📄 নবী দুহিতা যয়নব ও তাঁর স্বামী আবুল আস-এর কাহিনী
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জামাতা, তাঁর কন্যা যয়নাব (রা)-এর স্বামী আবুল আস ইব্ন রবী' ইব্ন আবদুল উয্যা ইব্ন আব্দ শামস-ও বন্দীদের মধ্যে ছিল।
ইবন হিশাম বলেন: তাকে বন্দী করেছিলেন বনূ হারাম গোত্রের খিরাশ ইব্ন সিম্মা।
'ইব্ন ইসহাক বলেন: আবুল আস ধনে, বিশ্বস্ততায় ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মক্কার একজন গণ্যমান্য লোক ছিল। সে ছিল হালা বিন্ত খুওয়ায়লিদের পুত্র। খাদীজা (রা) ছিল তার খালা। খাদীজা (রা)-ই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন, যেন তাকে জামাতা করে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কখনও খাদীজা (রা)-এর কথা প্রত্যাখ্যান করতেন না। এটা ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বের কথা। সুতরাং তিনি আবুল আসের সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। খাদীজা (রা) তাকে নিজ সন্তানতুল্য মনে করতেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে যখন নবুওয়াতের মর্যাদার ভূষিত করলেন, তখন খাদীজা (রা) ও তাঁর কন্যাগণ তাঁর প্রতি ঈমান আনলেন ও তাঁকে বিশ্বাস করলেন। তারা সকলেই সাক্ষ্য দিলেন যে, তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য। মোটকথা তাঁরা তার দীনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু আবুল আস তার শিরকের উপরই অটল থাকল।
এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু লাহাবের পুত্র উতবার কাছে রুকায়্যা (রা) অথবা উম্মু কুলসুম (রা)-কে বিবাহ দিয়েছিলেন। অবশেষে যখন তিনি কুরায়שদের কাছে খোলাখুলিভাবে আল্লাহর দীন ও তজ্জনিত শত্রুতা প্রকাশ করলেন, তখন তারা বলল: তোমরা মুহাম্মদকে সর্ব প্রকার চিন্তা হতে মুক্ত করে দিয়েছ। তোমরা তাঁর মেয়েদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে দাও এবং তাদের চিন্তায় তাঁকে ডুবিয়ে রাখ। সেমতে তারা আবুল আসের কাছে গেল এবং তাকে বলল: তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ কর। এরপর তুমি কুরায়শের যে নারীকেই চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে দেব। আবুল আস বলল: না, আল্লাহ্র কসম! আমি আমার স্ত্রীকে ত্যাগ করব না। আর আমি তার পরিবর্তে আর কোন কুরায়ש রমণী চাই না।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে এ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) জামাতা হিসাবে আবুল আসের প্রশংসা করতেন। এরপর তারা আবু লাহাবের পুত্র উতবার কাছে গেল। তারা তাকে বলল: তুমি মুহাম্মদের কন্যাকে তালাক দাও, তুমি কুরায়שদের যে মহিলাকে বিয়ে করতে চাও আমরা তার সাথে তোমাকে বিয়ে দেব। সে বলল: তোমরা যদি আমাকে আবান ইবন সাঈদ ইব্ন আস অথবা সাঈদ ইব্ন আসের কন্যার সাথে বিয়ে দিতে পার, তাহলে আমি তাকে ত্যাগ করব। সুতরাং তারা তার সাথে সাঈদ ইব্ন আসের কন্যাকে বিবাহ দিয়ে দিল। ফলে সে তার স্ত্রীকে ত্যাগ করল। উল্লেখ্য তখনও নবী দুহিতার সাথে তার মিলন হয়নি। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সম্মান রক্ষার্থে উতবার হাত থেকে তাঁকে নিষ্কৃতি দিলেন। আর উত্তাকে করলেন লাঞ্ছিত। পরে উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়।
মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) (এরূপ আত্মীয়তাকে) না বৈধ করতেন, না অবৈধ। কেননা তিনি ছিলেন শত্রুদের চাপের মুখে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যয়নব (রা) ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর ও আবুল আস ইবন রাবী'-এর মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম ছিলেন না। এ পরিপ্রেক্ষিতে যয়নব ইসলামে বহাল থেকে তার সাথে বসবাস করতে থাকলেন; আর আবুল আস শিকের উপর অটল থাকল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হিজরত করেন এবং কুরায়শরা বদর পর্যন্ত এগিয়ে যায়, তখন এদের সাথে আবুল আস ইবন রাবী'ও যোগ দেয়। আবুল আস বদর যুদ্ধে অন্য বন্দীদের সাথে বন্দী হয় এবং মদীনাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আসে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ইয়াহইয়া ইব্ন আব্বাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা আব্বাদ (র)-এর সূত্রে এবং তিনি আয়েশা (রা) থেকে। তিনি বলেন:
মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দীদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ দিয়ে পাঠাল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যয়নব (রা) তাঁর স্বামী আবুল আস ইবন রাবী'র মুক্তির জন্য কিছু মালামাল পাঠিয়ে দিলেন। সে মালের মধ্যে ছিল একখানি হার, যা খাদীজা (রা) তাঁর বিদায়ের সময় তাঁর গলায় পরিয়ে আবুল আসের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আয়েশা (রা) বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হারখানি দেখলেন, তখন তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলেন এবং বললেন: যদি তোমরা ভাল মনে কর, তবে বন্দীকে বিনাপণে মুক্তি দিয়ে দাও এবং তার মাল তাকে ফেরত দিয়ে দাও। তখন সাহাবীগণ বললেন: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এরপর তাঁরা আবুল আসকে মুক্তি দিলেন এবং যয়নব (রা)-এর সমস্ত মালামাল ফেরত পাঠালেন।
📄 মদীনার পথে যয়নব (রা)
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবুল আসের কাছে থেকে ওয়াদা নিয়েছিলেন বা আবুল আস নিজেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, সে যয়নবকে মদীনায় আসার সুযোগ দেবে। এমনও হতে পারে যে, এটা আবুল আসের মুক্তির শর্ত ছিল, কিন্তু বিষয়টি না তার থেকে এবং না রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে স্পষ্ট হওয়ায় আমরা জানতে পারিনি প্রকৃত ঘটনা কি ছিল। আবুল আস মুক্তি পেয়ে যখন মক্কার উদ্দেশে বের হল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) জনৈক আনসারী সাহাবীসহ যায়দ ইব্ন হারিসা (রা)-কে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। তিনি তাদের বললেন: তোমরা 'বাত্ন ইয়াজাজ' নামক স্থানে গিয়ে অপেক্ষা করবে। যয়নব সেখানে এসে পৌছুবে, তখন তোমরা তাকে নিয়ে আমার কাছে চলে আসবে। নির্দেশমত তারা বের হয়ে পড়লেন। এ ঘটনাটি ছিল বদর যুদ্ধের একমাস পরে বা তার কাছাকাছি সময়ে। আবুল আস মক্কায় এসে যয়নবকে তার পিতার কাছে চলে যেতে বলল। সুতরাং তিনি যাত্রার প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর বর্ণনা করেন যে, আমি যয়নব (রা)-এর