📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক তরুণ যুবকের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি
ইব্ন হিশাম বলেন: উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সামুরা ইব্ন্ন জুন্দুব ফাযারী এবং বনু হারিসা গোত্রের রাফি' ইন্ন খাদীজ (রা)-কে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার অনুমতি দিলেন। তখন তাদের উভয়ের বয়স ছিল পনের বছর। তিনি প্রথমে তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর যখন তাঁর কাছে এ মর্মে বলা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রাফি' তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত পারদর্শী, তখন তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। রাফি' (রা)-কে অনুমতি দেওয়ার পর সামুরা ইবন জুন্দুর (রা)-এর ব্যাপারে বলা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সামুরা তো রাফিকে কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারে। কাজেই তাঁকেও অনুমতি দিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকেও অনুমতি দিলেন। আর নিম্নোক্ত লোকদের ফিরিয়ে দিলেন: (১) উসামা ইব্ন্ন যায়দ (রা), (২) আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইবন খাত্তাব (রা), (৩) যায়দ ইব্ন সাবিত (রা), যিনি ছিলেন মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক; (৪) বারা ইব্ন আযিব (রা), যিনি বনূ হারিসার লোক ছিলেন; (৫) আমর ইব্ন হাযম, যিনি মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক ছিলেন। এরপর তিনি খন্দকের যুদ্ধে এঁদের সকলকে অনুমতি দিয়েছিলেন, তখন এঁদের বয়স ছিল পনের বছর।
ইবন ইসহাক বলেন: এদিকে কুরায়শরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করল। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, যার মধ্যে অশ্বারোহী ছিল দু'শ। এদেরকে তারা একপাশে রেখে দিয়েছিল, প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। অশ্বারোহীদের ডান দিকে খালিদ ইব্ ওয়ালীদ, আর বাম দিকে ইকরামা ইব্ন আবু জাহলকে নিযুক্ত করা হল।
📄 আবূ দুজানা এবং তাঁর বীরত্ব প্রসংগে
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) (নিজ তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবাদের লক্ষ্য করে) বললেন:
من يأخذ هذا السيف بحقة
• কে আছে, যে এই তরবারি নিয়ে এর হক আদায় করবে? একথা শুনে অনেকেই তরবারি নেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা কাউকেই দিলেন না। পরিশেষে বনূ সা'দার লোক আবূ দুজানা সিমাক ইবন খারাশা তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এর হক কি? তখন তিনি বললেন:
أن تضرب به العدو حتى ينحنى
এর হক এই যে, তা দ্বারা শত্রুকে এমনভাবে মারবে, যাতে তা বাঁকা হয়ে যায়। তখন দুজানা (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) এই তরবারি আমি নেব। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তা দিয়ে দিলেন।
