📄 আবূ উয্যার অংগীকার ভংগ প্রসংগে
আবূ উয্যা এতে সম্মত হয়ে গেল এবং তিহামার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। সেখানে পৌঁছে সে বনু কিনানাকে যুদ্ধের জন্য আহবান জানিয়ে এই কবিতা বলল :
إيها بني عبد مناف الرزام * أنتم حماة وابو كم حام
لا تعدوني نصركم بعد العام * لا تسلموني لا يحل إسلام
হে অবিচল যোদ্ধা বনূ আব্দ মানাফ! তোমরা হলে গোত্র মার্যদা সংরক্ষণকারী, যেমন ছিল তোমাদের পিতৃ পুরুষেরা গোত্র মর্যাদা রক্ষাকারী (সুতরাং এ কঠিন পরিস্থিতিতে তোমরা আমাদের সাহায্য কর)।
এ বছরের পর আর আমাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতির কোন প্রয়োজন নেই।
আমাদের শত্রুর হাতে ছেড়ে দিও না; কেননা, এরূপ করা আদৌ উচিত নয়।
📄 মুসাফি' ইব্ন আব্দ মানাফ প্রসংগে
এ ছাড়াও মুসাফি' ইব্ন আব্দ মানাফ ইব্ন ওয়াহাব ইবন হুযাফা ইব্ন জুমাহ্ বনু মালিক ইব্ন কিনানার কাছে পৌঁছে তাদেরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রতি প্ররোচিত করে এই কবিতা আবৃত্তি করলেন:
يا مال مال الحسب المقدم * أنشد ذا القربي وذا التذمم
من كان ذا رحم ومن لم يرحم * الحلف وسط البلد المحرم
عند حطيم الكعبة المعظم
হে বনূ মালিক ইব্ন কিনানা! তোমাদের সেই আগেকার আভিজাত্যবোধের কি হলো যে, আমি এখন সেই আত্মীয়-স্বজনকে, প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তাদানকারীদের তালাশ করে বেড়াচ্ছি?
তোমরা বল তো, দয়াবান রহম দিলের অধিকারী কারা ছিল? সম্মানিত শহরের মাঝে, পবিত্র কা'বা ঘরের হাতীমের পাশে, কে মিত্রদের প্রতি অনুগ্রহ করেনি? (অর্থাৎ তোমরাই এরূপ করেছিলে, এখন তোমাদের কি হলো?)
📄 ওয়াহশী প্রসংগে
জুবায়র ইবন মুতঈমের ওয়াহশী নামে এক হাবশী গোলাম ছিল। সে হাবশীদের মত বর্শা নিক্ষেপে পারদর্শী ছিল। তার লক্ষ্য খুব কমই ভ্রষ্ট হতো। জুবায়র তার গোলামকে বলল: তুমিও সকলের সাথে যুদ্ধে চলো। যদি তুমি আমার চাচা তু'মা ইব্ন 'আদীর হত্যার প্রতিশোধে মুহাম্মদের চাচা হামযাকে হত্যা করতে পার, তবে তুমি আমার পক্ষ হতে আযাদ হয়ে যাবে।
কুরায়শ তাদের অনুসারী ও তাদের সাথে যোগদানকারী বনু কিনানা ও তিহামার লোকদের নিয়ে অস্ত্র-শস্ত্রসহ পূর্ণ সাজ-সজ্জায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে রণাঙ্গনের দিকে বেরিয়ে পড়ল। আর কেউ যাতে পলায়ন না করে, সেই সাথে নিজেদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ সৃষ্টি হয়, সে জন্য তারা নিজেদের মহিলাদেরকে হাওদায় বসিয়ে সাথে নিয়ে নিল।
কুরায়শদের সেনাপতি আবু সুফিয়ান হিন্দা বিন্ত উতবাকে সাথে নিল। অনুরূপভাবে ইকরামা ইব্ন আবু জাহল, উম্মু হাকীম বিন্ত হারিস ইন হিশাম ইব্ন মুগীরাকে, হারিস ইন হিশাম ইব্ন মুগীরা ফাতিমা বিন্ত উয়ালীদ ইব্ন মুগীরাকে ও সাফওয়ান ইবন উমাইয়া বুরযা বিন্ত মাসউদ ইবন উমর ইবন উমায়ের সাকাফীকে সাথে নিয়ে নিল। বুরযা ছিল আবদুল্লাহ্ ইবন সাফওয়ান ইবন উমাইয়ার মা।
ইবন হিশাম বলেন: মতান্তরে তার নাম রুকাইয়া।
