📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কাতাদা (রা) এবং তাঁর চোখ প্রসংগে

📄 কাতাদা (রা) এবং তাঁর চোখ প্রসংগে


ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আসিম ইব্‌ন্ন আমর ইব্‌ন্ন কাতাদা (রা) বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ধনুক থেকে নিক্ষেপ করছিলেন, এমন কি ধনুকের এক পাশ ফেটে গেল। কাতাদা ইব্‌ন নু'মান (রা) তা নিয়ে নিলেন এবং তা তার হাতেই ছিল, সেদিন কাতাদা ইব্‌ন নু'মান (রা)-এর চোখে আঘাত লাগে, যার ফলে তাঁ চোখ বেরিয়ে এসে গালের উপর ঝুলে পড়ে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আসিম ইব্‌ন আমর ইব্‌ন কাতাদা (রা) আরও বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর চোখটি নিজ পবিত্র হাত দিয়ে স্বস্থানে বসিয়ে দিলেন; ফলে তাঁর এ চোখটি আগের চাইতে অধিক দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ও সুন্দর হয়ে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আনাস ইব্‌ন নযর (রা)-এর রাসূলপ্রীতি

📄 আনাস ইব্‌ন নযর (রা)-এর রাসূলপ্রীতি


ইবন ইসহাক বলেন: কাসিম ইব্‌ন আবদুর রহমান ইবন রাফি' (বনী 'আদী ইব্‌ নাজ্জারের লোক) আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, আনাস ইব্‌ন নযর (রা) যিনি আনাস ইব্‌ন মালিক (রা)-এর চাচা ছিলেন, উমর ইবন খাত্তাব ও তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ্ (রা)-এর কাছে পৌঁছলেন। সেখানে আরও কিছু মুহাজির ও আনসার সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। সকলেই হাতের উপর হাত রেখে বসে ছিলেন। তখন তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: আপনারা এখানে কেন বসে আছেন? তারা জবাব দিলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তো শহীদ হয়ে গিয়েছেন। একথা শুনে তিনি তাদের বললেন: তবে তাঁর অবর্তমানে তোমরা এ জীবন দিয়ে কি করবে? ওঠো, যে উদ্দেশ্যে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা) জীবন উৎসর্গ করেছেন, তোমরাও সে উদ্দেশ্যে জীবন উৎসর্গ করো। এরপর আনাস ইব্‌ন নযর (রা) কাফিরদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং লড়াই করতে করতে শহীদ হয়ে গেলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা)-এর বীরত্ব

📄 আবদুর রহমান ইবন আউফ (রা)-এর বীরত্ব


ইবন ইসহাক বলেন: হুমায়দ তাবীল আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি সেদিন আনাস ইব্‌ন নযর (রা)-এর শরীরে তরবারির ৭০টি জখম দেখেছি। তাঁকে তাঁর বোন ছাড়া আর কেউ চিনতে পারেনি। তাঁর বোন তাঁকে তার আংগুল দেখে চেনেন।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমার কাছে কিছু সংখ্যক বিজ্ঞ আলিম বর্ণনা করেছেন যে, উহুদের যুদ্ধে আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ (রা)-এর মুখে একটি পাথর লেগেছিল যার ফলে তাঁর সামনের একটা দাঁত ভেঙ্গে যায় এবং তাঁর দেহে বিশ বা তার চেয়েও অধিক আঘাত লাগে। কিছু আঘাত লেগেছিল তাঁর পায়ে, যার কারণে তিনি খোঁড়া হয়ে গিয়েছিলেন।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইব্‌ন শিহাব যুহরী বর্ণনা করেন যে, মুসলমানদের বিপর্যয় ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে যাওয়ার পর যিনি সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খোঁজ পেয়েছিলেন তিনি হলেন কা'ব ইবন মালিক (রা)। তিনি বলেন: আমি শিরস্ত্রাণের নীচে থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উভয় চক্ষু ঝলমল করতে দেখে তাঁকে চিনে ফেললাম। তখন আমি উচ্চৈঃস্বরে আহবান করতে লাগলাম হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমাদের জন্য সুসংবাদ। এই তো রাসূলুল্লাহ্ (সা)। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে চুপ থাকতে ইংগিত করলেন।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: এরপর যখন মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে চিনতে পারলেন, তখন তিনি মুসলমানদের সাথে নিয়ে ঘাঁটির দিকে চলে গেলেন। এ সময় তাঁর সংগে ছিলেন আবূ বকর সিদ্দীক, উমর ইব্‌ন খাত্তাব, আলী ইব্‌ন আবূ তালিব, তালহা ইব্‌ন উবায়দুল্লাহ্, যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম, হারিস ইন্ন সাম্মা (রা)-সহ আরও কিছু মুসলমান।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উবায় ইব্‌ন খালফের হত্যা

