📄 কুরায়শদের মুকাবিলা করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাহাবীদের বের-হওয়া সম্পর্কে যা নাযিল হয়
এরপর তাদের অবস্থা এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে তাদের এই সময় বের হওয়ার কথা আল্লাহ্ উল্লেখ করেন, যখন তাঁরা জানতে পারলেন যে, কুরায়শরা তাঁদের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে, কিন্তু তাঁরা তো নিছক কাফেলার আশায়, গনীমতের মোহে বেরিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন:
كَمَا أَخْرَجَكَ رَبُّكَ مِنْ بَيْتِكَ بِالْحَقِّ وَإِنَّ فَرِيقًا مِّنَ الْمُؤْمِنِينَ لَكُرِهُونَ - يُجَادِلُونَكَ فِي الْحَقِّ بَعْدَ مَا تَبَيَّنَ كَأَنَّمَا يُسَاقُوْنَ إِلَى الْمَوْتِ وَهُمْ يَنْظُرُونَ -
"এটা এরূপ, যেমন আপনার প্রতিপালক আপনাকে ন্যায়ভাবে আপনার ঘর থেকে বের করেছিলেন অথচ বিশ্বাসীদের একদল এটা পসন্দ করেনি। সত্য স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও তারা আপনার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়; মনে হচ্ছিল তারা যেন মৃত্যুর দিকে চালিত হচ্ছে, আর তারা যেন তা প্রত্যক্ষ করছে।" (৮: ৫-৬)
অর্থাৎ যখন তাদের সামনে উল্লেখ করা হল যে, কুরায়শরা রওয়ানা হয়েছে, তখন তাদের সাথে মুকাবিলা করার ইচ্ছা না থাকার কারণে এবং কুরায়শদের রওয়ানা হওয়ার সংবাদ স্বীকার না করার কারণে, তাঁদের মধ্যে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।
وَإِذْ يَعِدُكُمُ اللهُ إِحْدَى الطَّائِفَتَيْنِ أَنَّهَا لَكُمْ وَتَوَدُّوْنَ أَنَّ غَيْرَ ذَاتِ الشَّوْكَةِ تَكُونُ لَكُمْ -
"স্মরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদের প্রতিশ্রুতি দেন যে, দুই দলের একদল তোমাদের আয়ত্তাধীন হবে; অথচ তোমরা চাচ্ছিলে যে, নিরস্ত্র দলটি তোমাদের আয়ত্তাধীন হোক।" (৮: ৭)
অর্থাৎ বিনাযুদ্ধে গনীমত লাভ হোক।
وَيُرِيدُ اللهُ أَنْ يُحقِّ الْحَقِّ بِكَلِمَتِهِ وَيَقْطَعُ دَابِرَ الْكَفِرِينَ -
"আর আল্লাহ্ চাচ্ছিলেন যে, তিনি সত্যকে তাঁর বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কাফিরদের নির্মূল করেন।" অর্থাৎ বদর যুদ্ধের দিন কুরায়শ নেতাদের উপর যে বিপদ আপতিত হয়েছিল, এর মাধ্যমে।
اذْ تَسْتَغِيثُونَ رَبَّكُمْ
"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেছিলে।"
📄 মুসলমানদের সুসংবাদ ও উৎসাহ প্রদান সম্পর্কে যা নাযিল হয়
অর্থাৎ যখন তাঁরা শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্য এবং নিজেদের সংখ্যালঘুতা লক্ষ্য করে আল্লাহর কাছে দু'আ করেছিলেন।
فَاسْتَجَابَ لَكُمْ
“তখন তিনি তা কবুল করেছিলেন." অর্থাৎ তিনি তোমাদের ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু'আ কবুল করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন : اَنِّي مُمِدُّكُمْ بِأَلْفٍ مِّنَ الْمَلْئِكَةِ مُرْدَفِيْنَ এবং বলেছিলেন, “আমি তোমাদের সাহায্য করব এক হাজার ফেরেশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসবে." (৮ : ৯)
اذْ يُغَشِّيْكُمُ النُّعَاسَ اَمَنَةً مِّنْهُ
"স্মরণ কর, তিনি তাঁর পক্ষ হতে স্বস্তির জন্য তোমাদের তন্দ্রায় আছন্ন করেন." অর্থাৎ যখন তোমাদের উপর স্বস্তি নাযিল করা হয়, তখন তোমরা নির্ভয়ে শুয়ে পড়লে।