সূত্রে জানতে পেরেছি, তিনি বলেছেন: আমি আমার পিতার কাছে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, এ সময় একদিন উদ্বার কন্যা হিন্দ এসে আমার সাথে সাক্ষাৎ করল এবং বলল: হে মুহাম্মদ-তনয়া! শুনলাম আপনি নাকি পিতার কাছে চলে যেতে চাচ্ছেন? যয়নব (রা) বলেন: আমি বললাম, এমন ইচ্ছা আমার নেই। সে বলল: হে আমার চাচাত বোন, এমনটি করবেন না। যদি যেতে চান, আর পথ খরচার জন্য অর্থ-কড়ি দরকার পড়ে, তবে তা আমার কাছে বলবেন। আমি আপনার প্রয়োজন পূরণ করব। আমার কাছে কিছু চাইতে লজ্জাবোধ করবেন না। পুরুষদের মাঝে যা-কিছু চলছে, তা যেন আমাদের নারীদের মধ্যে অনুপ্রবেশ না করে।
যয়নব (রা) বলেন: আল্লাহ্র কসম! আমি জানতাম সে যা বলে তা করবে, কিন্তু তবু আমি তার ব্যাপারে সতর্ক থাকলাম। তাই আমি মদীনা-যাত্রার ইচ্ছার কথা তার কাছে অস্বীকার করলাম এবং ভিতরে ভিতরে আমার প্রস্তুতি সম্পন্ন করলাম।
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যখন প্রস্তুতি-পর্ব সমাপ্ত করে ফেললেন, তখন তাঁর দেবর অর্থাৎ তাঁর স্বামীর ভাই কিনানা ইবন রাবী' একটি উট নিয়ে এল। তিনি তাতে সওয়ার হলেন। কিনানা তার তীর-ধনুক সাথে নিল এবং তাকে নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে রওয়ানা হল। কিনানা উটের রশি টেনে আগে আগে চলছিল, আর যয়নব (রা) ছিলেন হাওদার ভেতর। কুরায়শদের কতিপয় লোক বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করল এবং তারা তাদের ধরার জন্য বের হয়ে গেল। 'যু-তুওয়া' নামক স্থানে পৌঁছে তারা তাদের ধরে ফেলল। সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি তাদের সামনে এল, সে ছিল হুবার ইব্ন আসওয়াদ ইবন মুত্তালিব ইব্ন আসাদ ইব্ন আবদুল উয্যা ফিহরী। হুবার তার বর্শা দ্বারা যয়নাব (রা)-কে ভয় দেখাল। তিনি ছিল হাওদার, ভিতর। বলা হয়: তিনি অন্তঃসত্তা ছিলেন। ফলে প্রচণ্ড ভয়ে তাঁর গর্ভপাত ঘটে যায়। তখন তাঁর দেবর কিনানা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল এবং তুণীর হতে তীর বের করে ধনুকে সংযোজন করল। এরপর বলল: আল্লাহ্র কসম! আমার কাছে যে-ই আসবে, আমি তাকে আমার তীরের নিশানা বানাব। এ অবস্থা দেখে সবাই তার থেকে পিছিয়ে গেল। আবূ সুফইয়ান একদল কুরায়শসহ তার সামনে এসে বলল: ওহে! তুমি আমাদের থেকে তোমার তীর সংযত কর। আমরা তোমার সাথে কথা বলি। কিনানা সংযত হল। তখন আবু সুফইয়ান আরও কাছে এসে, তার সামনে দাঁড়াল এবং বলল: তুমি কিন্তু কাজটি ঠিক করনি। তুমি প্রকাশ্য দিবালোকে এ মহিলাকে নিয়ে সকলের সামনে দিয়ে বের হলে, অথচ তুমি জান, আমরা কি মুসীবত ও বিপাকে আছি; মুহাম্মদের কারণে আমাদের মাঝে কী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে! তুমি যেভাবে প্রকাশ্যে সকলের চোখের সামনে তার মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে এলে, তাতে লোকে ভাববে, বদরে আমাদের যে সর্বনাশ ঘটে গেল, তদ্দরুন আমরা নিতান্তই অসহায় হয়ে পড়েছি। আমাদের চরম দুর্বলতা ও পর্যুদস্ত হওয়ার কারণেই তুমি এমনটি করতে পেরেছ। আমার জীবনের কসম! তার বাপ থেকে তাকে আটকে রাখার কোন প্রয়োজন আমাদের নেই। এভাবে প্রতিশোধ গ্রহণেরও কোন ইচ্ছা আমাদের নেই। কিন্তু তবু তুমি মেয়েটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। এরপর যখন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যাবে এবং লোকে বলবে, আমরা তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি, তখন গোপনে তুমি তাঁকে নিয়ে বের হয়ে যাবে এবং তাঁকে তাঁর পিতার কাছে পৌঁছে দেবে।
