📄 হামযা (রা)-এর শাহাদত
হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা)ও যুদ্ধে তৎপর ছিলেন এবং এক এক করে শত্রু নিধন করে চলছিলেন। এমন কি তিনি আরতাত্ ইব্ন আব্দ শুরাহবিল ইন্ন হিশাম ইব্ন আব্দ মানাফ ইব্ন আবদুদ্দারকেও মৃত্যুর ঘাঁটিতে পৌঁছে দিলেন। আরতাত ছিল পতাকাবাহীদের একজন। তারপর সিবা ইব্ন আবদুল উযযা গুবশানী হামযা (রা)-এর কাছে আসলো। তার কুনিয়াত ছিল আবূ নিয়ার। হামযা (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: এসো, হে খতনাকারিণীর ছেলে। তার মার নাম ছিলো উম্মু আনমার। সে শুরায়ক ইন্ন আমর ইব্ন ওয়াহাব সাকাফীর বাঁদী ছিল।
ইন্ন হিশাম বলেন: শুরায়ক ইব্ন আখনাছ ইবন শুরায়ক। উম্মু আনমার মক্কায় মহিলাদের খতনা করতো। মোট কথা, যখন তারা পরস্পর মুখোমুখি হলো। তখন হামযা (রা) তাকে হত্যা করলেন।
যুবায়র ইবন মুতঈম এর গোলাম ওয়াহশী (রা) বলেন: আল্লাহ্র কসম! আমি দেখতে লাগলাম, হামযা (রা) তরবারি দ্বারা লোকদেরকে নিধন করে চলেছেন। তাঁর তরবারি থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। হামযা (রা)-কে তখন ঈষৎ লালিমা মিশ্রিত কালো রঙের উটের মত দেখাচ্ছিল। ওয়াহশী (রা) বলেন: ততক্ষণে দেখলাম সিবা' ইব্ন আবদুল উয্যা আমার সামনে দিয়ে হামযা (রা)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাকে দেখে হামযা (রা) বললেন: হে খতনাকারিণীর ছেলে, এদিকে এসো। এই বলে তিনি তার উপর শক্ত আঘাত হানলেন, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। ঐ মুহূর্তে আমি আমার বর্শা ঘুরিয়ে সোজা তার উপর ছুঁড়লাম, যা একেবারে তার নাভীর উপরের অংশে বিদ্ধ হলো এবং তাঁর উভয় পায়ের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। হামযা (রা) আমার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলেন, কিন্তু তিনি কাবু হয়ে গিয়েছিলেন এবং মাটিতে পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে ছেড়ে দিলাম এবং এভাবেই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। এরপর আমি এসে আমার বর্শা নিয়ে নিলাম এবং নিজ বাহিনীর এক দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। এরপর আমার আর কোন প্রয়োজন অবশিষ্ট রইলো না।
ইব্ন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন ফযল ইব্ন আব্বাস ইব্ন রবী'আ ই হারিস, সুলায়মান ইব্ন ইয়াসার-এর সূত্রে জা'ফর ইব্ন আমর ইবন উমাইয়া যামরী থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: মু'আবিয়া ইব্ন আবু সুফিয়ানের শাসনামলে আমি এবং বন্ নওফল ইব্ন মানাফের লোক উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী ইব্ন্ন খিয়ার সফরে বের হলাম এবং লোকদের সাথে পাহাড়ী পথ অতিক্রম করলাম। আমরা ফেরার পথে হিমস এলাকার উপর দিয়ে যখন অতিক্রম করছিলাম, তখন যুবায়র ইবন মুতঈমের আযাদকৃত গোলাম ওয়াহশী সেখানে ছিলেন। সেখানে পৌঁছে উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি বলো? আমরা ওয়াহশী (রা)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে হামযা (রা)-এর হত্যার ঘটনাটি জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি তাঁকে কিভাবে হত্যা করেছিলেন? আমি বললাম আপনার ইচ্ছা হলে চলুন। আমরা বেরিয়ে হিমস শহরে