📄 উবায় ইব্‌ন খালফের হত্যা


ইবন ইসহাক আরও বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) যখন ঘাটির উপর উঠলেন, তখন সেখানে উবায় ইব্‌ন খালাফ তাঁর সন্ধান পেয়ে পৌঁছে গেল এবং বলল: হে মুহাম্মদ! তুমি বেঁচে গেলে আমার রক্ষা নেই। তখন মুসলমানরা জিজ্ঞাসা করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা কেউ কি তার দিকে অগ্রসর হব? তিনি বললেন: তাকে ছেড়ে দাও। এরপর সে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে গেল, তখন তিনি হারিস ইন্ন সাম্মা থেকে বর্শা নিলেন। (ইবন ইসহাক বলেন,) আমি জানতে পেরেছি, অনেকের বক্তব্য এই যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাম্মা থেকে বর্শাটি নিয়ে তা এমন জোরে ঝাড়া দিলেন যে, আমরা এমনভাবে ছিটকে পড়লাম, যেমন ভীমরুলের ঝাঁক উটের তাড়া খেয়ে, উটের পিঠ থেকে উড়ে যায়। ইব্‌ন হিশাম বলেন : الشعراء অর্থ দংশনকারী মাছি।
তারপর রাসূলুল্লাহ (সা) উবায় ইব্‌ন খাল্ফের দিকে অগ্রসর হলেন এবং তার ঘাড়ের উপর এমন জোরে বর্শার আঘাত হানলেন, যার ফলে সে ঘোড়ার উপর থেকে ছিটকে পড়লো এবং কয়েকবার গড়াগড়ি খেল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে সালিহ্ ইব্‌ন ইবরাহীম ইব্‌ন আবদুর রহমান ইন্ন আওফ বর্ণনা করেছেন যে, উবায় ইব্‌ন খাল্ফ মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ হলে বলতেন: হে মুহাম্মদ! আমার একটি আশ্রয়স্থল রয়েছে। তা হলো একটি ঘোড়া, যাকে আমি দৈনিক এক ফরক (প্রায় ৫ সের) দানা আহার দেই। তার উপর আরোহণ করে আমি তোমাকে হত্যা করব।
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জবাবে বলতেন: ইন্‌শাআল্লাহ আমিই তোমাকে হত্যা করব। তাই উবায় ইব্‌ন খালফ যখন কুরায়শদের মাঝে ফিরে এলো, তখন তার ঘাড়ে সামান্য মাত্র আঘাত লেগেছিল, যার কারণে রগে রক্ত জমে গিয়েছিল। সে বলতে লাগল আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ আমাকে খুন করেছে। কুরায়শরা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল: আল্লাহ্র কসম! তুমি অনর্থক মন খারাপ করছো। তোমার তো তেমন কিছু হয়নি। উবায় ইব্‌ন খাল্ফ বলল: মুহাম্মদ আমাকে মক্কা থাকতেই বলেছিল: আমি তোমাকে হত্যা করব। তাই আল্লাহ্র কসম! সে আমার উপর শুধু থুথু ফেললেও আমি মরে যেতাম। এরপর কুরায়শরা তাকে নিয়ে মক্কায় ফেরার পথে, 'সারিফ' নামক স্থানে পৌঁছলে আল্লাহর দুশমন মারা যায়।
ইবন ইসহাক বলেন: এ সম্পর্কে হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা)-এই কবিতা রচনা করেন:
أبي يوم يارزه الرسول وتوعده وأنت به جهول
أمية إذ يغوث يا عقيل أبا جهل ، لأ مهما الهبول
بأسر القوم ، اسرته فليل * * * * *
لقد ورث الضلالة عن أبيه
أتيت اليه تحمل رم عظم
وقد قتلت بنو الجار منكم
وتب اينا ربيعة اذا أطاعا
وافلت حارث لما شغلنا
তার পিতার উত্তরাধিকার সূত্রেই উবায় ইব্‌ন খাল্‌ল্ফ গুমরাহী পেয়েছিল। আর সে উহুদের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মুকাবিলার জন্য এগিয়ে এসেছিল।
হে উবায় ইব্‌ন খাল্ফ! তুমি তোমার ধ্বংসশীল হাড় নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দিকে এগিয়ে আসছিলে, আর তুমি তাঁর আসল পরিচয় না জেনে তাকে হুমকি দিচ্ছিলে।
বনূ নাজ্জার তোমাদের মধ্য থেকে উমাইয়াকে এমনভাবে হত্যা করেছে যে, সে হে আকীল! হে আকীল! বরে ফরিয়াদ করছিল!
রাবীআর পুত্রদ্বয় আবূ জাহলের আনুগত্য করে ধ্বংস হলো, আর এখন তাদের মা ধ্বংস হোক।
আমরা বন্দীদের গ্রেফতার করায় ব্যস্ত ছিলাম, এ সুযোগে হারিস উধাও হয়ে গেল; আর তার গোত্র পর্যুদস্ত হয়ে গিয়েছিল।
ইব্‌ন হিশাম বলেন : أسرته এর অর্থ قبيلته অর্থাৎ তার গোত্র। হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) এ সম্পর্কে আরও বলেন:
ألا من مبلغ عنى أبيا
تمنى بالضلالة من بعيد
تمنيك الأماني من بعيد
فقد لا قتك طعنة ذي حفاظ
له فضل على الاحياء طراً * * * * *
لقد ألقيت في سحق السعير
وتقسم أن قدرت مع النذور
وقول الكفر يرجع في غرور
كريم البيت ليس بذي فجور
إذا نابت ملمات الأمور
এমন কেউ আছে কি, যে উবায় ইব্‌ন খাল্ফের কাছে আমার পক্ষ থেকে এই বার্তা পৌছে দেবে যে, তোমাকে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হয়েছে।
তুমি দীর্ঘদিন যাবত ভ্রান্ত আশা করছিলে, আর সেই সাথে কসমও খাচ্ছিলে যে, তুমি অবশ্যই সফলকাম হবে।
তুমি অত্যন্ত দুরাশা করছিলে, অথচ কুফর সুলভ উক্তির ফলাফল নিছক আত্মপ্রবঞ্চনা বৈ কিছুই নয়।
তাই তোমার উপর এমন এক মহান ব্যক্তিত্বের বর্শা বিদ্ধ হলো; যিনি মর্যাদাশীল, নেতৃস্থানীয়, অভিজাত পরিবারের লোক। যিনি মর্যাদাহীন অনাচারী নন।
কঠিন বিপদ-আপদের সময়ে সকল মানুষের উপর শ্রেষ্ঠত্ব বজায় থাকে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00