আবু দুজানা (রা) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী পুরুষ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশলে পারদর্শী। যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সময় তিনি একটি লাল পট্টি চিহ্নস্বরূপ মাথায় বেঁধে নিতেন। এর দ্বারা বুঝা যেত, তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত থেকে তরবারি নিয়ে, সেই লাল পট্টি বেঁধে নিলেন এবং বীরত্বের সাথে উভয় কাতারের মাঝে হাটতে লাগলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম জা'ফর ইবন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আসলাম বনূ সালামার জনৈক আনসার সাহাবী থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ দুজানা (রা)-কে বীরত্বের সাথে চলতে দেখে বললেন:
انها لمشية يبغضها الله الا في مثل هذا الموطن
এ অহংকারসুলভ চলা আল্লাহ্ তা'আলা অত্যন্ত ঘৃণা করেন, তবে এ ধরনের মুহূর্ত ছাড়া।
ইবন ইসহাক বলেন: আসিম ইব্ন আমর ইব্ন কাতাদা আমাকে শুনিয়েছেন যে, আমর ইবন মালিক ইব্ নু'মান এর গোলাম আমির ইবন সায়ফী যে ছিল বনূ যুবাআর লোক, সে আওস গোত্রের পঞ্চাশ জন তরুণ, অন্য বর্ণনা মতে, পনের জন তরুণকে সাথে নিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে দূরে থাকার জন্য। সে কুরায়শদের সাথে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে তার সম্প্রদায়ের সাথে দেখা হলে কেউ-ই তার বিরুদ্ধে যাবে না। সেমতে মুকাবিলার সময় মক্কার গোলাম ও হাবশীদেরকে নিয়ে এই আবূ আমরই সর্বপ্রথম অগ্রসর হল। সে তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলল হে আওস গোত্র! আমি আবু আমির। জবাবে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল হে ফাসিক! আল্লাহ্ তোকে চক্ষু থেকে মাহরুম করুন। জাহিলী যুগে আবূ আমিরকে 'রাহিব' বলা হতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার নাম রাখেন ফাসিক। সে তার সম্প্রদায়ের জবাব শুনে বললেন: আমার সম্প্রদায়কে ছেড়ে আসার পর তারা বিগড়ে গেছে। এরপর সে তাদের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ করল এবং প্রস্তর বর্ষণ করল।
📄 আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী কর্তৃক কুরায়শদের উত্তেজিত করা প্রসংগে
ইরুন ইসহাক বলেন: আবু সুফিয়ান আব্দুদ্দারের পতাকাবাহীদেরকে যুদ্ধের প্রতি উত্তেজিত করার জন্য বলছিলো: শোন হে বনু আবদুদ্দার! বদর যুদ্ধেও ঝাণ্ডা তোমাদের হাতেই ছিল। তখন আমাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তা তোমাদের জানা আছে। মনে রেখ, ঝাণ্ডা দেখেই লোকেরা অগ্রসর হয়, ঝাণ্ডা স্থানচ্যুত হলে লোকদের পা পিছলে যায়। সুতরাং এখনও সময় আছে, হয়ত তোমরা আমাদেরকে নিশ্চয়তা দাও যে, এ ঝাণ্ডা উত্তোলিত রাখবে অথবা ঝাণ্ডা ছেড়ে দাও, আমরা নিজেরাই তা সামলে নেব।
একথা শুনে তারা অবিচল থাকার অঙ্গীকার করে বলল: ঝাণ্ডা তোমাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারি, তবে কালকে যুদ্ধের ময়দানে দেখে নিবে আমাদের কৃতিত্ব। আবু সুফিয়ান এটাই চাচ্ছিল।
উভয় দলের লোকেরা যখন যুদ্ধের জন্য মুখোমুখি হলো তখন হিন্দা তার সঙ্গিনীদের নিয়ে উঠে পড়লো এবং ঢোল বাজিয়ে ও গান গেয়ে পুরুষদের উত্তেজিত করতে লাগলো। হিন্দা এ কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল:
ويها بني عبد الدار * ويها حماة الادبار
ضريا بكل بتار .
উঠ হে বনু আবদুদ্দার। উঠ, হে পিছনের লোকদেরকে রক্ষণাবেক্ষণকারীরা। শাণিত তরবারি নাও এবং হামলা করো।
আরো বলছিল:
إن تقبلوا نعانق * ونفرش النمارق .