ওয়াহশী (রা)-এর খোঁজ করতে লাগলাম। আমরা যখন তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছিলাম, তখন এক ব্যক্তি আমাদেরকে বলল : তোমরা তাঁকে ঘরের সামনের উঠানে পাবে। তিনি এখন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে আছেন। যদি তোমরা তাঁকে এমন অবস্থায় পাও, যে তিনি নেশগ্রস্ত নন, তবে দেখবে তিনি আরবী ভাষায় কথা বলছেন, তখন তাঁর কাছে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। এ সময় তোমরা তাঁকে যা জিজ্ঞাসা করবে, তার জবাব পেয়ে যাবে। আর যদি তাঁকে এমন অবস্থায় পাও যা সাধারণত হয়ে থাকে (অর্থাৎ তিনি যদি নেশাগ্রস্ত থাকেন) তবে তাঁকে ছেড়ে ফিরে আসবে। আমর ইবন উমাইয়া (রা,) বলেন: আমরা বেরিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। দেখতে পেলাম, তিনি তাঁর ঘরের সামনের উঠানে একটি চাটাইয়ের উপর বসে আছেন। তিনি বোগাস (কালো চীল)-এর মত একেবারেই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি কোন কারণ ছাড়াই চীৎকার করছিলেন। আমরা তাঁর কাছে পৌঁছে তাঁকে সালাম দিলাম। তখন তিনি মাথা উঠিয়ে উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আদী ইব্ন খিয়ারের ছেলে? উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী জবাব দিলেন: হ্যাঁ।
ওয়াহশী বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাকে ঐ সময়ে পর থেকে দেখিনি, যখন আমি তোমাকে তোমার মা সা'দিয়ার কাছে দিয়েছিলাম, যিনি তোমাকে যীতুয়া নামক স্থানে দুধ পান করিয়েছিলেন। আমি যখন তোমাকে তাঁর হাতে উঠিয়ে দিলাম। তখন তিনি উটের উপর বসে ছিলেন। তিনি তোমাকে যখন নীচ থেকে উঠিয়ে নেন, তখন তোমার পা দুটো কাপড়ের বাইরে ঝলমল করছিল। আল্লাহ্র কসম! তুমি এখানে এসে দাঁড়াতেই তোমার পাগুলো চিনে ফেলেছি।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমাইয়া বলেন, আমরা উভয়েই ওয়াহশীর পাশে বসে তাঁকে বললাম: আমরা আপনার কাছে এসেছি হামযা (রা)-এর ঘটনা জানার জন্য। আপনি তাঁকে কিভাবে হত্যা করেছিলেন? ওয়াহশী (রা) বললেন: আমি তোমাদেরকে সে ঘটনা ঠিক সেভাবেই শুনাবো, যেভাবে আমি তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শুনিয়ে ছিলাম, যখন তিনি আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি যুবায়র ইব্ন মুতঈম-এর গোলাম ছিলাম। তার চাচা তুমা ইব্ন আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। কুরায়শরা যখন উহুদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন যুবায়র আমাকে বললেন: যদি তুমি আমার চাচার প্রতিশোধে মুহাম্মদ (সা)-এর চাচা হামযা (রা)-কে হত্যা করতে পার, তবে আমি তোমাকে আযাদ করে দেব। সুতরাং কুরায়শদের সাথে (উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য) আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমি হাবশী ছিলাম। হাবশীদের মত বর্শা নিক্ষেপে আমি এমন দক্ষ ছিলাম যে, আমার বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট কমই হতো। যখন উভয় সৈন্যদলের মাঝে তুমুল লড়াই শুরু হলো, তখন আমি বেরিয়ে হামযা (রা)-এর তাকে রইলাম। আমি দেখলাম, তিনি ধূলায় ধূসরিত হয়ে লাল মিশ্রিত কৃষ্ণ উটের মত হয়ে গেছেন এবং তিনি তার তরবারি দ্বারা বরাবর লোকদেরকে নিধন