📄 মুস'আব ইবন উমায়ের (রা)-এর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন, মুস'আব ইবন উমায়ের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হিফাযত করার জন্য লড়তে থাকেন। এভাবে তিনি শহীদ হন। তাকে যে শহীদ করেছিলেন, সে হলো ইবন কামীআ লায়ছী। সে ভেবেছিল ইনিই রাসূলুল্লাহ্ (সা)। তাই সে কুরায়শদের কাছে ফিরে গিয়ে বলে যে, আমি মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করেছি। মুস'আব ইবন উমায়ের (রা) শহীদ হওয়ার পর, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঝাণ্ডা আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর হাতে অর্পণ করেন। আলী (রা)ও অন্যান্য مسلمانوں সংগে মিলিত হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন।
ইবন হিশাম বলেন: আমার কাছে মাসলামা ইব্ন আলকামা মাযিনী বর্ণনা করেন যে, উহুদের দিন লড়াই যখন তীব্র আকার ধারণ করল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের ঝাণ্ডার নীচে বসে গেলেন এবং তিনি আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে এ মর্মে নির্দেশ দিলেন: তুমি ঝাণ্ডা নিয়ে সামনে অগ্রসর হও। সুতরাং তিনি অগ্রসর হয়ে বললেন: আমিই আবুল ফুসাম। ইব্ন হিশামের বর্ণনা মতে, মতান্তরে আবুল কুসাম। তখন মুশরিক সেনাবাহিনীর পতাকাবাহী আবূ সা'দ ইব্ন আবু তালহা তাঁকে ডেকে বললেন: হে আবুল কুসাম! ময়দানে এসে লড়বে কি? আলী (রা) বললেন: হ্যাঁ! এই বলে তিনি দুই কাতারের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দু'দিক থেকে তরবারি চলতে লাগলো। এক সময় আলী (রা) তরবারির আঘাত করে আবূ সা'দকে ভূপাতিত করলেন। কিন্তু তিনি তাকে একবারেই খতম না করে ফিরে এলেন। তাঁর সাথীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি তাকে খতম করলেন না কেন? জবাবে তিনি বললেন: সে আমার সামনে নগ্ন হয়ে পড়ায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাছাড়া আমি মনে করেছিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে মৃত্যু দিয়েছেন।
অন্য বর্ণনামতে আবূ সা'দ ইব্ন আবূ তালহা উভয় কাতারের মাঝে এসে গর্জন করতে লাগল: "আমি কাসিম! কে আছ আমার সাথে মুকাবিলা করবে?" কেউ যখন বেরিয়ে এলো না, তখন সে বলতে লাগল: “হে মুহাম্মদ (সা)-এর সাথীরা, তোমরা ধারণা কর যে, তোমাদের নিহতরা জান্নাতে, আর আমাদের নিহতরা জাহান্নামে যাবে। লাতের কসম! তোমাদের ধারণা মিথ্যা, যদি সত্যি তোমাদের এ বিশ্বাস হতো, তাহলে অবশ্যই তোমাদের কেউ না কেউ মুকাবিলা জন্য বেরিয়ে আসত।” একথা শুনে আলী (রা) তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উভয়ের মাঝে তরবারি চলতে লাগলো। অবশেষে আলী (রা) তাঁকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেললেন।
📄 আসিম ইবন সাবিত (রা)-এর ঘটনা
আসিম ইব্ন সাবিত ইব্ন আবূ আকলা (রা)ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি মুসাফি ইবন তালহা ও তার ভাই জুল্লাস ইব্ন তালহাকে হত্যা করেন। আসিম ইবন সাবিত (রা) উভয় ভাইয়ের উপর একের পর এক তীর নিক্ষেপ করেন। তাদের এক একজন (মারাত্মকভাবে আহত হয়ে) তাদের মা সুলাফার কাছে পৌঁছে নিজের মাথা তার কোলে রাখলো। তাদের মা তাদের দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলেন: হে বৎস! কে তোমাদের আহত করেছে। তারা প্রত্যেকে বললেন: তা তো জানি না, তবে আমি আমার উপর তীর নিক্ষেপ করার সময় এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি: এই নাও, আর আমি আবূল আকলার ছেলে। তখন তাদের মা প্রতিজ্ঞা করলো যে, আল্লাহ্ যদি তাকে সুযোগ দেন, তবে সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করবে। আসিম (রা) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এরূপ অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি নিজেও কোন মুশরিক কে স্পর্শ করবেন না, আর তাকেও কোন মুশরিক স্পর্শ করতে না পারে।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা উহুদের যুদ্ধের সময় এই কবিতা আবৃত্তি করে, তখন সে মুশরিকদের পতাকাবাহী ছিল:
إن على اهل اللواء حقا * أن يخضبوا الصعدة أو تندق
মনে রেখ! পতাকাবাহীদের দায়িত্ব হলো, তারা নিজ তীরগুলোকে (শত্রুর রক্তে) ক্রমাগত রঞ্জিত করতে থাকবে, যতক্ষণ না তা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা এ কবিতা আবৃত্তি করছিল, তখন হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাকে হত্যা করেন।
📄 ফেরেশতা কর্তৃক হানযালা (রা)-এর গোসল প্রসংগে
তুমুল যুদ্ধ চলাকালে হানযালা ইব্ন আবূ আমির গাসীল (রা) ও আবু সুফিয়ান পরস্পর মুখোমুখি হল। হানযালা আবু সুফিয়ানকে কাবু করে ফেললেন। এমন সময় শাদ্দাদ ইব্ন আসওয়াদ ইব্ন শাউব লক্ষ্য করলো, হানযালা (রা) আবু সুফিয়ানকে কাবু করে ফেলছেন। তখন সে হানযালা (রা)-কে তরবারি দিয়ে আঘাত করে তাঁকে শহীদ করে ফেলে। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : তোমাদের সংগী অর্থাৎ হানযালাকে এখন ফেরেশতাগণ গোসল দিচ্ছে। সাহাবীরা তাঁর পরিবারস্থ লোক ও তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন: হানযালা কি অবস্থায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জবাব দিলেন : তিনি যখন যুদ্ধের ঘোষণা শোনেন, তখন তিনি গোসল ফরয থাকা অবস্থায় বেরিয়ে পড়েন।
ইবন হিশাম বলেন: অন্য বর্ণনায় الهاتفة এর স্থলে الهائعة রয়েছে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে উত্তম ব্যক্তি হলো সে, যে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে অপেক্ষা করে এবং যুদ্ধের ঘোষণা শুনামাত্রই যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। তিরিম্মাহ ইব্ন হাকীম আত্মাঈ বলেন: (তিরিম্মাহ অর্থ দীর্ঘকায় ব্যক্তি)
أنا ابن حماة المجد من آل مالك * إذا جعلت خور الرجال تهيع
আমি মালিক বংশের ঐ লোকদের সন্তান যারা মর্যাদা সংরক্ষণকারী, যখন কাপুরুষেরা আত্মসমর্পণ করে।
الهيعة অর্থ ভয়ংকর আওয়াজ।
ইব্ন ইসকাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) (হানযালা (রা)-এর বিবরণ শুনে) বললেন, এজন্যেই তো তাকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছেন,
📄 হানযালার মৃত্যুতে ইবনুল আসওয়াদ ও আবু সুফিয়ানের কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন: শাদ্দাদ ইব্ন আসওয়াদ হানযালা (রা)-কে শহীদ করার সময় এই কবিতা আবৃত্তি করেছিল:
لأحمين صاحبي ونفسى * بطعنة مثل شعاع الشمس
আমি আমার বন্ধুকে এবং আমার নিজেকে এমন বর্শা দ্বারা হিফাযত করবো, যা সূর্যের কিরণের মত ঝলমলে হবে।
এদিকে আবু সুফিয়ান ইব্ন হাব সেদিন তার ধৈর্য ধারণের কথা ও হানযালা (রা)-এর বিরুদ্ধে ইন শা'উবের তাকে সাহায্য করার কথা উল্লেখ করে বলে:
ولم أحمل النعماء لابن شعوب لدن غدوة حتى دنت لغروب * * ولو شئت نجتني كميت طمرة
وما زال مهرى مزجر الكلب منهم
أقاتلهم وأدعى يا لغالب * وأدفعهم على بركن صليب
فبكى ولا ترعى مَقَالَةُ عَاذِل * ولا تسأمى من عبرة ونحيب
أباك وإخوانا له قد تتابعوا * وحق لهم من عبرة بنصيب
وسلى الذي قد كَانَ في النفس أني * فتلت من النجار كل نجيب
ومن هاشم قَرمَا كَرِيمًا وَمُصعبا * وكان لدى الهيجاء غير هيوب
ولو أنني لم أشف نفسى منهم * لكانت شجا في القلب ذات ندوب
فأبوا وقد أودى الجلابيب منهم * بهم خَدَب من معطب وكتيب
أصابهم من لم يكن لدمائهم * كفاء ولا في خُطه بضريب.