او تدبروا نفارق فراق غير وامق
তোমরা যদি অগ্রসর হও, তবে আমরা মহিলারা তোমাদেরকে বুকে জড়িয়ে নিব এবং তোমাদের জন্য উত্তম বিছানা ও বালিশ বিছিয়ে অভ্যর্থনা করবো।
আর যদি তোমরা পশ্চাদপসারণ করো, তবে আমরা তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো, যেমন বিচ্ছিন্ন হয় প্রেমহীন ব্যক্তি।
ইব্ন হিশাম বর্ণনা করেন: উহুদের যুদ্ধে مسلمانوں ধ্বনি ছিল:
أمت أمت
মার, মার
ইব্ন ইসহাক বলেন: লোকেরা যুদ্ধ আরম্ভ করল এবং তা প্রচণ্ডরূপ ধারণ করল। আবূ দুজানা (রা) লড়াই করতে করতে শত্রুদলের কাতারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
ইন্ন হিশাম বলেন: একাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে এ তথ্য শুনিয়েছেন যে, যুবায়র ইন্ন আওয়াম (রা) বলেন, আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে তাঁর তরবারি চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা আমাকে না দিয়ে আবু দুজানাকে দেওয়ার কারণে আমি এই ভেবে মনঃক্ষুণ্ণ হলাম যে, আমি তাঁর ফুফু সুফিয়া (রা)-এর ছেলে ও কুরায়শের লোক এবং আবূ দুজানার পূর্বে আমি তা চাইলাম, কিন্তু তিনি আমাকে বাদ দিয়ে তাঁকে দিলেন। আল্লাহ্র কসম! আমি দেখব সেকি করে। এই বলে আমি তাঁর অনুসরণ করতে লাগলাম। দেখলাম্, তিনি তাঁর সেই লাল পট্টি বের করে মাথায় বেঁধে নিলেন। এটা দেখে কোন কোন আনসার সাহাবী (রা) বললেন: আবু দুজানা (রা) তো মৃত্যুর পট্টি বেঁধে নিয়েছে, তিনি এই কবিতা পড়া অবস্থায় রণাঙ্গনে ঝাপিয়ে ছিলেন:
انا الذي عاهدني خليلي * ونحن بالسفح لدى النخيل
ألا أقوم للدهر في الكيول * أضرب بسيف الله والرسول
আমি সেই ব্যক্তি, যার থেকে আমার বন্ধু (রাসূলুল্লাহ (সা) খেজুর বৃক্ষের নীচে, পাহাড়ের কাছে, প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন।
আমি উঠে কাতারের শেষ পর্যন্ত মুকাবিলা করতে থাকবো। আল্লাহ্ ও তার রাসূল (সা)-এর তরবারি সমানে চালিয়ে যাব।
ইব্ন হিশাম বলেন : অন্য বর্ণনায় الكبول শব্দের স্থলে الكبول শব্দ রয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবু দুজনা (রা) যাকেই সামনে পেলেন, তাকেই হত্যা করলেন। মুশরিকদের মধ্যেও এমন একজন ছিল, যে আমাদের মুসলমানদের যাকেই পেত তাকেই শেষ করে দিত। আমি লক্ষ্য করলাম, সে আর আবু দুজানা (রা) পরস্পরের কাছাকাছি হতে লাগলো। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করলাম, তিনি যেন এদের পরস্পরের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন।' তাই ঘটল এবং তারা পরস্পরের মুখোমুখি হল। উভয় দিক থেকে তরবারি চলতে লাগল। মুশরিক ব্যক্তিটি আবূ দুজানা (রা)-এর উপর তরবারির আঘাত করল, কিন্তু আবূ দুজানা (রা) তরবারি দিয়ে তা প্রতিহত করে বেঁচে গেলেন। এরপর আবূ দুজানা (রা) কঠোর আঘাত করে তাকে শেষ করে দিলেন। এরপর আমি লক্ষ্য করলাম, আবু দুজানা (রা) হিন্দা বিন্ত উতবার মাথার উপর তরবারি উত্তোলন করলেন, কিন্তু তিনি তাঁর উপর থেকে তরবারি সরিয়ে নিলেন।
যুবায়র (রা) বলেন: আমি ভাবতে লাগলাম, (এর রহস্য) আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, স্বয়ং আবূ দুজানা সিমাক ইবন খারাশা (রা)-এ সম্পর্কে নিজেই বর্ণনা করেন: আমি লক্ষ্য করলাম, এক ব্যক্তি যুদ্ধের জন্য লোকদের উত্তেজিত করছে। আমি তার দিকে অগ্রসর হলাম এবং তাকে শেষ করার জন্য তার উপর তরবারি উঠালাম, তখন সে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। দেখলাম সে-একজন মহিলা। ভাবলাম, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র তরবারি দ্বারা একজন মহিলাকে হত্যা করে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব না।