করে যাচ্ছেন। তার তরবারির সামনে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আমি প্রস্তুত হয়ে দ্রুত তাঁর কাছে পৌঁছার জন্য গাছ কিংবা পাথরের আড়াল হতে লাগলাম। যাতে তিনি আমার নাগালের মধ্যে এসে যান। সেই মুহূর্তেই সীবা ইন্ন আবদুল উয্যা আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে হামযা (রা)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। হামযা (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: এসো হে খতনাকারিণীর ছেলে। এরপর হামযা (রা) সীবা এর উপর তরবারির একটি আঘাত করলেন কিন্তু তা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হলো। এ সময় আমি বর্শা ঘুরিয়ে ঠিকমত সোজা করে ছুঁড়ে মারলাম। বর্শাটি হামযা (রা)-এর নাভীর উপরের অংশে, পেটে বিদ্ধ হয়ে উভয় পায়ের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেল। হামযা (রা) এ অবস্থাতেই আমার দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তিনি কাবু হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে তাঁর জান বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এভাবেই ছেড়ে দিলাম। তারপর আমি তার কাছে গিয়ে বর্শা নিয়ে সেনা ছাউনিতে ফিরে এলাম এবং সেখানেই বসে রইলাম। এরপর আমার আর কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি নিছক আযাদ হওয়ার জন্যই তাঁকে হত্যা করেছিলাম। সুতরাং যখন মক্কায় ফিরে এলাম, তখন আমাকে আযাদ করে দেওয়া হলো।
আমি মক্কায় অবস্থানরত ছিলাম, কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) পবিত্র মক্কা নগরী জয় করলেন, তখন আমি পালিয়ে তায়েফে চলে গেলাম এবং সেখানেই অবস্থান করতে লাগলাম। যখন তায়েফের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে গেল, তখন আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম সিরিয়া, ইয়ামান কিংবা অন্য কোন দেশে চলে যাব। আল্লাহ্র কসম! আমি এই পেরেশানীর মধ্যেই ছিলাম, এ সময় এক ব্যক্তি এসে আমাকে বললেন: হে হতভাগা! আল্লাহ্র কসম, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন কাউকে হত্যা করেন না, যে তাঁর দীন গ্রহণ করে এবং কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে নেয়। ওয়াহশী (রা) বলেন: তার এ কথার পর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে মদীনায় আগমন করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে তাঁর মাথার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো দেখে বিস্মিত হলেন। এ সময় আমি কালিমায়ে শাহাদাত পড়ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম : হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। তিনি বললেন: বস্ এবং আমাকে বল তো তুমি কিভাবে হামযাকে হত্যা করেছিলে?
ওয়াহশী (রা) বলেন: আমি পূর্ণ ঘটনা যেভাবে তোমাদের কাছে বর্ণনা করলাম, সেভাবে তাঁর কাছে বর্ণনা করে শুনিয়েছিলাম। আমার কথা শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন:
ويحك ! غيب عنى وجهك ، فلا أرينك
হতভাগা! তোমার চেহারা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। আর যেন কোনদিন আমি তোমাকে না দেখি।