কিনানা তাই করল। এরপর যয়নব আরো কিছুদিন মক্কায় অবস্থান করলেন। অবশেষে যখন পরিস্থিতি শান্ত হল, তখন এক রাতে কিনানা তাকে নিয়ে বের হল এবং যায়দ ইব্ন হারিসা (রা) ও তাঁর সঙ্গীর কাছে তাঁকে সোপর্দ করল। তাঁরা তাঁকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে চলে আসলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) কিংবা বনূ সালিম ইব্ন আওফের ভ্রাতা আবূ খায়সামা (রা) যয়নব (রা)-এর ঘটনা সম্পর্কে বলেন, ইবন হিশাম বলেন: কবিতাটি আবূ খায়সামার:
"আমার কাছে এসে পৌঁছেছে যয়নবের প্রতি তাদের জঘন্য অন্যায় আচরণের সংবাদ, তাঁর সঙ্গে তারা এমন অমানবিক ব্যবহার করেছে, যার কল্পনাও মানুষ করতে পারে না। তাঁকে মক্কা থেকে নিয়ে আসায় মুহাম্মদ (সা)-এর কোন অসম্মান হয়নি, যদিও এ সময় আমাদের মাঝে যুদ্ধের অশুভ পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল।
যামযামের সাথে মৈত্রী, আর আমাদের সাথে যুদ্ধের কারণে আবূ সুফইয়ানকে চরমভাবে ব্যর্থ ও লজ্জিত হতে হয়েছে। আমরা তার পুত্র Amr এবং তার মিত্রকে ঝনঝন করে এমন মযবুত শেকলে বেঁধে ফেলেছি। আমি শপথ করে বলছি, আমাদের ছোট-বড় সেনাদল, সেনাপতি ও বিশেষ চিহ্নধারী সিপাহীর কোনদিন অভাব হবে না।
তারা কাফির কুরায়שদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলবে এবং উপর্যুপরি আক্রমণে তারা তাদের নাক ফুঁড়িয়ে রশি লাগাবে। আমরা নাজদ ও নাখলার আশেপাশে তাদের সাথে লড়াই করতে থাকব। তারা পদাতিক বা অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে তিহামায় ছাউনি ফেলে, তবে আমরাও সেখানে পৌঁছে যাব।
আর তাদের সাথে আমাদের এ যুদ্ধ চলবে যুগ যুগ ধরে। আমরা কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হব না। আমরা তাদের 'আদ' ও 'জুরহামের' দশা ঘটিয়ে ছাড়ব।
এ সম্প্রদায় মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসরণ না করার দরুন নিজেদের অবস্থার উপর এক সময় অনুতপ করবে, কিন্তু সে সময়ের অনুতাপ কোন কাজে আসবে না।
হে পথিক! আবূ সুফইয়ানের সাক্ষাৎ পেলে তাকে এ বার্তা পৌঁছে দিও যে, যদি তুমি আন্তরিকভাবে অবনত না হও এবং ইসলাম গ্রহণ না কর, তাহলে এ সুসংবাদ গ্রহণ কর, ইহকালে তুমি হবে লাঞ্ছিত, আর, জাহান্নামে তোমাকে পরানো হবে আলকাতরা মিশ্রিত স্থায়ী পোশাক।"
ইবন হিশাম বলেন: এক বর্ণনায় আছে, سریال نار অর্থাৎ আগুনের পোশাক।
এ কবিতায় আবূ সুফইয়ানের মিত্র বলে আমির ইবন হাযরামীকে বোঝান হয়েছে। সেও বদরের বন্দীদের মধ্যে ছিল। হারব ইবন উমাইয়ার সাথে তার মৈত্রী-চুক্তি ছিল।
ইবন হিশাম বলেন: এখানে আবূ সুফইয়ানের মিত্র বলে বরং উব্বা ইব্ন আবদুল হারিস ইবন হাযরামীকে বোঝান হয়েছে। আর আমির ইবন হাযরামী বদর যুদ্ধে নিহত হয়েছিল। যয়নব (রা)-কে ফিরিয়ে আনতে যারা গিয়েছিল, তারা মক্কায় ফিরে আসলে হিন্দ বিন্ত উত্তা তাদের কাছে গিয়ে বলল:
اني السلم اعيار جفاء وغلظه × وفى الحرب اشباه النساء العوارك
"এসব লোক কি শান্ত পরিবেশে গাধার মত নির্দয় ও কঠোর? আর যুদ্ধক্ষেত্রে ঠিক ঋতুমতী নারী?"
[রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রেরিত] ব্যক্তিদ্বয়ের কাছে যয়নব (রা)-কে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় কিনানা ইবন রাবী' বলেছিল:
"আমি হুবার ও তার গোত্রের দুর্বৃত্তদের আচরণে বিস্মিত হয়ে যাই যে, তারা চায় আমি মুহাম্মদ (সা)-তনয়ার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করি!
যতদিন আমি বেঁচে থাকব, ততদিন আমি তাদের সংখ্যাধিক্যের কোন পরওয়া করব না। আর যতক্ষণ আমার হাত হিন্দুস্তানের তৈরি সুতীক্ষ্ণ তরবারি দৃঢ়ভাবে ধরে থাকবে, ততক্ষণ আমি তাদের কোন তোয়াক্কা করব না।"
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ইয়াযীদ ইব্ন আবূ হাবীব বর্ণনা করেছেন—বুকায়র ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আশাজ্জ থেকে, তিনি সুলায়মান ইবন ইয়াসার থেকে, তিনি আবূ ইসহাক দাওসী থেকে এবং তিনি আবূ হুরায়রা (রা) থেকে। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি সেনাদল প্রেরণ করেন, যাতে আমিও ছিলাম। তিনি আমাদের এরূপ নির্দেশ দেন:
"তোমরা হুবার ইব্ন আসওয়াদ কিংবা তার সাথে যে লোকটি যয়নাবের দিকে সবার আগে অগ্রসর হয়েছিল, তাদের যদি পাকড়াও করতে পার, তবে তাদেরকে আগুনে জ্বালিয়ে দিও।"
ইবন হিশাম বলেন: ইবন ইসহাক তার বর্ণনায় অপর সেই লোকটির নাম বলেছেন নাফি' ইব্ন আব্দ কায়স।
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন: কিন্তু পরের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন: আমি তোমাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম যে, লোক দু'টিকে ধরতে পারলে আগুনে জ্বালিয়ে দেবে। কিন্তু পরে আমি চিন্তা করলাম, আল্লাহ্ ছাড়া আর কারও পক্ষে কাউকে আগুনে জ্বালিয়ে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়। অতএব তোমরা যদি তাদের নাগালের মধ্যে পাও, তবে তাদের হত্যা করবে।
📄 আবুল আস ইব্ন রবীআর ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন: আবুল আস মক্কায় ফিরে গেলেন এবং যয়নব মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে থাকতে লাগলেন। ইসলাম তাদের বিচ্ছেদ ঘটাল। পরে মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে আবুল আস ব্যবসা উপলক্ষে সিরিয়া চলে গেলেন। তার কাছে নিজের ও কুরায়শের ব্যবসার অর্থ ছিল। তা তাকে মূলধন হিসাবে দেয়া হয়েছিল। তিনি কেনাবেচা সম্পন্ন করে যখন ফিরে আসছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর একটি সেনাদল তার পণ্যদ্রব্য কেড়ে নিল এবং আবুল আস পালিয়ে আত্মরক্ষা করলেন। সেনাদল যখন তার পণ্যদ্রব্য নিয়ে মদীনায় পৌঁছল, তখন তিনি রাতের অন্ধকারে মদীনায় পৌঁছলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যয়নবের নিকট উপস্থিত হয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। যয়নব (রা) তাকে আশ্রয় দিলেন। তিনি তার জিনিসপত্র ফেরত চাইতে এসেছিলেন। সকালে রাসূলুল্লাহ্ (সা) লোকদের নিয়ে সালাত আদায় করার সময় যয়নব (রা) নারীদের কক্ষ থেকে চিৎকার করে বললেন: “হে জনগণ! শুনে রাখুন, আমি আবুল আস ইব্ন রবী'কে আশ্রয় দিয়েছি।” রাসূলুল্লাহ্ (সা) সালাম ফেরানোর পর সবার দিকে মুখ করে বললেন: হে জনগণ! "আমি যে কথা শুনেছি, তা কি তোমরাও শুনেছ?” সবাই বললেন: হ্যাঁ, শুনেছি। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: "আল্লাহর কসম! যাঁর হাতে আমার জীবন, এ ঘোষণা শুনবার আগে আমি কিছুই জানতাম না। চুক্তি অনুসারে যে কোন ব্যক্তি, যে কোন মুসলমানের নিকট আশ্রয় নিতে পারে।" এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যয়নবের কাছে গিয়ে বললেন: হে আমার প্রিয় কন্যা! আবুল আ'সকে সযত্নে রাখ। কিন্তু সে যেন নির্জনে তোমার কাছে না আসে। কেননা তুমি এখন তার জন্য হালাল নও।"
ইবন ইসহাক বলেন: যে সেনাদলটি আবুল আসের পণ্য কেড়ে নিয়ে এসেছিল, তাদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বার্তা পাঠালেন যে, এ ব্যক্তি তো আমাদের লোক, যা তোমরা জান। তোমরা তার মাল নিয়ে নিয়েছ। তোমরা ইচ্ছা করলে তার পণ্য ফেরত দিতে পার। আর আমি এটা পসন্দ করি। সেটা হবে তোমাদের মহানুভবতা। আর ইচ্ছা করলে গনীমত হিসাবে রেখেও দিতে পার। এটা তোমাদের হক। তখন তারা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা তার মাল ফিরিয়ে দেব। এরপর তাঁরা তার প্রতিটি জিনিস তাকে ফিরিয়ে দিলেন। তখন তিনি সেগুলো মক্কায় বহন করে নিয়ে গেলেন এবং কুরায়শের প্রতিটি জিনিস বুঝিয়ে ফেরত দিলেন। তারপর বললেন: হে কুরায়ש সম্প্রদায়! তোমাদের আর কারো কোন জিনিস কি আমার কাছে পাওনা আছে?
ইবন ইসহাক বলেন: আমাকে দাউদ ইবন হুসায়ন ইকরিমা থেকে, তিনি ইব্ন আব্বাস থেকে এ তথ্য শুনিয়েছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যয়নব (রা)-কে পূর্ব বিবাহের ভিত্তিতে, ছয় বছর পর তার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, বিবাহ দোহরাননি।
ইব্ন হিশাম বলেন: আমাকে আবু উবায়দা শুনিয়েছেন যে, যখন আবুল আস ইব্ন রবী' মুশরিকদের দ্রব্য-সামগ্রী নিয়ে সিরিয়া থেকে আগমন করলেন, তখন তাকে বলা হয়, তুমি কি চাও যে, ইসলাম গ্রহণ করবে এবং সেই সব দ্রব্য-সামগ্রী নিয়ে নেবে? কেননা এগুলো মুশরিকদের সম্পদ? আবুল আস বলেন: আমি কি আমার ইসলাম গ্রহণের শুরুতেই আমানতের খেয়ানত করব? এটা তো খুবই নিকৃষ্ট কাজ।
ইব্ন হিশাম বলেন: আমাকে আবদুল ওয়ারিস ইবন সাঈদ তানুরী, দাউদ ইব্ন আবূ হিন্দ থেকে, তিনি আমির শা'বী থেকে একই তথ্য শুনিয়েছেন যেমন শুনিয়েছেন আবু উবায়দা আবুল আস সম্পর্কে।
টিকা:
১. Amr ইব্ন শুআয়বের বর্ণিত হাদীসে উল্লেখ আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যয়নব (রা)-কে আবুল আসের কাছে, তার ইসলাম গ্রহণের পর পুনরায় বিবাহ দিয়েছিলেন। শরী'আতের আমল এ হাদীসের উপর।
📄 মুক্তিপণ ছাড়াই যাদের মুক্তি দেওয়া হয়েছিল
