📄 পরাজয়ের সংবাদ
ইবন ইসহাক বলেন: এদিকে হায়সুমান ইব্ন আবদুল্লাহ্ খুযাঈ কুরায়শের শোচনীয় পরাজয়ের দুঃসংবাদ নিয়ে সর্বপ্রথম মক্কায় উপনীত হল। লোকেরা জিজ্ঞেস করল: সেখানকার খবর কি? সে বলল: উত্তবা ইব্ন রবী'আ, শায়বা ইব্ন রবীআ, আবুল হাকাম ইব্ন হিশام, উমায়া ইব্ন খাল্ফ, যামআ ইব্ন আস্তয়াদ, নবীহ ও মুনাব্বিহ ইব্ন হাজ্জাজ, আবুল বাখতারী ইন্ন হিশাম-এরা সবাই নিহত হয়েছে। হায়সুমান যখন নিহত কুরায়শ নেতাদের নাম এক এক করে বলছিল, তখন হাতীমে বসে থাকা সাফওয়ান ইবন উমায়্যা বলল: আল্লাহর কসম! যদি তার জ্ঞানবুদ্ধি ঠিক থেকে থাকে, তবে তোমরা একে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করল: আচ্ছা সাফওয়ান ইবন উমায়্যার খবর কি? সে বলল: সেতো হাতীমের মধ্যে বসে আছে। আল্লাহর কসম! আমি তার বাপ ও ভাইকে স্বচক্ষে নিহত হতে দেখেছি।
📄 মক্কার ঘরে ঘরে আর্তনাদ
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আযাদকৃত গোলাম আবূ রাফি বলেন, আমি এক সময় আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের গোলাম ছিলাম। এই পরিবারে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। আব্বাস, তাঁর স্ত্রী উম্মুল ফযল ও আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। আব্বাস কুরায়שদের ভয় পেতেন এবং তাদের বিরোধিতা করা অপসন্দ করতেন এবং নিজের মুসলমান হওয়ার ব্যাপারটা তিনি গোপন রাখতেন। তাঁর অনেক সম্পদ ছিল এবং বহু লোককে তিনি অর্থ দিয়ে রেখেছিলেন। আবু লাহাব বদর যুদ্ধে নিজে অংশগ্রহণ না করে, সে তার পরিবর্তে আসী ইবন হিশام ইবন্ মুগীরাকে পাঠিয়েছিল। অন্য লোকেরাও এরূপ করেছিল। যে নিজে যায়নি, সে তার বদলে অন্য একজনকে পাঠিয়েছিল। আবু লাহাব যখন বদরের পরাজয়ের কথা জানল, তখন আল্লাহ্ তাকে ভীষণ অপমানিত করলেন। কিন্তু আমরা সম্মানিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলাম। আমি দুর্বল ছিলাম। তীর বানাবার কাজ করতাম। যমযমের পাশে অবস্থিত তাঁবুতে বসে সেগুলো ঠিক করতাম। একদিন আমি ঐ কক্ষে বসে কাজ করছিলাম। তখন আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফযল আমার কাছেই বসা ছিলেন। আমরা কুরায়শের পরাজয়ের খবরে আনন্দিত হয়েছিলাম। এ সময় আবু লাহাব শোচনীয় অবস্থায় পা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এসে তাঁবুর এক কোণে আমার দিকে পিঠ দিয়ে বসল। হঠাৎ শাবূ সুফইয়ান ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব সেখানে এল। তখন আবু লাহাব তাকে বলল: আমার কাছে এস। তুমি তো সব খবর জান। ফলে সে সেখানে তার পাশে বসে পড়ল এবং অন্য লোকেরা তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আবু লাহাব জিজ্ঞেস করল: বাবা! তুমি তাদের খবর আমাকে বল। সে বলল: আল্লাহ্র কসম! আমরা যেন সেখানে শত্রুদের কাছে নিজেদের সোপর্দ করেছি। তারা যেমন খুশি আমাদের বধ করেছে ও বন্দী করেছে। আমি আমাদের লোকদের ভর্ৎসনা করিনি। কারণ আমরা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে ধূসর বর্ণের ঘোড়ার উপর অসংখ্য ফর্সা রঙের সিপাহী দেখেছি। যারা কাউকে রেহাই দেয়নি এবং কেউ তাদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। আমি বললাম: "তারা নিশ্চয়ই ফেরেশতা ছিলেন।" এ কথা বলামাত্রই আবু লাহাব আমার মুখে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় মারল। আমিও এর বদলা নিলাম। এরপর সে আমাকে উপরে উঠিয়ে যমীনে আছাড় দিল এবং আমার শরীরের ওপর বসে আমাকে মারতে লাগল। আর আমি ছিলাম একজন দুর্বল ব্যক্তি। এ সময় উম্মুল ফযল তাঁবুর একটি খুঁটি নিয়ে আবু লাহাবের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং খুঁটি দিয়ে আঘাত করে তার মাথা ফাটিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: আবূ রাফি'র মনিব এখানে নেই বলে তাকে দুর্বল ভেবেছ?