ওয়াহশী (রা) বলেন: তারপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেখানে থাকতেন, আমি আমার মুখ অন্য দিকে লুকিয়ে ফেলতাম, যাতে তিনি আমাকে না দেখতে পান। তার ইন্তিকাল পর্যন্ত আমি এরূপই করতাম।'
টিকাঃ
১. ইসলাম গ্রহণের পর তিনি 'সাহাবী'-এর মর্যাদা লাভ করেছেন, সুতরাং তাঁর সম্পর্কে নেশাগ্রস্ত হওয়ার বর্ণনা গ্রহণযোগ নয় (সম্পাদক)।
📄 মুসায়লামা কায্যাবের হত্যা
ওয়াহশী বলেন: এরপর মুসলিম বাহিনী যখন ইয়ামামার অধিপতি মুসায়লামা কায্যাবকে হত্যা করার জন্য রওনা হয়, তখন আমিও তাদের সংগে বের হই এবং ঐ বর্শাই সাথে নিয়ে নেই যা দ্বারা আমি হামযা (রা)-কে হত্যা করেছিলাম। যখন উভয় দলের মাঝে সংঘর্ষ শুরু হয়, তখন আমি মুসায়লামা কায্যাবকে দেখলাম, সে তরবারি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাকে চিনতাম না, তাই কাউকে জিজ্ঞাসা করে তার সম্পর্কে জেনে নিলাম এবং তাকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুতি নিলাম। অন্যদিক থেকে জনৈক আনসার সাহাবীও তাকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হন। আমরা উভয়ই তার উপর আঘাত করার ইচ্ছা করি। আমি আমার বর্শা ঘুরিয়ে ঠিক করে তার দিকে ছুঁড়ে মারি যা তার গায়ে গিয়ে বিঁধে যায়। এদিকে আনসার সাহাবী তরবারি দিয়ে তার উপর প্রচণ্ড আঘাত হানলেন। আল্লাহ্-ই ভাল জানেন আমাদের মধ্যে কে তাকে হত্যা করেছি। যদি আমি তাকে হত্যা করে থাকি, তাহলে মনে করবো, (আমি একদিকে যেমন) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। তেমনি (অন্যদিকে) সব চাইতে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটিকেও আমিই হত্যা করেছি।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্ন ফযল, সুলায়মান ইবন ইয়াসার-এর সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর ইবন খাত্তাব (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন: সেদিন আমি শুনতে পেলাম, জনৈক ব্যক্তি চীৎকার করে বলছে, মুসায়লামা কায্যাবকে একজন হাবশী গোলাম হত্যা করেছে।
ইবন হিশام বলেন: আমি এ তথ্য পেয়েছি যে, ওয়াহশীকে মদ পানের দায়ে বার বার শাস্তি দেওয়া হচ্ছিল, এমনকি তাকে চাকরী থেকে বরখাস্তও করা হয়। উমর ইবন খাত্তাব (রা) বলতেন: আমি জানতাম যে, আল্লাহ্ তা'আলা হামযা (রা)-এর হত্যাকারীকে ছাড়বেন না।
📄 মুস'আব ইবন উমায়ের (রা)-এর শাহাদত
ইবন ইসহাক বলেন, মুস'আব ইবন উমায়ের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে হিফাযত করার জন্য লড়তে থাকেন। এভাবে তিনি শহীদ হন। তাকে যে শহীদ করেছিলেন, সে হলো ইবন কামীআ লায়ছী। সে ভেবেছিল ইনিই রাসূলুল্লাহ্ (সা)। তাই সে কুরায়শদের কাছে ফিরে গিয়ে বলে যে, আমি মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করেছি। মুস'আব ইবন উমায়ের (রা) শহীদ হওয়ার পর, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঝাণ্ডা আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)-এর হাতে অর্পণ করেন। আলী (রা)ও অন্যান্য مسلمانوں সংগে মিলিত হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন।