ইব্ন ইসহাক বলেন: আর আমর ইবন 'আস রায়তা বিন্ত মুনাব্বিহ ইব্ন হাজ্জাজকে। রায়তা ছিল আবদুল্লাহ্ ইব্ন আমরের মা। অনুরূপভাবে তালহা ইব্ন আবূ তালহা সুলাফা বিন্ত সা'দ ইব্ন শুহায়দ আনসারীকে সাথে নিল।
আবূ তালহা হল আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুল উয্যা ইবন উসমান ইব্ন আবদুদ্দার এর কুনিয়াত আর সুলাফা হল তালহার ছেলে মুসাফি', জুল্লাস ও কিলাবের মা। তাদের পিতাসহ তারা সকলে উহুদে নিহত হয়। বনু মালিক ইব্ন হিসল গোত্রের খুন্নাস বিন্ত মালিক ইব্ন মাযরাব নামক জনৈক মহিলা তার ছেলে আবু আযীয ইবন উমায়েরসহ যুদ্ধে বেরিয়েছিল। সে মাসআব ইবন উমায়েরেরও মা ছিল। অনুরূপভাবে আমরা বিন্ত আলকামা এ অভিযানে অংশগ্রহণ করে। সে ছিল বনু হারিস ইব্ন আব্দ মানাত ইবন কিনানার একজন মহিলা।
হিন্দ বিন্ত উতবা যখনই ওয়াহশীর কাছ দিয়ে অতিক্রম করত, কিংবা ওয়াহশী যখন তার পাশে আসত, তখন সে তাকে বলত: হে আবু দাসমা, আমার কলিজা শীতল কর। আবূ দাসমা ছিল ওয়াহশীর কুনিয়াত। মোটকথা, তারা যুদ্ধের জন্য রওনা হয়ে সেখানে পৌঁছে আয়নায়ন পর্বতে আস্তানা গাড়ল, যা মদীনার বিপরীত দিকে কানাত উপত্যকার পাশে বতনে সাবখার নিম্নভূমিতে অবস্থিত ছিল।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্বপ্ন এবং সাহাবীদের সংগে তার পরামর্শ
বর্ণনাকারী বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরায়শদের অবস্থা শুনলেন, আর মুসলমানরা তাদের স্থানে অবতরণ করলেন, তখন তিনি মুসলমানদের লক্ষ্য করে বললেন: আল্লাহর কসম! আমি একটি আজব স্বপ্ন দেখেছি। আমি একটি গাভী দেখলাম, আর দেখলাম আমার তরবারির ধারে ভঙ্গুরতা পড়ে গেছে, আর দেখলাম আমার হাত একটি মজবুত লৌহবর্মে ঢুকিয়ে দিয়েছি। আমার ধারণা, এর দ্বারা মদীনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ইব্ন হিশাম বলেন: আমাকে কতক জ্ঞানী ব্যক্তি একথা শুনিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন : رایت بقراً لى تذبح অর্থাৎ আমি দেখলাম, আমার কিছু গাভী যবাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও ইরশাদ করেন: গাভী দ্বারা উদ্দেশ্য আমার কিছু সাহাবী, যারা নিহত হবে। আর তরবারিতে করাতের দাঁত দ্বারা উদ্দেশ্য আমার বংশের এক ব্যক্তি, যে নিহত হবে।
ইবন ইসহাক বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: যদি তোমরা মনে কর যে, আমরা মদীনাতে অবস্থান করি, আর কুরায়শরা যেখানে ছাউনি গেড়েছে, তারা সেখানেই থাক; তবে এটা তাদের জন্য খুবই খারাপ হবে, আর তোমাদের জন্য ভাল হবে। কেননা, যদি তারা সেখানেই থাকে, তবে তারা অত্যন্ত ভুল জায়গায় থাকবে। আর যদি তারা মদীনায় এসে আমাদের উপর আক্রমণ করে, তবে আমরা সকলে সেখানে থেকে তাদের বিরুদ্ধে লড়ব। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে বের হওয়া সমীচীন মনে করছিলেন না। আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ইবন সালূল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সম্পূর্ণ একমত ছিল। সে জোরালোভাবে মদীনায় অবস্থান করা ও বাইরে বেরিয়ে আক্রমণ না করার প্রতি তাকীদ করছিল। কিন্তু কিছু সংখ্যক মুসলমান যারা বদরে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম হননি এবং পরবর্তীতে যাদেরকে আল্লাহ্ তা'আলা উহুদ ও অন্যান্য যুদ্ধে শহীদ হওয়ার মর্যাদা দান করেন, তারা জোর দাবি করে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! বাইরে বেরিয়ে দুশমনদের সাথে যুদ্ধ করার সুযোগ আমাদেরকে দিন, যাতে তারা এ ধারণা করতে না পারে যে, আমাদের মধ্যে কোন প্রকার কাপুরুষতা ও দুর্বলতা রয়েছে।
আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় (তার কথা খণ্ডন করে) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! মদীনায়ই অবস্থান করুন, তাদের দিকে বের হবেন না। আল্লাহর কসম! যখনই আমরা মদীনা থেকে কোন শত্রুকে লক্ষ্য করে বের হয়েছি, তখনই আমরা পরাভূত হয়েছি। আর যখনই মদীনায় তারা আমাদের উপর চড়াও হয়েছে, তখন তারা পরাস্ত হয়েছে। সুতরাং ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। কুরায়শদের তাদের অবস্থায় ছেড়ে দিন। যদি তারা স্বস্থানেই ছাউনি গেড়ে বসে থাকে তবে সে স্থান হবে তাদের জন্য নিকৃষ্ট জেলখানা স্বরূপ। আর যদি তারা মদীনায় প্রবেশ করে, তবে পুরুষেরা তাদের সাথে তুমুল মুকাবিলা করবে, আর মহিলা ও শিশুরা ছাদের উপর থেকে তাদের উপর প্রস্তর নিক্ষেপ করবে। আর যদি তারা ফিরে যায়, তবে যেমন এসেছিল তেমনি বিফল হয়ে ফিরে যাবে।
কিন্তু যারা বের হয়ে শত্রুর মুকাবিলা করতে আগ্রহী ছিলেন, তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বারবার আব্দার করতে লাগলেন। ফলে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘরে প্রবেশ করলেন এবং লৌহবর্ম পরিধান করে বেরিয়ে আসলেন। এ ঘটনা ঘটেছিল শুক্রবার জুমাআর সালাত আদায়ের পর। ঐ দিনই বনু নাজ্জারের আনসার সাহাবী মালিক ইবন আমর (রা)-এর ইন্তিকাল হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সর্বপ্রথম তাঁর জানাযার সালাত আদায় করলেন, তারপর দুশমনদের উপর হামলা করার উদ্দেশ্যে মদীনা থেকে বেরিয়ে পড়লেন। তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে এ কষ্ট দেয়ার কারণে লজ্জাবোধ করতে লাগলেন। তারা বলতে লাগলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অনর্থ কষ্টে ফেলে দিলাম, এটা আমাদের জন্য সমীচীন ছিল না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাঁদের কাছে বেরিয়ে এলেন, তখন তারা আরয করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা শুধু শুধু আপনাকে কষ্টে ফেলে দিলাম। এটা আমাদের জন্য মোটেই সমীচীন হয়নি। আপনি ইচ্ছা করলে এখানেই অবস্থান করুন, আপনার যাওয়ার দরকার নেই। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: কোন নবীর জন্য শোভা পায় না একবার লৌহবর্ম পরিধান করার পর যুদ্ধ না করে তা খুলে ফেলা।