেশ দিলেন, হে যুবায়র, তার শিরশ্ছেদ কর। নির্দেশ পেয়ে তিনি তার শিরশ্ছেদ করলেন।
ইন্ন হিশাম বলেন: সাঈদ ইব্ন মুসায়্যিবের সূত্রে আমার কাছে এই তথ্য পৌঁছেছে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় বলেছিলেন:
إِنَّ الْمُؤْمِنَ لَا يُلْدَعُ مِنْ جُحْرٍ مَرَّتَيْنِ ، إِضْرِبْ عُنَقَهُ بِاعَاصِمُ ابْنِ ثَابِتَ
মু'মিনের জন্য এক গর্তে থেকে দু'বার দংশিত হওয়া সমীচীন নয়, হে আসিম ইব্ন সাবিত! তার শিরশ্ছেদ কর। এ নির্দেশ পেয়ে তিনি তার শিরশ্ছেদ করলেন।