📄 সাবীক যুদ্ধ
আবূ মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইব্ন হিশাম বলেন, আমাকে যিয়াদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ বুকাঈ, মুহাম্মদ ইব্ন ইসহাক মুত্তালিবের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: এরপর আবু সুফিয়ান ইব্ন হারব যিলহাজ্জ মাসে সাবীকের যুদ্ধ করেন। সে বছর মুশরিকরাই হজ্জের তত্ত্বাবধান করে। মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর ইব্ন যুবায়র, ইয়াযীদ ইব্ন রূমান এবং আরও কিছু বিশ্বস্ত ব্যক্তিবর্গ আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব ইবন মালিকের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি ছিলেন আনসারগণের শ্রেষ্ঠতম আলিম। আবু সুফিয়ান যখন মক্কায় ফিরে এলো এবং কুরায়শের পরাজিত ব্যক্তিবর্গ বদর থেকে প্রত্যাবর্তন করল, তখন আবু সুফিয়ান মান্নত মানল, মুহাম্মদ (সা)-এর সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত জানাবাতের গোসলে মাথায় পানি ব্যবহার করবো না। কাজেই তার শপথ পুরা করার উদ্দেশ্যে সে কুরায়শদের মধ্য থেকে দু'শ আরোহীর দল নিয়ে বের হল এবং নজদের পথ ধরে একটি নহরের উপরি অংশে এক পাহাড়ের কাছে অবতরণ করলো। পাহাড়টির নাম 'ছায়িব', আর তা মদীনা থেকে এক রাবীদ (মানযিল) কিংবা তার কাছাকাছি দূরত্বে ছিল। তারপর বেরিয়ে রাতের বেলায় বনূ নযীরের কাছে পৌঁছলো এবং হুয়াই ইব্ন আখতাবের ঘরে এসে দরজায় আঘাত করলো। সে ভয় পেয়ে দরজা খুলতে অস্বীকার করলো। আবু সুফিয়ান সেখান থেকে ফিরে সাল্লাম ইব্ন মিশকামের কাছে পৌঁছল। সে সে সময় বনু নযীরের নেতা ও কোষাধ্যক্ষ ছিল, সে তার কাছে এসে প্রবেশের অনুমতি চাইলে সে অনুমতি দিল এবং আপ্যায়ন করাল, পানাহার করল, লোকদের গোপন তথ্য জানিয়ে দিল। এরপর আবু সুফিয়ান রাতের শেষাংশে বেরিয়ে সাথীদের কাছে পৌঁছলো এবং কুরায়শদের কতক ব্যক্তিকে তারা মদীনার দিকে পাঠালো। তারা মদীনার কাছে এলো, যার নাম 'উরায়েজ'। (সেখানে এসে) সেখানকার খেজুর বাগান জ্বালিয়ে দিল এবং সেখানে জনৈক আনসারী ও তার এক মিত্রকে পেল, যারা ঐ বাগানেই ছিল। তারা তাদের উভয়কে হত্যা করে ফেললো। এরপর তারা ফিরে গেল। লোকেরা এ সংবাদ পেয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সন্ধানে বের হলেন, এদিকে মদীনায় বাশীর ইব্ন আবদুল মুনযির ওরফে আবু লুবাবাকে শাসক নিযুক্ত করলেন। এ তথ্য ইবন হিশামের। তারপর কারকারাতুল কুদর এলাকায় পৌঁছে ফিরে গেলেন। আবু সুফিয়ান ও তার অনুচরদের ধরতে সক্ষম হলেন না। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগীরা দেখতে পেলেন, তারা পলায়ন করার সুবিধার্থে বোঝা হালকা করার উদ্দেশ্যে কিছু আসবাবপত্র ক্ষেত্রে ফেলে গেছে। রাসুলুল্লাহ্ (সা) যখন মুসলমানদের নিয়ে ফিরলেন, তখন তারা আরয করলো, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি কি চান যে, আমাদের লাভের জন্য যুদ্ধ হোক। ইরশাদ করলেন, হ্যাঁ।
ইবন হিশাম বলেন: আমাকে আবু উবায়দা এ তথ্য শুনিয়েছেন যে, সাবীক যুদ্ধের এ নামকরণের কারণ; তারা যে সব আসবাবপত্র ফেলে গিয়েছিল, তার অধিকাংশই ছিল ছাতু। মুসলমানরা ছাতুর (বস্তা) দখল করল। এখান থেকেই এ যুদ্ধের নাম হয় গাযওয়ায়ে সাবীক ('সাবীক' অর্থ ছাতু)।
📄 ইয়াহুদী ও নাসারাদের সাথে বন্ধুত্ব সম্পর্কে
ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে ইয়াহুদী ও নাসারাদের থেকে সম্পর্কচ্ছেদ ও তাদের সাথে বৈরিতা অবলম্বন করতে নির্দেশ দেন। আর তাদের সাথে কোনরূপ বন্ধুত্ব ও সুসম্পর্ক রাখতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُم مِّنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
'হে মু'মিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসারাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ্ জালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না' (৫: ৫১)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
فَتَرَى الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِم مَّرَضٌ يُسَارِعُونَ فِيهِمْ يَقُولُونَ نَخْشَى أَنْ تُصِيبَنَا دَائِرَةٌ فَعَسَى اللَّهُ أَنْ يَأْتِي بِالْفَتْحِ أَوْ أَمْرِ مِنْ عِندِهِ فَيُصْبِحُوا عَلَى مَا أَسَرُّوا فِي أَنْفُسِهِمْ نَادِمِينَ .
'যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তুমি তাদের দেখবে যে, তারা তাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং বলছে, আমরা আশঙ্কা করি যে, কোন বিপদ আমাদের স্পর্শ করবে। সম্ভবত আল্লাহ্ ফয়সালা করবেন কিংবা নিজের পক্ষ হতে এমন কিছু ঘটাবেন, যাতে তারা নিজেদের অন্তরের গোপন বিষয়সমূহের জন্য লজ্জিত হয়' (৫: ৫২)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَيَقُولُ الَّذِينَ آمَنُوا أَهَؤُلَاءِ الَّذِينَ أَقْسَمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ إِنَّهُمْ لَمَعَكُمْ حَبِطَتْ أَعْمَالُهُمْ فَأَصْبَحُوا خَاسِرِينَ .
'মু'মিনগণ বলবে, এরা কি সেই লোক, যারা আল্লাহ্র নামে কঠিন শপথ করে বলত, 'আমরা তোমাদের সাথেই রয়েছি?' তাদের কর্ম নিষ্ফল হয়েছে, ফলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে' (৫: ৫৩)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لائِمٍ ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ .
'হে মু'মিনগণ! তোমাদের মধ্যে যে কেউ তার দীন হতে ফিরে যায়, আল্লাহ্ অচিরে এমন এক সম্প্রদায় আনয়ন করবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন ও তারাও তাকে ভালোবাসবে। তারা মু'মিনদের প্রতি বিনয়ী হবে এবং কাফিরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না। এটা আল্লাহ্র অনুগ্রহ, তিনি যাকে ইচ্ছা দান করেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ' (৫: ৫৪)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
إِنَّمَا وَلِيُّكُمُ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلوةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكُوةَ وَهُمْ رَاكِعُونَ .
'তোমাদের বন্ধু তো আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং মু'মিনগণ, যারা সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় এবং তারা বিনয়াবনত' (৫: ৫৫)। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَمَنْ يَتَوَلَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالَّذِينَ آمَنُوا فَإِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْغَالِبُونَ .
'যে আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং মু'মিনদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে, সে জানবে যে, আল্লাহ্র দলই তো বিজয়ী হয়' (৫: ৫৬) ।
📄 হাসনা ইন্ন সাবিত (রা)-এর কবিতা
হাসান ইবন সাবিত (রা) এ সম্পর্কে তার কবিতায় বলেন:
আরব সম্প্রদায়সমূহের জন্য আল্লাহ্র রাসূলের কাছে আশ্রয় গ্রহণ ছাড়া আর কোন নিরাপদ স্থান ছিল না । কারণ তারা তাকে পরিত্যাগ করার পর আর কোন মুক্তিদাতা পায়নি । আমি শপথ করে বলছি , রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে তারা যখন মক্কা হতে মদীনায় চলে এল , তখন তারা ছিল হতবুদ্ধি ও ভীত-সন্ত্রস্ত । তাদের শত্রু ছিল প্রবল প্রতাপশালী , পক্ষান্তরে , যাদের উপর তারা নির্ভরশীল ছিল , তারা ছিল দুর্বল । আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর দীনের জন্য নিজের রাসূলকে যে বিজয় দান করেছেন , তাতে তারা তাঁর উপর মিথ্যা দাবী করেছিল । তারা তাঁর পক্ষ হতে বিপদ-আপদ দূরীভূত হওয়া ও তাঁকে সাহায্য করার কারণে তাঁর উপর বড়াই করে ।
টিকাঃ
১. সুলায়ম গোত্র।
২. যাতুস সালাসিলের যুদ্ধের প্রাক্কালে।
৩. অর্থাৎ মক্কা।
📄 মুহায়্যসা (রা)-এর কবিতা
মুহায়্যসা (রা) এই সম্পর্কেই বলেন:-
يَلُوْمُ ابْنُ أُمِّى لَوْ أَمْرُ بِقَتْلِهِ * لَطَبَقْتُ ذِفْرَاهُ بِأَبْيَضَ قَاضِبِ
حُسَامُ كَلَوْنِ الْمِلْحِ أَخْلَصَ صِقْلَةً * مَتَى مَا أُصِيْبُهُ فَلَيْسَ بِكَاذِبِ
وَمَاسَرَّنِى أَنِّى قَتَلْتُكَ طَائِعاً * وَأَنَّ لَنَا مَا بَيْنَ بُصْرَى وَمَأْرِبِ
(আমি ইব্ন সুনায়নাকে হত্যা করেছি বলে) আমার মার ছেলে অর্থাৎ আমার ভাই আমাকে তিরস্কার করছে। অথচ যদি তাকেও হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে আমি তার কানের পেছনের উভয় হাড় শ্বেতশুভ্র ঝলমলে কর্তনকারী তরবারি দ্বারা অবশ্যই কেটে দেবো।
এমন তরবারি দিয়ে যা লবণের রংয়ের মত সাদা এবং এটি খাঁটি ইস্পাতের তৈরী। যখন আমি আঘাত করবো, তখন তা ব্যর্থ হবে না।
আর তখন আমার কি যে আনন্দ হবে যে, আনুগত্যের বশবর্তী হয়ে আমি তোমাকে হত্যা করবো এবং আমাদের উভয়ের মাঝে বসরা ও মারিবের মধ্যবর্তী দূরত্ব হবে।