ইবন হিশাম বলেন: আমার কাছে মাসলামা ইব্ন আলকামা মাযিনী বর্ণনা করেন যে, উহুদের দিন লড়াই যখন তীব্র আকার ধারণ করল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের ঝাণ্ডার নীচে বসে গেলেন এবং তিনি আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর কাছে লোক পাঠিয়ে এ মর্মে নির্দেশ দিলেন: তুমি ঝাণ্ডা নিয়ে সামনে অগ্রসর হও। সুতরাং তিনি অগ্রসর হয়ে বললেন: আমিই আবুল ফুসাম। ইব্ন হিশামের বর্ণনা মতে, মতান্তরে আবুল কুসাম। তখন মুশরিক সেনাবাহিনীর পতাকাবাহী আবূ সা'দ ইব্ন আবু তালহা তাঁকে ডেকে বললেন: হে আবুল কুসাম! ময়দানে এসে লড়বে কি? আলী (রা) বললেন: হ্যাঁ! এই বলে তিনি দুই কাতারের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। দু'দিক থেকে তরবারি চলতে লাগলো। এক সময় আলী (রা) তরবারির আঘাত করে আবূ সা'দকে ভূপাতিত করলেন। কিন্তু তিনি তাকে একবারেই খতম না করে ফিরে এলেন। তাঁর সাথীরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: আপনি তাকে খতম করলেন না কেন? জবাবে তিনি বললেন: সে আমার সামনে নগ্ন হয়ে পড়ায় তার প্রতি আমার দয়া হয়। তাছাড়া আমি মনে করেছিলাম, আল্লাহ্ তা'আলা তাকে মৃত্যু দিয়েছেন।
অন্য বর্ণনামতে আবূ সা'দ ইব্ন আবূ তালহা উভয় কাতারের মাঝে এসে গর্জন করতে লাগল: "আমি কাসিম! কে আছ আমার সাথে মুকাবিলা করবে?" কেউ যখন বেরিয়ে এলো না, তখন সে বলতে লাগল: “হে মুহাম্মদ (সা)-এর সাথীরা, তোমরা ধারণা কর যে, তোমাদের নিহতরা জান্নাতে, আর আমাদের নিহতরা জাহান্নামে যাবে। লাতের কসম! তোমাদের ধারণা মিথ্যা, যদি সত্যি তোমাদের এ বিশ্বাস হতো, তাহলে অবশ্যই তোমাদের কেউ না কেউ মুকাবিলা জন্য বেরিয়ে আসত।” একথা শুনে আলী (রা) তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উভয়ের মাঝে তরবারি চলতে লাগলো। অবশেষে আলী (রা) তাঁকে তরবারির আঘাতে হত্যা করে ফেললেন।
📄 আসিম ইবন সাবিত (রা)-এর ঘটনা
আসিম ইব্ন সাবিত ইব্ন আবূ আকলা (রা)ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তিনি মুসাফি ইবন তালহা ও তার ভাই জুল্লাস ইব্ন তালহাকে হত্যা করেন। আসিম ইবন সাবিত (রা) উভয় ভাইয়ের উপর একের পর এক তীর নিক্ষেপ করেন। তাদের এক একজন (মারাত্মকভাবে আহত হয়ে) তাদের মা সুলাফার কাছে পৌঁছে নিজের মাথা তার কোলে রাখলো। তাদের মা তাদের দু'জনকে জিজ্ঞাসা করলেন: হে বৎস! কে তোমাদের আহত করেছে। তারা প্রত্যেকে বললেন: তা তো জানি না, তবে আমি আমার উপর তীর নিক্ষেপ করার সময় এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি: এই নাও, আর আমি আবূল আকলার ছেলে। তখন তাদের মা প্রতিজ্ঞা করলো যে, আল্লাহ্ যদি তাকে সুযোগ দেন, তবে সে আসিমের মাথার খুলিতে মদ পান করবে। আসিম (রা) আল্লাহ্ তা'আলার কাছে এরূপ অঙ্গীকার করেছিলেন যে, তিনি নিজেও কোন মুশরিক কে স্পর্শ করবেন না, আর তাকেও কোন মুশরিক স্পর্শ করতে না পারে।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা উহুদের যুদ্ধের সময় এই কবিতা আবৃত্তি করে, তখন সে মুশরিকদের পতাকাবাহী ছিল:
إن على اهل اللواء حقا * أن يخضبوا الصعدة أو تندق
মনে রেখ! পতাকাবাহীদের দায়িত্ব হলো, তারা নিজ তীরগুলোকে (শত্রুর রক্তে) ক্রমাগত রঞ্জিত করতে থাকবে, যতক্ষণ না তা ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়।
উসমান ইব্ন আবূ তালহা এ কবিতা আবৃত্তি করছিল, তখন হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা) তাকে হত্যা করেন।