📄 মুনাফিকদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া
মোটকথা, রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক হাজার সাহাবীর একটি দল সংগে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ইবন হিশাম বলেন: এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইবন উম্মু মাকতুমকে লোকেদের নিয়ে সালাত আদায়ের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: যখন মুসলিম সৈন্যদল মদীনা ও উহুদের মধ্যবর্তী 'শাওত' নামক স্থানে পৌঁছলো, তখন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় ইব্ন সালূল এক-তৃতীয়াংশ লোক নিয়ে ফিরে গেল এবং বলতে লাগল রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের কথা শুনলেন, আমার কথা শুনলেন না। হে লোক সকল! আমার বুঝে আসছে না, এখানে নিজেকে ধ্বংস করার কি অর্থ, মোটকথা সে তার দলের যে সব লোকদের অন্তরে কপটতা ও সংশয় ছিল, তাদেরকে নিয়ে ফিরে গেল।
বনূ সালামার লোক আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমর ইবন হারাম তাঁদের পিছু পিছু গিয়ে বললেন: হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! আমি তোমাদেরকে আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। তোমরা তোমাদের নিজ সম্প্রদায় ও নবীকে শত্রুর মুখোমুখি রেখে এভাবে চলে যেও না। জবাবে তারা বলল যদি জানতাম, তোমরা যুদ্ধের সম্মুখীন হবে, তবে তোমাদেরকে শত্রুর হাতে সমর্পণ করতাম না। কিন্তু আমাদের ধারণায় যুদ্ধ ঘটবে না। যখন মুনাফিকরা তাঁর কথা মানল না এবং ফিরে যেতেই চাইলো, তখন তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: হে আল্লাহ্ দুশমনেরা! আল্লাহ্ তোমাদেরকে নিজ রহমত থেকে দূরে রাখুন। অচিরেই আল্লাহ্ তাঁর নবীকে তোমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী করে দেবেন।
ইবন হিশাম বলেন: যিয়াদ ছাড়া সকলেই মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক সূত্রে যুহরী থেকে বর্ণনা করেন-যে, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে আনসার সাহাবিগণ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা আমাদের ইয়াহুদী মিত্রদের সাহায্য নিব কি? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমাদের জন্য তাদের সাহায্যের কোন প্রয়োজন নেই।
যিয়াদ বলেন: মুহাম্মদ ইবন ইসহাক আমার কাছে বলেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) অগ্রসর হয়ে বনু হারিসার হাররা নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন একটি কাণ্ড ঘটল যে, জনৈক ব্যক্তির ঘোড়া মাছি তাড়ানোর জন্য সজোরে লেজ নাড়ল, আর তা যেয়ে তার তরবারির কজির উপর পড়লো; ফলে তরবারি খাপ থেকে বেরিয়ে আসলো।
ইবন হিশাম বলেন: অনেকে (سيف كلاب) এর স্থলে (كلاب سيف) বলেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সুলক্ষণ নেওয়াকে পছন্দ করতেন, আর কুলক্ষণ নেওয়াকে অপছন্দ করতেন। তিনি তরবারির মালিককে বললেন: তরবারি খাপে ভরে নাও। আমার ধারণা, আজ তরবারি খাপ থেকে বের হবে।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন: কে আছো যে, আমাদেরকে শত্রুর কাছে এমন পথ ধরে নিয়ে যাবে, যা শত্রুর সামনে দিয়ে অতিক্রম করে না। আবু খায়ছামা বনু হারিসা ইবন হারিসের লোক বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমি নিয়ে যাব। এই কথা বলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বনু হারিসার হাররায় নিয়ে চললেন। পথে লোকদের বাগান ইত্যাদির কথাও আলোচনা করলেন। এক সময় তারা মিরবা' ইন্ন ফায়যা-এর বাগানের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলেন। সে মুনাফিক ছিল এবং অন্ধ ছিল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও মুসলমানদের আগমনের কথা অনুভব করে তাদের চেহারার উপর মুঠ ভরে ভরে মাটি