📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উহুদে শিবির স্থাপন
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) অগ্রসর হয়ে উহুদের এক ঘাঁটিতে গিয়ে অবতরণ করলেন। স্থানটি ছিল পাহাড়ের পাশে উপত্যকার উঁচুতে, তিনি উট ও সৈন্য দলকে উহুদ পাহাড়ের দিকে রাখলেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তোমাদের কেউ যেন যুদ্ধ না করে, যতক্ষণ না আমি তাকে এর নির্দেশ দেই। তখন কুরায়শরা নিজেদের উট ও ঘোড়া সমগাহ নামক স্থানের ক্ষেতে চরাচ্ছিল, যা মুসলমানদের মালিকানাধীন 'কানাত' উপত্যকার একটি অংশ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধ করতে নিষেধ করলে জনৈক আনসার সাহাবী (রা) বললেন: বনূ কায়লাহ (অর্থাৎ আওস ও খাযরাজ)-এর ক্ষেতে পশু চরানো হচ্ছে অথচ আমরা এর প্রতিরোধে এখনো তরবারি হাতে নিলাম না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলেন, তাঁর সংগে তখন সাত শত লোক ছিলেন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা), বনূ আমর ইব্ন আওফের লোককে তীরন্দাজদের দলপতি নিযুক্ত করলেন। তিনি তখন সাদা পোশাক পরিহিত ছিলেন। তীরন্দাজদের মোট সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: তোমরা তীর দ্বারা অশ্বারোহীদেরকে প্রতিরোধ করবে, যাতে শত্রুদল পিছন দিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ না করতে পারে। যুদ্ধের পরিস্থিতি আমাদের অনুকূল কিংবা প্রতিকূল যাই হোক না কেন, তোমরা তোমাদের স্থানে অটল থাকবে। তোমাদের ঐ দিক থেকে আমাদের উপর যেন কোন আক্রমণ না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেদিন দু'টি লৌহবর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি মুস'আব ইবন উমায়ের এর হাতে ঝাণ্ডা অর্পণ করলেন। তিনি ছিলেন বনূ আবদুদ্দারের লোক।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক তরুণ যুবকের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি
ইব্ন হিশাম বলেন: উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সামুরা ইব্ন্ন জুন্দুব ফাযারী এবং বনু হারিসা গোত্রের রাফি' ইন্ন খাদীজ (রা)-কে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার অনুমতি দিলেন। তখন তাদের উভয়ের বয়স ছিল পনের বছর। তিনি প্রথমে তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর যখন তাঁর কাছে এ মর্মে বলা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রাফি' তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত পারদর্শী, তখন তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। রাফি' (রা)-কে অনুমতি দেওয়ার পর সামুরা ইবন জুন্দুর (রা)-এর ব্যাপারে বলা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সামুরা তো রাফিকে কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারে। কাজেই তাঁকেও অনুমতি দিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকেও অনুমতি দিলেন। আর নিম্নোক্ত লোকদের ফিরিয়ে দিলেন: (১) উসামা ইব্ন্ন যায়দ (রা), (২) আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইবন খাত্তাব (রা), (৩) যায়দ ইব্ন সাবিত (রা), যিনি ছিলেন মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক; (৪) বারা ইব্ন আযিব (রা), যিনি বনূ হারিসার লোক ছিলেন; (৫) আমর ইব্ন হাযম, যিনি মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক ছিলেন। এরপর তিনি খন্দকের যুদ্ধে এঁদের সকলকে অনুমতি দিয়েছিলেন, তখন এঁদের বয়স ছিল পনের বছর।
ইবন ইসহাক বলেন: এদিকে কুরায়শরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করল। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, যার মধ্যে অশ্বারোহী ছিল দু'শ। এদেরকে তারা একপাশে রেখে দিয়েছিল, প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। অশ্বারোহীদের ডান দিকে খালিদ ইব্ ওয়ালীদ, আর বাম দিকে ইকরামা ইব্ন আবু জাহলকে নিযুক্ত করা হল।
📄 আবূ দুজানা এবং তাঁর বীরত্ব প্রসংগে
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) (নিজ তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবাদের লক্ষ্য করে) বললেন:
من يأخذ هذا السيف بحقة
• কে আছে, যে এই তরবারি নিয়ে এর হক আদায় করবে? একথা শুনে অনেকেই তরবারি নেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা কাউকেই দিলেন না। পরিশেষে বনূ সা'দার লোক আবূ দুজানা সিমাক ইবন খারাশা তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এর হক কি? তখন তিনি বললেন:
أن تضرب به العدو حتى ينحنى
এর হক এই যে, তা দ্বারা শত্রুকে এমনভাবে মারবে, যাতে তা বাঁকা হয়ে যায়। তখন দুজানা (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) এই তরবারি আমি নেব। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তা দিয়ে দিলেন।
আবু দুজানা (রা) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী পুরুষ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশলে পারদর্শী। যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সময় তিনি একটি লাল পট্টি চিহ্নস্বরূপ মাথায় বেঁধে নিতেন। এর দ্বারা বুঝা যেত, তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত থেকে তরবারি নিয়ে, সেই লাল পট্টি বেঁধে নিলেন এবং বীরত্বের সাথে উভয় কাতারের মাঝে হাটতে লাগলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম জা'ফর ইবন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আসলাম বনূ সালামার জনৈক আনসার সাহাবী থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ দুজানা (রা)-কে বীরত্বের সাথে চলতে দেখে বললেন:
انها لمشية يبغضها الله الا في مثل هذا الموطن
এ অহংকারসুলভ চলা আল্লাহ্ তা'আলা অত্যন্ত ঘৃণা করেন, তবে এ ধরনের মুহূর্ত ছাড়া।
ইবন ইসহাক বলেন: আসিম ইব্ন আমর ইব্ন কাতাদা আমাকে শুনিয়েছেন যে, আমর ইবন মালিক ইব্ নু'মান এর গোলাম আমির ইবন সায়ফী যে ছিল বনূ যুবাআর লোক, সে আওস গোত্রের পঞ্চাশ জন তরুণ, অন্য বর্ণনা মতে, পনের জন তরুণকে সাথে নিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে দূরে থাকার জন্য। সে কুরায়শদের সাথে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে তার সম্প্রদায়ের সাথে দেখা হলে কেউ-ই তার বিরুদ্ধে যাবে না। সেমতে মুকাবিলার সময় মক্কার গোলাম ও হাবশীদেরকে নিয়ে এই আবূ আমরই সর্বপ্রথম অগ্রসর হল। সে তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলল হে আওস গোত্র! আমি আবু আমির। জবাবে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল হে ফাসিক! আল্লাহ্ তোকে চক্ষু থেকে মাহরুম করুন। জাহিলী যুগে আবূ আমিরকে 'রাহিব' বলা হতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার নাম রাখেন ফাসিক। সে তার সম্প্রদায়ের জবাব শুনে বললেন: আমার সম্প্রদায়কে ছেড়ে আসার পর তারা বিগড়ে গেছে। এরপর সে তাদের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ করল এবং প্রস্তর বর্ষণ করল।
📄 আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী কর্তৃক কুরায়শদের উত্তেজিত করা প্রসংগে
ইরুন ইসহাক বলেন: আবু সুফিয়ান আব্দুদ্দারের পতাকাবাহীদেরকে যুদ্ধের প্রতি উত্তেজিত করার জন্য বলছিলো: শোন হে বনু আবদুদ্দার! বদর যুদ্ধেও ঝাণ্ডা তোমাদের হাতেই ছিল। তখন আমাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল, তা তোমাদের জানা আছে। মনে রেখ, ঝাণ্ডা দেখেই লোকেরা অগ্রসর হয়, ঝাণ্ডা স্থানচ্যুত হলে লোকদের পা পিছলে যায়। সুতরাং এখনও সময় আছে, হয়ত তোমরা আমাদেরকে নিশ্চয়তা দাও যে, এ ঝাণ্ডা উত্তোলিত রাখবে অথবা ঝাণ্ডা ছেড়ে দাও, আমরা নিজেরাই তা সামলে নেব।
একথা শুনে তারা অবিচল থাকার অঙ্গীকার করে বলল: ঝাণ্ডা তোমাদের হাতে ফিরিয়ে দিতে পারি, তবে কালকে যুদ্ধের ময়দানে দেখে নিবে আমাদের কৃতিত্ব। আবু সুফিয়ান এটাই চাচ্ছিল।
উভয় দলের লোকেরা যখন যুদ্ধের জন্য মুখোমুখি হলো তখন হিন্দা তার সঙ্গিনীদের নিয়ে উঠে পড়লো এবং ঢোল বাজিয়ে ও গান গেয়ে পুরুষদের উত্তেজিত করতে লাগলো। হিন্দা এ কবিতা আবৃত্তি করতে লাগল:
ويها بني عبد الدار * ويها حماة الادبار
ضريا بكل بتار .
উঠ হে বনু আবদুদ্দার। উঠ, হে পিছনের লোকদেরকে রক্ষণাবেক্ষণকারীরা। শাণিত তরবারি নাও এবং হামলা করো।
আরো বলছিল:
إن تقبلوا نعانق * ونفرش النمارق .