وَيُنَزِّلُ عَلَيْكُمْ مِّنَ السَّمَاءِ مَاءً
“এবং আকাশ হতে তোমাদের উপর বারি বর্ষণ করেন." অর্থাৎ সে রাতে তাঁদের উপর যে বৃষ্টি হয়েছিল, এর ফলে মুশারিকরা জলাশয়ে যেতে পারছিল না; পক্ষান্তরে مسلمانوں জন্য জলাশয়ে যাওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়।
لِيُطَهِّرَكُمْ بِهِ وَيُذْهِبَ عَنْكُمْ رِجْزَ الشَّيْطَنِ وَلِيَرْبِطَ عَلَى قُلُوبِكُمْ وَيُثَبِّتَ بِهِ الْأَقْدَامَ
"তা দ্বারা তোমাদের পবিত্র করার জন্য, তোমাদের হতে শয়তানের কুমন্ত্রণা অপসারণের জন্য, তোমাদের হৃদয় দৃঢ় করার জন্য এবং তোমাদের পা স্থির রাখার জন্য।" (৮: ১১)। অর্থাৎ তোমাদের মনের শয়তানী ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য; কেননা শয়তান তাঁদের শত্রুর ভয় দেখিয়েছিল। আর তাদের নিমিত্তে যমীন মযবুত করে দেওয়ার জন্য, ফলে তারা পৌঁছে গেলেন তাদের গন্তব্যস্থানে, যেখানে শত্রু পক্ষ তাদের আগে পৌঁছে গিয়েছিল।
এরপর আল্লাহ্ বলেন:
إِذْ يُوحِى رَبُّكَ إِلَى الْمَلْئِكَةِ أَنِّي مَعَكُمْ فَثَبِّتُوا الَّذِينَ آمَنُوا سَأَلْقِي فِي قُلُوبِ الَّذِينَ كَفَرُوا الرُّعْبَ فَاضْرِبُوا فَوْقَ الْأَعْنَاقِ وَاضْرِبُوا مِنْهُمْ كُلَّ بَنَانٍ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ شَاقُّوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَمَنْ يُشَاقِقِ اللهَ وَرَسُولَهُ فَإِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ -
"স্মরণ কর, যখন তোমাদের প্রতিপালক ফেরেশতাগণের প্রতি প্রত্যাদেশ করেন, 'আমি তোমাদের সঙ্গে আছি, সুতরাং মু'মিনগণকে অবিচলিত রাখ; যারা কুফরী করে, আমি তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করব; সুতরাং তাদের কাঁধে ও সর্বাঙ্গে আঘাত কর, তা এ কারণে যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে এবং কেউ আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করলে আল্লাহ্ তো শাস্তিদানে কঠোর।" (৮: ১২-১৩)।
📄 কংকর নিক্ষেপ
আল্লাহ্ আরো বলেন:
يَٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ آمَنُوٓا۟ إِذَا لَقِيتُمُ ٱلَّذِينَ كَفَرُوا۟ زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ ٱلْأَدْبَارَ ۖ وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُۥٓ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَآءَ بِغَضَبٍ مِّنَ ٱللَّهِ وَمَأْوَىٰهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ -
“হে মু'মিনগণ! তোমরা যখন কাফির বাহিনীর সম্মুখীন হবে, তখন তোমরা তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না, সেদিন যুদ্ধ কৌশল অবলম্বন কিংবা দলে স্থান নেওয়া ব্যতীত কেউ তাদের পৃষ্ঠ প্রদর্শন করলে সে তো আল্লাহ্র বিরাগভাজন হবে এবং তার আশ্রয় জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট!” (৮: ১৫-১৬)
অর্থাৎ এখানে আল্লাহ্ তাঁদের শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উদ্বুদ্ধ করছেন, যাতে তাঁরা মুকাবিলার সময় পশ্চাদপসরণ না করেন। এছাড়া আল্লাহ্ তাঁদের আরো বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এরপর আল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিজ হাতে মুশারিকদের প্রতি কংকর নিক্ষেপ করা সম্পর্কে বলেন:
وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَٰكِنَّ ٱللَّهَ رَمَىٰ
"এবং আপনি নিক্ষেপ করেননি যখন আপনি নিক্ষেপ করেছিলেন, আল্লাহই নিক্ষেপ করেছিলেন।"
অর্থাৎ তাদের পরাজয় কেবল আপনার কংকর নিক্ষেপ করার দ্বারাই হয়নি, বরং এ দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে সাহায্য করেন এবং আপনার শত্রুর মনে ভয়-ভীতির সঞ্চার করেন; ফলে তারা পরাজিত হয়।
وَلِيُبْلِيَ ٱلْمُؤْمِنِينَ مِنْهُ بَلَآءً حَسَنًا
"এবং এটা মু'মিনগণকে আল্লাহর পক্ষ হতে উত্তম পুরস্কার দান করার জন্য।" (৮: ১৭)
অর্থাৎ মু'মিনরা তাদের সংখ্যা কম হওয়া সত্ত্বেও তাদের জয়ী করার ব্যাপারে আল্লাহ্হ্ নি'য়ামতের সঠিক মর্ম বুঝে যাতে এ দ্বারা তাঁর হক বুঝে শোকর আদায় করে।
إِن تَسْتَفْتِحُوا۟ فَقَدْ جَآءَكُمُ ٱلْفَتْحُ ۗ
"যদি তোমরা মীমাংসা চাও, তবে তো তা তোমাদের নিকট এসেছে।" অর্থাৎ আবূ জাহলের ঐ উক্তির জবাব দেওয়া হচ্ছে যখন সে বলেছিল: আয় আল্লাহ্! আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী এবং একটি অপরিচিত নতুন বিষয় পেশকারী, তাকে আজ ভোরে ধ্বংস করে দিন।
استفتاح অর্থ ইনসাফ কামনা করা।
📄 আল্লাহ্ এবং রাসূলের আনুগত্য প্রসঙ্গে
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
وَإِنْ تَنْتَهُوا فَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَإِنْ تَعُودُوا نَعُدٌ
"যদি তোমরা বিরত হও, তবে তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা পুনরায় কর, তবে আমিও পুনরায় শান্তি দেব।" অর্থাৎ বদরের দিন আমি যেমন তোমাদের উপর মুসীবত আপতিত করেছিলাম, তেমন মুসীবতে তোমাদের ফেলব।
وَلَنْ تُغْنِيَ عَنْكُمْ فِئَتُكُمْ شَيْئًا وَلَوْ كَثُرَتْ وَأَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُؤْمِنِينَ -
"এবং তোমাদের দল সংখ্যায় অধিক হলেও তোমাদের কোন কাজে আসবে না, এবং আল্লাহ্ মু'মিনদের সংগে রয়েছেন।" (৮: ১৯) অর্থাৎ তোমাদের সংখ্যাধিক্য তোমাদের কোন কাজে আসবে না; কেননা আমি মু'মিনদের সঙ্গী, আমি তাঁদের শত্রুদের মুকাবিলায় তাঁদের সাহায্য করতে থাকব।
আল্লাহ্ বলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَوَلَّوا عَنْهُ وَانْتُمْ تَسْمَعُوْنَ .
"হে মু'মিনগণ! আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমরা যখন তাঁর কথা শ্রবণ করছ, তখন তা হতে মুখ ফিরিও না।" (৮: ২০) অর্থাৎ তাঁর হুকুম অমান্য করো না, অথচ তোমরা তাঁর কথা শুনছ এবং দাবি করছ যে, তোমরা তাঁর দলভুক্ত।
وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ قَالُوا سَمِعْنَا وَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ -
"এবং তোমরা তাদের ন্যায় হয়ো না, যারা বলে, 'শুনলাম', রস্তুত তারা শোনে না।" (৮: ২১) অর্থাৎ মুনাফিকদের মত হয়ো না। যারা প্রকাশ্যে আনুগত্য প্রকাশ করে আর গোপনে তাঁর হুকুমের বিরোধিতা করে।
إِن شَرَّ الدَّوابِّ عِنْدَ اللهِ الصُّمُّ البُكُمُ الَّذِينَ لَا يَعْقِلُونَ -
"আল্লাহ্র নিকট নিকৃষ্টতম জীব সেই বধির ও মূক যারা কিছুই বুঝে না।" (৮ : ২২) অর্থাৎ আমি সে সব মুনাফিকের মত হতে তোমাদের নিষেধ করেছি, তারা মূক-কেননা ভাল কথা তাদের মুখ থেকে বের হয় না, তারা বধির-কেননা তারা সত্য কথা শুনতে পায় না এবং বুঝে না-কেননা এসব আচরণের কারণে তাদের যে শাস্তি ভোগ করতে হবে, তা তারা জানে না।