📄 মুসায়লামা কায্যাবের হত্যা
ওয়াহশী বলেন: এরপর মুসলিম বাহিনী যখন ইয়ামামার অধিপতি মুসায়লামা কায্যাবকে হত্যা করার জন্য রওনা হয়, তখন আমিও তাদের সংগে বের হই এবং ঐ বর্শাই সাথে নিয়ে নেই যা দ্বারা আমি হামযা (রা)-কে হত্যা করেছিলাম। যখন উভয় দলের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়, তখন আমি মুসায়লামা কায্যাবকে দেখলাম, সে তরবারি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে চিনতাম না, তাই কাউকে জিজ্ঞাসা করে তার সম্পর্কে জেনে নিলাম এবং তাকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। অন্যদিক থেকে জনৈক আনসার সাহাবীও তাকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হন। আমরা উভয়ই তার উপর আঘাত করার ইচ্ছা করি। আমি আমার বর্শা ঘুরিয়ে ঠিক করে তার দিকে ছুঁড়ে মারি যা তার গায়ে গিয়ে বিঁধে যায়। এদিকে আনসার সাহাবী তরবারি দিয়ে তার উপর প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। আল্লাহ্-ই ভাল জানেন আমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছি। যদি আমি তাকে হত্যা করে থাকি, তাহলে মনে করবো, (আমি একদিকে যেমন) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। তেমনি (অন্যদিকে) সব চাইতে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটিকেও আমিই হত্যা করেছি।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্ন ফযল, সুলায়মান ইবন ইয়াসার-এর সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন: সেদিন আমি শুনতে পেলাম, জনৈক ব্যক্তি চীৎকার করে বলছে, মুসায়লামা কায্যাবকে একজন হাবশী গোলাম হত্যা করেছে।
ইবন হিশام বলেন: আমি এ তথ্য পেয়েছি যে, ওয়াহশীকে মদ পানের দায়ে বার বার শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, এমনকি তাকে চাকরী থেকে বরখাস্তও করা হয়। উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলতেন: আমি জানতাম যে, আল্লাহ্ তা'আলা হামযা (রা)-এর হত্যাকারীকে ছাড়বেন না।
📄 মুস'আব ইবন উমায়ের (রা)-এর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন, মুস'আব ইবন উমায়ের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হিফাযত করার জন্য লড়তে থাকেন। এভাবে তিনি শহীদ হন। তাকে যে শহীদ করেছিলেন, সে হলো ইবন কামীআ লায়ছী। সে ভেবেছিল ইনিই রাসূলুল্লাহ্ (সা)। তাই সে কুরায়শদের কাছে ফিরে গিয়ে বলে যে, আমি মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করেছি। মুস'আব ইবন উমায়ের (রা) শহীদ হওয়ার পর, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঝাণ্ডা আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর হাতে অর্পণ করেন। আলী (রা)ও অন্যান্য مسلمانوں সংগে মিলিত হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন।
ইবন হিশাম বলেন: আমার কাছে মাসলামা ইব্ন আলকামা মাযিনী বর্ণনা করেন যে, উহুদের দিন লড়াই যখন তীব্র আকার ধারণ করল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের ঝাণ্ডার নীচে বসে গেলেন এবং তিনি আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে এ মর্মে নির্দেশ দিলেন: তুমি ঝাণ্ডা নিয়ে সামনে অগ্রসর হও। সুতরাং তিনি অগ্রসর হয়ে বললেন: আমিই আবুল ফুসাম। ইব্ন হিশামের বর্ণনা মতে, মতান্তরে আবুল কুসাম। তখন মুশরিক সেনাবাহিনীর পতাকাবাহী আবূ সা'দ ইব্ন আবু তালহা তাঁকে ডেকে বললেন: হে আবুল কুসাম! ময়দানে এসে লড়বে কি? আলী (রা) বললেন: হ্যাঁ! এই বলে তিনি দুই কাতারের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দু'দিক থেকে তরবারি চলতে লাগলো। এক সময় আলী (রা) তরবারির আঘাত করে আবূ সা'দকে ভূপাতিত করলেন। কিন্তু তিনি তাকে একবারেই খতম না করে ফিরে এলেন। তাঁর সাথীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি তাকে খতম করলেন না কেন? জবাবে তিনি বললেন: সে আমার সামনে নগ্ন হয়ে পড়ায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাছাড়া আমি মনে করেছিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে মৃত্যু দিয়েছেন।
