📄 সুআবের বীরত্ব সম্পর্কে হাসানের বর্ণনা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে বর্ণনা করেন ইয়াহইয়া ইব্ন আব্বাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইন্ন যুবায়র তার পিতা আব্বাদ থেকে, তিনি আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা) থেকে, তিনি যুবায়র (রা) থেকে, তিনি বলেন: আল্লাহ্ জানেন, আমি হিন্দা বিন্ত উতবা ও তার সঙ্গিনীদের কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় পলায়ন করতে দেখেছি। আর তাদেরকে পাকড়াও করাটা কঠিন কিছু ছিল না। কিন্তু আমরা যখন কাফিরদের সৈন্যদলকে (পরাস্ত করে ছিন্ন ভিন্ন করে দিলাম) তখন আমাদের তীরন্দাজরা (রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক নির্ধারিত স্থান ছেড়ে দিয়ে) কাফিরদের পরাজিত সৈন্যদলের পিছু ধাওয়া করল, ফলে আমাদের পিঠ অশ্বারোহীদের দিকে হয়ে গেল। এই সুযোগে শত্রুরা আমাদের পিছন থেকে আক্রমণ করলো। অন্যদিকে জনৈক ঘোষক এরূপ ঘোষণা দিতে লাগল : ألا إن محمداً قد قتل শোন! শোন! মুহাম্মদ নিহত হয়েছে। তখন আমরা মুসলমানরাও তাদের দিকে ফিরলাম। আর তারাও আমাদের দিকে ফিরল। এ পরিস্থিতির উদ্ভব তখন হলো, যখন কাফিরদের ঝাণ্ডাবাহীদের নিঃশেষ করে ফেলেছিলাম এবং তাদের একজনও ঝাণ্ডার কাছে আসার সাহস পাচ্ছিল না।
ইবন হিশাম বলেন : الصارخ অর্থ-গিরিপথে চীৎকারকারী, এখানে এ দ্বারা শয়তানকে বুঝান হয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: কিছু সংখ্যক বিজ্ঞজনের বর্ণনামতে এ সময় কাফিরদের ঝাণ্ডা একেবারেই অবনমিত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু পরে যখন 'আমরাহ বিন্ত আলকামা হারিসী কুরায়শদের উদ্দেশ্যে তা উত্তোলন করল তখন কুরায়শরা পুনরায় ঝাণ্ডার চারপাশে সমবেত হলো। এক পর্যায়ে এই ঝাণ্ডা সুআব নামের হাবশীর হাতে এসে গেল। সে ছিল আবু তালহার গোলাম এবং কাফিরদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি যে এই ঝাণ্ডা উঠিয়েছিল। সুআব এই ঝাণ্ডা রক্ষা করতে গিয়ে ক্রমাগত লড়ে যেতে লাগল এমনকি যখন তার উভয় হাত কেটে দেওয়া হলো, তখন সে হাঁটুর উপর উপুড় হয়ে বুক ও গলার দ্বারা ঝাণ্ডাকে ধরলো এবং নিহত না হওয়া পর্যন্ত তা ধরে রাখলো। সে তখন বলছিল : اللهم هل اعزرت আয় আল্লাহ্! আমি কি কোন ওযর অবশিষ্ট রেখেছি।
এ সম্পর্কে হাসান ইব্ন সাবিত (রা) বলেন:
فخرتم باللواء وشرفخر * لواء حين رد إلى صواب
جعلتم فخركم فيه بعبد * وألا أم من يطا عفر التراب
طننتم والسفيه له ظنون * وما إن ذاك من أمر الصواب
بأن جلادنا يوم التقينا * بمكة بيعكم حمر العياب
أقر العين أن عصبت يداه * وما أن تعصبان على خضاب
তোমরা তোমাদের ঝাণ্ডা নিয়ে গর্ব করো, অথচ তোমাদের এ গর্ব ঘৃণ্যতম গর্ব, কেননা, এ ঝাণ্ডা সবশেষে সুআব (নামের গোলামের) মত ব্যক্তির হাতে পৌঁছেছে।
এ ঝাণ্ডা নিয়ে তোমরা গর্ব করছো এক গোলামের কারণে যার মায়ের অবস্থা এই যে, তাকে ধূসর বর্ণের লোকেরা ব্যবহার করে থাকে। (এখানে লোক দ্বারা বনূ আবু তালহার দিকে ইংগিত করা হয়েছে।)
তোমরা ধারণা করছো, আর বোকাদের কাজ হলো নিছক ধারণা করা। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাস্তবতার সাথে ধারণার সম্পর্কে খুব কমই থাকে।
যেদিন আমরা এবং তোমরা (উহুদ যুদ্ধে) মুখোমুখী হয়েছিলাম, (সেদিন তোমাদের ধারণা ছিল যে) তোমরা আমাদের চামড়া মক্কায় (বাণিজ্যিক পণ্য রাখার) লাল থলে বানিয়ে বিক্রি করবে।
তার হাত লাল দেখে চক্ষু শীতল হতো, আর এ লাল রং মাখানো লাল নয় (বরং রক্তের কারণে লাল)।
ইব্ন হিশাম বলেন: এর শেষ পংক্তিটি আবূ খুরাশ হুযালীর নামে বর্ণনা করা হয়। খালাফ আহমার আমাকে হুয্যালির নামে এ পংক্তিটি আরো কিছু পংক্তিটি শুনিয়ে দেন:
أقر العين أن عصبت يداها * وما إن تعصبان علي خضاب
📄 আমরা বিন্ত আলকামা হারিসীর বীরত্ব সম্পর্কে হাসানের কবিতার
