📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 তরবারি ধোয়া প্রসংগে

📄 তরবারি ধোয়া প্রসংগে


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘরে ফিরে তাঁর মেয়ে ফাতিমা (রা)-কে নিজ তরবারি দিয়ে বললেন: নেও মা, এর রক্তগুলো ধুয়ে ফেল। আল্লাহর কসম! আজ এটি আমার সাথে বেশ বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে। আলী (রা)ও নিজ তরবারি তাঁকে দিয়ে বললেন: এই তরবারিটিও ধুয়ে ফেল। আল্লাহ্র শপথ। আজ এটি আমার সাথে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছে। একথার প্রেক্ষিতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: যদি তুমি যুদ্ধে সত্যনিষ্ঠ হয়ে থাক, তবে তোমার সাথে সাহল ইব্‌ন হুসায়ফ এবং আবূ দুজানাও সত্যনিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছে।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর তরবারির নাম ছিল যুলফিকার। ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমার কাছে জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, ইব্‌ন আবু নুজায়েহ বলেছেন, উহুদ যুদ্ধে জনৈক ব্যক্তি ঘোষণা দিলেন যে,
لا سَيْفَ إِلَّا ذُو الْفَقَارُ وَلَا فَتَى إِلَّا عَلَى
যুলফিকারই তো একমাত্র তরবারি, আর আলী (রা)-ই একমাত্র যুবক।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমার কাছে জনৈক বিজ্ঞ ব্যক্তি বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা)-কে বলেন: মুশরিকরা আমাদের আর এ ধরনের বিপর্যয়ে ফেলতে পারবে না, যতদিন না আল্লাহ্ তাদের উপর আমাদের বিজয়ী করেন।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল শাওয়াল মাসের মাঝামাঝি শনিবার।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হামরাউল আসাদের যুদ্ধ

📄 হামরাউল আসাদের যুদ্ধ


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: তার পরের দিন অর্থাৎ রবিবার ১৬ই শাওয়াল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করার জন্য জনৈক ঘোষণাকারী লোকদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দিলেন। তিনি এরূপ ঘোষণাও করলেন, যে যাঁরা গতকল্য আমাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিল, শুধু তারাই যেন আজ আমাদের সংগে বের হয়। এই ঘোষণা শুনে জারিব ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আমর ইব্‌ন হারাম (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হাযির হয়ে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমার আব্বা আমাকে আমার সাত বোনের দেখাশুনার জন্য রেখে যান এবং বলেন: দেখ বৎস! আমার জন্য এবং তোমার জন্য সমীচীন হবে না যে, এই মহিলাদের কোন পুরুষ ছাড়া এভাবে ছেড়ে যাই। আর তুমি এমন নও যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে জিহাদে অংশ গ্রহণ করার ব্যাপারে আমি নিজের উপর তোমাকে অগ্রাধিকার দিব। সুতরাং তুমি বোনদের দেখাশুনার জন্য থেকে যাও। তাই আমি তাদের সাথে রয়ে গিয়েছিলাম। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার অনুমতি দিয়ে দিলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি তাঁর সংগে বের হলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুসলমানদের মধ্যে জিহাদের উদ্দীপনা

📄 মুসলমানদের মধ্যে জিহাদের উদ্দীপনা


রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়েছিলেন শুধুমাত্র শত্রুদেরকে ভয় দেখানোর জন্য এবং তাদের জানিয়ে দেওয়ার জন্য যে, তিনি তাদের খোঁজে বের হয়েছেন, যাতে তারা বুঝে নেয় যে, তাঁদের শক্তি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। উহুদ যুদ্ধে প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার কারণে তাঁরা শত্রুর মুকাবিলায় দুর্বল হয়ে পড়েননি।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন খারিজা ইব্‌ন যায়দ ইব্‌ন সাবিত; আয়েশা বিন্ত উসমানের আযাদকৃত গোলাম আবূ সায়েব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, বন্ আশহালের জনৈক সাহাবী উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে শরীক ছিলেন। তিনি বলেন: আমি এবং আমার ভাই উভয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে উহুদ যুদ্ধে শরীক ছিলাম এবং আহত হয়ে ফিরলাম। এরপর যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পক্ষ থেকে শত্রুর খোঁজে বের হওয়ার নির্দেশ হলো, তখন আমি আমার ভাইকে বললাম কিংবা ভাই আমাকে বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা থেকে আমরা কি মাহরুম থেকে যাব? আল্লাহ্র কসম! এখন আমাদের এমন কোন বাহনও নেই, যাতে আমরা আরোহণ করতে পারি, আর আমরা উভয়ে মারাত্মকভাবে আহত। এরপর আমরা উভয়েই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে বের হয়ে পড়লাম। ভাইয়ের তুলনায় আমি কিছুটা কম আহত ছিলাম। ভাই (তিনি) কাবু হয়ে পড়লে, আমি তাকে উঠিয়ে নিতাম এবং সকলের পিছু পিছু চলতাম আর কিছুক্ষণ তিনি পায়ে হাঁটতেন। এভাবে আমরা মুসলমানদের সাথে গন্তব্যস্থানে পৌঁছে গেলাম।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মা'বাদ খুযায়ীর ঘটনা