এরপর আবু লাহাব সেখান থেকে উঠে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গেল। আল্লাহ্র কসম! তারপর তার শরীরে বড় বড় ফোস্কা দেখা দিল এবং তাতেই সে সাত দিনের মধ্যেই মারা গেল।
ইবন ইসহাক বলেন: কুরায়ש গোত্র তাদের নিতহদের জন্য খুবই বিলাপ করল। কিন্তু অচিরেই সংযত হয়ে বলতে লাগল বেশি বিলাপ করো না। মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এ খবর জানলে উল্লসিত হবে, আর বন্দীদের মুক্তির জন্য কাউকে পাঠাবে না এখন কিছু বিলম্ব কর। অন্যথায় মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা কড়াকড়ির সাথে মুক্তিপণ আদায় করবে। আসওয়াদ ইব্ন আবদুল মুত্তালিব, তার দুই ছেলে-যাময়া' ইব্ন আসওয়াদ এবং আকীল ইব্ন আসওয়াদ এবং এক নাতি-হারিস ইব্ন যাম'আকে হারিয়েছিল। সে তার সন্তানদের বিয়োগ ব্যথায় কাঁদতে চাচ্ছিল। এ সময় গভীর রাতে সে এক শোকাহত নারীর কান্নার শব্দ শুনল। অন্ধ আসওয়াদ তার এক ভৃত্যকে বলল : "যাও তো, দেখে এস, এখন উচ্চস্বরে বিলাপ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে কিনা? দেখতো, কুরায়שরা তাদের নিহতদের জন্য কাঁদছে কিনা? তা হলে আমিও যামআর জন্য কাঁদব। কেননা আমার কলিজা জ্বলে যাচ্ছে।" গোলাম ফিরে এসে বলল: এক মহিলা তার উট হারিয়ে কাঁদছে। এ কথা শুনে আসওয়াদ একটি কবিতা আবৃত্তি করে বিলাপ করল। ঐ কবিতার অনুবাদ নিম্নরূপ:
"ঐ মহিলা একটি উটের জন্য এমন করে রাত জেগে বিলাপ করছে, এ কেমন কথা? হে মহিলা! তুমি জওয়ান উট হারানোর জন্য কেঁদো না, বরং বদরের মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণ করে কাঁদো, যেদিন আমাদের ভাগ্যের বিপর্যয় ঘটেছে। তুমি কাঁদো বদর যুদ্ধে নিহত নেতাদের স্মরণে-বনূ হুসায়ন, বনূ মাখযূম এবং আবুল ওয়ালীদের লোকদের জন্য। যদি তুমি কাঁদতেই চাও, তবে আকীল এবং বীর কেশরী হারিসের জন্য কাঁদো। এঁদের জন্য কাঁদতেই থাক, কাঁদায় বিরতি দিও না। আবূ হাকীমার তো কোন সমকক্ষই ছিল না। জেনে রাখ! ওদের মৃত্যুর পর এমন সব লোক নেতা হয়েছে, যদি বদর যুদ্ধ সংঘটিত না হত, তবে এরা কখনো নেতা হতে পারত না।"
ইবন ইসহাক বলেন: বদর যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে আবূ ওদা'আ ইব্ন্ন যবীরা সাহমীও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: মক্কায় তার একটা চতুর ছেলে আছে, যে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী। মনে হয় সে তার পিতাকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য এসেছে।
ওদিক কুরায়שরা বলাবলি করেছিল যে, তোমরা তোমাদের বন্দীদের ফিদয়া দিয়ে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করবে না, তাতে মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথীরা কঠোর হবে। এদিকে মুত্তালিব ইব্ন আবূ ওদা'আ - যার কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন, বলল : তোমরা ঠিকই বলেছ। তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না। কিন্তু সে গোপনে গভীর রাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে গেল এবং মদীনায় পৌঁছে চার হাজার দিরহাম দিয়ে তার পিতাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। এরপর কুরায়שরা তাদের বন্দীদের মুক্তির জন্য লোক পাঠাল। তখন মিকরায ইবন হাফস ইব্ন আখয়াফ-সুহায়ল ইব্ন আমরের মুক্তির জন্য এল। তাকে বনূ সালিম ইব্ন আওসের মালিক ইব্ন দাখশام (রা) বন্দী করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি সুহায়লকে বন্দী করেছি। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে বন্দী করতে আমি পসন্দ করিনি। বনু খিন্ন্দাফের এ কথা জানা আছে যে, সুহায়লই সে গোত্রের সাহসী পুরুষ। যখন যুলুমের বিনিময় গ্রহণের সময় আসে, তখন একমাত্র সাহসী যুবকই এর প্রতিশোধ নিতে পারে। আমি তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলে সে ঝুঁকে পড়ে এবং আমি ঐ ঠোঁটকাটার সঙ্গে যুদ্ধ করতে বাধ্য হই (উল্লেখ্য যে, সুহায়লের নীচের ঠোঁট কাটা ছিল)।