ছুড়তে লাগল এবং বলতে লাগল: তুমি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাক, তবে তোমার আমার বাগানে আসার অনুমতি নেই। আরো বর্ণিত রয়েছে যে, সে হাতে মাটি নিয়ে বলতে লাগলেন: হে মুহাম্মদ, আল্লাহ্র কসম! যদি আমি জানতে সক্ষম হতাম যে, এই মাটি তুমি ছাড়া আর অন্য কারো চেহারায় লাগবে না, তবে অবশ্যই আমি তা তোমার চেহারার উপর ছুড়ে মারতাম। এ কথা শুনে সকলেই তাকে হত্যা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) গিয়ে বললেন: তাকে হত্যা করো না। সে একই সাথে চক্ষু ও অন্তরের অন্ধ। কিন্তু সা'দ ইব্ন যায়দ, বনু আবদুল আশহালের লোক, রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিষেধ করার আগেই তার দিকে অগ্রসর হলেন এবং ধনুক উঠিয়ে তার মাথায় নিক্ষেপ করে তাকে আহত করে দেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উহুদে শিবির স্থাপন
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) অগ্রসর হয়ে উহুদের এক ঘাঁটিতে গিয়ে অবতরণ করলেন। স্থানটি ছিল পাহাড়ের পাশে উপত্যকার উঁচুতে, তিনি উট ও সৈন্য দলকে উহুদ পাহাড়ের দিকে রাখলেন এবং তাদেরকে নির্দেশ দিলেন, তোমাদের কেউ যেন যুদ্ধ না করে, যতক্ষণ না আমি তাকে এর নির্দেশ দেই। তখন কুরায়শরা নিজেদের উট ও ঘোড়া সমগাহ নামক স্থানের ক্ষেতে চরাচ্ছিল, যা মুসলমানদের মালিকানাধীন 'কানাত' উপত্যকার একটি অংশ। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধ করতে নিষেধ করলে জনৈক আনসার সাহাবী (রা) বললেন: বনূ কায়লাহ (অর্থাৎ আওস ও খাযরাজ)-এর ক্ষেতে পশু চরানো হচ্ছে অথচ আমরা এর প্রতিরোধে এখনো তরবারি হাতে নিলাম না।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করলেন, তাঁর সংগে তখন সাত শত লোক ছিলেন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র (রা), বনূ আমর ইব্ন আওফের লোককে তীরন্দাজদের দলপতি নিযুক্ত করলেন। তিনি তখন সাদা পোশাক পরিহিত ছিলেন। তীরন্দাজদের মোট সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন: তোমরা তীর দ্বারা অশ্বারোহীদেরকে প্রতিরোধ করবে, যাতে শত্রুদল পিছন দিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ না করতে পারে। যুদ্ধের পরিস্থিতি আমাদের অনুকূল কিংবা প্রতিকূল যাই হোক না কেন, তোমরা তোমাদের স্থানে অটল থাকবে। তোমাদের ঐ দিক থেকে আমাদের উপর যেন কোন আক্রমণ না হয়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেদিন দু'টি লৌহবর্ম পরিহিত ছিলেন। তিনি মুস'আব ইবন উমায়ের এর হাতে ঝাণ্ডা অর্পণ করলেন। তিনি ছিলেন বনূ আবদুদ্দারের লোক।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক তরুণ যুবকের যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি
ইব্ন হিশাম বলেন: উহুদ যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সামুরা ইব্ন্ন জুন্দুব ফাযারী এবং বনু হারিসা গোত্রের রাফি' ইন্ন খাদীজ (রা)-কে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার অনুমতি দিলেন। তখন তাদের উভয়ের বয়স ছিল পনের বছর। তিনি প্রথমে তাদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, এরপর যখন তাঁর কাছে এ মর্মে বলা হলো যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! রাফি' তীর নিক্ষেপে অত্যন্ত পারদর্শী, তখন তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। রাফি' (রা)-কে অনুমতি দেওয়ার পর সামুরা ইবন জুন্দুর (রা)-এর ব্যাপারে বলা হলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সামুরা তো রাফিকে কুস্তিতে পরাস্ত করতে পারে। কাজেই তাঁকেও অনুমতি দিন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকেও অনুমতি দিলেন। আর নিম্নোক্ত লোকদের ফিরিয়ে দিলেন: (১) উসামা ইব্ন্ন যায়দ (রা), (২) আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইবন খাত্তাব (রা), (৩) যায়দ ইব্ন সাবিত (রা), যিনি ছিলেন মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক; (৪) বারা ইব্ন আযিব (রা), যিনি বনূ হারিসার লোক ছিলেন; (৫) আমর ইব্ন হাযম, যিনি মালিক ইব্ন নাজ্জার গোত্রের লোক ছিলেন। এরপর তিনি খন্দকের যুদ্ধে এঁদের সকলকে অনুমতি দিয়েছিলেন, তখন এঁদের বয়স ছিল পনের বছর।