📄 হামযা (রা)-এর শাহাদত
হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব (রা)ও যুদ্ধে তৎপর ছিলেন এবং এক এক করে শত্রু নিধন করে চলছিলেন। এমন কি তিনি আরতাত্ ইব্ন আব্দ শুরাহবিল ইন্ন হিশাম ইব্ন আব্দ মানাফ ইব্ন আবদুদ্দারকেও মৃত্যুর ঘাঁটিতে পৌঁছে দিলেন। আরতাত ছিল পতাকাবাহীদের একজন। তারপর সিবা ইব্ন আবদুল উযযা গুবশানী হামযা (রা)-এর কাছে আসলো। তার কুনিয়াত ছিল আবূ নিয়ার। হামযা (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: এসো, হে খতনাকারিণীর ছেলে। তার মার নাম ছিলো উম্মু আনমার। সে শুরায়ক ইন্ন আমর ইব্ন ওয়াহাব সাকাফীর বাঁদী ছিল।
ইন্ন হিশাম বলেন: শুরায়ক ইব্ন আখনাছ ইবন শুরায়ক। উম্মু আনমার মক্কায় মহিলাদের খতনা করতো। মোট কথা, যখন তারা পরস্পর মুখোমুখি হলো। তখন হামযা (রা) তাকে হত্যা করলেন।
যুবায়র ইবন মুতঈম এর গোলাম ওয়াহশী (রা) বলেন: আল্লাহ্র কসম! আমি দেখতে লাগলাম, হামযা (রা) তরবারি দ্বারা লোকদেরকে নিধন করে চলেছেন। তাঁর তরবারি থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। হামযা (রা)-কে তখন ঈষৎ লালিমা মিশ্রিত কালো রঙের উটের মত দেখাচ্ছিল। ওয়াহশী (রা) বলেন: ততক্ষণে দেখলাম সিবা' ইব্ন আবদুল উয্যা আমার সামনে দিয়ে হামযা (রা)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তাকে দেখে হামযা (রা) বললেন: হে খতনাকারিণীর ছেলে, এদিকে এসো। এই বলে তিনি তার উপর শক্ত আঘাত হানলেন, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো। ঐ মুহূর্তে আমি আমার বর্শা ঘুরিয়ে সোজা তার উপর ছুঁড়লাম, যা একেবারে তার নাভীর উপরের অংশে বিদ্ধ হলো এবং তাঁর উভয় পায়ের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে পড়লো। হামযা (রা) আমার দিকে এগিয়ে আসতে চাইলেন, কিন্তু তিনি কাবু হয়ে গিয়েছিলেন এবং মাটিতে পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে ছেড়ে দিলাম এবং এভাবেই তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল। এরপর আমি এসে আমার বর্শা নিয়ে নিলাম এবং নিজ বাহিনীর এক দিকে গিয়ে দাঁড়ালাম। এরপর আমার আর কোন প্রয়োজন অবশিষ্ট রইলো না।
ইব্ন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন ফযল ইব্ন আব্বাস ইব্ন রবী'আ ই হারিস, সুলায়মান ইব্ন ইয়াসার-এর সূত্রে জা'ফর ইব্ন আমর ইবন উমাইয়া যামরী থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: মু'আবিয়া ইব্ন আবু সুফিয়ানের শাসনামলে আমি এবং বন্ নওফল ইব্ন মানাফের লোক উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী ইব্ন্ন খিয়ার সফরে বের হলাম এবং লোকদের সাথে পাহাড়ী পথ অতিক্রম করলাম। আমরা ফেরার পথে হিমস এলাকার উপর দিয়ে যখন অতিক্রম করছিলাম, তখন যুবায়র ইবন মুতঈমের আযাদকৃত গোলাম ওয়াহশী সেখানে ছিলেন। সেখানে পৌঁছে উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি বলো? আমরা ওয়াহশী (রা)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে হামযা (রা)-এর হত্যার ঘটনাটি জিজ্ঞাসা