ইবন ইসহাক বলেন: উমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি অনুমতি দিলে আমি সুহায়লের সামনের উপর-নীচের দুটো করে দাঁত উপড়ে ফেলব। যাতে তার জিহবা বেরিয়ে আসে এবং আপনার বিরুদ্ধে আর বক্তৃতা দিতে না পারে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমি তার মুখ বিকৃত করব না। তা হলে নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্ আমার মুখ বিকৃত করবেন। ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) উমর (রা)-কে এ কথাও বলেছিলেন যে, এক সময় সুহায়ল এমন ভূমিকাও পালন করতে পারে যা তেমন নিন্দনীয় নয়। এ ভূমিকার কথা পরে উল্লেখ করা হবে (হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরায়শ পক্ষের প্রধান আলোচক ছিল এই সুহায়ল ইব্ন Amr)। ইবন ইসহাক বলেন: যখন মিকরায তাদের সঙ্গে সুহায়লের মুক্তির ব্যাপারে কথাবার্তা বলে তাদের সন্তুষ্টই করল, তখন তাঁরা বললেন: যা দেওয়ার আমাদের দিয়ে দাও। সে বলল: তার পরিবর্তে আমাকে বন্দী করে রাখুন। আর তাকে ছেড়ে দিন, যাতে সে আপনাদের কাছে তার ফিয়া পাঠাতে পারে। তখন তারা সুহায়লকে ছেড়ে দিলেন এবং মিকরাযকে বন্দী হিসাবে রেখে দিলেন। এ সময় মিকরায বলে: আমি সে যুবককে ছাড়াবার জন্য আটটি দামী উট দিয়েছি, জরিমানা গোলামরা নয়, শরীফরা আদায় করে থাকেন। আমি আমার হাতকে বন্দী রাখলাম। অথচ নিজকে বন্দী রাখার পরিবর্তে মাল বন্ধক রাখা সহজ ছিল। কিন্তু আমি অপমানিত হওয়াকে ভয় করেছি। আমি বললাম: সুহায়ল আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি। এজন্য আমাদের বাচ্চাদের জন্য তাকে নিয়ে যাও। যাতে আমি আশার আলো দেখতে পারি।
📄 আমর ইব্ন আবু সুফিয়ানের বন্দিদশা
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর বর্ণনা করেন যে, বদর যুদ্ধে যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাতে বন্দী হয়েছিল, Amr ইব্ন আবূ সুফইয়ান ইব্ন হারবও ছিল তাদের একজন। সে ছিল উব্বা ইন্ন আবু মু'আয়তের দৌহিত্র।
ইবন হিশাম বলেন: Amr ইব্ন আবু সুফইয়ানের মা ছিল আবু আমরের কন্যা এবং আবু মু'আয়ত ইব্ন আবূ আমরের বোন।
ইবন হিশাম বলেন: তাকে বন্দী করেছিলেন আলী ইব্ন আবু তালিব (রা)।
ইন্ন ইসহাক বলেন: আমার নিকট আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর বর্ণনা করেন যে, আবু সুফইয়ানকে বলা হত, তোমার ছেলে আম্রকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আন। সে বলল: আমার উপর একই সাথে আমার রক্ত ও আমার মাল একত্রিত হবে? তারা হানযালাকে হত্যা করেছে; এখন আবার Amrকে মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনব? থাকতে দাও তাকে তাদের হাতে। তারা তাকে যতদিন ইচ্ছা, বন্দী করে রাখুক।