যদি আমি চাইতাম, তবে আমার তেজস্বী সাদা-কালো ঘোড়া আমাকে উদ্ধার করে নিত। আর আমার ইব্ন শা'উবের অনুগ্রহ নেয়ার প্রয়োজন হত না।
আমার এ ঘোড়া সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুসলমানদের থেকে এতটুকু দূরত্বে দৃঢ় অবস্থায় ছিল, যতটুকু দূরত্ব থেকে কুকুরকে তাড়া দেওয়া হয়।
আমি তাদের সাথে লাগাতার লড়তে থাকি এবং হে বনূ গালিব বলে আহবান করতে থাকি এবং আমি দৃঢ় শক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করি।
সুতরাং আহাজারি করে নাও। আর তিরস্কারকারীর তিরস্কারের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করো না।
হে বনূ গালিব! তোমাদের বাপ ও ভাইদের প্রতি খুব আহাজারি করে নাও। যারা একের পর এক নিহত হচ্ছিল, (এতে কোন ভর্ৎসনাকারীর ভর্ৎসনার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা উচিত নয়), আর না অশ্রু ঝরাতে ক্লান্ত হওয়া উচিত। কেননা এরা কিছু হলেও তোমাদের অশ্রুর হকদার ছিল।
আর ঐসব লোকদের সান্ত্বনা দাও, যাদের মনে একথা রয়েছে যে, আমরা বনূ নাজ্জারের সকল সম্ভ্রান্ত লোকদের কেন হত্যা করে ফেললাম
এবং বনু হাশিমের অভিজাত এক ব্যক্তিকে কেন মৃত্যুর ঘাঁটিতে পৌঁছে দিয়েছি, যিনি ছিলেন, অত্যন্ত কঠোর এবং যুদ্ধের ময়দানে নির্ভয়ে লড়াইকারী (অর্থাৎ হামযা (রা)।
অথচ তাকে হত্যা করে আমার অন্তর যদি ঠাণ্ডা না করে নিতাম; তবে আমার অন্তরে এমন ক্ষত থেকে যেত, যার দাগ কখনও মুছতো না।
মুসলমানরা এমন অবস্থায় ফিরে গেল যে, তাদের বড় বড় তেজস্বী ব্যক্তি পেট এফোঁড় ওফোঁড়কারী বর্শার আঘাতে ধ্বংস হয়েছিল। তাদের কতকের শরীর থেকে প্রবাহিত হচ্ছিল শোণিত ধারা, আর তাদের কতক দুঃখ ও বিষন্নতায় জর্জরিত হয়েছিল।
তাদেরকে আবূ সুফিয়ান পরীক্ষায় ফেলে দেয়, যার কারণে তাদের রক্তের প্রতিশোধ কেউ নিতে পারছিল না, আর না তার কৃতিত্বে কেউ তার সমকক্ষ ছিল।
جلابيب বহুবচন, এক বচনে جلباب জিলাব-এর অর্থ হলো: মোটা ও অমসৃণ পায়জামা। কাফিররা মুসলমানদেরকে, যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে ছিল, তাদেরকে এই উপাধি দিয়েছিল।