অর্থাৎ এখানে চা-এর স্থলে بداها রয়েছে, যার দ্বারা উদ্দেশ্য তাঁর স্ত্রী, উহুদ যুদ্ধের সাথে এর সম্পর্ক নেই। অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে যে, এ পংক্তিগুলো মা'কিল ইব্ন খুয়ায়লিদ হুযালী রচিত।
ইবন ইসহাক বলেন: হাসান ইব্ন সাবিত, আমরাহ বিন্ত আলকামা হারিসী ও তার ঝাণ্ডা উত্তোলন সম্পর্কে বলেন:
اذا عضل سيقت إلينا كأنها * جداية شرك معلمات الحواجب
اقمنا لهم طعنا مبيراً منكلا * وجزناهم بالضرب من كل جانب
فلو لا لواء الحارثية أصبحوا * يباعون في الأسواق بيع الجلائب
যখন বনূ আযল শিরক এলাকার হরিণের বাচ্চার মত আমাদের দিকে ধেয়ে এসেছিল, যাদের ভ্রুর উপর চিহ্ন ছিল; তখন আমরা তাদের প্রতি দৃষ্টান্তমূলক বিধ্বংসী বর্শা নিক্ষেপ শুরু করি এবং চারিদিক থেকে তরবারির আঘাত করে তাদের লাশের স্তূপে পরিণত করি।
যদি আমরাহ হারিসীর ঝাণ্ডা না হতো, তবে তারা বাজারে বাণিজ্যিক পণ্যের ন্যায় বিক্রি হতো।
ইন্ন হিশাম বলেন: হাসান ইবন সাবিতের এই কবিতাগুলো প্রথম কবিতাগুলোর অংশ বিশেষ।
📄 উহুদ যুদ্ধের দিনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আহত হওয়া প্রসংগে
ইবন ইসহাক বলেন: যখন মুসলমানগণ ছত্রভংগ হয়ে পড়েছিলেন, আর দুশমনরা তাদের উপর কঠিন আঘাত হানছিল, তখন ছিল মুসলমানদের অত্যন্ত দুর্যোগ ও কঠিন পরীক্ষার সময়। মুসলমানদের মধ্যে আল্লাহ্ তা'আলা যাকে চাচ্ছিলেন তাকে শাহাদাতের সৌভাগ্য দান করছিলেন। এরপর শত্রুদল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং তাঁর উপর পাথর বর্ষণ করতে আরম্ভ করলো। ফলে, তিনি একপাশে পড়ে গেলেন, তাঁর সামনের দাঁত ভেঙ্গে গেল, চেহারা মুবারক যখমী হলো এবং তাঁর ঠোঁটও কেটে গেল। যে ব্যক্তি তাঁকে আহত করেছিল, সে ছিল উতবা ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আনাস ইবন মালিক (রা) সূত্রে হুমায়দ তাবীল বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনের দাঁত ভেঙ্গে যায়। তাঁর পবিত্র চেহারাও যখমী হয়, মাথার যখম হতে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে এবং তিনি এই বলে রক্ত মুছতে থাকেন:
كَيْفَ يُفْلِحُ قَوْمٌ خَضْبُوا وَجْهَ نَبِيِّهِمْ وَهُوَ يَدْعُوهُمْ إِلَى رَبِّهِمْ -
ঐ জাতি কিভাবে সফলকাম হতে পারে যারা তাদের নবীর চেহারা রক্তে রঞ্জিত করে দিয়েছে। অথচ তিনি তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করছেন।
এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ্ তা'আলা এ আয়াত নাযিল করেন:
لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظُلِمُونَ .
"তিনি তাদের প্রতি ক্ষমাশীল হবেন কিংবা তাদের শাস্তি দিবেন-এই বিষয়ে তোমার করণীয় কিছুই নাই; কারণ তারা তো যালিম" (৩: ১২৮)।
📄 আঘাত পর আঘাত
ইব্ন হিশাম বলেন: রুবায়হ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আবু সাঈদ খুদরী (রা) তার পিতা থেকে, তিনি আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে এ তথ্য বর্ণনা করেছেন যে, উতবা ইব্ন আবু ওয়াক্কাস সেদিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর পাথর নিক্ষেপ করে তার সামনের ডান দিকের নীচের দাঁত ভেঙ্গে দেয় এবং নীচের ঠোঁট যখমী করে দেয়, আবদুল্লাহ্ ইব্ন শিহাব যুহরী তার ললাট যখমী করে দেয়, আর ইব্ন কামিয়া তাঁর পবিত্র চেহারার উপরিঅংশ এমনভাবে আঘাত করে যে, তাঁর শিরস্ত্রাণের দু'টি কড়া মাথার ভিতরে ঢুকে যায় এবং তিনি একটি গর্তে পড়ে যান, এই গর্তটি আবু আমির নামক জনৈক ব্যক্তি খনন করেছিল, যাতে মুসলমানরা না জেনে তার মধ্যে পড়ে। এ সময় আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত ধরেন, তালহা ইব্ন উবায়দুল্লাহ (রা) তাঁকে ভর দিয়ে উঠান এবং সোজা দাঁড়া করিয়ে দেন। আবু সাঈদ খুদরী (রা)-এর পিতা মালিক ইবন সিনান (রা) তার চেহারা থেকে রক্ত চুষে গিলে ফেলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেন:
مَنْ مَسَّ دَمِي دَمَهُ لَمْ تُصِبْهُ النَّارُ
আমার রক্ত যার রক্তের সাথে মিশেছে, দোজখের আগুন তাকে স্পর্শ করবে না।