রাবী বলেন: সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে মদীনায় বন্দী অবস্থায় কাটাচ্ছিল। ইত্যবসরে একদিন Amr ইব্ন আওফ গোত্রের শাখা বনূ মু'আবিয়ার সা'দ ইব্ন নু'মান ইব্ন আক্কাল উমরার উদ্দেশ্যে বের হন। সাথে ছিল তার যুবতী পত্নী। তিনি নিজে ছিলেন একজন বয়স্ক মুসলিম। মদীনার নিকটবর্তী নাকী'তে নিজ বকরীপাল নিয়ে থাকতেন। সেখানে থেকেই তিনি উমরার উদ্দেশ্যে বের হন। যে আচরণ তাঁর সাথে করা হয়, তার কোন আশংকা তাঁর মনে ছিল না। তিনি ধারণাই করতে পারেন নি যে, তাঁকে মক্কায় বন্দী করা হবে। কারণ তিনি যে উমরা করতে বের হয়েছেন! কুরায়שদের সাথে চুক্তি ছিল, যে কেউ হজ্জ বা উমরা করতে আসবে, তার সাথে তারা ভাল ছাড়া কোন মন্দ আচরণ করবে না। কিন্তু সুফইয়ান ইব্ন হারব ঠিকই আমরের প্রতি যুলুম করল এবং তার পুত্র Amrসহ তাকে মক্কায় বন্দী করে রাখল। এরপর আবূ সুফইয়ান বলল (কবিতা):
"হে ইব্ন আক্কালের দল! তোমরা সাড়া দাও তার ডাকে— তোমরা তো প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলে যে, এই বুড়ো সরদারকে দুশমনদের হাতে সোপর্দ করবে না। কেননা বনূ Amr অভদ্র ও নীচাশয় সাব্যস্ত হবে যদি না তারা মুক্তি দেয় তাদের শক্ত বাঁধনে আঁটা বন্দীকে।"
হাসান ইব্ন সাবিত (রা) এর জবাবে বলেন (কবিতা): "সে দিন মক্কায় সা'দ যদি মুক্ত থাকত, তবে নিজে বন্দী হওয়ার আগে সে তোমাদের বহুজনকে হত্যা করত, সে হত্যা করত তার তীক্ষ্ণ তরবারি দিয়ে, নয়ত সেই তীর দিয়ে যা নাব্আ কাঠের তৈরি, যখন তা নিক্ষেপের সময় ধনুক থেকে সশব্দে বেরিয়ে যায়।"
বনূ Amr ইব্ন আওফ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে সাক্ষাৎ করল এবং তাঁকে সা'দ ইব্ নু'মানের সংবাদ জানিয়ে আবেদন করল যে, তিনি যেন Amr ইবন আবূ সুফইয়ানকে তাদের হাতে সোপর্দ করেন। তাহলে তার বিনিময়ে তারা তাদের লোককে ছাড়িয়ে আনবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের অনুরোধ রক্ষা করলেন। তারা তাকে আবূ সুফইয়ানের কাছে পাঠিয়ে দিল। ফলে আবূ সুফইয়ানও সা'দকে মুক্তি দিল।
📄 নবী দুহিতা যয়নব ও তাঁর স্বামী আবুল আস-এর কাহিনী
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জামাতা, তাঁর কন্যা যয়নাব (রা)-এর স্বামী আবুল আস ইব্ন রবী' ইব্ন আবদুল উয্যা ইব্ন আব্দ শামস-ও বন্দীদের মধ্যে ছিল।
ইবন হিশাম বলেন: তাকে বন্দী করেছিলেন বনূ হারাম গোত্রের খিরাশ ইব্ন সিম্মা।
'ইব্ন ইসহাক বলেন: আবুল আস ধনে, বিশ্বস্ততায় ও ব্যবসা-বাণিজ্যে মক্কার একজন গণ্যমান্য লোক ছিল। সে ছিল হালা বিন্ত খুওয়ায়লিদের পুত্র। খাদীজা (রা) ছিল তার খালা। খাদীজা (রা)-ই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলেছিলেন, যেন তাকে জামাতা করে নেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) কখনও খাদীজা (রা)-এর কথা প্রত্যাখ্যান করতেন না। এটা ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বের কথা। সুতরাং তিনি আবুল আসের সাথে নিজ কন্যার বিবাহ দেন। খাদীজা (রা) তাকে নিজ সন্তানতুল্য মনে করতেন। এরপর আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে যখন নবুওয়াতের মর্যাদার ভূষিত করলেন, তখন খাদীজা (রা) ও তাঁর কন্যাগণ তাঁর প্রতি ঈমান আনলেন ও তাঁকে বিশ্বাস করলেন। তারা সকলেই সাক্ষ্য দিলেন যে, তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তা সত্য। মোটকথা তাঁরা তার দীনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলেন। কিন্তু আবুল আস তার শিরকের উপরই অটল থাকল।
এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু লাহাবের পুত্র উতবার কাছে রুকায়্যা (রা) অথবা উম্মু কুলসুম (রা)-কে বিবাহ দিয়েছিলেন। অবশেষে যখন তিনি কুরায়שদের কাছে খোলাখুলিভাবে আল্লাহর দীন ও তজ্জনিত শত্রুতা প্রকাশ করলেন, তখন তারা বলল: তোমরা মুহাম্মদকে সর্ব প্রকার চিন্তা হতে মুক্ত করে দিয়েছ। তোমরা তাঁর মেয়েদের তাঁর কাছে ফিরিয়ে দাও এবং তাদের চিন্তায় তাঁকে ডুবিয়ে রাখ। সেমতে তারা আবুল আসের কাছে গেল এবং তাকে বলল: তুমি তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ কর। এরপর তুমি কুরায়শের যে নারীকেই চাও, আমরা তাকে তোমার সাথে বিয়ে দিয়ে দেব। আবুল আস বলল: না, আল্লাহ্র কসম! আমি আমার স্ত্রীকে ত্যাগ করব না। আর আমি তার পরিবর্তে আর কোন কুরায়ש রমণী চাই না।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে এ বর্ণনা পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) জামাতা হিসাবে আবুল আসের প্রশংসা করতেন। এরপর তারা আবু লাহাবের পুত্র উতবার কাছে গেল। তারা তাকে বলল: তুমি মুহাম্মদের কন্যাকে তালাক দাও, তুমি কুরায়שদের যে মহিলাকে বিয়ে করতে চাও আমরা তার সাথে তোমাকে বিয়ে দেব। সে বলল: তোমরা যদি আমাকে আবান ইবন সাঈদ ইব্ন আস অথবা সাঈদ ইব্ন আসের কন্যার সাথে বিয়ে দিতে পার, তাহলে আমি তাকে ত্যাগ করব। সুতরাং তারা তার সাথে সাঈদ ইব্ন আসের কন্যাকে বিবাহ দিয়ে দিল। ফলে সে তার স্ত্রীকে ত্যাগ করল। উল্লেখ্য তখনও নবী দুহিতার সাথে তার মিলন হয়নি। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর সম্মান রক্ষার্থে উতবার হাত থেকে তাঁকে নিষ্কৃতি দিলেন। আর উত্তাকে করলেন লাঞ্ছিত। পরে উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর সাথে তাঁর বিবাহ হয়।
মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) (এরূপ আত্মীয়তাকে) না বৈধ করতেন, না অবৈধ। কেননা তিনি ছিলেন শত্রুদের চাপের মুখে। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যয়নব (রা) ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর ও আবুল আস ইবন রাবী'-এর মাঝে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদেরকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে সক্ষম ছিলেন না। এ পরিপ্রেক্ষিতে যয়নব ইসলামে বহাল থেকে তার সাথে বসবাস করতে থাকলেন; আর আবুল আস শিকের উপর অটল থাকল। অবশেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন হিজরত করেন এবং কুরায়শরা বদর পর্যন্ত এগিয়ে যায়, তখন এদের সাথে আবুল আস ইবন রাবী'ও যোগ দেয়। আবুল আস বদর যুদ্ধে অন্য বন্দীদের সাথে বন্দী হয় এবং মদীনাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আসে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট ইয়াহইয়া ইব্ন আব্বাদ ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন যুবায়র বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা আব্বাদ (র)-এর সূত্রে এবং তিনি আয়েশা (রা) থেকে। তিনি বলেন:
মক্কাবাসীরা যখন তাদের বন্দীদের মুক্তির জন্য মুক্তিপণ দিয়ে পাঠাল, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কন্যা যয়নব (রা) তাঁর স্বামী আবুল আস ইবন রাবী'র মুক্তির জন্য কিছু মালামাল পাঠিয়ে দিলেন। সে মালের মধ্যে ছিল একখানি হার, যা খাদীজা (রা) তাঁর বিদায়ের সময় তাঁর গলায় পরিয়ে আবুল আসের কাছে পাঠিয়েছিলেন। আয়েশা (রা) বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হারখানি দেখলেন, তখন তিনি দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে উঠলেন এবং বললেন: যদি তোমরা ভাল মনে কর, তবে বন্দীকে বিনাপণে মুক্তি দিয়ে দাও এবং তার মাল তাকে ফেরত দিয়ে দাও। তখন সাহাবীগণ বললেন: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এরপর তাঁরা আবুল আসকে মুক্তি দিলেন এবং যয়নব (রা)-এর সমস্ত মালামাল ফেরত পাঠালেন।