ইবন ইসহাক বলেন: এদিকে কুরায়শরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করল। তাদের সৈন্য সংখ্যা ছিল তিন হাজার, যার মধ্যে অশ্বারোহী ছিল দু'শ। এদেরকে তারা একপাশে রেখে দিয়েছিল, প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। অশ্বারোহীদের ডান দিকে খালিদ ইব্ ওয়ালীদ, আর বাম দিকে ইকরামা ইব্ন আবু জাহলকে নিযুক্ত করা হল।
📄 আবূ দুজানা এবং তাঁর বীরত্ব প্রসংগে
তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) (নিজ তরবারি হাতে নিয়ে সাহাবাদের লক্ষ্য করে) বললেন:
من يأخذ هذا السيف بحقة
• কে আছে, যে এই তরবারি নিয়ে এর হক আদায় করবে? একথা শুনে অনেকেই তরবারি নেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা কাউকেই দিলেন না। পরিশেষে বনূ সা'দার লোক আবূ দুজানা সিমাক ইবন খারাশা তাঁর দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এর হক কি? তখন তিনি বললেন:
أن تضرب به العدو حتى ينحنى
এর হক এই যে, তা দ্বারা শত্রুকে এমনভাবে মারবে, যাতে তা বাঁকা হয়ে যায়। তখন দুজানা (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) এই তরবারি আমি নেব। সুতরাং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে তা দিয়ে দিলেন।
আবু দুজানা (রা) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী পুরুষ এবং যুদ্ধের বিভিন্ন কলাকৌশলে পারদর্শী। যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সময় তিনি একটি লাল পট্টি চিহ্নস্বরূপ মাথায় বেঁধে নিতেন। এর দ্বারা বুঝা যেত, তিনি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছেন। এরপর তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত থেকে তরবারি নিয়ে, সেই লাল পট্টি বেঁধে নিলেন এবং বীরত্বের সাথে উভয় কাতারের মাঝে হাটতে লাগলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম জা'ফর ইবন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আসলাম বনূ সালামার জনৈক আনসার সাহাবী থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ দুজানা (রা)-কে বীরত্বের সাথে চলতে দেখে বললেন:
انها لمشية يبغضها الله الا في مثل هذا الموطن
এ অহংকারসুলভ চলা আল্লাহ্ তা'আলা অত্যন্ত ঘৃণা করেন, তবে এ ধরনের মুহূর্ত ছাড়া।
ইবন ইসহাক বলেন: আসিম ইব্ন আমর ইব্ন কাতাদা আমাকে শুনিয়েছেন যে, আমর ইবন মালিক ইব্ নু'মান এর গোলাম আমির ইবন সায়ফী যে ছিল বনূ যুবাআর লোক, সে আওস গোত্রের পঞ্চাশ জন তরুণ, অন্য বর্ণনা মতে, পনের জন তরুণকে সাথে নিয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে দূরে থাকার জন্য। সে কুরায়শদের সাথে এ মর্মে অঙ্গীকার করেছিল যে, যুদ্ধের ময়দানে তার সম্প্রদায়ের সাথে দেখা হলে কেউ-ই তার বিরুদ্ধে যাবে না। সেমতে মুকাবিলার সময় মক্কার গোলাম ও হাবশীদেরকে নিয়ে এই আবূ আমরই সর্বপ্রথম অগ্রসর হল। সে তার সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বলল হে আওস গোত্র! আমি আবু আমির। জবাবে তার সম্প্রদায়ের লোকেরা বলল হে ফাসিক! আল্লাহ্ তোকে চক্ষু থেকে মাহরুম করুন। জাহিলী যুগে আবূ আমিরকে 'রাহিব' বলা হতো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার নাম রাখেন ফাসিক। সে তার সম্প্রদায়ের জবাব শুনে বললেন: আমার সম্প্রদায়কে ছেড়ে আসার পর তারা বিগড়ে গেছে। এরপর সে তাদের বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ করল এবং প্রস্তর বর্ষণ করল।