ইবন ইসহাক বলেন: বদরের বন্দীদের মধ্যে যাদের বিনা মুক্তিপণে অনুগ্রহ পূর্বক মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তাদের যে নাম আমাদের জানানো হয়েছে, তারা হল: বনু আব্দ শামস্ ইবন আবদ মানাফ-এর আবুল আস ইবন রবী' ইবন আবদুল উযযা ইবন আবদ শামস। যয়নব (রা) তাঁর মুক্তিপণ পাঠানোর পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর প্রতি অনুগ্রহ করেছিলেন।
বনু মাখযূম ইব্ন ইয়াকাযা-এর মুত্তালিব ইব্ন হানতাব ইবন হারিস ইবন উবায়দা ইব্ন Amr ইব্ন মাখযূম। তিনি হারিস ইন্ন খাযরাজ বংশীয় কয়েকজনের হাতে বন্দী ছিলেন। সুতরাং তাকে তাঁদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হলে তাঁরা তাকে মুক্ত করে দেন। এরপর তিনি তার সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হন।
ইবন হিশাম বলেন: তাকে বনূ নাজ্জারের লোক খালিদ ইব্ন যায়দ আবু আইয়ুব আনসারী (রা) বন্দী করেছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আর সায়ফী ইব্ন আবূ রিফা'আ ইব্ন আবিদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন Amr ইব্ন মাখযূম। তাকে তার গ্রেফতারকারীদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তার মুক্তিপণ নিয়ে কেউ না আসায় তারা তাকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে, সে ফিরে গিয়ে নিজেই মুক্তিপণ পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সে কিছুই আদায় করেনি।
হাসান সাবিত (রা)-এ সর্ম্পকে বলেন: "অঙ্গীকার পুরা করার লোক সায়ফী নয়, সে তো ক্লান্ত শৃগালের মত কোন জলাশয়ের কাছে পড়ে আছে।"
ইবন হিশাম বলেন: এ কবিতাটি তার একটি দীর্ঘ কবিতায় অংশবিশেষ।
ইবন ইসহাক বলেন: আবূ ইয্যা Amr ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইবন উসমান ইব্ন উহায়ব ইব্ন হুযাফা ইব্ন জুমাহ্ ছিল অভাবী, অনেক কন্যা সন্তানের পিতা। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে তার দুরাবস্থার কথা বর্ণনা করে তাঁর করুণা চাইল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) এই শর্তে তার প্রতি অনুগ্রহ করলেন যে, তাঁর বিপক্ষে গিয়ে কাউকে সাহায্য করবে না। আবূ উয্যা স্বগোত্রীয় লোকদের কাছে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করে বলেন:
কেউ কি আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদকে আমার এই বার্তা পৌঁছে দেবে যে, আপনি হক এবং আল্লাহ্ প্রশংসার অধিকারী।
আপনি সত্য ও সরল পথের দিকে আহবানকারী। আপনার সত্যতার প্রমাণে মহান আল্লাহ্ পক্ষ থেকে সাক্ষী রয়েছে।
মর্যাদায় আপনি এমন ব্যক্তি যে, আমাদের মাঝে অনেক উঁচু মর্যাদা হাসিল করে নিয়েছেন। যার স্তরগুলো অতিক্রম করা সহজ আবার কঠিনও।
আপনি এমন যে, যার সাথে আপনি যুদ্ধ করেন সে দুর্ভাগা শত্রু। আর যার সাথে আপনি সন্ধি করেন, সে সৌভাগ্যবান।
কিন্তু যখন আমাকে বদর ও বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন আমার হৃদয় অনুতাপ ও বেদনায় ভরে উঠে।