করি যে, তিনি তাঁকে কিভাবে হত্যা করেছিলেন? আমি বললাম আপনার ইচ্ছা হলে চলুন। আমরা বেরিয়ে হিমস শহরে ওয়াহশী (রা)-এর খোঁজ করতে লাগলাম। আমরা যখন তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছিলাম, তখন এক ব্যক্তি আমাদেরকে বলল : তোমরা তাঁকে ঘরের সামনের উঠানে পাবে। তিনি এখন মদ খেয়ে মাতাল হয়ে আছেন। যদি তোমরা তাঁকে এমন অবস্থায় পাও, যে তিনি নেশগ্রস্ত নন, তবে দেখবে তিনি আরবী ভাষায় কথা বলছেন, তখন তাঁর কাছে তোমাদের উদ্দেশ্য সফল হবে। এ সময় তোমরা তাঁকে যা জিজ্ঞাসা করবে, তার জবাব পেয়ে যাবে। আর যদি তাঁকে এমন অবস্থায় পাও যা সাধারণত হয়ে থাকে (অর্থাৎ তিনি যদি নেশাগ্রস্ত থাকেন) তবে তাঁকে ছেড়ে ফিরে আসবে। আমর ইবন উমাইয়া (রা,) বলেন: আমরা বেরিয়ে তাঁর কাছে গেলাম। দেখতে পেলাম, তিনি তাঁর ঘরের সামনের উঠানে একটি চাটাইয়ের উপর বসে আছেন। তিনি বোগাস (কালো চীল)-এর মত একেবারেই বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। তিনি কোন কারণ ছাড়াই চীৎকার করছিলেন। আমরা তাঁর কাছে পৌঁছে তাঁকে সালাম দিলাম। তখন তিনি মাথা উঠিয়ে উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি আদী ইব্ন খিয়ারের ছেলে? উবায়দুল্লাহ্ ইব্ন আদী জবাব দিলেন: হ্যাঁ।
ওয়াহশী বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাকে ঐ সময়ে পর থেকে দেখিনি, যখন আমি তোমাকে তোমার মা সা'দিয়ার কাছে দিয়েছিলাম, যিনি তোমাকে যীতুয়া নামক স্থানে দুধ পান করিয়েছিলেন। আমি যখন তোমাকে তাঁর হাতে উঠিয়ে দিলাম। তখন তিনি উটের উপর বসে ছিলেন। তিনি তোমাকে যখন নীচ থেকে উঠিয়ে নেন, তখন তোমার পা দুটো কাপড়ের বাইরে ঝলমল করছিল। আল্লাহ্র কসম! তুমি এখানে এসে দাঁড়াতেই তোমার পাগুলো চিনে ফেলেছি।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমাইয়া বলেন, আমরা উভয়েই ওয়াহশীর পাশে বসে তাঁকে বললাম: আমরা আপনার কাছে এসেছি হামযা (রা)-এর ঘটনা জানার জন্য। আপনি তাঁকে কিভাবে হত্যা করেছিলেন? ওয়াহশী (রা) বললেন: আমি তোমাদেরকে সে ঘটনা ঠিক সেভাবেই শুনাবো, যেভাবে আমি তা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে শুনিয়ে ছিলাম, যখন তিনি আমাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি যুবায়র ইব্ন মুতঈম-এর গোলাম ছিলাম। তার চাচা তুমা ইব্ন আদী বদরের যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। কুরায়শরা যখন উহুদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন যুবায়র আমাকে বললেন: যদি তুমি আমার চাচার প্রতিশোধে মুহাম্মদ (সা)-এর চাচা হামযা (রা)-কে হত্যা করতে পার, তবে আমি তোমাকে আযাদ করে দেব। সুতরাং কুরায়শদের সাথে (উহুদের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার জন্য) আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমি হাবশী ছিলাম। হাবশীদের মত বর্শা নিক্ষেপে আমি এমন দক্ষ ছিলাম যে, আমার বর্শা লক্ষ্যভ্রষ্ট কমই হতো। যখন উভয় সৈন্যদলের মাঝে তুমুল লড়াই শুরু হলো, তখন আমি বেরিয়ে হামযা (রা)-এর তাকে রইলাম। আমি দেখলাম, তিনি ধূলায় ধূসরিত হয়ে লাল মিশ্রিত কৃষ্ণ উটের মত হয়ে গেছেন এবং তিনি তার তরবারি দ্বারা বরাবর লোকদেরকে নিধন করে যাচ্ছেন। তার তরবারির সামনে কেউই রেহাই পাচ্ছে না। আমি প্রস্তুত হয়ে দ্রুত তাঁর কাছে পৌঁছার জন্য গাছ কিংবা