📄 মা'বাদ খুযায়ীর ঘটনা


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে বেরিয়ে হামরাউল আসাদ নামক স্থানে পৌঁছেন, যা ছিল মদীনা থেকে আট মাইল দূরে অবস্থিত। ইন্ন হিশামের বর্ণনামতে, এসময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় ইবন উম্মু মাকতুমকে শাসক নিযুক্ত করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে সোম, মঙ্গল ও বুধবার অবস্থান করেন। তারপর মদীনায় ফিরে আসেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু বকর আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, এ সময় মা'বাদ ইব্‌ন আবূ মা'বাদ খুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে থেকে অতিক্রম করছিলেন, তিনি ছিলেন খুযাআ গোত্রীয়। এ গোত্রের মুসলিম, মুশরিক সকলেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিশ্বস্ত ও হিতাকাংক্ষী ছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, তারা তিহামার পরিস্থিতি যাই হোক না কেন তা তাঁর কাছে গোপন রাখবে না। মা'বাদ তখনও মুশরিক ছিল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলল: হে মুহাম্মদ! আপনার এ বিপদে সত্যি আমরা মর্মাহত। আমরা চাই যে, আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে এ কাফিরদের মাঝে হিফাযত করুন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) হামরাউল আসাদে থাকা অবস্থাতেই মা'বাদ তাঁর কাছ থেকে চলে গেল এবং রাওহা নামক স্থানে আবু সুফিয়ান ও তার সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ করলো। তখন তারা সর্বসম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাথীদের উপর পুনরায় আক্রমণ করার জন্য সিদ্ধান্ত করেছিল। তারা বলছিল : আমরা যখন মুহাম্মদের উল্লেখযোগ্য, অভিজাত ও শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে খতম করে দিয়েছি, তখন তাদের একেবারে মূলোৎপাটন না করে ফিরে যাবো? মোটেই হতে পারে না, বরং অবশিষ্টদের উপরও আক্রমণ করে তাদের শেষ করে যাবো।
আবু সুফিয়ান মা'বাদকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন : কি ব্যাপার মা'বাদ: সে বলল: মুহাম্মদ তাঁর সংগীদেরসহ এমন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তোমাদের সন্ধানে বের হয়েছে, যে রকম বাহিনী আমি আর কখনও দেখিনি। তারা তোমাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে। আর সেদিন যারা তাঁর সঙ্গে অংশ গ্রহণ করেনি, তারাও আজ তার সঙ্গে মিলিত হয়েছে এবং তারা তাদের কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত। তারা তোমাদের প্রতি এমন ক্রুদ্ধ, যার দৃষ্টান্ত আমি ইতিপূর্বে কখনও দেখিনি।
আবু সুফিয়ান বললেন: তোমার সর্বনাশ হোক; তুমি বল কি? মা'বাদ বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমার মনে হয় না, তাদের অশ্বের কপাল দেখার আগে তোমরা এখান থেকে ফিরে যেতে পারবে।
আবু সুফিয়ান পুনরায় বলল: আল্লাহর কসম! তাহলে আমরা এখন তাদের উপর আক্রমণ করে, তাদের অবশিষ্টদেরও মূলোৎপাটন করেই ছাড়বো। তখন মা'বাদ বললেন: আমি তোমাকে এরূপ করতে নিষেধ করছি।
আল্লাহ্র কসম! আমি যা দেখেছি, তা আমাকে কয়েকটি লাইন রচনা করতে বাধ্য করেছে। আবু সুফিয়ান জিজ্ঞাসা করলেন: কি রচনা করেছো? তখন মা'বাদ বললেন: এই শ্লোক রচনা করেছি:
* كادت تهد من الأصوات راحلتي إذ سالت الارض بالجرد الأبابيل
* تردی باسد گرام لا تنابلة عند اللقاء ولاميل معازيل
* فظلت عدوا أظن الإرض مائلة لما سموا برئيس غير مخذول
* فقلت : ويل ابن حرب من لقائكم إذا تغطمطت البطحاء بالجيل
* اني نذير لأهل البسل ضاحية لكل ذي إربة منهم ومعقول
* من جيش أحمد لا وخش تنابلة وليس يوصف ما انذرت بالقيل
সৈন্যদের তর্জন-গর্জনে আমার উটনী ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ার উপক্রম হল, যখন ভূ-পৃষ্ঠে পালের পর পাল ঘোড়ার সয়লাব বয়ে এলো।
ঐ ঘোড়াগুলো যুদ্ধের সময় তাদের ঐসব আরোহীদের অত্যন্ত দ্রুত নিয়ে যায় যারা ক্ষুদ্রাকায় নয়, অভিজাত, সিংহতুল্য এবং অস্ত্রসজ্জিত।
এ দৃশ্য দেখে আমি দ্রুত পালালাম। আমার মনে হচ্ছিল, তখন ঐ ভূখণ্ড যেন কাঁপছে, যখন সজ্জিত দীর্ঘদেহী সিংহদল, তাদের অপরাজেয় নেতার সংগে অগ্রসর হচ্ছিল।
আমি বললাম: ইন্ন হারবের কপাল মন্দ যে, সে তোমাদের (মুসলমানদের) সংগে মুকাবিলা করবে। আর আমি যখন একথা বলছি, তখন প্রস্তরময় যমীন মুসলিম সেনাদলের পদচারণায় প্রকম্পিত হচ্ছিল।
আমি কুরায়শদের বরং সকল বিবেকবান ও সচেতন ব্যক্তিকে আহমাদ (সা)-এর ঐ সৈন্যদলের থেকে সতর্ক করছি, যারা তুচ্ছ ও ক্ষুদ্রাকায় নয়।
আর আমি যে বিষয়ে সতর্ক করছি, তা যেন নিছক মুখের কথা বলে মনে না করা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00