অন্য বর্ণনামতে আবূ সা'দ ইব্ন আবূ তালহা উভয় কাতারের মাঝে এসে গর্জন করতে লাগল: "আমি কাসিম! কে আছ আমার সাথে মুকাবিলা করবে?" কেউ যখন বেরিয়ে এলো না, তখন সে বলতে লাগল: “হে মুহাম্মদ (সা)-এর সাথীরা, তোমরা ধারণা কর যে, তোমাদের নিহতরা জান্নাতে, আর আমাদের নিহতরা জাহান্নামে যাবে। লাতের কসম! তোমাদের ধারণা মিথ্যা, যদি সত্যি তোমাদের এ বিশ্বাস হতো, তাহলে অবশ্যই তোমাদের কেউ না কেউ মুকাবিলা জন্য বেরিয়ে আসত।” একথা শুনে আলী (রা) তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উভয়ের মাঝে তরবারি চলতে লাগলো। অবশেষে আলী (রা) তাঁকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেললেন।
📄 আসিম ইবন সাবিত (রা)-এর ঘটনা
আসিম ইব্ন সাবিত ইব্ন আবূ আকলা (রা)ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি মুসাফি ইবন তালহা ও তার ভাই জুল্লাস ইব্ন তালহাকে হত্যা করেন। আসিম ইবন সাবিত (রা) উভয় ভাইয়ের উপর একের পর এক তীর নিক্ষেপ করেন। তাদের এক একজন (মারাত্মকভাবে আহত হয়ে) তাদের মা সুলাফার কাছে পৌঁছে নিজের মাথা তার কোলে রাখলো। তাদের মা তাদের দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলেন: হে বৎস! কে তোমাদের আহত করেছে। তারা প্রত্যেকে বললেন: তা তো জানি না, তবে আমি আমার উপর তীর নিক্ষেপ করার সময় এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি: এই নাও, আর আমি আবূল আকলার ছেলে। তখন তাদের মা প্রতিজ্ঞা করলো যে, আল্লাহ্ যদি তাকে সুযোগ দেন, তবে সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করবে। আসিম (রা) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এরূপ অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি নিজেও কোন মুশরিক কে স্পর্শ করবেন না, আর তাকেও কোন মুশরিক স্পর্শ করতে না পারে।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা উহুদের যুদ্ধের সময় এই কবিতা আবৃত্তি করে, তখন সে মুশরিকদের পতাকাবাহী ছিল:
إن على اهل اللواء حقا * أن يخضبوا الصعدة أو تندق
মনে রেখ! পতাকাবাহীদের দায়িত্ব হলো, তারা নিজ তীরগুলোকে (শত্রুর রক্তে) ক্রমাগত রঞ্জিত করতে থাকবে, যতক্ষণ না তা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা এ কবিতা আবৃত্তি করছিল, তখন হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাকে হত্যা করেন।
📄 ফেরেশতা কর্তৃক হানযালা (রা)-এর গোসল প্রসংগে
তুমুল যুদ্ধ চলাকালে হানযালা ইব্ন আবূ আমির গাসীল (রা) ও আবু সুফিয়ান পরস্পর মুখোমুখি হল। হানযালা আবু সুফিয়ানকে কাবু করে ফেললেন। এমন সময় শাদ্দাদ ইব্ন আসওয়াদ ইব্ন শাউব লক্ষ্য করলো, হানযালা (রা) আবু সুফিয়ানকে কাবু করে ফেলছেন। তখন সে হানযালা (রা)-কে তরবারি দিয়ে আঘাত করে তাঁকে শহীদ করে ফেলে। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : তোমাদের সংগী অর্থাৎ হানযালাকে এখন ফেরেশতাগণ গোসল দিচ্ছে। সাহাবীরা তাঁর পরিবারস্থ লোক ও তাঁর স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলেন: হানযালা কি অবস্থায় ছিলেন। তাঁর স্ত্রী জবাব দিলেন : তিনি যখন যুদ্ধের ঘোষণা শোনেন, তখন তিনি গোসল ফরয থাকা অবস্থায় বেরিয়ে পড়েন।
ইবন হিশাম বলেন: অন্য বর্ণনায় الهاتفة এর স্থলে الهائعة রয়েছে।
হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে উত্তম ব্যক্তি হলো সে, যে তার ঘোড়ার লাগাম ধরে অপেক্ষা করে এবং যুদ্ধের ঘোষণা শুনামাত্রই যুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়। তিরিম্মাহ ইব্ন হাকীম আত্মাঈ বলেন: (তিরিম্মাহ অর্থ দীর্ঘকায় ব্যক্তি)
أنا ابن حماة المجد من آل مالك * إذا جعلت خور الرجال تهيع
আমি মালিক বংশের ঐ লোকদের সন্তান যারা মর্যাদা সংরক্ষণকারী, যখন কাপুরুষেরা আত্মসমর্পণ করে।
الهيعة অর্থ ভয়ংকর আওয়াজ।
ইব্ন ইসকাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) (হানযালা (রা)-এর বিবরণ শুনে) বললেন, এজন্যেই তো তাকে ফেরেশতারা গোসল দিয়েছেন,