পাথরের আড়াল হতে লাগলাম। যাতে তিনি আমার নাগালের মধ্যে এসে যান। সেই মুহূর্তেই সীবা ইন্ন আবদুল উয্যা আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে হামযা (রা)-এর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলো। হামযা (রা) তাকে লক্ষ্য করে বললেন: এসো হে খতনাকারিণীর ছেলে। এরপর হামযা (রা) সীবা এর উপর তরবারির একটি আঘাত করলেন কিন্তু তা লক্ষ্য ভ্রষ্ট হলো। এ সময় আমি বর্শা ঘুরিয়ে ঠিকমত সোজা করে ছুঁড়ে মারলাম। বর্শাটি হামযা (রা)-এর নাভীর উপরের অংশে, পেটে বিদ্ধ হয়ে উভয় পায়ের মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে গেল। হামযা (রা) এ অবস্থাতেই আমার দিকে অগ্রসর হতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু তিনি কাবু হয়ে গিয়েছিলেন এবং সেখানেই পড়ে গেলেন। আমি তাঁকে তাঁর জান বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত এভাবেই ছেড়ে দিলাম। তারপর আমি তার কাছে গিয়ে বর্শা নিয়ে সেনা ছাউনিতে ফিরে এলাম এবং সেখানেই বসে রইলাম। এরপর আমার আর কোন প্রয়োজন ছিল না। আমি নিছক আযাদ হওয়ার জন্যই তাঁকে হত্যা করেছিলাম। সুতরাং যখন মক্কায় ফিরে এলাম, তখন আমাকে আযাদ করে দেওয়া হলো।
আমি মক্কায় অবস্থানরত ছিলাম, কিন্তু যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) পবিত্র মক্কা নগরী জয় করলেন, তখন আমি পালিয়ে তায়েফে চলে গেলাম এবং সেখানেই অবস্থান করতে লাগলাম। যখন তায়েফের প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে গেল, তখন আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লাম। একবার ভাবলাম সিরিয়া, ইয়ামান কিংবা অন্য কোন দেশে চলে যাব। আল্লাহ্র কসম! আমি এই পেরেশানীর মধ্যেই ছিলাম, এ সময় এক ব্যক্তি এসে আমাকে বললেন: হে হতভাগা! আল্লাহ্র কসম, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এমন কাউকে হত্যা করেন না, যে তাঁর দীন গ্রহণ করে এবং কালিমায়ে শাহাদাত পড়ে নেয়। ওয়াহশী (রা) বলেন: তার এ কথার পর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে মদীনায় আগমন করলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে তাঁর মাথার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো দেখে বিস্মিত হলেন। এ সময় আমি কালিমায়ে শাহাদাত পড়ছিলাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন: তুমি কি ওয়াহশী? আমি বললাম : হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। তিনি বললেন: বস্ এবং আমাকে বল তো তুমি কিভাবে হামযাকে হত্যা করেছিলে?
ওয়াহশী (রা) বলেন: আমি পূর্ণ ঘটনা যেভাবে তোমাদের কাছে বর্ণনা করলাম, সেভাবে তাঁর কাছে বর্ণনা করে শুনিয়েছিলাম। আমার কথা শেষ হওয়ার পর তিনি বললেন:
ويحك ! غيب عنى وجهك ، فلا أرينك
হতভাগা! তোমার চেহারা আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। আর যেন কোনদিন আমি তোমাকে না দেখি।
ওয়াহশী (রা) বলেন: তারপর থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যেখানে থাকতেন, আমি আমার মুখ অন্য দিকে লুকিয়ে ফেলতাম, যাতে তিনি আমাকে না দেখতে পান। তার ইন্তিকাল পর্যন্ত আমি এরূপই করতাম।'
টিকাঃ
১. ইসলাম গ্রহণের পর তিনি 'সাহাবী'-এর মর্যাদা লাভ করেছেন, সুতরাং তাঁর সম্পর্কে নেশাগ্রস্ত হওয়ার বর্ণনা গ্রহণযোগ নয় (সম্পাদক)।