او تدبروا نفارق فراق غير وامق
তোমরা যদি অগ্রসর হও, তবে আমরা মহিলারা তোমাদেরকে বুকে জড়িয়ে নিব এবং তোমাদের জন্য উত্তম বিছানা ও বালিশ বিছিয়ে অভ্যর্থনা করবো।
আর যদি তোমরা পশ্চাদপসারণ করো, তবে আমরা তোমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবো, যেমন বিচ্ছিন্ন হয় প্রেমহীন ব্যক্তি।
ইব্ন হিশাম বর্ণনা করেন: উহুদের যুদ্ধে مسلمانوں ধ্বনি ছিল:
أمت أمت
মার, মার
ইব্ন ইসহাক বলেন: লোকেরা যুদ্ধ আরম্ভ করল এবং তা প্রচণ্ডরূপ ধারণ করল। আবূ দুজানা (রা) লড়াই করতে করতে শত্রুদলের কাতারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
ইন্ন হিশাম বলেন: একাধিক জ্ঞানী ব্যক্তি আমাকে এ তথ্য শুনিয়েছেন যে, যুবায়র ইন্ন আওয়াম (রা) বলেন, আমিও রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে তাঁর তরবারি চেয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তা আমাকে না দিয়ে আবু দুজানাকে দেওয়ার কারণে আমি এই ভেবে মনঃক্ষুণ্ণ হলাম যে, আমি তাঁর ফুফু সুফিয়া (রা)-এর ছেলে ও কুরায়শের লোক এবং আবূ দুজানার পূর্বে আমি তা চাইলাম, কিন্তু তিনি আমাকে বাদ দিয়ে তাঁকে দিলেন। আল্লাহ্র কসম! আমি দেখব সেকি করে। এই বলে আমি তাঁর অনুসরণ করতে লাগলাম। দেখলাম্, তিনি তাঁর সেই লাল পট্টি বের করে মাথায় বেঁধে নিলেন। এটা দেখে কোন কোন আনসার সাহাবী (রা) বললেন: আবু দুজানা (রা) তো মৃত্যুর পট্টি বেঁধে নিয়েছে, তিনি এই কবিতা পড়া অবস্থায় রণাঙ্গনে ঝাপিয়ে ছিলেন:
انا الذي عاهدني خليلي * ونحن بالسفح لدى النخيل
ألا أقوم للدهر في الكيول * أضرب بسيف الله والرسول
আমি সেই ব্যক্তি, যার থেকে আমার বন্ধু (রাসূলুল্লাহ (সা) খেজুর বৃক্ষের নীচে, পাহাড়ের কাছে, প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন।
আমি উঠে কাতারের শেষ পর্যন্ত মুকাবিলা করতে থাকবো। আল্লাহ্ ও তার রাসূল (সা)-এর তরবারি সমানে চালিয়ে যাব।
ইব্ন হিশাম বলেন : অন্য বর্ণনায় الكبول শব্দের স্থলে الكبول শব্দ রয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবু দুজনা (রা) যাকেই সামনে পেলেন, তাকেই হত্যা করলেন। মুশরিকদের মধ্যেও এমন একজন ছিল, যে আমাদের মুসলমানদের যাকেই পেত তাকেই শেষ করে দিত। আমি লক্ষ্য করলাম, সে আর আবু দুজানা (রা) পরস্পরের কাছাকাছি হতে লাগলো। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করলাম, তিনি যেন এদের পরস্পরের সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেন।' তাই ঘটল এবং তারা পরস্পরের মুখোমুখি হল। উভয় দিক থেকে তরবারি চলতে লাগল। মুশরিক ব্যক্তিটি আবূ দুজানা (রা)-এর উপর তরবারির আঘাত করল, কিন্তু আবূ দুজানা (রা) তরবারি দিয়ে তা প্রতিহত করে বেঁচে গেলেন। এরপর আবূ দুজানা (রা) কঠোর আঘাত করে তাকে শেষ করে দিলেন। এরপর আমি লক্ষ্য করলাম, আবু দুজানা (রা) হিন্দা বিন্ত উতবার মাথার উপর তরবারি উত্তোলন করলেন, কিন্তু তিনি তাঁর উপর থেকে তরবারি সরিয়ে নিলেন।
যুবায়র (রা) বলেন: আমি ভাবতে লাগলাম, (এর রহস্য) আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত।
ইবন ইসহাক বর্ণনা করেন, স্বয়ং আবূ দুজানা সিমাক ইবন খারাশা (রা)-এ সম্পর্কে নিজেই বর্ণনা করেন: আমি লক্ষ্য করলাম, এক ব্যক্তি যুদ্ধের জন্য লোকদের উত্তেজিত করছে। আমি তার দিকে অগ্রসর হলাম এবং তাকে শেষ করার জন্য তার উপর তরবারি উঠালাম, তখন সে কাকুতি-মিনতি করতে লাগল। দেখলাম সে-একজন মহিলা। ভাবলাম, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পবিত্র তরবারি দ্বারা একজন মহিলাকে হত্যা করে তার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করব না।